রাজধানীর আজিমপুরের নিউ পল্টনে পয়ঃনিষ্কাশন সংযোগ স্থাপনের জন্য চার মাস আগে আলহেরা জামে মসজিদ, হেফজখানা ও হিল্লাহ বোর্ডিংয়ের সামনের সড়কটি খুঁড়েছিল ঢাকা ওয়াসা। পাইপ বসানোর পর গর্ত ভরাট ও ঢালাই দিয়ে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও এখনো সড়কটি মেরামত করা হয়নি। এর মধ্যেই একই সড়কে আবার খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) নিউ পল্টন এলাকায় গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে। তবে শুধু এই একটি সড়ক নয়, সেই সঙ্গে নিউ পল্টন লেন, নিউ পল্টন লেন উত্তর, ইরাকি মাঠের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের গলি ও পিলখানার বীর উত্তম হাবিবুর রহমান গেটের উত্তর পাশের গলিতেও চলছে পয়ঃনিষ্কাশন লাইনের কাজ। কোথাও রাস্তার একাংশ কেটে রাখা, কোথাও আবার বড় অংশজুড়ে মাটি তুলে রাখা হয়েছে। আবার কোনো কোনো জায়গায় খোঁড়া অংশের পাশে বালু ও নির্মাণসামগ্রী স্তূপ করে রাখা হয়েছে।
ফলে এসব সড়কে যান চলাচল প্রায় বন্ধ। হেঁটে চলাচল করতেও স্থানীয়দের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। সরু গলি হওয়ার কারণে একটি জায়গায় খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হলেই পুরো সড়ক অচল হয়ে যাচ্ছে। বাড়ির সামনে গাড়ি বা রিকশা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। পথচারীদের অনেককে নির্মাণকাজের পাশ দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে দেখা গেছে।
রাজধানীর আজিমপুরে পয়ঃনিষ্কাশন সংযোগ স্থাপনের জন্য চলছে গলি-সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি/ছবি: জাগো নিউজ
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রাস্তা কাটার পর দ্রুত সংস্কার না করায় ভোগান্তি তৈরি হচ্ছে। একটি অংশের কাজ শেষ হওয়ার পর সেটি পুরোপুরি পুনর্নির্মাণ না করেই আবার নতুন অংশে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করা হচ্ছে। ওয়াসাকে দ্রুত সময়ের মধ্যে এসব কাজ শেষ করে সড়কগুলো চলাচল উপযোগী করার দাবি জানান তারা।
নিউ পল্টনের বাসিন্দা লোকমান হোসেন বলেন, চার মাস আগে রাস্তা কেটে পাইপ বসানো হয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল কাজ শেষ হলে রাস্তা ঠিক করে দেওয়া হবে। কিন্তু এখনো আগের অবস্থায় ফেরেনি। তার মধ্যেই আবার রাস্তা কাটা হচ্ছে। বাসিন্দাদের চলাচল করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে, খোঁড়াখুঁড়ির পাশাপাশি আরসিসি ঢালাই দেওয়া সড়ক কাটার যন্ত্রের বিকট শব্দেও অতিষ্ঠ এলাকাবাসী। বৃহস্পতিবার সরেজমিনে রাস্তার পাকা অংশ মেশিন দিয়ে কাটতে দেখা যায়। এ কাজে জেনারেটর ব্যবহার করা হচ্ছে।
স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, জেনারেটর ও কাটিং মেশিনের শব্দে আশপাশের বাড়িঘরে কম্পন অনুভূত হচ্ছে। বিশেষ করে রাতে কাজ হলে শব্দদূষণ আরও বেশি সমস্যা তৈরি করে।
আরও পড়ুন
খোঁড়াখুঁড়িতে প্রায় অচল প্রগতি সরণি, ৬ লেনের সড়কে বাস চলে ২ লেনে
যদিও কাজ চলার জায়গাগুলোতে স্টিলের কাঠামোর ওপর সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। তাতে লেখা রয়েছে—‘সাবধান; ওয়াসার পয়ঃনিষ্কাশন লাইনের কাজ চলমান। সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখিত।’
নিউ পল্টন লেনের বাসিন্দা ফারুক আহমেদ বলেন, ‘দিনের পর দিন রাস্তা খোঁড়া থাকায় শিশু, বয়স্ক ও রোগীদের নিয়ে চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। বৃষ্টি হলে কাদা ও পানি জমে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। কাজ করতেই হলে এক অংশ শেষ করে দ্রুত রাস্তা চলাচলের উপযোগী করা দরকার।’
নিউ পল্টনের আলহেরা জামে মসজিদ, হেফজখানা ও হিল্লাহ বোর্ডিংয়ের পশ্চিম পাশের সড়কে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ করছিলেন শ্রমিক জামাল মিয়া। তিনি জানান, প্রায় তিন মাস ধরে ওই এলাকায় সড়ক খোঁড়াখুঁড়ির কাজ করছেন তিনি। আগে খোঁড়া সড়কের একটি অংশে বর্তমানে নতুন করে ম্যানহোল স্থাপনের কাজ চলছে।
ঢাকা ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার আধুনিক ও টেকসই স্যানিটেশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং পয়ঃবর্জ্য শোধনের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষার লক্ষ্যে ঢাকা স্যানিটেশন ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্টের আওতায় আজিমপুরে পয়ঃনিষ্কাশন লাইনের কাজ চলছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে ঢাকা ওয়াসা। আজিমপুর এলাকায় প্রায় তিন কিলোমিটার সড়ক ও গলিতে এ প্রকল্পের আওতায় কাজ করা হচ্ছে।
রাজধানীর আজিমপুরে পয়ঃনিষ্কাশন সংযোগ স্থাপনের জন্য চলছে গলি-সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি/ছবি: জাগো নিউজ
ওয়াসার ওই কাজে সার্ভেয়ার হিসেবে আছেন মো. বায়জিদ। তিনি বলেন, কোন সড়কে কতটুকু মাটি কাটতে হবে এবং কোন স্তরে কোন পাইপ বসাতে হবে, তা তারা তদারকি করেন। তার ভাষ্য, প্রথমে মাটি কাটার পর পাইপ বসানো হয়। এরপর ম্যানহোল তৈরি করে বাড়ির সংযোগ দেওয়া হয়। এরই মধ্যে ওই এলাকার অধিকাংশ বাড়ির সংযোগের কাজ শেষ হয়েছে। কয়েকটি সড়ক নাগরিকদের চলাচলের জন্য খুলেও দেওয়া হয়েছে।
এ নিয়ে কথা হলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা ওয়াসার এক কর্মকর্তা জানান, আজিমপুরের সড়ক ও গলির নিচে বিপুলসংখ্যক পরিষেবা লাইন রয়েছে। পয়ঃনিষ্কাশন লাইন স্থাপনের সময় এসব পরিষেবা লাইন সরানো বা এড়িয়ে কাজ করা কঠিন। এ কারণে কাজ শেষ করতে কিছুটা বেশি সময় লাগছে। এরই মধ্যে ছয়-সাতটি সড়কের কাজ শেষ হয়েছে এবং সেগুলো মানুষের চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। সড়কগুলোতে ঢালাই দেওয়ার জন্য সিটি করপোরেশনকে বলা হবে।
ওয়াসার ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, আজিমপুরের অধিকাংশ সড়ক ও গলি সরু হওয়ায় একটি সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হলেই ব্যাপক নাগরিক দুর্ভোগ তৈরি হয়। স্থানীয়দের বাধার কারণেও কোথাও কোথাও কাজ স্থগিত রাখতে হয়েছে। নিউ মার্কেট-নীলক্ষেত মোড় থেকে পিলখানা গেট হয়ে আজিমপুর কবরস্থানের পশ্চিম পাশের সড়কের কাজ বর্তমানে স্থগিত রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে সেখানে খোঁড়াখুঁড়ি করলে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি আরও বাড়বে। তাই ওই অংশের কাজ আগামী শুষ্ক মৌসুমে করার পরিকল্পনা রয়েছে।
আরও পড়ুন
দখলদারদের পেটে কান্দিখাল, বৃষ্টিতে ভাসে কুমিল্লা নগরী
তবে প্রশ্ন উঠেছে—যেসব সড়কের নিচে পাইপ বসানোর কাজ শেষ হয়েছে, সেগুলো দ্রুত স্থায়ীভাবে সংস্কার করা হচ্ছে না কেন? একই জায়গায় পুনরায় খোঁড়াখুঁড়ির আগে আগের কাজ পুরোপুরি শেষ করা হয়েছে কি না, তার সমন্বয়ও কতটা হচ্ছে, সেটিও এখন স্থানীয়দের প্রশ্ন।
জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অঞ্চল-৩-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবীব জাগো নিউজকে বলেন, ওয়াসার কাজ শেষ হওয়ার পর সিটি করপোরেশন সড়কে ঢালাই দেবে। এ জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং তারা কাজ শুরুর জন্য প্রস্তুত। ওয়াসাকে দ্রুত কাজ শেষ করে সড়কগুলো সিটি করপোরেশনের কাছে বুঝিয়ে দিতে বলা হয়েছে।
তিনি জানান, কয়েক দিনের মধ্যে চার-পাঁচটি গলি বুঝিয়ে দেবে বলে জানিয়েছে ওয়াসা। তখন সেগুলোতে ঢালাইয়ের কাজ শুরু করা হবে। পুরো আজিমপুর এলাকার কাজ শেষ করার জন্য ওয়াসাকে দুই সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এমএমএ/একিউএফ