ইরান ও ওমান হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের অংশ এবং এ জলপথ থেকে অর্জিত রাজস্ব ভাগাভাগির বিষয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের শর্ত না মানলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ পুনরায় খুলে দেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে বাহিনীটি।
বুধবার (২৬ আগস্ট) ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্যে আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌ চলাচল নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে ইরান ও ওমান কয়েক সপ্তাহ ধরে দফায় দফায় আলোচনা চালিয়ে আসছে। প্রায় এক মাসের আলোচনার পর উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য ফল পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।
ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস- এলএনজির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হতো। তবে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে বেশির ভাগ নৌ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে দাম বেড়ে যায়। একই সময়ে তেহরান ও ওয়াশিংটন পৃথক অবরোধ আরোপ করে এই কৌশলগত জলপথের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
মোহেব্বি বলেন, হরমুজ প্রণালি ইরান ও ওমানের। আমরা প্রায় এক মাস ধরে ওমানের সঙ্গে আলোচনা করেছি ও উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য ফলাফলে পৌঁছেছি।
তিনি আরও বলেন, আলোচনায় প্রণালির জলসীমায় প্রতিটি দেশের অংশ এবং সেখান থেকে প্রাপ্ত রাজস্বে ইরান ও ওমানের অংশীদারত্ব নিয়েও সমঝোতা হয়েছে।
তবে এই সমঝোতা বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্রকে শর্ত মেনে চলতে হবে বলে স্পষ্ট করে দিয়েছে আইআরজিসি। ইরানি বাহিনীটির অভিযোগ, ইরান ও ওমানের মধ্যকার আলোচনায় বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যার কারণে চূড়ান্ত সমঝোতা বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়েছে।
মোহেব্বি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি বাধা দেওয়া বন্ধ করে এবং চুক্তিতে ফিরে আসে, তাহলে অর্জিত সমঝোতার কাঠামোর মধ্যে আমরা হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে পারি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যদি আমাদের শর্ত না মানে, তাহলে কোনো অবস্থাতেই হরমুজ প্রণালি খোলা হবে না।
জাহাজে হামলা, এখনো ঝুঁকিপূর্ণ হরমুজ
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাত অনেকটাই কমে এলেও শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এখনো অচলাবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে জাহাজে হামলা অব্যাহত থাকায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল এখনো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
রোববার (২৩ আগস্ট) ইরান ৪৫টি জাহাজের একটি কালো তালিকা প্রকাশ করে। উপসাগরীয় জ্বালানি উৎপাদকদের ব্যবহৃত জাহাজ-থেকে-জাহাজে পণ্য স্থানান্তরের কার্যক্রম ঠেকাতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ইরানি অবরোধ এড়িয়ে জ্বালানি পরিবহনের জন্য এ ধরনের স্থানান্তর পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কালো তালিকাভুক্ত কিছু জাহাজের ব্যবহার বন্ধ করার পরিকল্পনা করছে কয়েকটি কোম্পানি।
এদিকে, ইরানের অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়াতে চলতি সপ্তাহের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র হুমকি দেয়, তেহরানের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক বজায় রাখা দেশগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হবে না বলেও জানানো হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত এই নতুন চাপের আওতায় ইরানের তেল রপ্তানিতে সহায়তার অভিযোগ থাকা চীনের কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। মার্কিন অবরোধের কারণে ইরানের তেল রপ্তানি ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরানের অর্থনীতিকে বিচ্ছিন্ন করার এই উদ্যোগকে ‘চরম আইনহীনতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে তেহরান। একই সঙ্গে ইরান আশাবাদ ব্যক্ত করেছে যে, অনেক দেশ ওয়াশিংটনের এই চাপ প্রয়োগের অভিযানে যোগ দেবে না।
শান্তি আলোচনার আভাসে কমল তেলের দাম
যুদ্ধের মধ্যস্থতামূলক সমাধানের চেষ্টা নতুন করে শুরু হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়ার পর টানা তৃতীয় দিনের মতো কমেছে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম। প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ২ ডলারের বেশি কমে দুই সপ্তাহের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হয় এই যুদ্ধ। এরপর কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাত, হরমুজ প্রণালি ঘিরে পাল্টাপাল্টি অবরোধ এবং আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলে হামলার ঘটনায় বিশ্ব জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব পড়ে।
এখন ইরান ও ওমানের মধ্যে হরমুজ প্রণালি নিয়ে সমঝোতার খবর নতুন করে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা তৈরি করলেও, প্রণালিটি খুলবে কি না তা অনেকটাই নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শর্ত গ্রহণ করে কি না তার ওপর।
সূত্র: রয়টার্স
এসএএইচ