বাংলা সাহিত্য বহুকাল ধরেই ছোটগল্পের ঐশ্বর্যে সমৃদ্ধ। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘স্বর্ণযুগ’ পর্বে ‘পোস্টমাস্টার’, ‘একরাত্রি’ কিংবা ‘কাবুলিওয়ালা’র মতো কালজয়ী সৃষ্টি দিয়ে বিশ্বসাহিত্যের দরবারে বাংলা ছোটগল্পকে অনন্য উচ্চতায় আসীন করেছিলেন। তিনি তাঁর ‘বর্ষাযাপন’ কবিতায় ছোটগল্পের অমর সূত্র উপহার দিয়েছেন—‘শেষ হয়ে হইল না শেষ’। কিন্তু আধুনিক সাহিত্যচর্চায়, বিশেষ করে দেশি-বিদেশি প্রকাশনা, ঐতিহ্যবাহী পত্রিকা এবং বাংলা সাহিত্য সাময়িকীগুলোতে সম্পাদকদের জারি করা কড়াকড়ি ‘শব্দসীমা’র যান্ত্রিক চোখরাঙানি সেই রবীন্দ্রনাথের দর্শনেই সবচেয়ে বড় আঘাত হানছে। সাহিত্যিক নন্দনতত্ত্বের জায়গায় স্থান করে নিয়েছে প্রিন্ট মিডিয়ার পাতার কলাম-ইঞ্চি আর বাণিজ্যিক স্পেসের গাণিতিক হিসাব।
সম্প্রতি বহু কালজয়ী পটভূমির গল্পকে ৭০০, ১০০০ বা ১৫০০ শব্দের নিগড়ে বাঁধতে গিয়ে সম্পাদকদের নির্দেশে যে নির্দয় ছাঁটাই চালানো হচ্ছে, তা বাংলা সাহিত্যের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি বয়ে আনছে। নির্দয় ছাঁটাইয়ের এই যান্ত্রিক সংস্কৃতি সাহিত্যকে রূপ দিচ্ছে কেবল ঘটনাপ্রবাহের সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপে। সম্পাদকীয় টেবিলের ‘ছোট করুন’ আদেশের সামনে ইতিহাস কী বলে, তা একটু ঝালিয়ে নেওয়া যাক। বাংলা ও বিশ্বসাহিত্যের যেসব ছোটগল্প কালজয়ী হয়েছে; সেগুলোর শব্দসংখ্যা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, মহৎ সাহিত্য কখনো শব্দের বাঁধনে বন্দি হয়ে তৈরি হয়নি।
আর্নেস্ট হেমিংওয়ের বিখ্যাত ছোটগল্প ‘দ্য শর্ট হ্যাপি লাইফ অব ফ্রান্সিস ম্যাকম্বার’ প্রায় ৮ হাজার ২০০ শব্দের। তাঁর বহুল পঠিত ‘দ্য কিলারস’ গল্পটিও প্রায় ৩ হাজার শব্দের। লিও তলস্তয়ের মাস্টারপিস ছোটগল্প ‘হাউ মাচ ল্যান্ড ডাজ আ ম্যান নিড?’ প্রায় ৬ হাজার ৫০০ শব্দের। ও হেনরিকে বলা হয় ছোটগল্পের জাদুকর। তাঁর বিখ্যাত গল্প ‘দ্য গিফট অব দ্য ম্যাজাই’ প্রায় ২ হাজার ১০০ শব্দের এবং ‘দ্য লাস্ট লিফ’ প্রায় ২ হাজার ৫০০ শব্দের। মোপাসাঁর কালজয়ী গল্প ‘দ্য নেকলেস’ প্রায় ২ হাজার ৯০০ শব্দের। আন্তন চেখভের মনস্তাত্ত্বিক ছোটগল্প ‘দ্য বেট’ প্রায় ৩ হাজার শব্দের।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কাবুলিওয়ালা’ গল্পটি প্রায় ২ হাজার ৫০০ শব্দের এবং তাঁর দীর্ঘ ছোটগল্প ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ প্রায় ৩ হাজার ৫০০ শব্দের। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সংবেদনশীল ছোটগল্প ‘মহেশ’ প্রায় ৩ হাজার ৬০০ শব্দের। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনস্তাত্ত্বিক মাস্টারপিস ‘প্রাগৈতিহাসিক’ প্রায় ৪ হাজার ৫০০ শব্দের। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত গল্প ‘পুঁইমাচা’ প্রায় ৫ হাজার শব্দের। সৈয়দ মুজতবা আলীর অনন্য রসাত্মক গল্প ‘পাদটীকা’ প্রায় ৪ হাজার শব্দের।
এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, বিশ্ব ও বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ গল্পগুলোর গড় আয়তন ছিল ২ হাজার থেকে ৫ হাজার শব্দের মধ্যে। অথচ আধুনিক পত্রিকা বা সাময়িকীর সম্পাদকেরা একজন লেখককে বাধ্য করছেন ৮০০ বা ১ হাজার শব্দের খাঁচায় আস্ত একটি জীবনের রূপান্তরকে বন্দি করতে! তাতে ছোটগল্পের বনসাই রচিত হচ্ছে, যার ফলাফল অতৃপ্তি।
পত্রিকা ও সাময়িকীর প্রিন্ট সংস্করণের নিজস্ব কিছু ভৌত ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। সংবাদপত্রের পাতা সীমিত, বিজ্ঞাপনের চাপ থাকে, আর লেআউট বা মেকআপের একটি নির্দিষ্ট কলাম-ইঞ্চি হিসাব থাকে। কিন্তু এই প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাকে সাহিত্যের শিল্পরীতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া কতটুকু সমীচীন?
প্রিন্ট মিডিয়ার স্থানসংকট বা কাগজের দাম বাড়ার অর্থনৈতিক সমীকরণ কি সৃজনশীল মননের গতিপথকে বেঁধে দেওয়ার অজুহাত হতে পারে? যখন একজন লেখক তার কল্পনার বিশাল ক্যানভাসে একটি জীবনবোধ ফুটিয়ে তুলতে চান; তখন সম্পাদকীয় লাল কালির কাঁচি এসে তা ছেঁটে ফেলে। সাহিত্যের ভাষা তখন আর স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততায় বাড়ে না; তা হয়ে ওঠে মেপে মেপে বসানো এক মেকানিক্যাল ড্রাফট।
এই সংকুচিত যান্ত্রিক শব্দসীমার কারণে ছোটগল্পের শিল্পরূপে যে ৭টি প্রধান বিপর্যয় ঘটে চলেছে—
রূপক, পরিবেশ ও দৃশ্যকল্পের অবলুপ্তি
কোনো গল্পের আত্মা থাকে তার পরিবেশের বর্ণনায়। কোনো পুরোনো বাড়ি, প্রকৃতির রূপবদল, শিউলি বা পর্তুলিকা ফুলের রূপক ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের সম্পর্কের ভঙ্গুরতা বোঝানোর যে নান্দনিক চেষ্টা, শব্দ কমানোর চাপে লেখককে সবার আগে সেই রূপক ও দৃশ্যকল্পগুলোকেই বিসর্জন দিতে হয়।
চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের সংকট
ছোটগল্পের প্রধান শক্তি এর অন্তর্গত গতিময়তা ও মনস্তত্ত্ব। দুই বন্ধুর বহু বছরের পুরোনো অভিমান ধসে পড়ার মুহূর্তটিকে যদি মাত্র দুই বাক্যে ফুটিয়ে তুলতে বাধ্য করা হয়, তবে চরিত্রগুলোর রূপান্তর বিশ্বাসযোগ্য হয় না। যে আবেগের পরিপক্বতার জন্য প্রয়োজন ছিল পরিবেশের গভীরতা, সম্পাদকীয় ছাঁটাইয়ের ফলে তা পরিণত হয় নিছক ঘটনার এক খতিয়ানে।
আরও পড়ুন
ছোটগল্প: রবিন টুইস্ট
লেখকের নিজস্ব শৈলীর মৃত্যু
প্রতিটি লেখকের ভাষার একটি আলাদা মেজাজ বা শৈলী থাকে। কিন্তু হাজার শব্দের মধ্যে প্লট শেষ করার তাগিদে লেখককে দ্রুত ঘটনার পরিণতিতে পৌঁছাতে হয়। ফলে লেখকের নিজস্ব বয়ান, উপমা ও ভাষার ঝংকার হারিয়ে গিয়ে তিনি কেবল এক যান্ত্রিক তথ্য সরবরাহকারী বা কথকে পরিণত হন।
মেসেজ, জীবনদর্শন ও উদ্ধৃতি কমে যাওয়া
গল্পের ভেতরে যে গভীর জীবনমুখী বার্তা বা অন্তর্দৃষ্টিমূলক উদ্ধৃতিগুলো মানুষকে যুগের পর যুগ ভাবায়, শব্দসীমার টানে লেখককে সবার আগে সেই বাক্য ও বার্তাগুলোকেই কেটে বাদ দিতে হয়। ফলে গল্পটি তার প্রয়োজনীয় সামাজিক বা দার্শনিক মেসেজ হারিয়ে ফেলে।
পাঠকের তৃপ্তি কমে যাওয়া
নির্দয়ভাবে সংক্ষিপ্ত করা গল্পগুলো পাঠ শেষে পাঠককে সাহিত্যরস দিতে ব্যর্থ হয়। গল্প পড়ে মনে হয় বাটার ও জেলি ছুড়ে ফেলে শুধু শক্ত শুকনো রুটি চিবানো হচ্ছে। তাতে পেট হয়তো ভরে কিন্তু ভেতরের রস বা আত্মিক তৃপ্তি অধরাই থেকে যায়।
অন্যায্যভাবে লেখকের ওপর দোষ চাপানো
সম্পাদকীয় ছাঁটাইয়ের কারণে গল্পটি যখন প্রাণহীন ও অগভীর হয়ে পড়ে; তখন সাধারণ পাঠক কিন্তু সম্পাদককে দোষ দেন না। পাঠক ধরে নেন লেখক নিজেই কাঁচা এবং গল্পটি জমাট বাঁধেনি। ফলে সম্পাদনার ভুলের দায়ভার অন্যায্যভাবে লেখকের ওপর এসে পড়ে।
কালজয়ী গল্প কমে যাওয়া ও মান হ্রাস পাওয়া
সম্পাদকীয় কাটছাঁট একটি শিল্পকর্মের মান কতটা নামিয়ে দেয়, তার একটি উদাহরণ ‘শাওনাজ ভিলা’ নামের আমার একটি ১৭০০ শব্দের গল্প। গল্পটির কাব্যিকতা ও গভীরতা হারিয়ে গেল ধারালো লাল কেঁচির আঁচড়ে। একই গল্পকে বলপূর্বক ১ হাজার শব্দে নামিয়ে আনা হলো! আর এই গল্প দিয়ে কখনো ‘কালজয়ী’ সাহিত্য তৈরি হয় না। তৈরি হয় না ভালো সাহিত্যিক। সম্ভাবনাময় যে সাহিত্যিক ওপরে উঠতেন, তাকে উপড়ে ফেলা হলো।
আমাদের সাহিত্যের প্রকাশনা জগতে একধরনের মানসিক সংকীর্ণতা বাসা বেঁধেছে। ভাবা হয়, আধুনিক যুগের মানুষের পড়ার সময় কম, তাই গল্প যত ছোট হবে; তত বেশি পঠিত হবে। কিন্তু ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। পাঠক বড় লেখা পড়তে অনাগ্রহী নয়, পাঠক রসহীন ও তড়িঘড়ি করে শেষ করা কৃত্রিম গল্প পড়তে অনাগ্রহী। ছোটগল্প মানে আকৃতিতে ছোট হওয়া নয়, ছোটগল্প মানে ভাব ও অনুভূতির ঘনীভূত একক রূপ।
প্রকাশনা মাধ্যম যদি প্রিন্টের সীমাবদ্ধতার কারণে ৩ হাজার বা ৪ হাজার শব্দের বড় গল্প ছাপতে না-ও পারে, তবে তার বিকল্প মাধ্যম নিয়ে ভাবা উচিত। অনলাইন সংস্করণ, সাহিত্য সাময়িকীর বিশেষ দীর্ঘ সংস্করণ কিংবা কিউআর কোডের মাধ্যমে গল্পের পূর্ণাঙ্গ রূপ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ আজ ডিজিটাল যুগে বিদ্যমান। প্রযুক্তির এই যুগে এসেও প্রিন্টের পুরোনো কলাম-ইঞ্চির অজুহাতে সাহিত্যের ডানা ছেঁটে ফেলা কেবল একটি প্রশাসনিক অলসতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
অবশ্যই সম্পাদনার সুনির্দিষ্ট প্রয়োজনীয়তা আছে; মেদবহুলতা বাদ দেওয়া বা অপ্রয়োজনীয় বাক্য ছাঁটাই করা ভালো সম্পাদনার লক্ষণ। কিন্তু ‘১ হাজার শব্দের মধ্যে শেষ করতে হবে’—এই যান্ত্রিক শর্ত যখন সাহিত্য বিচারের মূল মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়; তখন সৃজনশীলতা শেকল পরা আসামির মতো আটকে যায়।
আরও পড়ুন
বাবা দিবসের গল্প: জীবনের স্থপতি
সাহিত্য কোনো সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং নয় যে, স্কেল দিয়ে মেপে এর ইট-কাঠ বসাতে হবে। চেখভ, মোপাসাঁ কিংবা রবীন্দ্রনাথ যদি আজকের যুগে সংবাদপত্র বা সাময়িকীর ওয়ার্ড লিমিটের মুখোমুখি হতেন, তবে হয়তো বাংলা ও বিশ্বসাহিত্যের কালজয়ী রূপকথাগুলো জন্মই নিতে পারত না। তাই সম্পাদক ও প্রকাশকদের উপলব্ধি করতে হবে, অক্ষরের সংখ্যা দিয়ে সাহিত্যের গভীরতা মাপা যায় না। পত্রিকার কয়েক ইঞ্চি পাতা বাঁচাতে বা প্রকাশের সুবিধার দোহাই দিয়ে যদি গল্পের আত্মাকেই বলি দেওয়া হয়, তবে নতুন প্রজন্মের পাঠক প্রকৃত সাহিত্যরস থেকে চিরতরে বঞ্চিত হবে।
বাংলা ছোটগল্পকে বিশ্বমানের মর্যাদায় টিকিয়ে রাখতে হলে এবং লেখককে তার পূর্ণ ডানা মেলতে দিতে হলে এই যান্ত্রিক ‘শব্দসীমার খাঁচা’ ভাঙতেই হবে। সাহিত্যের বিচার হোক তার আবেগে, মনস্তাত্ত্বিক গভীরতায় ও শিল্পগুণে; অক্ষরের সংখ্যায় নয়।
এসইউ