চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে নীলক্ষেত ও ঢাকা কলেজকেন্দ্রিক আন্দোলন সংগঠিত করার নেপথ্যে অন্যতম ভূমিকা ছিল তৎকালীন ছাত্রনেতা নাজমুল হাসানের। আন্দোলনে হামলা, নির্যাতন ও জীবনঝুঁকির মুখে পড়া এই ছাত্রনেতা বর্তমানে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।
গণঅভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতা, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আগামী দিনের বাংলাদেশ নিয়ে তিনি কথা বলেছেন। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাগো নিউজের নিজস্ব প্রতিবেদক মো. নাহিদ হাসান।
জাগো নিউজ: জুলাইয়ের শুরুর দিকে নীলক্ষেত ও সায়েন্সল্যাব এলাকা ছিল আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র। রাজপথে শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করা এবং আন্দোলন ধরে রাখার ক্ষেত্রে কেমন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলেন?
নাজমুল হাসান: ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্টে কোটা পুনর্বহালের রায়ের পর বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ প্রথম রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠন হিসেবে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বুঝেছিলাম, কোনো রাজনৈতিক ব্যানারে আন্দোলন করলে শুরু থেকেই দমন-পীড়ন বাড়তে পারে। তাই কৌশলগত কারণে একটি নিরপেক্ষ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আন্দোলন এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তখন আমি ঢাকা কলেজ ছাত্র অধিকার পরিষদের সেক্রেটারি এবং একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ছাত্র অধিকার পরিষদের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। আমার বিশ্বাস ছিল, ঢাকা কলেজ ও সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে যুক্ত হলে তা নতুন গতি পাবে। সেই লক্ষ্যেই ৯ জুন নীলক্ষেত ও সায়েন্সল্যাব এলাকায় কর্মসূচি শুরু করি এবং পরদিন ঢাকা কলেজের সামনে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়।
আরও পড়ুন
‘আমরা থানা জ্বালিয়ে দিয়েছিলাম’ বৈছাআ নেতার বক্তব্য ভাইরাল
ঢাকা কলেজ এলাকায় ছাত্রলীগের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ছিল। ফলে আন্দোলন সংগঠিত করা, শিক্ষার্থীদের একত্র করা এবং নেতৃত্ব দেওয়া ছিল বড় ঝুঁকির বিষয়। অতীতে নানা নির্যাতন ও হামলার অভিজ্ঞতা থাকলেও আমি বিশ্বাস করতাম, ঢাকা কলেজের রয়েছে গণআন্দোলনের গৌরবময় ইতিহাস। সেই বিশ্বাস থেকেই ব্যক্তিগত ঝুঁকি নিয়ে আন্দোলন সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেছি।
জাগো নিউজ: জুলাইয়ের শুরুতে আপনারা যখন আন্দোলনে নামেন, তখন কি একবারের জন্যও মনে হয়েছিল যে এটি শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের একদফায় রূপ নেবে?
নাজমুল হাসান: ২০১৮ সালে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার পর থেকেই আমরা এমন একটি সরকারের পতনের স্বপ্ন দেখেছি, যে সরকার জনগণের ন্যূনতম অধিকার, স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকার ও নাগরিকের মর্যাদা নিশ্চিত করেনি। সুশাসনের পরিবর্তে আমরা ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুমসহ নানা ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা দেখেছি। এ কারণে অনেক আগে থেকেই আমরা সরকার পতনের লক্ষ্যে রাজনৈতিকভাবে কাজ করে আসছিলাম।
আরও পড়ুন
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা / বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মূল কারণ ছিল ঘুস-দুর্নীতি
তবে সরকার দীর্ঘদিন ধরে দমন-পীড়নের মাধ্যমে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিল। ফলে সাধারণ মানুষও সহজে প্রতিবাদ করার সাহস করে উঠতে পারেনি। একইভাবে বিএনপির মতো বড় একটি রাজনৈতিক দলকেও গত দেড় দশকে নানা ধরনের দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তাই শুরুতেই শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটানো সম্ভব হবে- এমনটা আমরা মনে করিনি। আমাদের ধারণা ছিল, আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় যখন বিভিন্ন পর্যায়ের মোমেন্টাম তৈরি হবে, সেগুলো কাজে লাগাতে পারলে ধীরে ধীরে বৃহত্তর গণআন্দোলন গড়ে উঠবে এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের পতনের দিকে যাওয়া সম্ভব হবে।
জাগো নিউজ: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক হিসেবে পুরো আন্দোলনকে সুসংগঠিত রাখা ও রাজপথে থাকার পথটি কতটা কঠিন ছিল?
নাজমুল হাসান: স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া ছিল কষ্টকর ও ঝুঁকিপূর্ণ একটি অভিজ্ঞতা। আন্দোলনের সময় ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট- বিশেষ করে ঢাকা কলেজ, সায়েন্স ল্যাব ও নীলক্ষেত এলাকায় নেতৃত্ব দেওয়া এবং সমন্বয় করার দায়িত্ব ছিল আমার ওপর। সেখানে ঢাকা কলেজ, ইডেন কলেজ, সিটি কলেজ, আইডিয়াল কলেজ এবং মুন্সী আব্দুর রউফ কলেজের শিক্ষার্থীদের এক সুতোয় গেঁথে আন্দোলন পরিচালনা করতে হয়েছে। যেহেতু আমাদের আন্দোলনের এই মূল কেন্দ্রগুলোর পাশেই ছিল শাসক দলের মূল কার্যালয়, তাই প্রতিনিয়ত ভয়াবহ চাপ, আতঙ্ক এবং জীবননাশের হুমকির মধ্য দিয়ে প্রতিটি মুহূর্ত পার করতে হতো।
আন্দোলন চলাকালে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বহুবার হামলার মুখোমুখি হতে হয়েছে। চব্বিশের ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বরে আমি মারাত্মক হামলার শিকার হই এবং প্রায় ১৮ ঘণ্টা অচেতন ছিলাম। এমনকি তৎকালীন বেশ কিছু গণমাধ্যমে আমার শহীদ হওয়ার সংবাদও প্রচারিত হয়েছিল। কিন্তু পঙ্গুত্ব বা মৃত্যুর ভয় আমাদের দমাতে পারেনি। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থাতেই আন্দোলনের ধারা বজায় রাখতে কাজ করে গেছি। যখনই আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রভাবিত করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে, তখনই শহীদ আবু সাঈদ ও ওয়াসিমদের রক্তকে স্মরণ করে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছি- সহযোদ্ধাদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে কোনো আপস বা সংলাপ হতে পারে না, বিজয় অতি নিকটে।
আরও পড়ুন
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ভাঙন, কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ
নেতৃত্বে থাকা এবং গণমাধ্যমে সোচ্চার ভূমিকার কারণে আমার ওপর নজরদারি ও হয়রানির মাত্রা চরম আকার ধারণ করেছিল। ঢাকা কলেজে আমার নিজ বিভাগে গোয়েন্দা নজরদারি বসানো হয়েছিল। পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা আমার যাত্রাবাড়ীর বাসা এমনকি মেঘনায় গ্রামের বাড়িতেও অভিযান চালায়, আর বিভিন্ন অচেনা নম্বর থেকে প্রতিনিয়ত হুমকি-ধামকি তো ছিলই। তবুও সব ঝুঁকি মাথায় নিয়েই আমরা লড়াই চালিয়ে গেছি। আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল এই স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটিয়ে জন্মভূমিকে এমন এক স্বাধীনতা এনে দেওয়া, যেখানে সাধারণ মানুষ মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারবে এবং কাউকে গুম বা খুনের শিকার হতে হবে না।
জাগো নিউজ: ফ্যাসিবাদের পতন ও রাষ্ট্র সংস্কারের যে স্বপ্ন নিয়ে তরুণ সমাজ রক্ত দিলো, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর সেই প্রত্যাশা বা আকাঙ্ক্ষা কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে বলে মনে করেন?
নাজমুল হাসান: এমন একটা সময়ে ২০২৪ সালে কোটা পুনর্বহাল করা হলো, যখন বাংলাদেশে সাধারণ সময়, সেই সময়টায় প্রায় ২৫ লাখ শিক্ষিত তরুণরা বেকার। সেই সময়টায় আমি দেখেছি রেলওয়েতে একটি চাকরি নিয়োগ পরীক্ষা হচ্ছিল, সেখানে মাস্টার্স পাস শিক্ষার্থীরা রেলওয়ের ক্লিনার হিসেবে নিয়োগ পরীক্ষা দিচ্ছিলেন।তো এমন একটা ভয়াবহ চাকরির বাজারের সময়ে আবার সেই কোটা নামক অভিশাপ চাপিয়ে দেওয়া মানে ছাত্রসমাজ, তরুণ সমাজ, যুবসমাজকে আত্মহত্যার দিকে ধাবিত হওয়ার একটা অবস্থার পরিস্থিতি ছিল।
আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল কোটাবিহীন, মেধাভিত্তিক একটা বাংলাদেশ তৈরি করা। ৫৬ শতাংশ যে অযৌক্তিক কোটা, সেগুলো কমিয়ে মেধাবীদের অগ্রাধিকার দেওয়া। তো দুঃখজনক হলো যে আমাদের যে চাকরির বাজার তৈরি করা, বেকারত্ব হ্রাস করা, কোটাবিহীন মেধাভিত্তিক বাংলাদেশ তৈরি করা- সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে আমরা কিন্তু পৌঁছাতে পারি নাই। গত দুই বছরে কিন্তু আমরা চাকরিপ্রার্থীদের জন্য স্কোপ তৈরি করতে পারি নাই। সরকারি যে ফাঁকা পদগুলো আছে, সেই ফাঁকা পদগুলোতে নিয়োগ দিতে পারি নাই। কাঙ্ক্ষিত যে শিক্ষার্থী, তরুণ-যুবকরা অভিশাপ হিসেবে রাষ্ট্র আছে, রূপান্তরিত হয়েছে, তাদের জন্য কল্যাণকর কিছু করা হয় নাই- এটার অকপটে স্বীকার করতে হবে।
আরও পড়ুন
সিরাজগঞ্জে একদিনেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৫০ জনের পদত্যাগ
প্রাপ্তির জায়গা হচ্ছে একজন অগণতান্ত্রিক সরকার নাই, মানুষ একটু নির্দ্বিধায়, শান্তিতে ঘুমাতে পারছে- এটা একটা বড় বিষয়। তবে আমরা শুধু চেহারার পরিবর্তনের জন্যই এতগুলো মানুষ শহীদ হয় নাই। আমরা রাষ্ট্র সংস্কার করতে চেয়েছিলাম, যেখানে প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতির মধ্যকার ক্ষমতার ভারসাম্য থাকবে, বিচারপতিরা জবাবদিহিতার মধ্যে থাকবে, সুপ্রিম কোর্টের সচিবালয় থাকবে, মানবাধিকার কমিশন হবে। যে অধ্যাদেশগুলোর মধ্য দিয়ে বা যে আইনের মাধ্যমে শাসকগুলো কখনোই স্বৈরাচার হয়ে উঠবে না বা তারা নিজেদের মালিক মনে করবে না- সেই বিষয়গুলো, কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এখনো আসে নাই।
সেই প্রত্যাশাগুলো এখন, বিশেষ করে যেন ক্যাম্পাসগুলোতে আর সেই সংঘাত-সহিংসতার যে কালচার বাংলাদেশে ছিল, সেগুলো যেন না থাকে- সেটা আমরা প্রত্যাশা করি। ক্যাম্পাসগুলোতে শিক্ষার্থীরা যেন নির্বিঘ্নে পড়াশোনা করতে পারে, সেই পথ সুগম হলেই আমাদের সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন হতে পারে।
জাগো নিউজ: অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনে গুটিকয়েক সমন্বয়কের মতামত নেওয়া হয়েছিলো- এমন অভিযোগ আছে, আপনারা বা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কী উপেক্ষিত ছিল?
নাজমুল হাসান: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন একটা ঐতিহাসিক প্ল্যাটফর্ম ছিল। আমি এটাকে একটা পবিত্র প্ল্যাটফর্মও মনে করেছি, যার মধ্য দিয়ে এ দেশের সব মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য কথা যে, অভ্যুত্থান পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন হওয়ার পর থেকেই সেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন একটা বড় বৈষম্যের পথ তৈরি করেছে।
আরও পড়ুন
কোটাবিরোধী আন্দোলন: শিক্ষার্থীদের নামে পুলিশের মামলা
দেখুন, এই আন্দোলনে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা হল ত্যাগ করতে শুরু করলো, তখন কিন্তু ঢাকা কলেজসহ সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের ভ্যানগার্ড হিসেবে কাজ করেছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা- তাদের তো সরকারি চাকরির প্রতি ওই রকম ঝোঁক নাই, তারপরও তারা যে রামপুরা, বনশ্রীতে ইস্ট ওয়েস্ট, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা যেভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে বা কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীরা যেভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে- অভ্যুত্থান পরবর্তীতে আমরা তাদের সেই মূল্যায়নের জায়গাটাতে দেখতে পাই নাই। এটা দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আমরা আন্দোলন-সংগ্রামের সূঁতিকাগার হিসেবে, তাদের সেই ক্যাম্পাসকে সম্মান-শ্রদ্ধা করি কিন্তু সেই ক্যাম্পাসেরই গুটি কয়েকজন বন্ধু- তারা পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও না, শিক্ষার্থীরা না- একটা নির্দিষ্ট গ্রুপ পুরো অভ্যুত্থানকে কুক্ষিগত করে সবাইকেই এখান থেকে মাইনাস করার একটা অপপ্রয়াস করেছে। যার কারণে আজকে অভ্যুত্থানের দুই বছরের মধ্যে ফাটল ধরা, বিভাজনের পথ তৈরি হওয়া।
জাগো নিউজ: তৎকালীন আওয়ামী সরকারপন্থি ছাত্র সংগঠন ছাড়া বাকি সবাই এই আন্দোলনে যুক্ত ছিলো। আওয়ামী লীগের পতনের পর নিজেদের মধ্যে বিভেদ শুরু হলো কেন?
নাজমুল হাসান: প্রফেসর ইউনূস যখন মাহফুজ আলমকে এই আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড ঘোষণা করে, তার মধ্য দিয়েই অভ্যুত্থানের ছাত্র সংগঠনগুলো- ছাত্র সংগঠন, ছাত্র জনতা, রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে যেই ইস্পাতকঠিন ঐক্য ছিল, সেই ইস্পাতকঠিন ঐক্যের প্রথম ফাটল ধরে। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ‘ছাত্র নেতা’ বলতেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ওই সময়ের সাথে যারা জড়িত, তাদের কাউন্ট করা। এখানে ছাত্রদল, ছাত্র অধিকার পরিষদ, ছাত্র ফেডারেশন বা ইসলামী ছাত্র আন্দোলন তারা থাকলেও, তাদের কিন্তু ওইভাবে কোথাও স্পেস তৈরি করে দেওয়া হয় নাই।
আরও পড়ুন
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন / শুধু কোটা প্রথার বিরুদ্ধে নয়, এটি ছিল মুক্তির আন্দোলন
আমাদের বৃহৎ একটা স্বপ্ন ছিল, হাসিনার পতন করা- সবাই এক বাক্যে, এক ভিত্তিতে আমরা উপনীত হয়েছি। কিন্তু অভ্যুত্থান পরবর্তীতে একটা সংগঠন, একজন মানুষ বা কিছু মুষ্টিমেয় মানুষ যখন আন্দোলনের সুফল ভোগ করতে থাকলো, অন্যদের কন্ট্রিবিউশনকে অস্বীকার করতে শুরু করলো- তখনই কিন্তু রাজনৈতিক সংগঠন বা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভেদ আসছে এবং সবচেয়ে বড় বিভেদটা তৈরি করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। পরবর্তীতেই সবার মধ্যে নিজ পলিটিক্যাল এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার, প্রত্যেকের দলের আদর্শ বাস্তবায়ন করা, তাদের কাজগুলো বাস্তবায়ন করার কারণেই আল্টিমেট আমাদের যেই ঐক্যটা ছিল, সেটা ফাটল ধরেছে।
জাগো নিউজ: আগামীতে কেমন বাংলাদেশ প্রত্যাশা করেন?
নাজমুল হাসান: আমি এমন একটা বাংলাদেশ চাই, যেই বাংলাদেশে আমরা স্বপ্ন দেখেছিলাম মুক্তিযুদ্ধের যেই স্বপ্নের বাংলাদেশ- সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচারের। স্বাধীনতার, মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর পরেও আমরা সেটা পাই নাই। যার কারণেই ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশে সংগঠিত হয়েছে।
আমরা চাই যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হোক। নাগরিকদের যে মর্যাদা, নাগরিকদের যে সম্মান- সেই সম্মান নিশ্চিত হোক। শাসকরা যেন নাগরিকদের বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাতে না পারে। ভোটাধিকার যেন হরণ না হয়, বাকস্বাধীনতা যেন কেড়ে নেওয়া না হয়। দমন-পীড়ন, রাজনৈতিক কারণে ভিন্নমত হলেই দমন-পীড়ন করা, রিমান্ডে নির্যাতন করা- এ রকম সংস্কৃতি আর বাংলাদেশে চাই না।
আরও পড়ুন
বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার পথ কি খোলা ?
বিশেষ করে ক্যাম্পাসগুলোতে আমরা যেই অস্ত্রের ঝনঝনানি দেখেছিলাম, আমরা গণরুম-গেস্টরুমে শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করার যে পরিবেশ দেখেছিলাম, সেই রকম পরিবেশ দেখতে চাই না। আমরা একটা নিরাপদ ক্যাম্পাস চাই এবং যেই ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা নির্বিঘ্নে পড়াশোনা করবে, গবেষণা করবে এবং নিজেদের তৈরি করবে।
সর্বশেষ আমরা বেকার যুবকদের জন্য, তরুণ যুবকদের জন্য একটা কর্মসংস্থান- উন্মুক্ত কর্মসংস্থানের একটা পরিবেশ যেন তৈরি করে সে প্রত্যাশা করি। তরুণরা যেন সমাজের জন্য ভূমিকা রাখতে পারে, ইতিবাচক কাজ করতে পারে। বর্তমান সরকার যেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের যে স্পিরিট, শহীদদের যে আকাঙ্ক্ষা, আহত-পঙ্গু যারা হয়েছেন তাদের যে স্বপ্ন ছিল- সেই স্বপ্নকে লালন করেন, সেটাকে কাঁধে দায়িত্ব নিয়ে যেন শহীদদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ তৈরি করেন- এটাই আমার শেষ প্রত্যাশা।
এনএস/এমআরএম