ড. এম এ মুহিত। সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী। সিরাজগঞ্জ-৬ (শাহজাদপুর) আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য। জন্ম ১৯৬৯ সালের ৫ অক্টোবর। বাবা প্রখ্যাত চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও দেশের সাবেক স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এম এ মতিন।
পেশাগত জীবনে ড. মুহিতও একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জনস্বাস্থ্য ও চক্ষু রোগ বিশেষজ্ঞ। মাঠপর্যায়ে প্রতিবন্ধী শিশুদের চিকিৎসা এবং অন্ধত্ব দূরীকরণে বিশ্বজুড়ে তার কাজের সুনাম রয়েছে। পাশাপাশি তিনি ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়ার চেয়ারম্যান এবং ‘সিএসএফ গ্লোবাল’-এর সভাপতি হিসেবে যুক্ত আছেন।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছেন। তার মূল লক্ষ্য হলো রোগ হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করা। এ উদ্দেশে তিনি দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যা সংখ্যা বাড়াচ্ছেন। তৃণমূলের পাঁচ লাখেরও বেশি স্বাস্থ্যকর্মীকে চোখের প্রাথমিক চিকিৎসার ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া হাম, কলেরা ও ডায়রিয়া প্রতিরোধে তিনি ওরাল ভ্যাকসিন কার্যক্রম জোরদার করেছেন।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের ৬ মাস তথা ১৮০ দিন পূর্তি উপলক্ষে জাগো নিউজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তার সরকারের কার্যক্রম ও পরিকল্পনা তুলে ধরেন ড. মুহিত। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সালাহ উদ্দিন জসিম। দুই পর্বের ধারাবাহিকের আজ প্রকাশ হলো দ্বিতীয় তথা শেষ পর্ব।
জাগো নিউজ : চিকিৎসকদের পদোন্নতি ও বদলির ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি অটোমেশন পদ্ধতি চালু করে গেছে এবং নার্সদের ক্ষেত্রে এর প্রয়োগও করেছে। তবে চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে এটি বাস্তবায়ন হয়নি। এরই মধ্যে চিকিৎসকদের বদলি ও পদোন্নতি নিয়ে নানান নেতিবাচক কথা শোনা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে আপনারা কী করবেন?
ড. এম এ মুহিত : এর আগেও অটোমেশন ব্যবহার হয়েছে। শেষবার নতুন বিসিএসের মাধ্যমে যেসব চিকিৎসককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাদের পদায়ন অটোমেশনের মাধ্যমেই হয়েছে। অটোমেশনের কাজ চলমান রয়েছে। এরপরও পদায়নের একটি বড় অংশ অটোমেটেড হচ্ছে না, যা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা ও সমালোচনা রয়েছে।
আমাদের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, চিকিৎসকদের হাজিরা ও পদায়ন অটোমেশনের আওতায় নিশ্চিত করা হবে। আমরা ধাপে ধাপে এগুলো বাস্তবায়ন করছি।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলছেন জাগো নিউজের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সালাহ উদ্দিন জসিম, ছবি: জাগো নিউজ
জাগো নিউজ : অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রায় সাড়ে সাত হাজার চিকিৎসককে পদোন্নতি দিলেও তাদের পদায়ন করে যেতে পারেনি। পদায়ন শেষ না করেই কাউকে কাউকে চলতি দায়িত্বে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। এটি কি একরকম বৈষম্য এবং ক্ষোভ পুঞ্জীভূত করবে না?
ড. এম এ মুহিত : আমি বলতে চাচ্ছিলাম না, কিন্তু প্রশ্নের মাধ্যমে বারবার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কথাটি উঠে আসছে। তারা হয়তো ভালো কিছু চিন্তা করে কাজ শুরু করেছিলেন, কিন্তু তা শেষ করে যেতে পারেননি। যেমন—টিকা কেনা হয়নি বলে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল। এখানেও একই পরিস্থিতি।
তাদের (অন্তর্বর্তী সরকারের) চিন্তার শুরুটা হয়তো ভালো ছিল, কিন্তু অদক্ষতার কারণে তারা সিদ্ধান্তগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেননি। তারা দেড় বছর দায়িত্বে ছিলেন, আর আমরা মাত্র ছয় মাস হলো দায়িত্ব নিয়েছি।
আরও পড়ুন
১৭ বছরের জঞ্জাল রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বিপুল হারে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল, অথচ অনেক পদোন্নতির বিপরীতে কোনো পদই ছিল না! পদই যদি না থাকে, তবে পদায়ন হবে কীভাবে? পদ না রেখেই পদোন্নতি দিয়ে গেছে অন্তর্বর্তী সরকার। তারা যে অব্যবস্থাপনা তৈরি করে গেছেন, তার খেসারত আমাদের দিতে হচ্ছে। যাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, তারা এখন বলছেন—‘আমাদের পদোন্নতি তো দিয়েছেন, কিন্তু কাজ করার মতো পদ কোথায়?’ এ বিষয়টি অন্তর্বর্তী সরকার ঠিক করেনি।
জাগো নিউজ : গত ছয় মাসে কাজ করতে গিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কী কী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন এবং সমস্যাগুলো কতখানি গভীরভাবে চিহ্নিত করতে পেরেছেন?
ড. এম এ মুহিত : আমাদের বহু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিল, আর সামনেই রয়েছে ডেঙ্গু—এগুলো তো রোগবালাইয়ের বিষয়। পাশাপাশি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার মধ্যেও রোগ ও ত্রুটি রয়েছে, যা আমরা এবং দেশের জনগণ প্রতিদিন মোকাবিলা করছি। আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ করছে না।
দেশের মানুষ আসলে কী চায়? অসুখ হলে হাসপাতালে গিয়ে সুচিকিৎসা পেতে চায়, দালালের খপ্পরে পড়তে চায় না এবং হাসপাতাল থেকেই ওষুধ পেতে চায়। চিকিৎসকের রুমে গেলে যেন চিকিৎসককে পাওয়া যায়, প্রেসক্রিপশনে চারটি ওষুধ লেখা থাকলে অন্তত দুটি ওষুধ যেন সরকারি হাসপাতাল থেকেই পাওয়া যায়। হাসপাতালে থাকা অবস্থায় বাথরুমে গেলে সেটি যেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পাওয়া যায়। এছাড়া হাসপাতালে ভর্তি হলে খাবারের মান যেন ভালো থাকে এবং বিছানায় যেন ছারপোকা না থাকে। মানুষ শেষ পর্যন্ত এই মৌলিক বিষয়গুলোই চায়।
আরও পড়ুন
স্বাস্থ্যের রাজস্বখাতে ৫ হাজার পদ সৃষ্টির প্রস্তাব যাচ্ছে জনপ্রশাসনে
এগুলোর জন্যই আমাদের অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। প্রতিটি অব্যবস্থাপনার পেছনে কোনো না কোনো গোষ্ঠী লাভবান হচ্ছে এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আমাদের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল চিকিৎসকদের সময়মতো হাসপাতালে না যাওয়া, যা নিয়ে আমরা কথা বলেছি। তবে আমাদের চিকিৎসকদের সঙ্গে নিয়েই কাজ করতে হবে, কারণ চিকিৎসকরাই স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার প্রাণ।
জাগো নিউজ : আগামী দুই বছরের মধ্যে আমরা কি দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখতে পাবো?
ড. এম এ মুহিত : আমরা এটিই আশা করছি। হাসপাতালগুলোকে আর আগের মতো দেখা যাবে না। সবাইকে সচেতন ও সতর্ক করা হবে। স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এনে আমরা দেশের মানুষের জন্য কাজ করবো।
জাগো নিউজ : দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো সাপের কামড়ে মারা যাচ্ছে। এর প্রতিষেধক অ্যান্টিভেনম বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। দেশীয় কাঁচামাল দিয়ে এই ভ্যাকসিন তৈরির কোনো পরিকল্পনা আপনাদের আছে কি?
ড. এম এ মুহিত : আমাদের গ্রামগঞ্জে অ্যান্টিভেনমের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। কারণ, অনেক মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন। এখানে দুটি দিক রয়েছে—আমরা কি শুধু ওষুধই আমদানি করব, নাকি রোগ প্রতিরোধের দিকেও মনোযোগ দেবো? সাপের কামড়ে এতো মানুষ আক্রান্ত হয় যে, জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এটি অনেকাংশেই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত, ছবি: জাগো নিউজ
এছাড়া অ্যান্টিভেনম বেশ ব্যয়বহুল এবং এটি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এটিও আমাদের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে গত ছয় মাসে কোথাও অ্যান্টিভেনম সরবরাহ করতে কোনো অসুবিধা হয়নি, যদিও এতে সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে।
সামনের দিনগুলোতে কাজ করার জন্য আমরা মন্ত্রণালয় থেকে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছি এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছি। এ গবেষণাগুলো সময়সাপেক্ষ, তাই কিছুটা সময় লাগবে; তবে আমরা এর ক্ষেত্র প্রস্তুত করছি।
আরও পড়ুন
মাত্র ২৯% জনবলে চলছে স্বাস্থ্য খাত, সরকারি হিসাবেই শূন্যপদ ৭২ হাজার
জাগো নিউজ : প্রসঙ্গক্রমে আমাদের ওষুধ শিল্প প্রসঙ্গে আসি। এ খাতের সার্বিক পরিস্থিতি কেমন বলে আপনার মনে হয়? তারা কি শুধুই ব্যবসা করছে?
ড. এম এ মুহিত : আমাদের ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রির অনেক সুনাম রয়েছে এবং তারা বিভিন্ন ধরনের ওষুধ তৈরি করছে। এ শিল্পটিকেও পরিবর্তিত সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন কিছু করতে হবে। ওষুধ প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে তা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানো পর্যন্ত এ খাতের অনেক অবদান রয়েছে।
এখানে প্রচুর বিনিয়োগের প্রয়োজন হয় এবং আমরা নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে তাদের সহযোগিতা করছি। ওষুধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। এ খাতে আমি বিপুল সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি।
এসইউজে/এমকেআর