বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের সংগঠন ‘বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতি’। অডিটে সমিতিটির অভ্যন্তরীণ আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ভয়াবহ অনিয়ম, কারচুপি ও কোটি টাকার আর্থিক অসংগতি ধরা পড়েছে।
২০১৬-২০২৩ মেয়াদকালের অডিট ও অভ্যন্তরীণ পরিদর্শন প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ভাউচার ছাড়াই লাখ লাখ টাকা তোলা হয়েছে। গায়েব করা হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ক্যাশ বই ও স্টক রেজিস্টার।
সাধারণ শিক্ষকদের চাঁদার টাকায় ব্যক্তিগত ফ্রিজ কেনা এবং একই ব্যক্তির খাবারের বিল দুইবার দেখিয়ে টাকা তোলার মতো নজিরবিহীন দুর্নীতি ও অনিয়মও করেছেন সমিতির নেতারা।
সংগঠনটির বর্তমান কমিটির সদস্যরা ২০২৪ সালে বিগত কয়েক বছরের অডিট কার্যক্রম পরিচালনা করে এসব অনিয়মের তথ্য পেয়েছে। অধ্যাপক এস এম মাহবুবুল ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের কমিটি এ অডিট কার্যক্রম পরিচালনা করে।
প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৬-২০২২ মেয়াদের অডিটে বিশেষ তহবিল (মামলা) থেকে ৩৬ লাখ ২৮ হাজার টাকা তোলা হলেও মাত্র পাঁচ লাখ ৬৫ হাজার টাকার খরচের বিবরণ দেওয়া হয়। বাকি ৩০ লাখ ৬৩ হাজার টাকা খরচের কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য বা নথি অডিট কমিটির কাছে উপস্থাপন করা হয়নি।
এছাড়া সমিতির মূল আয়-ব্যয় বিবরণী, ব্যাংক সংক্রান্ত চেক রেজিস্টার, কেনাকাটার স্টক রেজিস্টার, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক টাকা প্রাপ্তির রশিদ এবং বকেয়া চাঁদার বিস্তারিত হিসাব বিবরণী অডিট কমিটির কাছে জমা না দিয়ে গায়েব করা হয়েছে।
মামলা পরিচালনায় সমিতির পৃথক বিশেষ তহবিল থাকা সত্ত্বেও এ খরচ মেটানো হয়েছে সাধারণ তহবিল থেকে। মামলা পরিচালনার নামে সাধারণ তহবিল থেকে ৪৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা খরচ করা হলেও তার পেছনে কোনো অনুমোদিত রিকুইজেশন বা প্রয়োজনীয় কার্যবিবরণী ছিল না।
আরও পড়ুন
উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএসসির ফল প্রকাশ, পাস ৬৩.৭৪ শতাংশ
অডিট প্রতিবেদনে সমিতির অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার ১৬টি ভয়াবহ অসংগতি ও প্রাপ্ত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, সংগঠনের প্রাতিষ্ঠানিক তহবিল ব্যবহার করে শওকত হোসেন নামের একজনের ব্যক্তিগত জন্য ফ্রিজ কেনা হয়েছে।
এছাড়া সম্পূর্ণ ভাউচারবিহীন অবস্থায় ২০২৩ সালের অক্টোবরে কোষাধ্যক্ষ কর্তৃক নাসিরুল আজম বাপ্পিকে সাত হাজার ৫০০ টাকা এবং কাজী হাসান ও নাজমুল নামের দুই ব্যক্তিকে তিন হাজার টাকা করে নগদ দেওয়া হয়েছে।
২০২৩ সালের ২১ জুলাই নীতিমালা প্রণয়ন কমিটির দুপুরের খাবারের বিল একই ভাউচারে দুইবার দেখানো হয়েছে, যার পরিমাণ ১৫ হাজার ৯০০ টাকা এবং ফটোকপি বাবদ খরচ এক হাজার ৫০ টাকা।
২০২২ সালের এপ্রিল ও মে- এই দুই মাসের ক্যাশ বুকের কোনো হিসাবই পাওয়া যায়নি। এছাড়া অধিকাংশ ভাউচারে কাটাকাটি ও ওভাররাইটিং ছিল এবং তারিখ গায়েব করে রাখা হয়েছে।
সমিতির মহাসচিব এবং কোষাধ্যক্ষ পৃথকভাবে হিসাব সংরক্ষণ করায় দুজনের হিসাবে ব্যাপক অমিল দেখা গেছে। যার ফলে সুষ্ঠুভাবে হিসাব নিরীক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
অনিয়ম হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, খরচের কোনো বিল-ভাউচারে ভ্যাট পরিশোধ করা হয়নি এবং সরকারি বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও রেভিনিউ স্ট্যাম্প লাগানো হয়নি। কর্মচারীদের বেতন ও বোনাসের বিলেও কোষাধ্যক্ষ ও সম্পাদকের স্বাক্ষর ছিল না।
অডিট কমিটি তাদের সুপারিশে জানিয়েছে, প্রতিটি বিল ও ভাউচারে অবশ্যই নিয়ম মেনে যথাযথ কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর থাকতে হবে। ২৫ হাজার বা তার তদূর্ধ্ব সব খরচের ক্ষেত্রে নগদের বদলে বাধ্যতামূলকভাবে চেকের মাধ্যমে লেনদেন নিশ্চিত করতে হবে। ক্যাশ বই ও আয়-ব্যয় বিবরণী তৈরিতে হিসাববিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। তবে বিগত ২০১৬-২০২৩ পর্যন্ত সংগঠনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা এটি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।
এ বিষয়ে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির বর্তমান সদস্যসচিব অধ্যাপক ড. মো. মাসুদ রানা খান বলেন, ‘২০১৩-২০১৬ সালে আমরা যখন দায়িত্বে ছিলাম, তখন এক কোটি ৮ লাখ টাকা রেখে এসেছিলাম। দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় বিল-ভাউচারসহ জমা দিয়েছিলাম। ২০১৬-২০২৩ সাল পর্যন্ত কী হয়েছে তা বলতে পারছি না।’
এএএইচ/একিউএফ