নীলনদ, পিরামিড ও হাজারো মিনারের দেশ মিশরে আগামী মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) পালিত হবে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)। তবে দেশটির সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, এ উপলক্ষে সরকারি ও সাধারণ ছুটি থাকবে ২৭ আগস্ট বৃহস্পতিবার।
ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার পর মিশরে অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবে পালিত হয় ঈদে মিলাদুন্নবী। মিশরীয়রা দিনটিকে সাধারণত ‘মাওলিদ আল-নাবি’ বা ‘মাওলিদ আল-রাসুল’ (সা.) নামে অভিহিত করেন।
আরও পড়ুন
রাজনীতিতে মেধা ও দক্ষতার মূল্যায়নের প্রস্তাব
প্রতি বছর রবিউল আওয়াল মাস শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কায়রোসহ দেশটির বিভিন্ন শহরের সুপারশপ, বাজার, পাড়া-মহল্লার মিষ্টি ও বেকারীর দোকান গুলোতে বসে ‘হালাওয়েত আল-মাওলিদ’-এর পসরা। বাদাম, তিল, চিনি ও ঘন সিরাসহ বিভিন্ন উপকরণে তৈরি এসব মিষ্টির মধ্যে ‘মালবান’ অন্যতম জনপ্রিয়।
সরেজমিনে বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি ‘হালাওয়াত আল-মাওলিদ’ বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ২০০ মিশরীয় পাউন্ডে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২০০ থেকে ৫০০ টাকার সমান।
তবে মিশরের মিলাদুন্নবীর উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও পরিচিত ঐতিহ্যগুলোর একটি হলো ‘আরুসাত আল-মাওলিদ’—অর্থাৎ ‘মাওলিদের পুতুল’।
চিনি দিয়ে তৈরি এই পুতুলকে সাধারণত কনের সাজে সাজানো হয়। সাদা ও রঙিন কাপড়, কাগজ ও নানা ধরনের অলংকার দিয়ে তৈরি করা হয় এর পোশাক ও সাজসজ্জা। শিশুদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয় এই মিষ্টির পুতুল মিশরের লোকসংস্কৃতি ও উৎসবের ঐতিহ্যের একটি পরিচিত প্রতীক হয়ে উঠেছে।
মিলাদুন্নবী উপলক্ষে বাজার ও দোকানে নানা রঙ, নকশা ও আকারের ‘আরুসাত আল-মাওলিদ’ দেখা যায়। সময়ের সঙ্গে এর নকশা ও উপস্থাপনায় পরিবর্তন এলেও মিশরীয়দের কাছে এর আবেদন এখনো অমলিন।
মিশরের পথঘাট, বাজার ও উৎসবের সাজে ‘আরুসাত আল-মাওলিদ নামের এই পুতুল যেন ধর্মীয় আবহের পাশাপাশি ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি ও আনন্দের এক অনন্য মেলবন্ধন। প্রকারভেদে প্রতিটি আরুসাত আল-মাওলিদ বিক্রি হচ্ছে ২শ থেকে হাজার পাউন্ডে।
ঐতিহাসিকদের মতে, মিশরে আনুষ্ঠানিকভাবে মিলাদুন্নবী উদযাপনের প্রচলন শুরু হয় ফাতিমীয় খেলাফতের সময়। দশম থেকে দ্বাদশ শতকের এ সময়ে শাসকগোষ্ঠী মাওলিদ উপলক্ষে দরিদ্র ও অভাবী মানুষের জন্য ভোজের আয়োজন করত এবং বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি বিতরণ করত বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
‘আরুসাত আল-মাওলিদ’-এর উৎপত্তি নিয়েও মিশরে একটি প্রচলিত লোককাহিনি রয়েছে। জনশ্রুতি অনুযায়ী, ফাতিমীয় শাসনামলের খলিফা আল-হাকিম তার এক স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে মাওলিদের দিনে শহরে বের হয়েছিলেন।
তিনি রাজকীয় পোশাকে জনসম্মুখে উপস্থিত হলে তার সঙ্গে থাকা নারীর সাজসজ্জা ও সৌন্দর্য দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে এক মিষ্টি কারিগর কনের আকৃতিতে একটি মিষ্টির পুতুল তৈরি করেন। পরবর্তীকালে সেটিই ‘আরুসাত আল-মাওলিদ’ নামে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে বলে লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে।
তবে মিশরীয়দের অধিকাংশই এই পুতুলকে ধর্মীয় কোনো অনুষঙ্গ হিসেবে নয়, বরং একটি ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক নিদর্শন হিসেবেই দেখেন।
মিশর শাফেয়ি মাজহাবের ঐতিহ্যবাহী প্রভাব থাকা একটি দেশ হলেও দেশটির ধর্মীয় চর্চায় বিভিন্ন মাজহাব ও সুফি ধারার প্রভাব রয়েছে। ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে কায়রোর বিভিন্ন মসজিদে বিশেষ দোয়া, কোরআন তেলাওয়াত ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠের আয়োজন করা হয়।
বিশেষ করে কায়রোর ঐতিহাসিক ইমাম হোসাইন (রা.) মসজিদকে ঘিরে এদিন ভক্তদের উপস্থিতি বাড়ে। মাগরিবের নামাজের পর দোয়া ও দরুদ পাঠের পাশাপাশি মসজিদের আশপাশে সুফি অনুসারীদের ধপ বাজিয়ে ইসলামী সংগীত ও ধর্মীয় সঙ্গীত পরিবেশন করতেও দেখা যায়।
ঈদে মিলাদুন্নবীর দুই-তিন দিন আগে থেকেই পুরো মিশরে শুরু হয় মিষ্টি বিতরণের উৎসব। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও ‘হালাওয়েত আল-মাওলিদ’ বিতরণ করা হয়।
তাছাড়াও পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের মধ্যেও মিষ্টি উপহার দেওয়ার প্রচলন রয়েছে। ফলে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি এ সময়টি পরিণত হয় সামাজিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের এক আনন্দঘন উৎসবে।
১২ রবিউল আওয়াল বা মিলাদুন্নবীর দিনে অনেক মিশরীয় নফল রোজা রাখেন। পাশাপাশি অতিরিক্ত সময় কোরআন তেলাওয়াত, নফল ইবাদত ও দরুদ পাঠে কাটান। তবে বাংলাদেশ বা দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অঞ্চলের মতো মসজিদে দাঁড়িয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মিলাদ কায়েম’-এর প্রচলন মিশরে সাধারণভাবে দেখা যায় না। বরং ব্যক্তিগত ইবাদত, দোয়া ও ধর্মীয় আলোচনাই এদিনের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ।
সন্ধ্যার পর অনেক মিশরীয় পরিবারে দেখা যায় বিশেষ খাবার তৈরির আয়োজন। এর মধ্যে ‘রুজ বি লাবান’- দুধ ও চাল দিয়ে তৈরি এক ধরনের মিষ্টি পায়েস- ছোট ছোট পাত্রে করে প্রতিবেশী ও পথচারীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।
সব মিলিয়ে মিশরে ঈদে মিলাদুন্নবী শুধু একটি ধর্মীয় উপলক্ষ নয়; বরং শতাব্দী প্রাচীন ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি, পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য উৎসব। আর সেই ঐতিহ্যের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীকগুলোর একটি হয়ে আজও টিকে আছে রঙিন সাজে সজ্জিত ‘আরুসাত আল-মাওলিদ’।
এমআরএম