১৯১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত রাজবাড়ী পৌরসভা কাগজে-কলমে ‘ক’ শ্রেণির মর্যাদা পেলেও নাগরিক সেবা নিয়ে জনমনে রয়েছে নানা ক্ষোভ। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় দুর্বল হয়ে পড়েছে প্রায় পুরো পৌরসভার ড্রেনেজ ব্যবস্থা। অল্প বৃষ্টিতেই তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা।
সামান্য বৃষ্টিতেই যেসব এলাকায় জলাবদ্ধতা হয়, তার মধ্যে অন্যতম পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সুবিধাবঞ্চিত বিন্দুপাড়া এলাকা। গত এক মাস ধরে পানিবন্দি হয়ে রয়েছেন এই এলাকার অর্ধশত পরিবার। বসতঘর, রান্নাঘর, টয়লেটসহ চলাচলের রাস্তায় নোংরা পানি থাকায় ব্যাহত হচ্ছে সব দৈনন্দিন কাজ। ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধসহ পানিবাহিত রোগ।
এদিকে দীর্ঘদিন এলাকায় পানি জমে থাকায় বেড়েছে মশা-মাছির উপদ্রব। সেই সঙ্গে দেখা দিয়েছে ডায়রিয়া, চুলকানি ও খোসপাঁচড়াসহ নানা রোগ-বালাই। আর পচা পানির দুর্গন্ধে পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সরেজমিনে দেখা গেছে, পৌরসভার বিন্দুপাড়া এলাকার বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল না থাকায় বের হতে পারছে না জমে থাকা পানি। নোংরা ও পচা দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে ডুবে রয়েছে বসতবাড়ির আঙিনা ও চলাচলের রাস্তা। চলাচলের বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়ে দুর্গন্ধযুক্ত পচা পানির মধ্য দিয়ে চলাচল করছেন শিশু, নারী ও বয়স্করা। এতে ছড়াচ্ছে পানিবাহিত রোগ।
এলাকাবাসীর দাবি, প্রায় পাঁচ বছর ধরে বর্ষার মৌসুমে তারা পানিবন্দি থাকেন। নিচু এলাকা এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থা কার্যকর না থাকায় তারা এই দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন এবং রোগ-জীবাণুতে আক্রান্ত হচ্ছেন। পৌর কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি সমাধানের জন্য একাধিকবার জানিয়েও পাওয়া যায়নি প্রতিকার। অথচ ভোটের সময় ঠিকই তারা ভোট নিতে আসে। পানির কারণে চলাফেরা, খাওয়া-দাওয়া, থাকা, কাজকর্ম প্রায় সব বন্ধ হয়ে গেছে।
এখন তাদের শেষ ভরসা ছাত্রদল নেতা রোমান। কারণ তিনি পৌরসভার বিভিন্ন জায়গার ময়লা-আবর্জনা, ড্রেন পরিষ্কারসহ নানা মানবিক কাজ করে আসছেন। তিনি তাদের পানিবন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত করার আশ্বাস দিয়েছেন।
চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী শিরিন জানায়, পচা পানির কারণে তারা ঠিকমতো চলাচল, খাওয়া-দাওয়া ও স্কুলে যেতে পারছে না। গন্ধে ঘরে থাকতে কষ্ট হয়। পানি দিয়ে হেঁটে পায়ে চুলকানি ও ঘা হয়েছে। বৃষ্টি হলে নিচের সব ময়লা উপরে উঠে আসে। দ্রুত এই পানি বের করে দেওয়ার দাবি তার।
নুরজাহান বেগম নামের এক গৃহবধূ বলেন, বৃষ্টি হলেই এখানে পানি জমে যায়। পানি বের হওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই। দীর্ঘদিন পানি জমে থেকে পচে কালো হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। মশা-মাছির উপদ্রব যেমন বেড়েছে, তেমনি বাচ্চাদের ডায়রিয়াসহ হাত-পায়ে ঘা হয়েছে। টিউবওয়েলের পানিও গন্ধ, খাওয়া যায় না। বাচ্চাদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি। আমরা চাই দ্রুত এই পানি বের করা হোক।
স্থানীয় গৃহবধূ সেলিনা বেগম বলেন, পানি পচে দূষিত ও দুর্গন্ধ হয়ে গেছে। পানিতে পোকা ও প্রচুর মশা। গন্ধের কারণে টিউবওয়েলের পানিও খেতে পারছি না। বিশেষ করে বাচ্চাদের নিয়ে ভয়ে আছি। এ অবস্থায় প্রায় এক মাস ধরে রয়েছি।
স্থানীয় সামসুল হক বলেন, আমরা চার বছর ধরে এই দুর্ভোগ পোহাচ্ছি। পৌরসভার কয়েকজন মেয়রের কাছে গিয়েও কোনো সমাধান পাইনি। পানি পচা গন্ধে ঘরে ঘরে জ্বর, ডায়রিয়া, চুলকানি হয়েছে। রান্না করতে পারছি না, একদিন রান্না করে দুই দিন খাই। টয়লেটে যাওয়ার পর্যন্ত উপায় নেই। তা ছাড়া মশা-মাছির কারণে খাবার ঠিকমতো খেতে বা ঘুমাতেও পারছি না।
তিনি বলেন, ‘আর কতকাল এভাবে ভুগব? আমরা তো পৌরসভার বাসিন্দা। ভোট নিয়ে মেয়র-কাউন্সিলার হয়, তাহলে কেন আমরা বিপদে থাকব। টাকা-পয়সা চাই না, চাই নাগরিক সুবিধা।’
রাজবাড়ী জেলা ছাত্রদল নেতা ও মেয়র প্রার্থী আরিফুল ইসলাম রোমান বলেন, বিন্দুপাড়ার সুবিধাবঞ্চিত পরিবারগুলো পানিবন্দি হয়ে রয়েছে খবর পেয়ে ছুটে এসেছি। পুরো এলাকা ঘুরে দেখেছি। এখানকার অবস্থা খুবই খারাপ। প্রায় অর্ধশত পরিবার পানিবন্দি হয়ে রয়েছে। পানি থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। তারপরও এর মধ্যেই চলছে তাদের খাওয়া-দাওয়া, চলাচলসহ দৈনন্দিন কাজ।
তিনি বলেন, এই অবস্থা থেকে তাদের মুক্তি দিতে পানির পাম্প লাগিয়ে পানি নিষ্কাশন এবং বন্ধ ড্রেন পরিষ্কার করা হবে। এছাড়া তাদের চলাচলের ক্ষতিগ্রস্ত বাঁশের মাচালি নতুন করে তৈরি করে দেওয়া হবে।
রাজবাড়ী পৌরসভার প্রশাসক কল্যাণ চৌধুরী বলেন, বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করা হবে।
রুবেলুর রহমান/এসজেডএইচ/এএসএম