মজুরি শ্রমিকের কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়, এটি তার অধিকার এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের মৌলিক মাধ্যম বলে মন্তব্য করেছেন শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান ও বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ।
তিনি বলেন, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা শুধু শ্রমিকের দাবি নয়; এর সঙ্গে দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, বৈষম্য কমানো এবং টেকসই উন্নয়নের বিষয় সরাসরি জড়িত। জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) জাতীয় প্রেস ক্লাবে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন আয়োজিত ‘অবিলম্বে জাতীয় মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন এবং জীবনযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের দাবি’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, শ্রমিক ও মালিক উভয় পক্ষের মধ্যেই মজুরি চাওয়া ও দেওয়ার ক্ষেত্রে এক ধরনের মানসিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। শ্রমিক তার শ্রমের বিনিময়ে ন্যায্য মজুরি পাবেন এখানে কাকুতি-মিনতির কোনো বিষয় নেই। মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
আরও পড়ুন
দেশ ছাড়ছেন গার্মেন্টস শ্রমিকরা, ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা মজুরি দাবি
তিনি বলেন, একজন শিল্প মালিক যখন তার প্রতিষ্ঠানের খরচের হিসাব করেন, সেখানে বিদ্যুৎ বিলসহ বিভিন্ন ব্যয়ের হিসাব থাকে। এমনকি অনৈতিক ব্যয়ের হিসাবও অনেক সময় থাকে। কিন্তু শ্রমিকের ন্যায্য মজুরির সঠিক প্রতিফলন থাকে না। জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ হলে শ্রমিক যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি মালিকদের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ও ইন্ডাস্ট্রি প্রোফাইল তৈরিতেও সুবিধা হবে।
মজুরি নির্ধারণে সুনির্দিষ্ট ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, দেশে জাতীয়, সেক্টরভিত্তিক ও পেশাভিত্তিক এই তিন পর্যায়ে মজুরির মানদণ্ড নির্ধারণ করা জরুরি। মজুরি নির্ধারণের ভিত্তি কোনোভাবেই মনগড়া হতে পারে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যস্ফীতির তথ্য, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পারিবারিক ব্যয়ের হিসাব এবং সরকারের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও মাতৃত্বকালীন সুরক্ষার মতো নীতিগুলো বিবেচনায় নিয়ে মজুরি নির্ধারণের মানদণ্ড তৈরির আহ্বান জানান তিনি।
সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিশ্বজুড়ে এখন শুধু ‘ন্যূনতম মজুরি’ নয়, ‘জীবনযাত্রার উপযোগী মজুরি’ বা ‘লিভিং ওয়েজ’ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশেও শ্রমিকের মর্যাদা ও জীবন বিকাশের উপযোগী মজুরি নিশ্চিত করার বিষয়ে জাতীয়ভাবে আলোচনা করতে হবে।
সাম্প্রতিক মজুরি বোর্ডের কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, অদক্ষ ও তরুণ শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে যে ধরনের অঙ্ক সামনে এসেছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। খসড়া হিসেবে ৪ হাজার ৪৪০ টাকা এবং সর্বসাকুল্যে ৭ হাজার টাকা মজুরির মতো প্রস্তাব শ্রমিকদের সঙ্গে এক ধরনের ‘তামাশা’। মজুরি নির্ধারণের পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
মজুরি বোর্ডে শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্বের বিষয়েও গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, শ্রমিক প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য ও নৈতিক পদ্ধতি থাকা প্রয়োজন। প্রতিনিধির তথ্য-উপাত্তভিত্তিক প্রস্তুতি এবং সাধারণ শ্রমিকদের কাছে নিয়মিত জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সঠিক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে দরকষাকষির জন্য শ্রমিক সংগঠন ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, ন্যায্য মজুরি ও ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের অধিকার শ্রমিকের মৌলিক মানবাধিকারের অংশ। জাতীয় ন্যূনতম মজুরির ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই মজুরির দাবিকে শুধু শ্রমিকদের খণ্ডিত আন্দোলন হিসেবে না দেখে জাতীয় অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথা তুলে ধরে সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, তিনি নিজেকে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে নয়, ট্রেড ইউনিয়ন ও শ্রমিক আন্দোলনের একজন সাধারণ কর্মী ও সঙ্গী হিসেবে দেখতে চান।
বক্তব্যে কিংবদন্তি ফুটবলার পেলের আত্মজীবনীর একটি ঘটনার উদাহরণও তুলে ধরেন তিনি। পেলের ছোটবেলায় জুতা পালিশ করার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, মানুষ মুখে অনেক সময় সহানুভূতি দেখায়, কিন্তু কাজের ন্যায্য মূল্য বা টাকা দেওয়ার সময় শুরু হয় দরদাম ও টানাপোড়েন।
তিনি বলেন, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত হওয়ার ওপর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সমাজে বৈষম্য কমানোর বিষয়টি নির্ভর করে। তাই বৈষম্যহীন সমাজ গঠন, টেকসই উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে নীতি নির্ধারণের আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট আতাউর রহমানের সভাপতিত্বে গোলটেবিল আলোচনায় বিভিন্ন সেক্টরের কেন্দ্রীয় শ্রমিক নেতারা বক্তব্য দেন।
ইএআর/এমআরএম