একটা সময় ভালো ছবি তুলতে হলে দামি ক্যামেরা, ভালো লেন্স আর ফটোগ্রাফির কৌশল জানা জরুরি ছিল। কিন্তু এখন সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের সাহায্যে কয়েকটি শব্দ লিখেই তৈরি করা যাচ্ছে বাস্তবের মতো ছবি।
এমনকি সাধারণ একটি ছবিকেও মুহূর্তের মধ্যে বদলে দেওয়া সম্ভব। ফলে প্রশ্ন উঠছে এআই যদি ছবি বানিয়েই দিতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে কি ক্যামেরার আর প্রয়োজন থাকবে? প্রশ্নটি সহজ হলেও উত্তরটা এতটা সরল নয়।
কয়েকটি শব্দেই তৈরি হচ্ছে ছবি
বর্তমানে বিভিন্ন এআই টুলে শুধু একটি নির্দেশনা লিখলেই তৈরি হয়ে যাচ্ছে ছবি। কোথায় দৃশ্যটি হবে, আলো কেমন থাকবে, মানুষ কী পোশাক পরবে কিংবা ছবির পরিবেশ কেমন হবে সবই নির্দেশ দিয়ে নির্ধারণ করা যায়। আগে এমন একটি ছবি তৈরি করতে ফটোগ্রাফারকে জায়গা খুঁজতে হতো, আলো ঠিক করতে হতো, ক্যামেরার সেটিংস পরিবর্তন করতে হতো এবং অনেক সময় একাধিকবার ছবি তুলতে হতো। এআই সেই কাজের বড় একটি অংশ কয়েক সেকেন্ডে করে দিতে পারছে। বিজ্ঞাপন, সোশ্যাল মিডিয়া, পোস্টার, ওয়েবসাইটের ইলাস্ট্রেশনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাই এআই-জেনারেটেড ইমেজের ব্যবহার বাড়ছে।
আরও পড়ুন
এআই-কে যেসব ব্যক্তিগত তথ্য কখনোই দেবেন না
কিন্তু এআই কি সত্যিই ক্যামেরার বিকল্প?
এখানেই আসল পার্থক্য। এআই একটি ছবি তৈরি করতে পারে, কিন্তু বাস্তবে ঘটে যাওয়া একটি মুহূর্তকে ক্যামেরার মতো ধরে রাখতে পারে না। একজন ফটোগ্রাফার যখন কোনো মানুষের ছবি তোলেন, তখন শুধু মুখ বা পোশাকই ক্যামেরাবন্দি হয় না। সেই মুহূর্তের পরিবেশ, আলো, আবেগ এবং ঘটনাটিও ছবির সঙ্গে থেকে যায়। একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে বাবার চোখের জল, খেলার মাঠে জয়ের মুহূর্ত, কোনো দুর্যোগের বাস্তব চিত্র কিংবা রাস্তায় ঘটে যাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এসব ক্ষেত্রে ছবির সবচেয়ে বড় মূল্য হলো সেটি সত্যিই ঘটেছিল। এআই চাইলে এমন দৃশ্য তৈরি করতে পারে। কিন্তু সেটি বাস্তব ঘটনার প্রমাণ নয়।
সাংবাদিকতায় ক্যামেরার গুরুত্ব আরও বেশি
সংবাদমাধ্যমের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ, রাজনৈতিক ঘটনা বা সামাজিক আন্দোলনের ছবি শুধু সুন্দর একটি দৃশ্য নয়; সেটি ইতিহাসের দলিল। এআই দিয়ে তৈরি ছবি দেখতে বাস্তবের মতো হলেও সেটিকে বাস্তব ঘটনার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। বরং এআই-জেনারেটেড ছবি ও বাস্তব ছবির পার্থক্য বোঝা ভবিষ্যতের সাংবাদিকতার জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
তাহলে এআই কি ফটোগ্রাফারদের কাজ কমিয়ে দেবে?
কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রভাব পড়বে। বিজ্ঞাপন বা সৃজনশীল কনটেন্ট তৈরির মতো কাজে অনেক প্রতিষ্ঠান হয়তো এআই ব্যবহার করে সময় ও খরচ কমাতে চাইবে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ফটোগ্রাফারের প্রয়োজন শেষ হয়ে যাচ্ছে। বরং ফটোগ্রাফারের কাজের ধরন বদলাতে পারে। ভবিষ্যতের একজন ফটোগ্রাফারকে শুধু ক্যামেরা চালাতে জানলেই হবে না, এআই ও ডিজিটাল এডিটিং সম্পর্কেও ধারণা রাখতে হবে। অন্যদিকে বাস্তব মুহূর্তের ছবি, বিয়ে, ভ্রমণ, সংবাদ, খেলাধুলা, বন্যপ্রাণী এবং ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফির ক্ষেত্রে ক্যামেরার গুরুত্ব সহজে কমবে না।
আরও পড়ুন
আপনার তথ্য অনলাইনে ফাঁস হয়েছে কি না জানুন বিনামূল্যে
ক্যামেরার সঙ্গে এআই-এর লড়াই নয়, সহযোগিতা
বাস্তবে ভবিষ্যৎটা হয়তো এআই বনাম ক্যামেরা হবে না। বরং দুই প্রযুক্তি একসঙ্গে কাজ করবে। আজকের স্মার্টফোন ক্যামেরাই তার উদাহরণ। ছবি তোলার পর ফোনের সফটওয়্যার নিজেই আলো, রং, নয়েজ এবং বিভিন্ন খুঁটিনাটি ঠিক করে দেয়। অর্থাৎ ক্যামেরা এরই মধ্যেই এআই ও কম্পিউটেশনাল ফটোগ্রাফির সঙ্গে মিশে গেছে।
তাই এআই যতই উন্নত হোক, ক্যামেরার প্রয়োজন একেবারে শেষ হয়ে যাবে এমনটা বলার সময় এখনো আসেনি। কারণ এআই কল্পনা থেকে ছবি তৈরি করতে পারে, কিন্তু বাস্তব পৃথিবীর কোনো মুহূর্তকে সত্যিকার অর্থে ধরে রাখার ক্ষমতা এখনো ক্যামেরারই সবচেয়ে বড় শক্তি। ভবিষ্যতে হয়তো আমরা এমন সময়ের দিকে এগোব, যেখানে প্রশ্নটা আর ‘ক্যামেরা না এআই’ থাকবে না। বরং প্রশ্ন হবে বাস্তব মুহূর্তকে আরও ভালোভাবে ধরে রাখতে ক্যামেরা ও এআই-কে কীভাবে একসঙ্গে ব্যবহার করা যায়।
কেএসকে