দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ মেটাতে আলোচনা অব্যাহত রাখার বিষয়ে একমত হয়েছে চীন ও ভারত। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) বেইজিংয়ে দুই দেশের শীর্ষ কূটনীতিকদের বৈঠকে একটি ‘ন্যায্য, যুক্তিসংগত ও পারস্পরিকভাবে গ্রহণযোগ্য সমাধান’ খুঁজে বের করার বিষয়ে সম্মতি হয়েছে।
বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দুই দেশ চীন ও ভারত—দুটিই পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র। হিমালয় অঞ্চলে দেশ দুটির মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। এই সীমান্তের বড় একটি অংশ এখনো সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত নয় এবং দীর্ঘদিন ধরে এর মালিকানা নিয়ে বিরোধ রয়েছে।
মঙ্গলবার বেইজিংয়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এবং ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের মধ্যে বৈঠক হয়। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৈঠকে সীমান্ত পরিস্থিতি ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে ‘বিস্তৃত, গভীর, বন্ধুত্বপূর্ণ ও খোলামেলা’ আলোচনা হয়েছে।
সীমান্ত বিরোধে সমঝোতার বার্তা
বৈঠকে ওয়াং ই বলেন, চীন-ভারত সম্পর্ক এখন আর শুধু দুই দেশের মধ্যকার বিষয় নয়; এর সঙ্গে বৈশ্বিক ও কৌশলগত গুরুত্বও জড়িয়ে আছে। তাই দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে যোগাযোগ আরও বাড়ানো এবং মতপার্থক্য কমিয়ে আনা প্রয়োজন।
চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে ওয়াং ইকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, দুই দেশের উচিত অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে সীমান্ত সমস্যাটিকে যথাযথ অবস্থানে রাখা। একই সঙ্গে সম্পর্কের অগ্রযাত্রায় স্থবিরতা, পিছিয়ে যাওয়া বা বিচ্যুতি এড়িয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ভারতীয় দূতাবাসও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এতে বলা হয়, দুই পক্ষ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অগ্রগতি পর্যালোচনা করেছে। পাশাপাশি সহযোগিতা আরও বাড়ানো এবং সীমান্ত এলাকায় স্থিতিশীলতা ও শান্তি বজায় রাখার উপায় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
২০২০ সালের সংঘাতের পর সম্পর্কের টানাপোড়েন
চীন ও ভারতের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই সীমান্ত বিরোধের কারণে উত্তেজনাপূর্ণ। বিশেষ করে ২০২০ সালে সীমান্তে ভয়াবহ সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্ক বড় ধরনের সংকটে পড়ে।
ওই সংঘর্ষের পর প্রায় চার বছর ধরে সীমান্ত এলাকায় দুই দেশের সেনাদের মধ্যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের অক্টোবরে সেনা প্রত্যাহার ও বিচ্ছিন্নকরণ নিয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছায় দুই দেশ।
এরপর ধীরে ধীরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে বরফ গলতে শুরু করে।
গত বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সাত বছর পর প্রথমবারের মতো চীন সফর করেন। তার এই সফর দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতির গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত-সংক্রান্ত নতুন একটি বিরোধকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে আবারও তীব্র কূটনৈতিক পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেখা যায়।
২০২৭ সালে ভারতে পরবর্তী সীমান্ত বৈঠক
এর মধ্যেই সীমান্ত সমস্যা নিয়ে নিয়মিত আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুই দেশ।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগামী দফার সীমান্ত আলোচনা ২০২৭ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত হবে।
দীর্ঘ প্রায় চার হাজার কিলোমিটারের বিতর্কিত সীমান্তের চূড়ান্ত সমাধান এখনো অনেক দূরের বিষয় হলেও মঙ্গলবারের বৈঠককে দুই দেশের সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষ করে ২০২০ সালের সংঘাতের পর সামরিক উত্তেজনা কমিয়ে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সীমান্ত সমস্যার সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার বার্তাই দিয়েছে বেইজিং ও নয়াদিল্লি।
সূত্র: রয়টার্স
এমএসএম