‘বাপুরে, বৃষ্টি আইলে (এলে) বাইরে পানি পড়ার আগে ঘরে পড়ে। তহন ঘরে থাহার (থাকার) কুনু (কোনো) উপায় থাহে (থাকে) না। কোমরে দুক্কু (ব্যথা) পাওয়ার আগে কাজকাম করে চলতাম, কিন্তু এহন আর কাজ করতে পারি না, শরীরডা আর সায় দেই না৷’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন সত্তরোর্ধ্ব আজমত আলী।
শেরপুরের নালিতাবাড়ী পৌর শহরের আড়াইআনী ব্রিজপাড় এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন আজমত আলী ও তার স্ত্রী আছিয়া বেগম। এক ছেলে ও এক মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। সন্তানদের নিজ নিজ সংসার হয়েছে, কিন্তু তাদেরও চলার পথ তেমন একটা ভালো না। নিজেদের নিয়ে চলতেই তারা হিমশিম খাচ্ছেন। কিন্তু জীবনের শেষ সময়ে এসে এই দম্পতির নিজের বলতে নেই এক টুকরো জমি, নেই একটি আশ্রয়ের জায়গা। তাই ব্রিজের পাশেই সড়কের সঙ্গে পলিথিন দিয়ে তৈরি ছোট্ট একটি ঝুপড়ি ঘরই তাদের আশ্রয়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চারপাশে ছেঁড়া পলিথিন, মাথার ওপরও পলিথিনের ছাউনি। নেই শক্ত দেওয়াল কিংবা একটি চাল। সামান্য বৃষ্টি হলেই ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ে পানি। ভিজে যায় বিছানাসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। কোনোমতে একপাশে একটা চৌকি আরেকপাশে রান্নার একটা চুলার ব্যবস্থা করেছেন। সেই চুলায় কিছু জোগাড় করতে পারলে আগুন জ্বলে, না হলে সেটাও জ্বলে না।
বৃদ্ধ আজমত আলীকে দেখা যায় একটি দোকানে পসরা সাজিয়ে বসে আছেন। যেখানে সবমিলিয়ে ৩০০ টাকার পণ্যও হবে না। অভাবের সংসারে প্রতিদিন ঘরের পাশের সড়কে ছোট একটি ঝুপড়ি দোকানে পুরোনো, ছেঁড়া কাপড়-চোপড় ও মাটির তৈজসপত্র নিয়ে এভাবেই বসে থাকেন দিনের পর দিন। সেখানে যা বিক্রি করে আয় হয়, সেই টাকা দিয়েই কোনোভাবে খাবারের ব্যবস্থা করেন।
রোজগারের বিষয়ে আজমত আলী বলেন, এখান থেকে যা আয় হয় তা দিয়েই কোনোদিন আধাকেজি চাল, আর আধাকেজি আলু কিনে নিয়ে আসি। আর বিক্রি না হলে সেদিন চুলায় আগুন জ্বলে না। তবে আমি কারোর কাছে হাত পেতে কিছু নিই না। যখন শরীরে বল ছিল, তখন আমি কাজ করে সংসার চালাতাম। কিন্তু কোমরে ব্যথা পাওয়ার পর থেকে আর কাজ করতে পারি না। আমার জায়গা সম্পদ কিছুই নেই। তাই সড়কের পাশে ব্রিজের নিচে এভাবে থাকি। আমি সরকারের সহযোগিতা চাই।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মান্নান বলেন, এই বৃদ্ধ দম্পতি দীর্ঘদিন ধরে এখানে বাস করেন। এভাবে পলিথিনের ঘরে মানুষের বাস করা খুব কষ্টের। তাছাড়া তাদের আয় রোজগারের তেমন কিছুই নেই। তাই সরকারের সহযোগিতার বিকল্প নেই।
স্থানীয় আশরাফুল ইসলাম বলেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে এখানে মানবেতর জীবনযাপন করছে। কিছু দিতে চাইলেও নিতে সংকোচ করে। দোকানে সব মিলিয়ে ৩০০ টাকার জিনিসপত্রও হবে না, যা নিয়ে প্রতিদিন আজমত আলী বসে থাকেন। এখানে কি আর বিক্রি হবে? সরকার ও বিত্তবানদের সহযোগিতা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থী আব্দুল আলিম বলেন, ২০২৬ সালে এসেও এমন একটি পরিবারকে দেখতে হচ্ছে- যাদের জীবনমান দারিদ্র্যসীমার মাপকাঠিতে ধরা যাবে না। পলিথিন চাপা দিয়ে কোনোমতে রাত কাটাচ্ছে বৃদ্ধ দম্পতি। রাষ্ট্রকে এই দম্পতির জন্য তার মৌলিক চাহিদা বাসস্থান, খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে।
আজমত আলীর স্ত্রী আছিয়া বেগম বলেন, ‘আমার বাপেরও কিছুই নেই। আমার ভাইয়েরা মানুষের জায়গায় কোনোমতে থাকছে। আমার ভাই আমাকে একবার খুব কষ্ট করে দুই হাজার টাকা দিয়েছিল। কীভাবে থাকছি, আপনারা দেখলেই বুঝবেন। নদীতে গোসল করি, এখানে এসে ঘুমায়। কোনোদিন খাবার হয় আবার কোনোদিন খাবার জোটে না। বহুদিন ধরে দুজনেই আমরা অসুস্থ, টাকার অভাবে ওষুধ কিনতে পারি না।’
নালিতাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল মালেক বলেন, আজমত আলী ও আছিয়া দম্পতি সম্পর্কে উপজেলা প্রশাসন খোঁজখবর নিয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে শুকনো খাবার ও চালের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিমাসে তাদের চাল দেওয়া হবে। খুব দ্রুত তাদের আবাসের একটা ব্যবস্থা করা হবে।
মো. নাঈম ইসলাম/এফএ/জেআইএম