২০২৬ সালের ৭ আগস্ট পবিত্র মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান যে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি (Mecca Joint Defence Agreement) স্বাক্ষর করেছে, তা মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ভূরাজনীতিতে একটি যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। চুক্তিটি ঘোষণার পরপরই আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি কেবল তিনটি মুসলিম দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা, নাকি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে একটি নীরব বার্তা?
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, চুক্তিতে মিসরকে অন্তর্ভুক্ত করার আলোচনা চলছে। ফলে এটি ভবিষ্যতে বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তাকাঠামোয় পরিণত হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতায় এই উদ্যোগকে অনেকে এমন এক নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখছেন, যেখানে আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় ক্রমশ স্বনির্ভর হতে চাইছে।
কেন মক্কা চুক্তি?
চুক্তির পটভূমি বুঝতে হলে সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যকে দেখতে হবে। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। বিভিন্ন বিশ্লেষকের মতে, ওই অভিযানের সময় উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গে পর্যাপ্ত পরামর্শ করা হয়নি, অথচ সম্ভাব্য ইরানি প্রতিশোধের ঝুঁকি বহন করতে হয়েছিল মূলত সেই দেশগুলোকেই।
এখানেই দেখা দেয় আস্থার সংকট। উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে প্রশ্ন তৈরি হয়—যদি আঞ্চলিক সংঘাতের সিদ্ধান্ত অন্যরা নেয়, অথচ তার মূল্য দিতে হয় তাদের, তাহলে নিরাপত্তার জন্য একমাত্র ভরসা হিসেবে ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা কতটা যৌক্তিক?
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কৌশল ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ মনসুর আহমেদের মতে, মক্কা চুক্তি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার ঘাটতির কারণে নয়, বরং উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোকে কার্যকরভাবে রক্ষা করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে তৈরি হওয়া প্রশ্নের ফল।
ট্রাম্পের নীতি ও আঞ্চলিক বাস্তবতা
মজার বিষয় হলো, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব আরও বেশি করে নিজেরাই নিক—এটাই তিনি দীর্ঘদিন ধরে চেয়ে এসেছেন। বাস্তবেও ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিতে সেই প্রবণতা স্পষ্ট। ২০২৫ সালে ন্যাটো সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ২ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে উন্নীত করার জন্য ব্যাপক চাপ দিয়েছিল ওয়াশিংটন। একইভাবে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া কমানোর ঘোষণাও দেয় যুক্তরাষ্ট্র।
এসব পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার—যুক্তরাষ্ট্র তার বৈশ্বিক মিত্রদের নিরাপত্তা ব্যয়ের বড় অংশ বহন করতে আর আগ্রহী নয়। ফলে আঞ্চলিক শক্তিগুলো বিকল্প নিরাপত্তাকাঠামোর দিকে ঝুঁকছে।
চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে একটি বিষয় ইতোমধ্যেই স্পষ্ট—মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে মার্কিন প্রভাবের একচ্ছত্র আধিপত্য আগের মতো আর নেই। আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেদের অবস্থান পুনর্নির্ধারণ করছে, এবং মক্কা চুক্তি সেই নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
তবে এর অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে চলে যাচ্ছে। বরং অনেক বিশ্লেষকের মতে, ওয়াশিংটন সরাসরি নিরাপত্তা প্রদানকারীর পরিবর্তে একটি ‘সহায়ক শক্তি’ হিসেবে ভূমিকা রাখতে চাইছে। কিন্তু এই পরিবর্তনও আঞ্চলিক দেশগুলোকে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করাচ্ছে।
নিরাপত্তা ভোক্তা নয়, নিরাপত্তা প্রদানকারী
মক্কা চুক্তির অন্যতম বড় উপকারভোগী হতে পারে তুরস্ক। গত এক দশকে আঙ্কারা নিজেকে কেবল একটি আঞ্চলিক শক্তি নয়, বরং একটি নিরাপত্তা প্রদানকারী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে। সিরিয়া, লিবিয়া, ককেশাস এবং কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে তুরস্কের সক্রিয় ভূমিকা সেই কৌশলেরই অংশ।
আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক বেতুল দোগান-আক্কাশের ভাষায়, তুরস্কের প্রধান অর্জন নিরাপত্তা পাওয়া নয়; বরং নিরাপত্তা দেওয়ার সক্ষমতা প্রদর্শন করা। একই সঙ্গে তুরস্কের যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি দীর্ঘদিনের সংশয়ও এখানে ভূমিকা রেখেছে। ন্যাটোর সদস্য হওয়া সত্ত্বেও আঙ্কারা বহুবার অনুভব করেছে যে পশ্চিমা নিরাপত্তাকাঠামো সব সময় তার স্বার্থ রক্ষা করেনি। ফলে মক্কা চুক্তি তুরস্কের জন্য এক ধরনের ‘পোস্ট-ডিপেনডেন্স’ বা নির্ভরতা-উত্তর কৌশল।
সৌদি আরব ও পাকিস্তানের হিসাব
সৌদি আরবের জন্য চুক্তিটি আরও বাস্তবধর্মী। ইয়েমেন যুদ্ধ, ইরান-সৌদি উত্তেজনা এবং উপসাগরীয় নিরাপত্তা সংকট রিয়াদকে বুঝিয়েছে যে কেবল বাইরের শক্তির ওপর নির্ভর করে স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন।
অন্যদিকে পাকিস্তানের জন্য এটি মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তাব্যবস্থায় আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের সুযোগ। পাকিস্তান একদিকে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। ফলে চুক্তিটি তাকে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সমীকরণে নতুন গুরুত্ব দিতে পারে।
এটি কি ‘মুসলিম ন্যাটো’?
মক্কা চুক্তি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হলো এর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ধারা। চুক্তিতে বলা হয়েছে, সদস্যরাষ্ট্রের একটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণকে সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ভাষাগতভাবে এটি ন্যাটোর অনুচ্ছেদ-৫-এর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
তবে বাস্তবে এটি ন্যাটোর মতো স্বয়ংক্রিয় সামরিক প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা নয়।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান স্পষ্ট করেছেন যে আক্রান্ত দেশকে প্রথমে সহায়তা চাইতে হবে এবং কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন—গোয়েন্দা তথ্য, লজিস্টিক সহায়তা নাকি সেনা—তা নির্ধারণ করতে হবে।
অর্থাৎ এটি বাধ্যতামূলক যুদ্ধজোট নয়; বরং একটি নমনীয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকাঠামো। ফলে কোনো সদস্যরাষ্ট্রের সংঘাতে অন্য দুই দেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়বে—এমন সম্ভাবনা কম।
ইরান, ইসরায়েল ও নতুন আঞ্চলিক সমীকরণ
অনেক বিশ্লেষক মক্কা চুক্তিকে ইরানবিরোধী সুন্নি জোট হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল।
একদিকে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব মোকাবিলার বিষয়টি রয়েছে, অন্যদিকে গাজা যুদ্ধ, পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি এবং লেবানন-সিরিয়া সীমান্তে চলমান উত্তেজনার কারণে ইসরায়েলের ভূমিকাও আরব ও মুসলিম বিশ্বে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ফলে এই জোট কেবল ইরানকে লক্ষ্য করে গঠিত—এমন ব্যাখ্যা যথেষ্ট নয়। বরং এটি এমন একটি কাঠামো, যা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতার বাইরে থেকেও নিজেদের নিরাপত্তা সমন্বয়ের সুযোগ দিতে পারে।
মার্কিন প্রভাব কি সত্যিই কমছে?
মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। সামরিক, প্রযুক্তিগত ও গোয়েন্দা সক্ষমতার বিচারে যুক্তরাষ্ট্র এখনো এই অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী বহিরাগত শক্তি।
তাই ‘মক্কা চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিস্থাপন করবে’—এমন দাবি বাস্তবসম্মত নয়।
তবে এটিও সত্য যে চুক্তিটি এমন এক প্রবণতার প্রতীক, যেখানে আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলো আর এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করতে চায় না। তারা নিরাপত্তার নতুন স্তর তৈরি করতে চায়—যেখানে ওয়াশিংটন থাকবে, কিন্তু একমাত্র ভরসা হিসেবে নয়।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, এটি যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্র-নির্ভর নিরাপত্তাব্যবস্থার পরিপূরক একটি কাঠামো। কিন্তু ইতিহাসে অনেক বড় পরিবর্তনের সূচনা এভাবেই হয়—প্রথমে বিকল্প হিসেবে, পরে নতুন বাস্তবতা হিসেবে।
বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বের দিকে
মক্কা চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা সম্ভবত এখানেই। বিশ্ব ক্রমশ একমেরুকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা থেকে বহুমেরুকেন্দ্রিক ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। চীন, ভারত, তুরস্ক, সৌদি আরব এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তি নিজেদের কৌশলগত পরিসর সম্প্রসারণ করছে।
মধ্যপ্রাচ্যও সেই পরিবর্তনের বাইরে নয়। মক্কা চুক্তি দেখিয়ে দিয়েছে যে এই অঞ্চলের দেশগুলো এখন নিজেদের নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা শিল্প ও কৌশলগত ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বাধীনভাবে ভাবতে শুরু করেছে।
চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে একটি বিষয় ইতোমধ্যেই স্পষ্ট—মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে মার্কিন প্রভাবের একচ্ছত্র আধিপত্য আগের মতো আর নেই। আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেদের অবস্থান পুনর্নির্ধারণ করছে, এবং মক্কা চুক্তি সেই নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
লেখক : বৃটেনপ্রবাসী কলামিস্ট।
এইচআর/জেআইএম