একটি সুস্থ, দক্ষ ও উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠীই একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্রের প্রধান শক্তি। তাই ‘সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ’ গড়ে তোলা কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত দায়িত্ব। রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসার চেয়ে রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যসচেতনতা এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণকে অগ্রাধিকার দেওয়াই আধুনিক জনস্বাস্থ্যের মূল দর্শন।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপির রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফায় স্বাস্থ্যকে মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করে ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ এবং ‘চিকিৎসাবিহীন অবস্থায় কোনো মৃত্যু নয়’—এই লক্ষ্য সামনে রাখা হয়েছে। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, নাগরিকদের জন্য Health Card, স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ বরাদ্দ এবং প্রাথমিক ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতিও সেখানে রয়েছে।
এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক ও সময়োপযোগী দৃষ্টিভঙ্গি। কারণ বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সমস্যার সমাধান শুধু হাসপাতাল, চিকিৎসক কিংবা ওষুধের সংখ্যা বাড়িয়ে সম্ভব নয়। মানুষের জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস, পরিচ্ছন্নতা, শারীরিক কর্মকাণ্ড, তামাক বর্জন, টিকাদান, মাতৃ ও শিশুসেবা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষাকে জনস্বাস্থ্য সংস্কৃতির অংশ করতে হবে।
বিএনপির ঘোষিত স্বাস্থ্য খাত সংস্কার প্রস্তাবেও ‘প্রতিরোধের মাধ্যমে সুরক্ষিত স্বাস্থ্য’ ধারণাটিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা, গ্রামীণ স্বাস্থ্য সহকারী নিয়োগ, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে কার্যকর প্রাথমিক রেফারেল কেন্দ্রে রূপান্তর এবং সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে মানুষ অসুস্থ হলে চিকিৎসা পাবে—কিন্তু তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, মানুষ যাতে সহজে অসুস্থ না হয়। যেখানে প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পাবে; যেখানে একজন দরিদ্র মানুষ অর্থের অভাবে চিকিৎসাবঞ্চিত হবে না; যেখানে মা ও শিশু নিরাপদ থাকবে; যেখানে স্বাস্থ্যতথ্য হবে সহজলভ্য; এবং যেখানে নাগরিক নিজেই নিজের স্বাস্থ্য সুরক্ষার অংশীদার হবে।
বর্তমান সরকারের ঘোষিত কর্মপরিকল্পনাতেও এই প্রতিরোধমূলক দর্শনের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। দেশব্যাপী ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ, যার প্রায় ৮০ শতাংশ নারী হওয়ার কথা; প্রতিটি নাগরিকের জন্য E-Health Card চালু করার পরিকল্পনা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ইউনিয়ন পর্যায়ে Primary Healthcare Unit স্থাপন এবং দেশব্যাপী বাড়ি বাড়ি স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং চালুর উদ্যোগও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষ হাসপাতালে আসার আগেই যদি উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ বা অন্যান্য ঝুঁকি শনাক্ত করা যায়, তাহলে অনেক জটিলতা প্রতিরোধ করা সম্ভব।
এখানে জনগণের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার যত ভালো নীতিই গ্রহণ করুক, নাগরিকরা যদি স্বাস্থ্যবিধি না মানেন, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করেন, তামাক ব্যবহার অব্যাহত রাখেন, অস্বাস্থ্যকর খাবারে অভ্যস্ত থাকেন কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শ উপেক্ষা করেন, তাহলে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন কঠিন হবে।
তাই আমাদের প্রত্যেককে ‘নিজের স্বাস্থ্য, নিজের দায়িত্ব’—এই চেতনায় এগিয়ে আসতে হবে। পরিবারে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। শিশুদের খেলাধুলায় উৎসাহিত করতে হবে। নিয়মিত হাঁটা ও শারীরিক পরিশ্রমকে দৈনন্দিন জীবনের অংশ করতে হবে। ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য বর্জন করতে হবে। নারীদের মাতৃস্বাস্থ্য, কিশোর-কিশোরীদের পুষ্টি ও প্রজননস্বাস্থ্য এবং বয়স্কদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
একই সঙ্গে সরকারের স্বাস্থ্যনীতি বাস্তবায়নে জনগণকে অংশীদার ও নজরদারির অংশ হতে হবে। কোথাও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসক নেই, ওষুধ নেই, সেবা পাওয়া যাচ্ছে না কিংবা দুর্নীতি হচ্ছে—তা নীরবে মেনে না নিয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা জনগণের অধিকার; তাই এর মান ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জনগণের নাগরিক দায়িত্ব।
বিএনপির স্বাস্থ্যনীতির আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো স্বাস্থ্যসেবাকে শুধু চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা, স্বাস্থ্যবীমা, মাতৃ ও শিশুসেবা, চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণা এবং প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা। ২০২৬ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের বার্তাতেও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা, সবার জন্য স্বাস্থ্য, E-Health Card, স্বাস্থ্যবীমার সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এখন দরকার এই নীতিগুলোকে কাগজের প্রতিশ্রুতি থেকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব কর্মসূচিতে পরিণত করা। স্বাস্থ্যকর্মী, চিকিৎসক, শিক্ষক, সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় নেতা এবং তরুণ সমাজ—সবাইকে নিয়ে একটি জাতীয় জনস্বাস্থ্য আন্দোলন গড়ে তোলা যেতে পারে।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে মানুষ অসুস্থ হলে চিকিৎসা পাবে—কিন্তু তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, মানুষ যাতে সহজে অসুস্থ না হয়। যেখানে প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পাবে; যেখানে একজন দরিদ্র মানুষ অর্থের অভাবে চিকিৎসাবঞ্চিত হবে না; যেখানে মা ও শিশু নিরাপদ থাকবে; যেখানে স্বাস্থ্যতথ্য হবে সহজলভ্য; এবং যেখানে নাগরিক নিজেই নিজের স্বাস্থ্য সুরক্ষার অংশীদার হবে।‘সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ’ তাই কোনো একক সরকারের প্রকল্প নয়—এটি একটি জাতীয় অঙ্গীকার। বিএনপির ঘোষিত ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’, Universal Health Coverage এবং প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার নীতিকে বাস্তব সাফল্যে রূপ দিতে হলে সরকারকে নীতি ও অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে, আর জনগণকে হতে হবে সেই পরিবর্তনের সক্রিয় অংশীদার।
আসুন, আমরা সবাই মিলে একটি নতুন স্বাস্থ্য সংস্কৃতি গড়ে তুলি—রোগ হওয়ার পর শুধু চিকিৎসা নয়, রোগ হওয়ার আগেই প্রতিরোধ; শুধু হাসপাতাল নয়, প্রতিটি পরিবারকে স্বাস্থ্যসচেতনতার কেন্দ্র; শুধু সরকারের উদ্যোগ নয়, জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ।কারণ সুস্থ নাগরিকই শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়ার সবচেয়ে বড় সম্পদ।
লেখক : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।
এইচআর/এএসএম