হিমালয়ের পাদদেশে নেমে আসা কাদা, পাথর ও পানির ভয়ংকর স্রোত যখন ঘরবাড়ি গিলে খাচ্ছিল, তখন স্ত্রীকে বাঁচাতে শেষ চেষ্টা করেছিলেন নেপালের কেশব প্রসাদ বারাল। স্ত্রীর হাত ধরে তাকে বাড়ির ছাদে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। কিন্তু চোখের সামনেই কাদার স্রোত তার স্ত্রীকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৬৮ বছর বয়সী কেশব। নিরাপদে উদ্ধার হওয়ার পরও তার চোখে ভাসছে শুধু সেই মুহূর্তের স্মৃতি- যখন তিনি স্ত্রীকে ধরে রাখতে পারেননি।
নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ এই দুর্যোগে বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) পর্যন্ত অন্তত ১৬২ জনের মৃত্যু হয়েছে। কাদা ও পাথরের বিশাল ধস নদীতে আছড়ে পড়ার পর সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা শহর, গ্রাম ও উপত্যকাজুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। এখনো শত শত মানুষ নিখোঁজ।
নিখোঁজদের খুঁজে বের করতে বৃহস্পতিবার হেলিকপ্টার নিয়ে আকাশপথে তল্লাশি চালান উদ্ধারকারীরা। নেপালের পর্যটন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিখোঁজ ৫৭৯ পর্যটকের মধ্যে ৪০০ জনের বেশি বিদেশি নাগরিক। দুর্গত অঞ্চলটি ট্রেকার ও কৈলাস তীর্থযাত্রীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হওয়ায় নিখোঁজের সংখ্যা এত বেশি।
পুলিশ আশঙ্কা করছে, নিহতের সংখ্যা আরও বাড়বে।
নেপাল পুলিশের মুখপাত্র আবি নারায়ণ কাফলে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, উদ্ধার অভিযান আবার শুরু হয়েছে এবং আরও মরদেহ পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে নিহতের সংখ্যা ১৬২-এর বেশি হবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
নেপাল পর্যটন বোর্ডের মুখপাত্র সুনীল শর্মা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানান, নিখোঁজ পর্যটকদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭ জন, অস্ট্রেলিয়ার ৩৪ জন, যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন এবং কানাডার ২৪ জন রয়েছেন।
অন্যদিকে, চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, তিব্বতের গিয়েরং কাউন্টিতে কাদা ও পাথরধসের ঘটনায় ৫৫৮ জন নিখোঁজ। তাদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। তবে নেপাল ও চীনের দেওয়া নিখোঁজের হিসাবের মধ্যে একই ব্যক্তিদের নাম রয়েছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে পরিষ্কার হয়নি।
যাচাইকৃত ভিডিওতে দেখা গেছে, গিয়েরং সীমান্ত পারাপার এলাকায় প্রচণ্ড স্রোতের সঙ্গে নেমে আসা পানি, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের তোড়ে বহু মানুষ ভেসে যাচ্ছেন। নিচের দিকে নেপালের বিভিন্ন এলাকায় ভেসে গেছে ঘরবাড়ি, সড়ক ও বিদ্যুৎ প্রকল্প।
‘স্ত্রীকে বাঁচাতে তার হাত ধরেছিলাম’
হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে কেশব প্রসাদ বারাল সেই বিভীষিকার মুহূর্তের কথা বলেন। তার ভাষায়, বিশাল কাদার ঢল সোজা তাদের দিকে ধেয়ে আসছিল।
তিনি বলেন, স্রোত যত কাছে আসছিল, ততই তা উঁচু হচ্ছিল। একসময় তিনি দেখেন, কাদা তাদের ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। তখন তিনি স্ত্রীর হাত ধরে তাকে ছাদে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্ত্রীকে ধরে রাখতে পারেননি। কাদার স্রোত তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
চার ঘণ্টা পর একটি হেলিকপ্টার কেশবকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায়। কিন্তু তার স্ত্রী আর ফেরেননি।
ভাঙা কণ্ঠে কেশব বলেন, আমার স্ত্রী আর নেই। কোথাও কাদার নিচে আছেন।
আরেক জীবিত ব্যক্তি জানান, তিনি একটি আমগাছ শক্ত করে ধরে নিজের জীবন রক্ষা করেন। আর সেই অবস্থায় দাঁড়িয়ে দেখেন, যেখানে তিনি কাজ করছিলেন, সেই বাড়িটিই মুহূর্তের মধ্যে স্রোতে মিলিয়ে গেছে।
নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে মানুষের ভিড়
চীনা সীমান্তের পাশের নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, পাথর, কাদা ও পানির ভয়াবহ স্রোত থেকে বাঁচতে মানুষ দৌড়াচ্ছেন। মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে ভবন ও যানবাহন।
নেপালের নুয়াকোট ও ধাদিং এলাকার নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনেরা খবরের আশায় জড়ো হয়েছেন নেপালি সেনাবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের সামনে। সেখান থেকেই হেলিকপ্টারে উদ্ধার অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।
জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। অন্ধকারের মধ্যে মোবাইল ফোনের টর্চ জ্বালিয়ে পুলিশ সদস্যরা নিখোঁজ ব্যক্তিদের নাম লিখে নিচ্ছেন।
দুর্গত এলাকায় ঘরবাড়ি, গাছপালা ও যানবাহন পুরু কাদার স্তরে ঢেকে গেছে। আর দিনভর আকাশে ঘুরেছে জীবিতদের খুঁজে বের করা ও উদ্ধার করা হেলিকপ্টার।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তারা এক্সে জানান, প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট ছবির প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বরফ ও পাথরের একটি ভূমিধস লহেন্দে নদীতে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষসহ বন্যার সৃষ্টি করে। ঘটনাস্থলটি নেপাল-চীন রাসুওয়াগাধি সীমান্ত পারাপার কেন্দ্র থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে।
টেলিভিশনের ছবিতে ধসে পড়া বাড়ি, পানিতে ভাসতে থাকা গাড়ি ও একটি ধাতব সেতু ভেসে যেতে দেখা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, পানির স্রোত পুরো গ্রাম গ্রাস করে ফেলেছে।
রাসুওয়ার স্বাস্থ্যকর্মী তুলা বাহাদুর বিক বলেন, চারদিকে শুধু ধ্বংস আর ধ্বংস। নদীর পাশের বসতিগুলো পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তার নিজের পাঁচ স্বজনও নিখোঁজ।
চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, কাদা ও পাথরধস গিয়েরং বন্দরে আঘাত হেনেছে। এতে শিগাতসে সীমান্ত অঞ্চলের সড়ক, যোগাযোগব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
সিসিটিভিকে এক উদ্ধারকর্মী জানান, গিয়েরং সীমান্ত বন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো ফল পাওয়া যায়নি।
ড্রোনে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর তিনি জানান, সীমান্ত পারাপার কেন্দ্রের দিকে যাওয়ার সব সড়ক পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।
কেশব প্রসাদ বারালের মতো বহু মানুষ এখনো জানেন না, তাদের প্রিয়জন বেঁচে আছেন, নাকি কাদা-পাথরের স্তূপের নিচেই হারিয়ে গেছেন চিরতরে। হেলিকপ্টারগুলো আকাশে ঘুরছে, উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপ খুঁজছেন- আর নিচে দাঁড়িয়ে থাকা স্বজনদের অপেক্ষা শুধু একটি খবরের জন্য।
সূত্র: রয়টার্স
এসএএইচ