জনপ্রিয় ইসলামি চিন্তাবিদ ও আলোচক মিজানুর রহমান আজহারী বলেছেন, সিরাত বা নবীজির (সা.) জীবনী না জানার কারণেই আমরা ইসলামকে একটি কঠিন, নীরস ধর্ম হিসেবে উপস্থাপন করছি, অথচ নবীজি (সা.) এসেছিলেন বিশ্বজগতের জন্য রহমত ও কোমলতা স্বরূপ।
আজহারী বলেন, ইসলাম কেবল কিছু শুষ্ক আচার-অনুষ্ঠানের সমষ্টি নয়; ইসলাম এক প্রবহমান জীবনধারা, যার কেন্দ্রবিন্দুতে স্পন্দিত হন বিশ্বনবী (সা.)। একজন মানুষের ইমান ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণতা পায় না, যতক্ষণ না তার অন্তরে রাসুলুল্লাহর (সা.) প্রতি ভালোবাসা নিজের জীবন ও সমস্ত পার্থিব মোহের চেয়ে ঊর্ধ্বে স্থান পায়।
বুধবার (১৯ আগস্ট) ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড পেজে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি এসব কথা বলেন।
মিজানুর রহমান আজহারীর ফেসবুক পোস্ট:
“সময়ের অন্তহীন পথচলায় পৃথিবী অসংখ্য রাজাধিরাজ আর বিজেতার উত্থান-পতন দেখেছে। কালের আবর্তনে তাঁদের নাম ধূসর হয়েছে, ম্লান হয়েছে তাঁদের শ্রেষ্ঠতম মতবাদও। কিন্তু আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগে আরবের তপ্ত বালুকা ফুঁড়ে যে আলো উদিত হয়েছিল, যেই আধ্যাত্মিক যাত্রা শুরু হয়েছিল তার প্রদীপ্ত আভা আজও প্রতিটি মুমিনের হৃদস্পন্দনকে আন্দোলিত করে।
আজ মুসলিম উম্মাহ স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ ও সংকটময় সময়টুকু পার করছে। নৈতিক অবক্ষয়, শিক্ষা ও সাহিত্যে অনগ্রসরতা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা, অপসংস্কৃতির আধিপত্য ও অর্থনৈতিক অসমতা আমাদের চারপাশকে গ্রাস করে নিয়েছে। সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, আধুনিকায়নের মোড়কে আমরা আজ নিজেদের স্বকীয়তা ও আপন আত্মমর্যাদাবোধও খুইয়ে বসেছি। মতাদর্শিক বিভেদ, ইন্টারনেট-কেন্দ্রিক জীবনযাপন এবং অবাধ ভোগবিলাসের অসুস্থ প্রতিযোগিতার ফলে এই উম্মাহ আজ নিজেদের প্রকৃত আত্মপরিচয় প্রায় ভুলতে বসেছে। এই সামগ্রিক পতনের কারণটা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট; আমাদের ভেতর মৌলিক মানবিক ও নৈতিক শিক্ষার তীব্র অভাব। আরও বিশেষভাবে বললে, প্রিয় রাসুলের (সা.) সুমহান জীবনাদর্শ থেকে আমাদের যোজন যোজন দূরত্ব। রাসুলুল্লাহর (সা.) সম্যক জ্ঞানই আমাদের অস্তিত্বের পরম ভিত্তি এবং স্বীয় মহিমা ও চিরন্তন স্বকীয়তা বজায় রেখে সগৌরবে টিকে থাকার একমাত্র শাশ্বত পদ্ধতি। তাঁকে না চিনে, তাঁর জীবনের অলৌকিক সৌন্দর্যকে আত্মস্থ না করে ইসলামের প্রকৃত মাধুর্য আস্বাদন করা অসম্ভব।
ইসলাম কেবল কিছু শুষ্ক আচার-অনুষ্ঠানের সমষ্টি নয়; ইসলাম এক প্রবহমান জীবনধারা, যার কেন্দ্রবিন্দুতে স্পন্দিত হন বিশ্বনবি (সা.)। একজন মানুষের ইমান ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণতা পায় না, যতক্ষণ না তার অন্তরে রাসুলুল্লাহর (সা.) প্রতি ভালোবাসা নিজের জীবন ও সমস্ত পার্থিব মোহের চেয়ে ঊর্ধ্বে স্থান পায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যাকে আমরা জানিই না, তাকে ভালোবাসবো কীভাবে? অপরিচয় কেবল অন্ধ আবেগের মরীচিকা তৈরি করতে পারে, কিন্তু আত্মিক প্রেমের উন্মেষ কেবল চেনা-জানার আলোকেই ঘটে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসুলের মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ, তার জন্য যে আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে। (সুরা আহযাব: ২১)
এই \'উত্তম আদর্শ\' বা \'উসওয়াতুন হাসানাহ\'-এর সন্ধান লুকিয়ে আছে সিরাত অধ্যয়নে। সিরাত হলো সেই অনন্য দর্পণ, যেখানে তাকালে বোঝা যায় চরম প্রতিকূলতার মাঝেও কীভাবে মানুষ আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা রাখতে পারে। সহিহ বুখারিতে বর্ণিত একটি হাদীসে আল্লাহর রাসুল (সা.) অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন, তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত ইমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান এবং সমস্ত মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হই। (সহিহ বুখারি: ১৫)
এই ভালোবাসা অর্জনের একমাত্র পথ সিরাতের অনুপুঙ্খ জ্ঞান। যখন আমরা জানবো কীভাবে উহুদের ময়দানে তাঁর পবিত্র দন্ত মুবারক শহীদ হয়েছিল, কীভাবে তায়েফের পাথরে তাঁর পবিত্র পা রক্তাক্ত হয়ে মরুর ধুলি রাঙিয়েছিল, আর ফেরেশতা যখন সেই জনপদকে পিষে দেওয়ার অনুমতি চাইলেন, তখনও তাঁর রক্তাক্ত ওষ্ঠে ফুটে উঠেছিল প্রতিশোধ নয় বরং তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হেদায়াতের আকুল প্রার্থনা—তখন আমাদের হৃদয় অবাধ্য হতে পারে না। অশ্রুসিক্ত চোখে তাঁর প্রতি ভালোবাসার যে আর্তি জন্মাবে, সেটাই ইমানের প্রকৃত বহিঃপ্রকাশ। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে আজ এ কথা বিশ্বজনীনভাবে সুবিদিত যে, রাসুল (সা.) শুধু একজন নবী বা ধর্মীয় প্রচারক নন, বরং তিনি ছিলেন একাধারে দক্ষ সমাজসেবক, মহান সংস্কারক, সর্বোত্তম স্বামী, প্রজ্ঞাবান নেতা এবং পরম বিশ্বস্ত বন্ধু। মানবীয় গুণের এমন কোনো দিক নেই, যা তাঁর মাঝে পূর্ণতা পায়নি। স্বয়ং আল্লাহ তাআলা তাঁর চারিত্রিক উৎকৃষ্টতার সাক্ষ্য দিয়ে ঘোষণা করেছেন: \'নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত আছেন। (সুরা কলম: ৪)
আজকের সমাজ যখন এক মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক চোরাবালিতে নিমজ্জিত, মানুষ বাহ্যিক চাকচিক্য আর প্রযুক্তির শিখরে আরোহণ করেও ভেতরে ভেতরে চরম একা, দিকভ্রান্ত ও রিক্ত; তখন এই চারিত্রিক মাধুর্যের চেয়ে বড় কোনো নিরাময় হতে পারে না। আমরা ভুলে গেছি যে, আমাদের জন্য ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম মহামানবকে রোল মডেল হিসেবে পাঠানো হয়েছে। সিরাত বাস্তব জীবনের সবচেয়ে সফল ও প্রায়োগিক গাইডবুক। আপনি যদি একজন ব্যবসায়ী হন, তবে মক্কার বিশ্বস্ত তরুণ \'আল-আমিন\'-এর দিকে তাকান। আপনি যদি রাষ্ট্রনায়ক হন, তবে মদীনার দূরদর্শী নেতার প্রজ্ঞা দেখুন। আপনি যদি স্বামী বা পিতা হন, তবে আয়েশা (রা.)-এর সাথে পরম কৌতুকে দৌড় প্রতিযোগিতা করা এবং ফাতিমাকে (রা.) দেখে স্নেহে নিজের আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে যাওয়া সেই দয়ালু মানুষটিকে পরম মায়ায় লক্ষ্য করুন।
আমাদের সংকটের মূল কারণ হলো, আমরা রাসুলের (সা.) ইবাদতের বাহ্যিক রূপরেখা কিছুটা জানলেও, তাঁর যাপিত জীবনের কোমল অনুভূতি ও সংকট মোকাবিলার কৌশল থেকে অনেক দূরে সরে গেছি। সিরাত আমাদের শেখায় কীভাবে চরম ঝড়ের মাঝেও মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হয় এবং কীভাবে একটি ভাঙা সমাজকে ভালোবাসার সুতোয় বাঁধতে হয়।
রাসুলুল্লাহর (সা.) জীবন কোনো একমুখী চরিত্র নয়, বরং তা মানবীয় গুণের এক পূর্ণাঙ্গ মহাসমুদ্র। আজ আমাদের নিজেদের দিকে তাকানো প্রয়োজন। আমরা নিজেদের নবী-প্রেমিক দাবি করি, সিরাত মাহফিলে আবেগে আপ্লুত হই। কিন্তু আমাদের বাস্তব জীবনে, আমাদের ব্যবসায়িক সততায়, আমাদের পারিবারিক সদ্ভাবে, আমাদের প্রতিবেশীর সাথে আচরণে নববি সুন্নাহর প্রতিফলন কতটুকু? আমরা কি উম্মতের প্রতি তাঁর সেই ব্যাকুলতা অনুভব করি?
রাসুলুল্লাহর (সা.) অন্তিম মুহূর্তের অসিয়তেও ফুটে উঠেছিল উম্মতের প্রতি তাঁর অপরিসীম ব্যাকুলতা। আর কেয়ামতের সেই কঠিনতম মুহূর্তে, যেদিন প্রত্যেক নবী কেবল নিজের মুক্তির জন্য প্রার্থনা করবেন, তখনো একমাত্র তিনিই ব্যাকুল হয়ে বলবেন, \'উম্মাতি, উম্মাতি\'। আর আজ তাঁর সেই উম্মত দুনিয়ার মোহে অন্ধ হয়ে, পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষে লিপ্ত হয়ে তাঁর আদর্শকে বিস্মৃত হয়েছে। সিরাত না জানার কারণে আজ আমরা ইসলামকে একটি কঠিন, নীরস ধর্ম হিসেবে উপস্থাপন করছি, অথচ তিনি এসেছিলেন বিশ্বজগতের জন্য রহমত ও কোমলতা স্বরূপ।
বাস্তবতা হলো, রাসুলের (সা.) জীবনী গভীরভাবে অধ্যয়ন করে প্রকৃত শিক্ষা অর্জন করতে পারলে খুব সহজেই এই জাতিকে সার্বিক ক্ষতি ও সামগ্রিক অবক্ষয় থেকে মুক্তি দেয়া সম্ভব। অতএব, শুধু ব্যক্তিজীবনে সিরাতচর্চা করলেই চলবে না, বরং আমাদের সমাজের প্রতিটি পরতে, প্রতিটি স্তরে সিরাতের দীপ্যমান আলোকবিভা ছড়িয়ে দেয়ার কোনো বিকল্প আজ আর অবশিষ্ট নেই।”
ওএফএফ