ছোটগল্প: শিখা
ফাত্তাহ তানভীর রানা
রহমান মিঞা খুব ভোরে কবরস্থান থেকে বাড়ি এলো। সে সারারাত তার ছেলের কবরে কাটিয়েছে। মাঝে মাঝে তার সাথে কবরস্থানে অন্যদেরও দেখা যায়।
গত সপ্তাহে বজ্রপাতে তার ছেলে রহমত খামারি মারা যায়। ছেলের স্মৃতি তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়! নাবালক নাতিকে দেখলেই ছেলের কথা মনে পড়ে। রহমান কিছুতেই তার ছেলের লাশ চুরি হতে দেবে না। গ্রামবাসীও তাকে আশ্বস্ত করে।
দরিদ্র খামারি রহমতের লাশ এখনো পচেনি। বজ্রপাতে মারা যাওয়া মানুষের অঙ্গ ও হাড় দিয়ে প্রাকৃতিক চুম্বক তৈরি হয়! এখন লাশ চুরির সিন্ডিকেট সক্রিয়! বিনসাড়া গ্রামে আগেও লাশ চুরি হয়েছে। রহমতের বাবা ও গ্রামবাসী প্রতি রাতে কবরস্থান পাহারায় থাকে। চুরির লাশ কখনো উদ্ধার হয়নি। চোর ধরাও পড়েনি! পুলিশও কখনো মুখ খোলেনি।
এভাবে আর কতদিন লাশ পাহারা দেয়া যাবে? ছয় মাস আগেও লাশ চুরি হয়েছে। পাহারা বন্ধ হলে যদি লাশ চুরি হয়? ওদের টার্গেট কঙ্কাল, যা অনেকাংশেই চলে যায় সীমানা পেরিয়ে। বজ্রপাতে মারা যাওয়া লাশের প্রতি ওদের বিশেষ নজর, এতে বেশি টাকা পায়।
কাঞ্চন ডাকাত শিষ্যের কাছে জানতে চায়, ‘কী খবর? কয়টা মাল সরাইছিস?’‘মাল তো সরাইনি। আর এট্টু হলি পারে ধরা পড়তাম।’‘বলিস কি? এলাকার খবর কী?’‘সারারাত মুরুব্বি লাশ পাহারায় থাকে! মাঝে মাঝে গ্রামের মানুষেরাও পাহারায় থাকে। ধরা পড়লেই কাবাব!’‘এখন উপায়?’‘অপেক্ষা করা ছাড়া কী উপায়?’‘এত সময় নাই। বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে। যে কোনো উপায়ে।’
আরও পড়ুন
তুমি চলে যাও তোমার সময় হয়ে গেছে
লাশ কেউ চুরি করতে পারে না। লাশ চুরি করতে হলে আরেকটা লাশ ফেলতে হবে! বর্ডারের ওপাশে লাশের হাড় ও কিডনি নেওয়ার অপেক্ষায় ওরা!‘খুন করলি কী লাভ হবে? আমার চাই কঙ্কাল। অন্য উপায় বের করতে হবে। খুন হলিপারে আরেকটা মামলা, আরেকটা তদন্ত হবে! আবার ধরা পড়ার ভয়!’‘ওকে। তবে কাজ সমাপ্ত করতে হলে ঝুঁকি তো নিতেই হবে। পয়সা তো আর পায়ে হেঁটে বাড়ি আসবে না।’
কুদ্দুস মণ্ডলের বাড়িতে আগুন লেগেছে। এখন সেখানে বেশ ভিড়। মুহূর্তেই আগুনের লেলিহান শিখা প্রকাণ্ড আকার ধারণ করল। কেউ যায় আগুন নেভাতে, কেউ যায় আগুন দেখতে! রহমান মিঞার বাড়ি কুদ্দুসের কয়েক বাড়ি পরেই। রহমান মিঞা দৌড়ায় কুদ্দুসের বাড়িতে।
‘এখন গোরস্থান ফাঁকা! সবাই আগুন নিয়ে ব্যস্ত। এখন লাশ চুরির আসল সময়।’‘এত বড় কেন? আগুন কি লাইগলো খড়ের গাদায়?’‘আগুন আরও বাড়ে বাড়ুক। আমার কাজ আগে সারতে হবে। চল তাড়াতাড়ি হাত লাগা। লাশ চুরি করি বস্তায় ভরতি পারলি, তখন মনের আগুন নিভতি পারে।’‘আগুন দিছো কনে?’‘গোয়াল ঘরে।’‘অবলা পশুগুলা তো মরি যাবে! কাজটা করছ কী?’‘যে মরে মরুক। আমার কিরে হারামজাদা? আমার চাই লাশের কঙ্কাল, লাশের কিডনি। এই কঙ্কাল পালি আমার মনের আগুন পেজি যাবে। যতক্ষণ কঙ্কাল-কিডনি না পাবো; ততক্ষণ যা খুশি তা-ই করতি পারি। দরকার লাগলে গোটা দুনিয়া জ্বালাই দিবো।’‘ওস্তাদ তুমি চোর হলিও সর্দার খারাপ না।’‘কাজটা শেষ কর, ফিসফাস কম কর। কাজ শেষ হলিপারে কাইল মোটা টাকা পাবানি।’
খড়ের গাদায় আগুনের তেজ কমে এসেছে। কাঞ্চন ডাকাতের মনের শিখাও ম্রিয়মান হয়েছে। বস্তায় লাশের কঙ্কাল ভরে কাঞ্চন স্বস্তিতে। আগুন নিভিয়ে কিছু মানুষ রাস্তা দিয়ে ঘরে ফিরছে। কাঞ্চন সিএনজি নিয়ে লক্ষ্যের মুখে ধাবমান। গ্রামের মানুষ একজন অন্যজনকে জিজ্ঞেস করছে, ‘কোন গেরামের গাড়ি? কনে যায়?’
কাঞ্চনের সিএনজির গিয়ার চেঞ্জ হয়ে গেল। গাড়ি এখন আরও দ্রুত চলতে আরম্ভ করল। গ্রামের মানুষের আবেগ দাবানলের মতোই। একবার জ্বলে উঠলে না পুড়িয়ে রক্ষা নেই! এ সত্য কাঞ্চনের ভালো করেই জানা।
আরও পড়ুন
বিয়ের গহনার নকশায় খোদাই করা ভালোবাসা
এসইউ