মবিনুল ইসলাম রাশা
বাবার চাকরির সুবাদে গাজী ইশমাম হাসানের শৈশবের একটা বড় অংশ কেটেছে ঢাকার রেলওয়ে অফিসার্স কোয়ার্টারে। কংক্রিটে মোড়া ব্যস্ত এই নগরীর মাঝেও সবুজে ঘেরা সেই আবাসিক পরিবেশেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা। প্রকৃতির সান্নিধ্যে কাটানো সেই শৈশব আজও জীবনের অন্যতম মূল্যবান স্মৃতি হয়ে আছে। শিক্ষাজীবনের শুরু ঢাকার আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে। যেখান থেকে এসএসসিতে অর্জন করেন জিপিএ-৫। পরে ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসিতেও ধরে রাখেন সেই ধারাবাহিকতা।
টেলিস্কোপে সূর্যগ্রহণ দেখা সেই দিন
ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞানের প্রতি ছিল গাজী ইশমাম হাসানের গভীর আগ্রহ। সেই টানেই স্কুলজীবনে যুক্ত হন বিজ্ঞান ক্লাবে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় ক্লাবের আয়োজনে টেলিস্কোপের মাধ্যমে সূর্যগ্রহণ দেখার অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়। সেখান থেকেই কিশোর মনে জন্ম নেয় মহাকাশ, সূর্য ও তার চারপাশে ঘুরে চলা গ্রহ-নক্ষত্র সম্পর্কে জানার অদম্য কৌতূহল। সেই কৌতূহলই ধীরে ধীরে রূপ নেয় পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি গভীর ভালোবাসায়।
বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় রুয়েট, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেলেও বেছে নেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ। শৈশব থেকে সবুজ পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণে প্রকৃতিনির্ভর ক্যাম্পাসের প্রতি ছিল আলাদা টান, সঙ্গে পরিবারের কাছাকাছি থাকার ইচ্ছাও প্রভাব ফেলে এই সিদ্ধান্তে।
শিক্ষকতা থেকে বিদেশযাত্রার স্বপ্ন
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্নাতকোত্তরের ফল প্রকাশের পর শুরু হয় পেশাগত জীবনের প্রস্তুতি। একই বছরের ১ সেপ্টেম্বর সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। শিক্ষকতায় এসে উপলব্ধি করেন শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদানই যথেষ্ট নয়, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও নিজেকে প্রতিনিয়ত দক্ষ করে তোলাও সমান জরুরি। এই উপলব্ধিই বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্নকে আরও দৃঢ় করে তোলে।
ক্লাস, পরীক্ষা, খাতা মূল্যায়নের ফাঁকেই চলতে থাকে প্রস্তুতি। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে পরিকল্পিতভাবে শুরু হয় আইইএলটিএসের প্রস্তুতি। ডিসেম্বরে পরীক্ষায় বসে অর্জন করেন ব্যান্ড স্কোর ৭.০। পাশাপাশি ধাপে ধাপে প্রস্তুত করেন একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট, সনদের সত্যায়িত কপি, গবেষণাকেন্দ্রিক সিভি এবং সম্ভাব্য বিশ্ববিদ্যালয়-অধ্যাপকদের তালিকা।
আরও পড়ুন
নীলক্ষেত থেকে নয়, নিজের সিভি নিজে তৈরি করতে হবে
একাডেমিক ফলাফল না গবেষণা—কোনটির গুরুত্ব বেশি?
স্কলারশিপ অর্জনে একাডেমিক ফলাফল ও গবেষণা দুটিই গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন তিনি। তবে গবেষণাভিত্তিক উচ্চশিক্ষায় গবেষণার অভিজ্ঞতা ও সম্ভাবনাই তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব পায়। ভালো ফলাফল প্রমাণ করে মৌলিক দক্ষতা আর অধ্যবসায়। গবেষণার অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে নতুন জ্ঞান সৃষ্টির সক্ষমতা।
নিজের ক্ষেত্রে একাডেমিক ফলাফল ভালো থাকলেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন গবেষণার অভিজ্ঞতা অর্জন, গবেষণাপত্র প্রকাশ এবং সুস্পষ্ট গবেষণা-পরিকল্পনা তৈরিতে। গাজী ইশমাম হাসানের মতে, ‘শুধু ভালো ফলাফল বা গবেষণা-অভিজ্ঞতা নয়, এই দুইয়ের সমন্বয়ই একজন আবেদনকারীকে এগিয়ে রাখে।’
ক্যামেরার লেন্সে দুনিয়া দেখা
পড়াশোনা, গবেষণা আর প্রিপারেশনের পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রম সামলানোর মূলমন্ত্র ছিল পরিকল্পনা ও সময় ব্যবস্থাপনা। কলেজজীবন থেকেই ফটোগ্রাফির প্রতি ছিল গভীর টান। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে যুক্ত হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ফটোগ্রাফিক সোসাইটিতে। যেখানে শেখেন ফটোগ্রাফির কারিগরি দিক, পাশাপাশি কাজ করার সুযোগ পান জাতীয়-আন্তর্জাতিক ফটো এক্সিবিশন আয়োজনে। এসব অভিজ্ঞতা গড়ে তোলে দলগত কাজ, নেতৃত্ব ও যোগাযোগ দক্ষতা। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ফটোগ্রাফিক সোসাইটিতে সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন।
আন্তর্জাতিক ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতা থার্টিফাইভ অ্যাওয়ার্ডস ২০২১-এ দ্বিতীয় ধাপ উত্তীর্ণ হয়ে বাংলাদেশের সেরা ১৫০ ফটোগ্রাফারের একজন হিসেবেও নির্বাচিত হন। তার বিশ্বাস, সহশিক্ষা কার্যক্রম পড়াশোনার প্রতিবন্ধক নয় বরং সঠিক ভারসাম্যে এটি একজন শিক্ষার্থীকে আরও পরিপূর্ণ করে তোলে। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও শুধু ফলাফল নয়, নেতৃত্ব ও দলগত কাজের অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দেয়।
একাধিক অফার, শেষ পছন্দ জাপান
জাপানের পাশাপাশি আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে অফার এসেছিল গাজী ইশমাম হাসানের কাছে—থাইল্যান্ডের এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এআইটি) থেকে বায়ো-ন্যানো ম্যাটেরিয়ালসে এডিবি-জেএসপি স্কলারশিপের আংশিক ফান্ডিং, যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব লুইজিয়ানা অ্যাট লাফায়েতে আর্থ অ্যান্ড এনার্জি সিস্টেমসে পিএইচডি আর স্টিভেন্স ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি জার্মানির এফএইচ মুনস্টার থেকেও অফার আসে। যদিও সেগুলোতে পূর্ণ ফান্ডিং মেলেনি।
আরও পড়ুন
আয়কর আইনজীবী হিসেবে ক্যারিয়ার গড়বেন যেভাবে
শেষপর্যন্ত জাপানকেই বেছে নেওয়ার পেছনে কয়েকটি স্পষ্ট কারণ জানান তিনি। প্রথমত, এমইএক্সটি স্কলারশিপ বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ও পূর্ণ অর্থায়নভিত্তিক স্কলারশিপ, যা গবেষণায় সম্পূর্ণ মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। দ্বিতীয়ত, সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তির মাধ্যমে সোলার সেল উন্নয়ন নিয়ে তার গবেষণার আগ্রহের সঙ্গে দারুণভাবে মিলে যায় জাপানের শক্তিশালী গবেষণা অবকাঠামো ও শিল্প-অ্যাকাডেমিয়ার সমন্বয়। এ ছাড়া তার গবেষণার আগ্রহের সঙ্গে সুপারভাইজারের কাজের দারুণ মিলও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে সিদ্ধান্তে। এমইএক্সটি স্কলারশিপ জাপান সরকার প্রদত্ত ফুল ফান্ডেড প্রোগ্রাম।
গাজী ইশমাম হাসানের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য, দেশে ফিরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সেমিকন্ডাক্টর গবেষণায় অবদান রাখা। সেই লক্ষ্যে জাপানের গবেষণা সংস্কৃতি ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষকেই সবচেয়ে উপযুক্ত মনে হয়েছে তার কাছে।
২৭ জন প্রফেসরকে ই-মেইল, তারপর দীর্ঘ অপেক্ষা
এমইএক্সটি স্কলারশিপে আবেদনের দুটি পথ এমব্যাসি রেকমেন্ডেশন ও ইউনিভার্সিটি বা প্রফেসর রেকমেন্ডেশন। তিনি নির্বাচিত হন দ্বিতীয় পথে। প্রথমে গবেষণার আগ্রহের সঙ্গে মিল রেখে তৈরি করেন জাপানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরদের একটি তালিকা। এরপর সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু করেন ই-মেইল পাঠানো সব মিলিয়ে ২৭ জন প্রফেসরকে।
অক্টোবরের দিকে সাইতামা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু হয়। প্রথমে প্রায় ২০ মিনিটের অনলাইন সাক্ষাৎকারে আলোচনা হয় গবেষণার ধারণা, অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে জুমে হয় একটি অনলাইন পরীক্ষা, তাতেও সফল হন তিনি। সবশেষে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রায় ৪০ মিনিটের আরেকটি সাক্ষাৎকারের পর সুপারভাইজার তাকে চূড়ান্তভাবে মনোনীত করেন নিজের গবেষণাগারে কাজের জন্য।
এরপর সুপারিশ যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট সিলেকশন কমিটির কাছে, যাচাই-বাছাই শেষে কাগজপত্র পাঠানো হয় জাপানের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়টা ছিল সবচেয়ে কঠিন—দীর্ঘ অনিশ্চয়তা, দুশ্চিন্তায় নির্ঘুম রাত। অবশেষে ২ জুলাই যখন ফলাফল প্রকাশ পায়, জানতে পারেন এমইএক্সটি স্কলারশিপের জন্য চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়েছেন—জীবনের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে থাকে সেই দিনটি।
আরও পড়ুন
তরুণ বয়সেই গড়ে উঠুক ভবিষ্যতের ভিত্তি
যারা বাইরে পড়তে চান, তাদের জন্য পরামর্শ
যারা বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখেন, তাদের উদ্দেশে সবচেয়ে বড় পরামর্শ—আগে নিজেকে প্রস্তুত করুন, তারপর আবেদন করুন। শুধু ভালো ফলাফল যথেষ্ট নয়; নিজের গবেষণার আগ্রহ, দক্ষতা ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য সম্পর্কে থাকতে হবে স্পষ্ট ধারণা। ধৈর্য ও ধারাবাহিকতাকেও মনে করেন সমান জরুরি। অনেক প্রফেসর বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উত্তর না এলেও হতাশ না হয়ে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে, যেমনটা তিনি নিজে করেছেন ২৭ জনকে ই-মেইল করে, শেষে একজনের সঙ্গেই সফল হয়ে। ইংরেজি যোগাযোগ দক্ষতা ও গবেষণার অভিজ্ঞতা যতটা সম্ভব, উন্নত করার তাগিদও দেন তিনি।
সবশেষে গাজী ইশমাম হাসান বলেন, শুধু স্কলারশিপ পাওয়াই যেন লক্ষ্য না হয়; লক্ষ্য হওয়া উচিত একজন দক্ষ গবেষক হয়ে ওঠা এবং সেই জ্ঞান দেশের কাজে লাগানো। নিষ্ঠা, অধ্যবসায় আর সঠিক পরিকল্পনা থাকলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভালো সুযোগ পাওয়া অবশ্যই সম্ভব।
এসইউ