(বিশেষ নোট: ১৯৭৬ সালের ১২ ভাদ্র কবি নজরুল দেহত্যাগ করেন। সেদিন ছিল ইংরেজি ২৯ আগস্ট। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে ১২ ভাদ্র ইংরেজি ২৭ আগস্ট। এ দুর্বলতা ইংরেজি ক্যালেন্ডারের নয়, বাংলার। বাংলা একাডেমির উচিত যথাযথ গবেষণার মাধ্যমে এ তারিখ ঠিক করে ফেলা।)
বাংলা সাহিত্য ও সঙ্গীতের জগতে কাজী নজরুল ইসলাম এক ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হয়েছিলেন। কথিত আছে, জুলিয়াস সিজারের সেই বিখ্যাত উক্তি ‘এলাম, দেখলাম, জয় করলাম’ (ভেনি ভিডি ভিসি) নজরুলের ক্ষেত্রে ভীষণভাবে প্রযোজ্য। জীবনের একটি সংক্ষিপ্ত সময়ের সাহিত্য-সঙ্গীত সাধনায় তিনি স্বীয় উজ্জ্বলতায় বাংলা সংস্কৃতির মানচিত্রকে চিরতরে বদলে দিয়েছেন। তিনি কেবল এক উত্তাল জ্বালাময়ী রাজনৈতিক বক্তব্যের কবিই ছিলেন না, সেই সঙ্গে ছিলেন এক অতুলনীয় সঙ্গীতস্রষ্টা, যাঁর সুরের মাদকতা বাঙালি হৃদয়কে একই সঙ্গে বিপ্লব ও প্রেমে মগ্ন করেছে। কাজী নজরুলের সঙ্গীত প্রতিভা ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, বহুমুখী এবং বৈচিত্র্যে ভরপুর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সুবিশাল সুরসাম্রাজ্যের পাশাপাশি নজরুলসঙ্গীত বাংলা গানের ভাণ্ডারকে দিয়েছে এক অভূতপূর্ব গতি, স্বকীয়তা এবং নতুনত্ব। তাঁর সঙ্গীতের বিপুল পরিধি, সুরের বৈচিত্র্য এবং বাণী ও সুরের নিখুঁত মিলন তাঁকে উপমহাদেশের সঙ্গীতের ইতিহাসে এক অনন্য উচ্চতায় আসীন করেছে। একথা বললে মোটেই ভুল হবে না যে নজরুল বেঁচে থাকবেন তাঁর গানে।
নজরুলের সঙ্গীত প্রতিভার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল শৈশবেই, ঘটনাক্রমে। সত্যিই দারিদ্র্যই তাঁকে মহান করেছিল। দরিদ্র ঘরের সন্তান ছিলেন বলেই লেটো দলে যোগ দিতে পেরেছিলেন বা দিতে হয়েছিল। আসানসোলের চুরুলিয়া গ্রামে লেটো দলের সাথে যুক্ত হয়ে তিনি নাটক রচনা ও গান তৈরির প্রথম পাঠ গ্রহণ করেন। লেটো দলের এই মুক্ত পরিবেশ তাঁর মনে লোকসুরের বীজ বুনে দিয়েছিল। সেই সময়ে বর্ধমান, আসানসোল ও ময়মনসিংহের গ্রামীণ লোকজীবনের সুর তাঁর সুরবোধকে জাগিয়ে দেয়। নজরুল ছিলেন এক ক্ষণজন্মা প্রতিভা। পৃথিবীতে কিছু মানুষ আছে যাদেরকে বলা হয় ‘হাইলি সুপিরিয়র অটোবায়োগ্রাফিক্যাল মেমোরি’ সম্পন্ন। ৮০০ কোটি মানুষের মধ্যে সর্বোচ্চ ১০০ জন মানুষ এই বিশেষ জ্ঞানসম্পন্ন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এখন এমন ৬ জনকে খুঁজে পাওয়া গেছে যারা জীবিত আছেন। এই মানুষগুলোর বিশেষত্ব হলো, তাঁরা শিশুকাল থেকে যা দেখেছেন, যা করেছেন, যা পড়েছেন তার কিছুই ভোলেননি। এমনকি ধরা যাক যদি জানতে চাওয়া হয়, ১৬ বছর আগে ২৫ আগস্ট কী বার ছিল, তারা সঙ্গে সঙ্গে বলে দেন। সেদিন বৃষ্টি হয়েছিল কি না, অথবা বাসায় কী রান্না হয়েছিল, অথবা পত্রিকায় কী পড়েছিল—সব তাদের মেমোরিতে থাকে। ধারণা করা যায়, নজরুলের আংশিক হলেও এমন মস্তিষ্কের ক্ষমতা ছিল, যাকে তিনি তাঁর সৃজনশীলতায় কাজে লাগিয়েছেন।
নজরুল যেখানে গিয়েছেন, সেই ভূমির মাটির রস আস্বাদন করেছেন, আত্মস্থ করেছেন—ইংরেজিতে যাকে বলে inculcate; শিশিরবিন্দুতে ঝরে পড়া সকালের ভৈরব, ভৈরবী, প্রখর দুপুরের বৃন্দাবনী সারং অথবা স্নিগ্ধ সন্ধ্যার ইমন কল্যাণের যে স্থানভেদে ভিন্ন ভিন্ন ঢং, তা অসাধারণ মেধার মাধ্যমে রপ্ত করেছেন।
সামরিক বাহিনীতে যোগ দিয়ে করাচি যাওয়ার পর তিনি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত এবং মধ্যপ্রাচ্যের ফার্সি ও আরবি সঙ্গীতের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হন। পরবর্তী জীবনে তার বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় কালজয়ী সব সৃষ্টিতে। করাচি শিবিরে থাকাকালীন তিনি রাগসঙ্গীত এবং বিভিন্ন ভিনদেশি সুরের নিখুঁত রূপ আয়ত্ত করেন, যা পরবর্তীতে তাঁর সঙ্গীত সৃষ্টিতে এক বৈবর্ণিক মাত্রা যোগ করে।
নজরুল ইসলাম তাঁর জীবনের একটি সংক্ষিপ্ত সময়ে প্রায় চার হাজারেরও বেশি গান রচনা ও সুরারোপ করেছেন, যা সংখ্যা ও বৈচিত্র্যের দিক থেকে পৃথিবীর সঙ্গীত ইতিহাসে বিরل। তাঁর সৃষ্ট গানকে প্রধানত কয়েকটি ধারায় বিভক্ত করা যায়। তারই কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের দিকে আমরা দৃষ্টি দিতে পারি।
নজরুলের বিদ্রোহাত্মক বাণী ও সুর পরাধীন ভারতের মুক্তিকামী মানুষকে জাগিয়ে তুলেছিল। “কারার ঐ লৌহকপাট”, “দুর্গম গিরি কান্তার-মরু”, “চল্ চল্ চল্” কিংবা “শিকল পরা ছল”-এর মতো গানগুলোতে তিনি ব্যবহার করেছিলেন মার্চিং সুর, পিয়ানো ও পশ্চিমা ব্রাস ব্যান্ড। এই গানগুলোতে ছন্দের দ্রুততা এবং সুরের দৃঢ়তা পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার আহ্বান জানিয়েছিল। একে ফৌজি গানও বলা যায়। নজরুল গান লেখার সময়েই এর সুর, তাল ও ছন্দ মনের মধ্যে গেঁথে নিতেন।
অন্যদিকে বিপ্লবের কঠোরতার পাশাপাশি নজরুলের হৃদয়ে ছিল প্রেমের এক অতল সাগর। “পরদেশী মেঘ যাও কোন দেশে”, “মোর প্রিয়া হবে এসো রানি” বা “তুমি কি ভুলিয়াছ মোরে”-এর মতো গানে প্রেম ও বিরহের সূক্ষ্ম অনুভূতি ফুটে উঠেছে। তাঁর প্রেমের গানে বিরহের বিষাদ এবং মিলনের ব্যাকুলতা একাকার হয়ে গেছে। ব্যক্তিগত জীবনের বিরহও সার্বজনীন হয়ে ফুটে উঠেছে।
শুধু কি বিদ্রোহ এবং প্রেমের গান? নজরুলের সঙ্গীত প্রতিভার অন্যতম বিস্ময়কর দিক হলো ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে সাম্যবাদী ভাবধারায় ভক্তিগীতি রচনা। একদিকে তিনি রচনা করেছেন শত শত ইসলামী গান ও গজল, যা মুসলিম সমাজকে সুফি ভাবধারায় স্নাত করেছে, যেমন—“ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ”, “রমজানের ঐ রোজার শেষে”; অন্যদিকে তিনি রচনা করেছেন কালজয়ী শ্যামাসঙ্গীত, ভজন ও কীর্তন। “আমার হাতে কালী মুখে কালী”, “আমার কালো মেয়ের পায়ের তলায়”, “চিন্ময়ী রূপ ধরে আয়”, “পদ্মগোখরো সাপের মতো পেঁচিয়ে আছে” অথবা “কালো মেয়ে রাগ করেছে, কে দিয়েছে গালি”। আজও শ্যামাসঙ্গীত হিসেবে এমন অসংখ্য নজরুলের রচনা সর্বাধিক বাদিত। নজরুল ধর্মীয় সম্প্রীতির যে সেতু বন্ধন সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি করে গিয়েছেন, তা অনন্য। ধর্মীয় সম্প্রীতির এমন নজির বিশ্ব সঙ্গীতের ইতিহাসেই বিরল।
রবীন্দ্রোত্তর যুগে প্রকৃতির নান্দনিক রূপকে সুরের ফ্রেমে বাঁধার ক্ষেত্রে নজরুল অনন্য ভূমিকা রেখেছেন। বর্ষা, বসন্ত কিংবা শরতের রূপ নিয়ে রচিত তাঁর গানগুলোতে প্রকৃতির সাথে মানবমনের আকুলতার অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে।
শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও রাগভিত্তিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন এক মহান সাধক। তবে তিনি শাস্ত্রীয় নিয়মকে অন্ধভাবে অনুসরণ না করে তাতে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছিলেন। ধ্রুপদ, ধামার, খেয়াল এবং ঠুমরি ধারায় তিনি অগাধ দক্ষতায় গান লিখেছেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তিনি কেবল প্রচলিত রাগে গান বেঁধেই ক্ষান্ত হননি, বরং অনেকগুলো নতুন রাগ সৃষ্টি করেছেন। তাঁর সৃষ্ট রাগের মধ্যে ‘বেণুকা’, ‘দোলচাঁপা’, ‘সন্ধ্যামালতী’, ‘বনকুমারী’, ‘মিনাক্ষী’ এবং ‘যোগিনী’ অন্যতম। উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সুরের জটিলতাকে তিনি সাধারণ শ্রোতার বোধগম্য করে তুলেছিলেন, যার ফলে ক্লাসিক্যাল মিউজিক সাধারণ মানুষের হৃদয়ে সহজেই জায়গা করে নেয়।
গজল এবং বিদেশি সুরের মেলবন্ধনে বাংলা গজল গানের প্রবর্তক হিসেবে কাজী নজরুল ইসলাম চিরস্মরণীয়। তিনি গজল ও ঠুমরি দিয়ে শ্রোতা মাতিয়েছেন। পারস্যের কবি হাফিজ ও ওমর খৈয়ামের গজল শুনে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি বাংলায় গজলের সূচনা করেন। তাঁর রচিত “বাগিচায় বুলবুলি তুই”, “দূর দ্বীপবাসিনী” কিংবা “আসে বসন্ত ফুলবনে” গানে গজলের সেই বিখ্যাত খামখেয়ালী মিষ্টতা ও বিরহবোধ মূর্ত হয়ে উঠেছে। গজলের পাশাপাশি তিনি মধ্যপ্রাচ্যের সুরের সাথে দেশীয় ভাটিয়ালি, বাউল ও সাঁওতালি লোকসুরের এক অপূর্ব মিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন। তিনি খেয়াল রচনা করেছেন এবং সেখানেও নজরুল অদ্বিতীয়। বাংলা খেয়ালের জনক বলা যায় তাঁকে।
সুর ও বাণীর নিখুঁত সামঞ্জস্য নজরুল সঙ্গীতের মূল শক্তি লুকিয়ে রয়েছে এর বাণী ও সুরের গভীর সংযোগে। কথার আবেগ অনুযায়ী সুরের লয় ও তান নির্ধারণে তিনি ছিলেন সিদ্ধ। যেখানে উদ্দীপনা প্রয়োজন, সেখানে তিনি ব্যবহার করেছেন দ্রুত লয় ও জোরালো ব্যঞ্জনবর্ণ; আবার যেখানে বিরহ বা ভক্তি প্রধান, সেখানে তিনি ব্যবহার করেছেন ধীর লয় ও কোমল স্বরগ্রাম।
বাঙালি সংস্কৃতিতে নজরুল সঙ্গীতের প্রভাব কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গীত কেবল বিনোদনের খোরাক নয়, তা বাঙালি জাতীয়তাবোধের বিকাশ এবং সংগ্রামী চেতনার প্রাণভোমরা। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে নজরুলের উদ্দীপনামূলক গানগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছিল। “কারার ওই লৌহকপাট” গানটি সৃষ্টির পর থেকেই রাজদণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠে চলমান।
বাংলা গানকে নজরুল এলিট শ্রেণির বৈঠকখানা থেকে বের করে সাধারণ মানুষের মিছিলে, ক্ষেতে-খামারে এবং ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছিলেন। গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে রেকর্ড প্রকাশের পর তা মানুষকে এত মোহিত করে রাখত যে মুসলমান সমাজে শ্যামাসঙ্গীত এবং হিন্দু সমাজে ইসলামিক গান ও গজল উপভোগে কোনো খামতি ছিল না, আজও নেই। বৈচিত্র্যময় সুরের বাঁধন, নতুন রাগের সৃষ্টি, প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মেলবন্ধন এবং গভীর মানবিক আবেদন নজরুল সঙ্গীতকে চিরঅমর করে রেখেছে। সাহিত্যের আকাশে তিনি যেমন বিদ্রোহী কবি, সুরের জগতে তিনি তেমনি এক রাজহাঁস—যিনি সুরের ধারায় বাংলা ও বাঙালিকে চিরকালের জন্য সমৃদ্ধ করে গেছেন। একথা স্বীকার করতেই হবে, নজরুলের অসংখ্য রোমান্টিক গান ও কবিতার মধ্যেও উপমহাদেশে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন তুলেছিল এবং উদ্দীপনা জাগিয়েছিল ব্রিটিশবিরোধী জাগরণের গান, সংগ্রামের গান। তাই তো ১৯২৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি কলকাতার অ্যালবার্ট হলে নজরুল সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু বলেছিলেন, “তাঁর লেখার প্রভাব অসাধারণ। তাঁর গান পড়ে আমার মতো বেরসিক লোকেরও জেলখানায় বসে গান গাইবার ইচ্ছা হয়। আমাদের প্রাণ নেই, তাই আমরা এমন প্রাণময় কবিতা লিখতে পারি না।” তৎকালীন ভারত উপমহাদেশের শান্তিপ্রিয় শিক্ষিত যুবসমাজের রক্তে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন নজরুল। ‘কারার ঐ লৌহকপাট’, ‘শিকল পরা ছল মোদের এ শিকল পরা ছল’, ‘মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম, মোরা ঝরনার মতো চঞ্চল’—এই গানগুলো শুধু মুখে মুখেই ফিরত না, হৃদয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছিল স্বাধীনতার চেতনা। আর এই গান বা কবিতাগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাপার’, যার টাইটেল আমরা জানি ‘কাণ্ডারী হুশিয়ার’। ১৯২৬ সালে কৃষ্ণনগরে প্রাদেশিক কংগ্রেস সম্মেলনে পরাধীন ভারতবর্ষের মানুষকে তাদের পরাধীনতার কথা স্মরণ করিয়ে দিতে এই গানটি প্রথম গাওয়া হয়। শুধু এই গানটি নিয়েই খানিক আলোচনা করা যাক:
‘কাণ্ডারী হুশিয়ার’ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদ্দীপনামূলক কবিতা ও গান। এই কবিতায় কবি সমগ্র দেশ ও জাতিকে একটি ঝড়ের কবলে পড়া নৌকার সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং সেই সংকটময় মুহূর্তে জাতিকে রক্ষা করার জন্য এক অকুতোভয়, নিরপেক্ষ ও আদর্শ নেতার (কাণ্ডারী) প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন, ভারত-জাতিকে সতর্ক করেছেন। কবিতার শুরুতেই কবি এক ভয়াবহ যাত্রার চিত্রকল্প তৈরি করেছেন। \'দুর্গম গিরি, কান্তার-মরু, দুস্তর পারাবার\'—এগুলো নিছক প্রকৃতির বর্ণনা নয়, বরং পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতা অর্জনের পথে যে সীমাহীন বাধা-বিপত্তি রয়েছে, তারই রূপক। ঘোর অন্ধকার রাতে উত্তাল সমুদ্রে নৌকা টলমল করছে, দিকভ্রান্ত যাত্রীরা ভীত। এমন দিশেহারা মুহূর্তে কে হাল ধরবে? কবি তাই তরুণ সমাজকে ‘জোয়ান’ ও ‘আগুয়ান’ হওয়ার ডাক দিয়েছেন, কারণ তরুণেরাই পারে অসীম সাহসে ভবিষ্যতের নেতৃত্ব দিতে। যুগ যুগ ধরে শোষিত, নিপীড়িত ও অধিকারবঞ্চিত মানুষের বুকে যে অভিমান পুঞ্জীভূত হয়েছে, তা আজ বিদ্রোহের রূপ নিয়েছে। সমাজ ও রাষ্ট্রের এই অবহেলিত মানুষদের পেছনে ফেলে প্রকৃত মুক্তি সম্ভব নয়। তাই কাণ্ডারী বা নেতাকে কবি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, এই বঞ্চিত শ্রেণির অধিকার নিশ্চিত করে তাদের সাথে নিয়েই মুক্তির সৈকতে পাড়ি দিতে হবে।
কবিতাটির সবচেয়ে কালজয়ী ও শক্তিশালী অংশ হলো এর অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রকাশ। যখন দেশ ও জাতি চরম সংকটে, তখন মানুষের ধর্ম বা জাতের পরিচয় খোঁজা চরম সংকীর্ণতা।
“হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
কাণ্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার।”
যারা বিপদে পড়েছে তারা সর্বাগ্রে মানুষ এবং তারা একই দেশমাতৃকার সন্তান। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের জীবন রক্ষা করাই কাণ্ডারীর একমাত্র ধর্ম। নজরুলের এই অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদ আজও যেকোনো জাতীয় সংকটে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। কবিতার শেষাংশে কাণ্ডারীর প্রতি এক চরম সতর্কবার্তা দিয়েছেন তিনি। দেশজুড়ে যখন হানাহানি, যাত্রী নামক জনসাধারণের মনে সন্দেহ ও অবিশ্বাস, তখন নেতা কি পথ ভুলে যাবেন? নেতা তো পথপ্রদর্শক, তিনি কি মাঝপথে হাল ছেড়ে দেবেন? তাই তিনি পরামর্শ দিয়েছেন, শত হানাহানি সত্ত্বেও নেতাকে তাঁর দায়িত্ব পালন করতে হবে। ‘কাণ্ডারী হুশিয়ার’ কেবল একটি কবিতাই নয়, এটি পরাধীন জাতির ঘুম ভাঙানোর এক অবিস্মরণীয় রণতূর্য। ‘কাণ্ডারী হুশিয়ার’ তাই বারবার প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। শিল্পে, সাহিত্যে, কবিতায়, প্রবন্ধে, প্রকাশনায় তা বারবার উচ্চারিত হওয়ার দরকার।
লেখক: সাংবাদিক, আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।
এইচআর/এএসএম