বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবলে বিদেশি খেলোয়াড় ও কোচের পদচারণা শুরু সেই সত্তরের দশকে। ঐতিহ্যবাহী মোহামেডান স্পোটিং ক্লাব প্রথম বিদেশি ফুটবলার আনা দল। ১৯৭৪ সালে মোহামেডানে খেলে গেছেন সি প্রসাদ ও সি প্রভাকর মিশ্র নামের দুই ভারতীয় ফুটবলার।
ওই সময়ে মোহামেডান ও আবাহনীতে খেলা কয়েকজন ফুটবলারের সাথে কথা বলে এতটুকু নিশ্চিত হওয়া গেছে, প্রসাদ আর প্রভাকরই হচ্ছেন বাংলাদেশের ঘরোয়া আসরে খেলতে আসা প্রথম বিদেশি ফুটবলার।
আরেক ঐতিহ্যবাহী ক্লাব আবাহনীর হাত ধরে একই বছর প্রথম বিদেশি কোচ আসেন বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবলে। উইলিয়াম বিল হার্ট নামের আইরিশ কোচ বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবলে প্রথম বিদেশি হিসেবে আবাহনীর ডাগআউটে দাঁড়িয়েছিলেন।
অর্ধশত বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবলে বিদেশি কোচ ও খেলোয়াড় আসছেন। আশির দশক থেকে বিদেশি ফুটবলারদের পদচারণা বাড়তে থাকে। ওই সময় থেকে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের ফুটবলারদের প্রাধান্য হতে থাকে এই দেশের ক্লাবগুলোতে। সেই ধারা এখনও চলমান। ২০০৭ সালে দেশে পেশাদার ফুটবল চালু হওয়ার পর থেকেও দেখা যাচ্ছে, যে ক্লাব মাঠে প্রাধান্য দেখাচ্ছে তার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছেন বিদেশি ফুটবলাররা।
তবে বিগত চার বছর ধরে সেই বিদেশি ফুটবলার আর কোচদের পারিশ্রমিক নিয়ে বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবলে চলছে অস্থিরতা। অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ শেষে বিষয়টি গড়াচ্ছে ফিফার দরবার পর্যন্ত। সেখানে গিয়ে বাংলাদেশের ক্লাবগুলোর বিপক্ষেই চুক্তি অনুযায়ী ফুটবলারদের পারিশ্রমিক না দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হচ্ছে। তাতে ফিফা ক্লাবগুলোর বিরুদ্ধে নিচ্ছে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক নিয়ে টালবাহানার শাস্তি ট্রান্সফার ব্যান বা নিষেধাজ্ঞা। এক, দুই বা তিন মৌসুমের জন্য ক্লাবগুলোর ওপর দলবদলে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হচ্ছে।
২০০৯-১০ মৌসুমে ঘরোয়া ফুটবলের শীর্ষ লিগে নাম লেখানোর পর সাত আসর টিকে থাকা ফেনী সকার ক্লাবের বিপক্ষে বিদেশি ফুটবলারদের পরিশ্রমিক না দেওয়ার অভিযোগ গড়িয়েছিল ফিফায়। ক্লাবটির বিপক্ষে দলবদলে নিষেধাজ্ঞা এসেছিল ২০২২ সালে। তবে তার আগেই ক্লাবটির অবনমন হয় শীর্ষ লিগ থেকে।
এরপর শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব, শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র, ফকিরেরপুল ইয়ংমেন্স ক্লাব, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব লিমিটেড, আবাহনী লিমিটেড এবং বসুন্ধরা কিংসের ওপর আসে ফিফার দলবদলের নিষেধাজ্ঞা। মোহামেডান অভিযোগকারী খেলোয়াড়ের পাওনা পরিশোধ করে মামলাটি আগেই ফয়সালা করে নিষেধাজ্ঞামুক্ত হয়েছে। শেখ রাসেলও মুক্ত হয়েছিল। তবে শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র ও শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব আর লিগে খেলছে না। এখন বাংলাদেশ ফুটবল লিগের তিন ক্লাব- বসুন্ধরা কিংস, আবাহনী লিমিটেড ও ইয়ংমেন্স ক্লাব তাদের কাঁধে থাকা নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্ত হতে লড়াই করছে।
আরও পড়ুন
ফিফার নিষেধাজ্ঞা ঝড়ে টালমাটাল বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবল
অভিযোগ ওঠে, শাস্তি হয়। আবার সেই শাস্তি মওকুফ করিয়ে খেলা চালিয়ে যায় ক্লাবগুলো। এভাবেই চলে আসছিল। তবে আগামী ২০২৬-২৭ মৌসুম সামনে রেখে এই ইস্যুটি ভয়ংকর রূপ নিয়েছে।
বিশেষ করে আলোচনায় বর্তমান চ্যাম্পিয়ন বসুন্ধরা কিংস ও রানার্সআপ আবাহনী। এ মুহূর্তে দেশের শীর্ষ দুই ক্লাব নতুন মৌসুমে খেলতে পারবে কিনা তা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। বসুন্ধরা কিংসের বিপক্ষে আছে ফিফার ১৪টি নিষেধাজ্ঞা এবং আবাহনীর বিপক্ষে ৩টি।
বিভিন্ন তথ্য ঘেঁটে দেখা গেছে একটি ক্লাবের বিপক্ষে একসাথে ফিফার ১৪টি নিষেধাজ্ঞা থাকা নজিরবিহীন ঘটনা। আবাহনী ও কিংসকে ফিফার নিষেধাজ্ঞামুক্ত হয়ে লিগে খেলার সুযোগ দিতে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) বারবার ঘরোয়া ফুটবলের ক্লাব লাইসেন্সিংয়ের এবং খেলোয়াড় তালিকা জমা দেওয়ার সময় বৃদ্ধি করছে। সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী ১৭ আগস্টের পর আর কোনো সুযোগ থাকবে না এই দুই ক্লাবের, যদি আর সময় বাড়ানো না হয়। শেষ পর্যন্ত কিংস ও আবাহনী লিগে খেলতে না পারলে সেটা দেশের ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় লজ্জাজনক ঘটনা হিসেবে রেকর্ড হয়ে থাকবে।
এতদিন হয়নি। এখন কেন এমন হচ্ছে? এই প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসছে ফুটবলাঙ্গনে। এটা কি ক্লাবগুলোর পেশাদারিত্বের অভাব? নাকি অজ্ঞতা? দেশের ফুটবলের অভিজ্ঞ সংগঠক আনোয়ারুল হক হেলাল। এক সময় মোহামেডানের ফুটবল দল পরিচালনায় সক্রিয় ছিলেন। তখন সাদাকালোদের বিদেশি ফুটবলার আনার ক্ষেত্রে তিনিই মূল ভূমিকা পালন করতেন। পরে দায়িত্ব পালন করেছেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) ও সাউথ এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের (সাফ) সাধারণ সম্পাদকের।
অভিজ্ঞ এই সংগঠক বলেন, ‘এখন ফিফার নিয়ম-কানুন অনেক কঠিন হয়ে গেছে। আগে বিদেশি ফুটবলার বা কোচ আনতে লিখিত কোনো চুক্তি হতো না। মৌখিকভাবেই সব হতো। তাই কোনো ফুটবলার ক্লাবের বিপক্ষে পারিশ্রমিক নিয়ে অভিযোগ তুললেও তিনি ফিফা পর্যন্ত যেতে পারতেন না। ফিফায় আপত্তি জানালে কোনো লাভও হতো না। কারণ, তখন সবকিছু ছিল অ্যামেচার। এখন পেশাদার ফুটবলে সবকিছুই ফিফার নজরে আছে। এখন ডান-বাম করার কোনো সুযোগ নেই।’
একটি ক্লাবের বিপক্ষেই ১৪টি নিষেধাজ্ঞা! কিভাবে দেখছেন আনোয়ারুল হক হেলাল? ‘হতে পারে তাদের অর্থ সংকট বা টেকনিক্যাল কোনো কারণে এমন হয়েছে।’
আরও পড়ুন
ফিফার ট্রান্সফার নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পাওয়ার পথে আবাহনী
ক্লাবগুলোর কাছে অভিজ্ঞ এই সংগঠকের বার্তা পরিস্কার, ‘আমি মনে করি, যার যতটুকু ক্ষমতা সেভাবেই খেলোয়াড় বা কোচ রিক্রুট করা উচিত। ওভার ট্রেডিং মোটেও উচিত হবে না। এখন যদি এই ইস্যুতে কোনো ক্লাব লিগ খেলতে না পারে সেটা হবে দেশের ফুটবলের জন্য দুঃসবাদ ও ইজ্জতের বিষয়। যার যেটুকু ক্ষমতা সেভাবেই করা উচিত।’
বাস্তবতা দুটোই। আগে কোচ-খেলোয়াড়দের সাথে চুক্তি ছিল অনেকটা মৌখিক বা আধা-আনুষ্ঠানিক। টাকার অঙ্ক ছোট ছিল, খেলোয়াড়রাও ফিফার দ্বারস্থ হওয়ার কথা কম ভাবত। এখন অনেকের চুক্তির অঙ্ক কোটি টাকায় পৌঁছেছে, বিদেশি খেলোয়াড় ও তাদের এজেন্টরাও সচেতন। ফিফার প্লেয়ার্স স্ট্যাটাস কমিটি এখন অনেক কঠোর। চুক্তি অনুযায়ী অর্থ না দিলে বা একতরফা চুক্তি ভেঙে দিলে নিষেধাজ্ঞা অনিবার্য। আগে এ নিয়ম এত কঠোরভাবে প্রয়োগ হতো না।
আরও পড়ুন
বসুন্ধরা কিংসের ওপর ফিফার নিষেধাজ্ঞা
দেশের ফুটবলের সার্বিক চিত্রও দুর্বল। ক্লাবগুলোর আর্থিক স্বচ্ছতা নেই, স্পনসরশিপ অনিয়মিত, অনেক সময় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কমিটি বদলে গেলে আগের চুক্তি অস্বীকার করার প্রবণতাও আছে। মৌখিক সমঝোতা বা দুর্বল প্রমানাদির কারণেও বিরোধ বাড়ে। স্থানীয় খেলোয়াড়রা বছরের পর বছর বকেয়া পেয়েও চুপ থাকেন, কিন্তু বিদেশিরা ফিফায় যান এটাই এখন নিয়ম।
এটা যে শুধু ক্লাবগুলোর অজ্ঞতা তা নয়। অজ্ঞতার পাশাপাশি পেশাদারিত্বের অভাবও মূল সমস্যা। চুক্তি মেনে চলা, সময়মতো পারিশ্রমিক না দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রমানাদি নিশ্চিত না করলে নিষেধাজ্ঞা থামবে না। ফিফার নিয়ম এখন আর আগের মতো নমনীয় নয়। ক্লাবগুলোকে এই বাস্তবতা মেনে নিতে হবে, নইলে ঘরোয়া ফুটবল আরও পিছিয়ে পড়বে।
সাবেক তারকা ফুটবলার আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু এর জন্য প্রধানত পেশাদারিত্বের অভাবকেই দায়ী করেছেন। তার বক্তব্য পরিস্কার, ‘আমাদের ক্লাবগুলোর পেশাদারিত্বের অভাব চরমে। ক্লাব কর্মকর্তারা ফিফা ও এএফসির কোনো নিয়মে কর্ণপাত করতে চান না। আসলে ফিফা কত বড় শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান সে সম্পর্কে তাদের পুরোপুরি ধারণাই নেই। আমরা যা করবো সেটাই ঠিক- এমন ধারণা সবার মধ্যে। অজ্ঞতা, একঘুঁয়েমি মিলেই এই দশা।’
আবাহনী, শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব ও বাফুফের বিভিন্ন পদে থেকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা এই সংগঠক ও সাবেক তারকা ফুটবলার আশা করছেন হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে। তবে তিনি মনে করেন, ‘যদি সেটা না হয় এবং চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ দল লিগে খেলতেই না পারে সেটা হবে দেশের ফুটবলের জন্য চরম লজ্জার। বিশ্বকাপ ফুটবলে আমাদের উম্মাদনা এবং হামজা দেওয়ান চৌধুরীর আগমনের পর অনেক দেশের নজরে বাংলাদেশের ফুটবল। ফিফার অনেক নিয়েম বদলেছে। এই ঘটনা কেবল ভুক্তিভোগী কয়েকটি ক্লাবের জন্যই নয়, দেশের সব ক্লাবের জন্যই শিক্ষনীয়। আমি অবাক হয়েছি যে, বসুন্ধরা কিংসের মতো ক্লাবের ওপর ১৪টি ব্যান! এটাই কি ক্লাবটির পেশাদারিত্বের নমুনা? আসলে এখন সব নিয়ম কানুন মেনে চলতে হবে। এই ঘটনার পর আর অনিয়ম করার সুযোগ নেই।’
ক্লাবই দোষী? ফুটবলার কি ফিফার সহানুভূতি পান?
দেশের ঘরোয়া ফুটবলে পারিশ্রমিক বকেয়ার কারণে ক্লাবগুলোর ওপর ফিফার ট্রান্সফার ব্যানের ঘটনা যেন নিয়মিত হয়ে পড়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই সংকটে ক্লাবই কি একমাত্র দোষী? নাকি ফুটবলাররা ফিফার সহানুভূতি পাচ্ছেন এবং ক্লাবগুলো একতরফাভাবে শাস্তি ভোগ করছে?
মূলতঃ ফিফার নিয়ম কঠোর। ফিফার রেগুলেশনস অন দ্য স্ট্যাটাস অ্যান্ড ট্রান্সফার অব প্লেয়ার্স (আরএসটিপি) অনুযায়ী চুক্তি দুই পক্ষের জন্যই বাধ্যতামূলক। ক্লাব যদি নির্ধারিত সময়ে পারিশ্রমিক না দেয়, খেলোয়াড় চুক্তি বাতিল করে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেন এবং ক্লাবের ওপর নিবন্ধন নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়।
আরও পড়ুন
ফিফার নিষেধাজ্ঞা মুক্ত হতে আরো চারদিন সময় পেলো আবাহনী-কিংস
অন্যদিকে, খেলোয়াড় যদি যথাযথ কারণ ছাড়া চুক্তি ভেঙে চলে যান, তিনি ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য এবং নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য খেলা থেকে নিষিদ্ধও হতে পারেন। ওই ফুটবলারের নতুন ক্লাবও যৌথভাবে দায়ী হতে পারে। অর্থাৎ ফিফার নিয়ম একতরফা নয়।
তবুও বাস্তবে পারিশ্রমিক সংক্রান্ত বিরোধে শাস্তি প্রায় সব সময় ক্লাবের দিকেই যায়। এমনটি কেন হয়? বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মূল সমস্যা ক্লাবগুলোর আর্থিক অব্যবস্থাপনা ও চুক্তি মেনে না চলা। অনেক ক্লাব মৌখিক বা দুর্বল কাগজপত্রের ভিত্তিতে খেলোয়াড় দলে নেয়। পরে অর্থ সংকট বা কমিটি পরিবর্তনের কারণে পারিশ্রমিক আটকে যায়। বিদেশি খেলোয়াড় ও কোচরা তখন সরাসরি ফিফায় অভিযোগ করেন। ফিফা খেলোয়াড়কে ‘দুর্বল পক্ষ’ হিসেবে দেখে এবং ক্লাবের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়।
স্থানীয় খেলোয়াড়রা বছরের পর বছর বকেয়া পেয়েও ফিফায় যান না। তারা বাফুফের প্লেয়ার্স স্ট্যাটাস কমিটির ওপর নির্ভর করেন, যেখানে প্রক্রিয়া ধীরগতির। বিদেশিরা ফিফায় যান। তাদের অভিযোগই প্রাধান্য পায় এবং রায়টাও তাদের পক্ষে যায়। স্থানীয় অনেক ফুটবলার দাবি করতে থাকেন, তারা ক্লাবগুলোর কাছে পারিশ্রমিক পান। তাদের আর্জি বড়জোর বাফুফে পর্যন্ত। এ বিষয়ে সাবেক ফুটবলার জাহিদ হাসান এমিলি বলেন, ‘স্থানীয় ফুটবলাররা ক্লাবগুলোকে আসলে বাঁচিয়েই দেন। তবে আগামীতে দেখবেন, এমন অনিয়ম হলে স্থানীয় ফুটবলাররাও ফিফা পর্যন্ত পৌঁছে যাবেন। এবারের ঘটনা কিন্তু সবার জন্যই সতর্ক সংকেত।’
নতুন মৌসুম শুরুর দ্বারপ্রান্তে এসেও দেশের শীর্ষ দুই ক্লাবের অংশ নেওয়াটা অনিশ্চিত। এর কারণ হিসেবে এমিলি ক্লাবগুলোর গাফিলতিকেই দায়ী করছেন। তিনি বলেন, ‘কোচ ও খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক নিয়ে এই যে ঝামেলা তৈরি হয়েছে, তা ক্লাবকর্তাদের ইচ্ছেমতো কাজ করার কারণে। স্থানীয় ফুটবলারদের ইস্যুটা ক্লাবগুলো ফাঁকফোকর দিয়ে পার পেয়ে গেলেও বিদেশিদের অভিযোগগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। আমাদের এই লিগ তো পেশাদার কাঠামোর মধ্যেই পড়ে না। দেখেন, কয়েকবার দলবদলের তারিখ পেছানো হয়েছে। কিংস, আবাহনীর মতো দল আজ পর্যন্ত দলবদল করতেই পারছে না। এটা লজ্জাজনক। চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ দলের যদি এমন হয়, তাহলে ছোট ছোট ক্লাবের কী অবস্থা হবে? আমরা বসুন্ধরা কিংসকে পেশাদার ক্লাবের উদাহরণ হিসেবে দেখতাম। এখন তাদের ওপর ১৪টি নিষেধাজ্ঞা। এটা কী করে হয়? যাদের অন্য ক্লাব রোলমডেল হিসেবে দেখত, সেই ক্লাবেরই এই অবস্থা। এটা অন্য সব ক্লাবের জন্যও সতর্কবার্তা। এখন থেকে সব নিয়ম-কানুন মেইনটেইন করে কাজ করতে হবে।’
আরও পড়ুন
আবাহনী-কিংসকে আরো ৬ দিন সময় দিলো বাফুফে
অনেকের মতো ফুটবলাররা ফিফার অনুকম্পা পান। বিষয়টি সেভাবে ঠিক নয়। কারণ ফুটবলাররাও নানা কারণে ফিফার শাস্তি ভোগ করে থাকেন। নিজ নিজ ক্লাবও ফিফার আইনের ভিত্তিতে ফুটবলারদের শাস্তি দিয়ে থাকে। খেলোয়াড়রা শাস্তি পান মূলত ম্যাচ ফিক্সিং, অসদাচরণ বা চুক্তি ভঙ্গের ক্ষেত্রে। কিন্তু পারিশ্রমিক ইস্যুতে তাদের শাস্তি সেভাবে দেখা যায় না। কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ক্লাবই আগে চুক্তি ভঙ্গ করে। আর ফুটবলাররা তাদের এজেন্টদের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েই ফিফায় যান।
সমস্যা শুধু ক্লাবের নয়, তবে ক্লাবই অনেক ক্ষেত্রে মূল দায়ী। পেশাদারিত্বের অভাব, আর্থিক স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং দুর্বল চুক্তি ব্যবস্থাপনাই সংকটের মূল কারণ। ফিফার সহানুভূতি খেলোয়াড়দের প্রতি বেশি মনে হলেও, বাস্তবে এটি চুক্তিভিত্তিক অধিকার রক্ষার নীতি। ক্লাবগুলো যদি সময়মতো পারিশ্রমিক দেয়, স্বচ্ছ চুক্তি করে এবং প্রমাণাদি ঠিক রাখে, তাহলে নিষেধাজ্ঞার এই চক্র ভাঙা সম্ভব। অন্যথায় ঘরোয়া ফুটবল আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সহ-অধিনায়ক প্রতাপ শঙ্কর হাজরা যখন ফুটবল খেলেছেন, তখন থেকেই বিদেশিদের আনাগোনা শুরু। তার মতে, এখন যতটা কঠিন নিয়ম, তাদের সময় তেমন ছিল না। তখন মুখের কথায় ক্লাবগুলো কোচ ও ফুটবলার নিয়োগ দিত। প্রতাপ শঙ্কর হাজরা বলেন, ‘আগে অ্যামেচার ফুটবল ছিল। একটা সময় পেশাদার ফুটবলাররা অলিম্পিক ও এশিয়ান গেমসে খেলতে পারতেন না। তাই ‘আন্ডার টেবিল পেমেন্টের’ মাধ্যমে বিভিন্ন ক্লাবে অ্যামেচার হিসেবে খেলতেন। এখন সব পেশাদার। তাই ফুটবলাররা যেমন ক্লাবকে দ্রুত আটকাতে পারেন, ক্লাবও পারে ফুটবলারদের দ্রুত আটকাতে। আগে বিদেশি কোচ বা ফুটবলার আসতেন। টাকা দিলে খেলতেন, না দিলে খেলতেন না। ওই পর্যন্তই। এখন তো পান থেকে চুন খসলেই ফিফায় নালিশ চলে যায়। সময় বদলেছে, নিয়ম বদলেছে। তাই ক্লাব ও ফুটবলারদের সেই নিয়ম মেনেই সবকিছু করতে হবে।’
কী আছে ফিফার আরএসটিপি নিয়মে?
ফিফার আরএসটিপি হলো বিশ্ব ফুটবলে খেলোয়াড়ের স্ট্যাটাস, চুক্তি ও ট্রান্সফার নিয়ন্ত্রণের মূল বিধিমালা। এটি খেলোয়াড় ও ক্লাব উভয়ের অধিকার রক্ষা করে এবং চুক্তির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে। আরএসটিপির গুরুত্বপূর্ণ দুটি ধারা হলো- ক্লাব যদি নির্ধারিত সময়ে পারিশ্রমিক না দেয়, তাহলে প্রমাণ সাপেক্ষে নির্দিষ্ট একটি সময়ে শাস্তি পেতে পারে।
দুই মাস বেতন না দিলে খেলোয়াড় লিখিত নোটিশ দিয়ে ১৫ দিন সময় দিয়ে চুক্তি বাতিল করতে পারেন। এতে ক্লাবের ওপর ট্রান্সফার নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে। যথাযথ কারণ ছাড়া চুক্তি ভাঙলে উভয় পক্ষই ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য। খেলোয়াড়রা চুক্তি ভাঙলে চার থেকে ছয় মাস নিষিদ্ধ হতে পারেন। ক্লাবের ক্ষেত্রেও নিবন্ধন নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়।
কোচ-ফুটবলাররা মিথ্যা অভিযোগ করলে কী হয়?
ফিফার নিয়মে কোচ বা ফুটবলাররা পারিশ্রমিক বকেয়ার অভিযোগ করতে পারেন। কিন্তু মিথ্যা অভিযোগ করলে কী হয়?
ফিফার ডিসপিউট রেজোলিউশন চেম্বার (ডিআরসি) প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়। যদি অভিযোগ প্রমাণিত না হয় বা মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে সাধারণত অভিযোগ খারিজ হয়ে যায়। খেলোয়াড় বা কোচের বিরুদ্ধে আলাদা করে নিষেধাজ্ঞা বা বড় জরিমানা আরোপের নজির খুবই কম। তবে জালিয়াতি বা ভুয়া প্রমাণাদি প্রেরণ করলে ফিফার ডিসিপ্লিনারি কোড অনুযায়ী খেলোয়াড়দের শাস্তি হতে পারে। এতে জরিমানাসহ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ফুটবলার বা কোচ নিষিদ্ধ হতে পারেন। ক্লাবগুলো অনেক সময় দাবি করে যে, খেলোয়াড় বা কোচ মিথ্যা অভিযোগ করেন। কিন্তু ফিফা অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রমাণ দেখে খেলোয়াড়ের পক্ষেই রায় দেয়। কারণ পারিশ্রমিক না দেওয়ার দায় মূলত ক্লাবের। মিথ্যা অভিযোগ করলে অভিযোগ খারিজ হয়। ইচ্ছাকৃত জালিয়াতি প্রমাণিত না হলে কোচ বা ফুটবলার শাস্তির মুখে পড়েন না। ফিফা প্রমাণকেই প্রাধান্য দেয়।
পেশাদারিত্বের সংজ্ঞাই প্রশ্নবিদ্ধ
বসুন্ধরা কিংস ও আবাহনীকে বাংলাদেশের সবচেয়ে পেশাদার ক্লাব হিসেবে ধরা হয়। অথচ তাদের বিরুদ্ধেই ফিফার বারবার ট্রান্সফার নিষেধাজ্ঞা আসা ঘরোয়া ফুটবলের পেশাদারিত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সেই সত্তর-আশির দশক থেকে বিদেশি খেলোয়াড় খেললেও আগে এভাবে নিষেধাজ্ঞা আসেনি। এখন ফিফার আরএসটিপি নিয়ম কঠোর। দুই মাসের বেতন না দিলে খেলোয়াড় চুক্তি বাতিল করতে পারেন এবং ক্লাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা আসে।
কিংস, আবাহনীসহ একাধিক ক্লাব এই ফাঁদে পড়েছে। মূল কারণ আর্থিক অব্যবস্থাপনা, দুর্বল চুক্তি ও সময়মতো পারিশ্রমিক না দেওয়া। বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের ফুটবলকে স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে। পেশাদারিত্ব শুধু ট্রফি জয় বা বিদেশি খেলোয়াড় আনা নয়। চুক্তি মেনে চলা, স্বচ্ছতা ও সময়মতো বেতন দেওয়াও এর অংশ। শীর্ষ ক্লাবগুলোই ব্যর্থ হলে বাকিদের অবস্থা আরও খারাপ। সমাধান একটাই- আর্থিক শৃঙ্খলা ও চুক্তির প্রতি শ্রদ্ধা। না হলে ফিফার নিষেধাজ্ঞা শুধু ক্লাব নয়, পুরো দেশের ফুটবলকেই ক্ষতিগ্রস্ত করতে থাকবে।
দেশের সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক ও ক্রীড়া লেখক আজম মাহমুদ। এক সময় তিনি বাফুফের নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৭৪ সালে বিচিত্রার স্পোর্টস রিপোর্টার হিসেবে ক্রীড়া সাংবাদিক পেশায় যুক্ত হওয়া আজম মাহমুদ নব্বইয়ের দশকে ইংল্যান্ডের ‘ওয়ার্ল্ড সকার’-এর দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ওই সময় তিনি এএফসির বর্ষসেরা স্পোর্টস রাইটারের পুরস্কারও জিতেছিলেন।
দেশের শীর্ষ দুটি ক্লাব আবাহনী ও বসুন্ধরা কিংস ফিফার ট্রান্সফার নিষেধাজ্ঞার কারণে এএফসির টুর্নামেন্টে খেলতে পারেনি এবং নতুন ঘরোয়া ফুটবল মৌসুমে খেলতে পারবে কি না, তা আজ পর্যন্ত অনিশ্চিত। শেষ পর্যন্ত খেলতে পারলেও এই ঘটনাকে আজম মাহমুদ দেশের ফুটবলের কালো দাগ হিসেবে দেখছেন।
‘আমি বুঝি না, কিংস কেন এই ঝুঁকির মধ্যে গেল। তাদের তো টাকার অভাব নেই। ফুটবলাররা প্রকৃত প্রমাণ দিতে পেরেছে বলেই তো ফিফা অ্যাকশনে গেছে। আবাহনীর একটা সমস্যা গেছে। ঠিক আছে। তারপরও আমি মনে করি, আমাদের ক্লাবগুলোর পেশাদারিত্বের অভাব আছে। সবার মধ্যেই একটা- ড্যামকেয়ার ভাব। ফিফার নিয়ম-কানুন সম্পর্কে হয়তো পুরো ধারণা নেই। যা ঘটেছে, সেটা দেশের ফুটবলের ইমেজের জন্য মারাত্মক হুমকি’- বলছিলেন আজম মাহমুদ।
বিষয়টি এতদূর গড়ানোর জন্য বর্ষীয়ান এই ক্রীড়া সাংবাদিক বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের গাফিলতিও দেখছেন। তিনি বলেন, ‘বাফুফের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা উচিত ছিল। সম্ভব হলেও অর্থ ধার দিয়ে হলেও আগেই ফয়সালা করা উচিত ছিল। বাফুফের তো টাকা সমন্বয় করার সুযোগ ছিল। এ অবস্থায় পৌঁছানোর আগেই ফেডারেশনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল।’
দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের ক্লাবই কেন?
দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের ক্লাবগুলোই ফিফার ট্রান্সফার নিষেধাজ্ঞার শিকার সবচেয়ে বেশি হয়েছে। বসুন্ধরা কিংস, আবাহনী, মোহামেডানসহ একাধিক ক্লাবের বিরুদ্ধে একসঙ্গে একাধিক নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে।
অন্য দেশগুলোতে এতটা দেখা যায় না। ভারতের কিছু ক্লাবের ওপর মাঝে মাঝে নিষেধাজ্ঞা আসে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেগুলো সাধারণত প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে হয়ে থাকে। অন্যান্য দেশে সাধারণত দেখা যায় না। এ বিষয়ে আজম মাহমুদের বক্তব্য হলো, ‘অন্য দেশগুলো হুটহাট করে কোচ বা খেলোয়াড় নিবন্ধন করে না। তারা ফিফার নিয়ম-কানুন অনুসরণ করেই সবকিছু করে। তাই তাদের ক্ষেত্রে এমন সমস্যা কম হয়।’
আরআই/আইএইচএস