৩৭৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল আমদানির সুযোগ রেখে নতুন ‘আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২০২৯’ জারি করেছে সরকার। এর ফলে সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় (সিবিইউ) সর্বোচ্চ ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল আমদানি করা যাবে। এর আগে ২০২১–২০২৪ সালের আমদানি নীতি অনুযায়ী, সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় ১৬৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেল আমদানিতে বিধিনিষেধ ছিল।
দেশের আমদানি ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও ব্যবসাবান্ধব করতে নতুন এ নীতি জারি করা হয়েছে। এতে আমদানি প্রক্রিয়া সহজীকরণ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য তৈরি, ব্যবসায়ীদের জন্য নীতিগত স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জারি করা গেজেটে আদেশটি এক্সপোর্ট অ্যান্ড ইমপোর্টস (কন্ট্রোল) অ্যাক্ট, ১৯৫০-এর ধারা ৩(১) অনুযায়ী প্রণয়ন করা হয়েছে। গেজেট অনুযায়ী, নতুন আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬ সাল থেকে ২০২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
মূল্যসীমা ছাড়াই ক্রয়-বিক্রয় চুক্তিতে আমদানি
নতুন নীতিতে আমদানি সহজ করতে আরও বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ঋণপত্র (এলসি) খোলার পাশাপাশি এখন থেকে কোনো মূল্যসীমা ছাড়াই ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির মাধ্যমে পণ্য আমদানি করতে পারবেন শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের আমদানিকারকেরা।
আরও পড়ুন
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ১৮০ দিন: নতুন বাজার ও সম্ভাবনার নতুন দুয়ার
আগের আমদানি নীতি আদেশ ২০২১–২০২৪-এ এলসি ছাড়াই ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির মাধ্যমে আমদানির সুযোগ থাকলেও বিভিন্ন পণ্য ও খাতের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমা ও শর্ত ছিল। নতুন আদেশে সেই সুযোগ আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রচলিত পদ্ধতির সঙ্গে দেশের আমদানি ব্যবস্থাকে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাণিজ্য সহজীকরণে গুরুত্ব
নতুন আমদানি নীতিতে ব্যবসায়ীদের জন্য আমদানি কার্যক্রম পরিচালনায় অধিকতর স্পষ্টতা ও কাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পণ্যের শ্রেণিবিন্যাস, আমদানি শর্ত, প্রয়োজনীয় সনদপত্র, উৎপত্তির দেশ নির্ধারণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিধিমালা অনুসরণের বিষয়গুলোকে আরও সুসংগঠিত করা হয়েছে।
আরও পড়ুন
বিনিয়োগকারীদের সেবা সহজ করতে নতুন আইন অনুমোদন
নীতিতে আমদানি পণ্যের উৎপত্তির দেশসংক্রান্ত তথ্য নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে পণ্যের উৎস সম্পর্কে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির আওতায় প্রযোজ্য সুবিধা গ্রহণ সহজ হবে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা
নতুন নীতিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট, কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট, ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট এবং অন্যান্য আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তির আওতায় সুবিধা গ্রহণের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
আরও পড়ুন
যেসব সুবিধা থাকতে পারে নতুন আমদানি নীতিতে
এ ধরনের বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে শুল্ক সুবিধা, বাজার সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
আন্তর্জাতিক মান অনুসরণে গুরুত্ব
নতুন আমদানি নীতিতে আন্তর্জাতিক মান ও কারিগরি বিধিমালার বিষয়টিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে টেকনিক্যাল ব্যারিয়ার্স টু ট্রেড, কোডেক্স অ্যালিমেন্টারিয়াস এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন-এর মানদণ্ড অনুসরণের বিষয়টি নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এর ফলে একদিকে যেমন মানসম্পন্ন পণ্য আমদানি নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের বাণিজ্য ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী হবে।
ব্যবসায়ীদের জন্য বাড়বে নীতিগত স্বচ্ছতা
আমদানি ব্যবসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো নিয়ম-কানুনের জটিলতা ও নীতিগত অনিশ্চয়তা। নতুন নীতিতে আমদানি কার্যক্রমের বিভিন্ন সংজ্ঞা, প্রক্রিয়া ও শর্তাবলি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে ব্যবসায়ীরা আগাম পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারেন।
আরও পড়ুন
শিগগির ঢাকায় আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি
নতুন নীতির অন্যতম লক্ষ্য হলো আমদানি ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা। পণ্য যাচাই, প্রয়োজনীয় নথিপত্র, সনদ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের বিষয়গুলোকে সুস্পষ্ট করার মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের সময় ও ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
শিল্প ও বিনিয়োগে প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদি আমদানি নীতি শিল্প খাতের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, মূলধনী যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি আমদানি সহজ করবে। এতে উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং শিল্প সম্প্রসারণে সহায়তা পাওয়া যাবে।
খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন আমদানি নীতি শুধু আমদানি নিয়ন্ত্রণের একটি কাঠামো নয়; বরং এটি দেশের শিল্পায়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা গ্রহণ, মানসম্পন্ন পণ্য আমদানি এবং ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া সহজ করার মাধ্যমে দেশের বেসরকারি খাত আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আরও যেসব সুবিধা
নতুন নীতিতে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল (ফ্রি ট্রেড জোন) ও সেন্ট্রাল বন্ডেড ওয়্যারহাউস প্রতিষ্ঠার বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের শিল্পে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমদানি সুবিধা এবং রপ্তানিমুখী শিল্পে কাঁচামাল আমদানির সুযোগও সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
এনএইচ/এসএইচএস