এক বুক স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন তরুণ-তরুণীরা। কিন্তু উচ্চশিক্ষার এই সময়ে তাদের বড় একটি অংশকে প্রতিদিন লড়তে হচ্ছে আরেক বাস্তবতা—পুষ্টিকর খাবারের সংকটের সঙ্গে। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) আশপাশের মেসগুলোতে থাকা শিক্ষার্থীদের বড় অংশের খাদ্যতালিকায় নিয়মিত জায়গা করে নিয়েছে পাতলা ডাল, আলুভর্তা ও স্বল্পমূল্যের সবজি। দুপুরে বা রাতে কখনো জোটে ব্রয়লার মুরগির এক টুকরো মাংস, কখনো অর্ধেক ডিম। নিত্যপণ্যের বাড়তি দামের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে পুষ্টির চাহিদার সঙ্গে আপস করতে হচ্ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে প্রায় ৮ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। এর মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশই ক্যাম্পাসের আশপাশের বিভিন্ন মেস ও বাসাবাড়িতে থাকেন। এসব মেসে শিক্ষার্থীদের খাবারের ব্যয় নির্ধারণ হয় মূলত বাজারদর ও শিক্ষার্থীদের সামর্থ্যের ওপর।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেক মেসেই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় আমিষের পরিমাণ খুবই কম। মাছ-মাংসের পরিবর্তে ডাল ও আলুভর্তা নিয়মিত খাবারে পরিণত হয়েছে। সবুজ শাকসবজিও প্রতিদিনের মেন্যুতে থাকে না। কোনো কোনো মেসে একটি ডিম ভেজে বা সেদ্ধ করে দুজন শিক্ষার্থীর মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার ঘটনাও রয়েছে।
‘দুপুরে বড় এক বাটি ভাতের সঙ্গে থাকে ব্রয়লার মুরগির এক টুকরো মাংস। সঙ্গে বাজারের সবচেয়ে কমদামি সবজি, যার বড় অংশই আলু। দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাংসের টুকরোর আকারও ছোট হয়ে আসছে। দুপুরের খাবার খেয়ে টিউশনে যেতে হয়। সন্ধ্যা বা রাতে ফিরে আবার ভাত, ডাল, সবজি কিংবা সস্তা মাছ দিয়ে দিন পার করতে হয়’
বাজারে চাল, তেল, মাছ, মাংস, ডিম ও সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দামের প্রভাব পড়েছে মেসের খাবারে। ফলে স্বল্প ব্যয়ে খাবারের পরিমাণ ঠিক রাখতে গিয়ে কমে যাচ্ছে খাবারের বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমান।
একজন শিক্ষার্থীর মাসে মেস ও খাবার বাবদ প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা খরচ হয়। কারও ক্ষেত্রে এই ব্যয় আরও বেশি। এর সঙ্গে পড়াশোনার আনুষঙ্গিক খরচ যোগ হওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের অনেকেই খাবারের ক্ষেত্রেও হিসাব করে চলতে বাধ্য হচ্ছেন।
‘এক প্লেট ভাতে বেঁচে আছি’
বেরোবির জেন্ডার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী এস এম শাহজালাল রিয়াদ তিন বছর ধরে ‘আল্লাহর দান’ মেসে থাকেন। মেসের খাবারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ভোর ৫টায় দিন শুরু হয়। রিডিং রুমে পড়াশোনা শেষে সকাল ৯টার দিকে খাবার হিসেবে মেলে পাতলা ডাল ও আলুভর্তা।
তার ভাষায়, দুপুরে বড় এক বাটি ভাতের সঙ্গে থাকে ব্রয়লার মুরগির এক টুকরো মাংস। সঙ্গে বাজারের সবচেয়ে কমদামি সবজি, যার বড় অংশই আলু। দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাংসের টুকরোর আকারও ছোট হয়ে আসছে।
তিনি বলেন, দুপুরের খাবার খেয়ে টিউশনে যেতে হয়। সন্ধ্যা বা রাতে ফিরে আবার ভাত, ডাল, সবজি কিংবা সস্তা মাছ দিয়ে দিন পার করতে হয়।
‘আগে তুলনামূলক কম দামে মাছ-মাংস ও বিভিন্ন ধরনের সবজি দিয়ে দুবেলা খাবার খাওয়া সম্ভব হলেও এখন তা কঠিন হয়ে পড়েছে।সকালে ডাল, ভর্তা ও ভাত এবং দুপুর ও রাতে প্রায় একই ধরনের খাবার খেতে হচ্ছে। আগে যেখানে দুবেলা আমিষ খাওয়া সম্ভব ছিল, এখন কোনো কোনো দিন একবেলা তুলনামূলক সস্তা ব্রয়লার মাংস খেয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে’
শাহজালাল রিয়াদের ভাষায়, ‘আমরা যা খাই তার পুষ্টিমান বিচার করার মানদণ্ড নেই, পরিমাপের যোগ্যও না। আমরা মূলত বেঁচে আছি এক প্লেট ভাতে। মস্তিষ্কজুড়ে বিশাল স্বপ্ন, পেটে রাজ্যের ক্ষুধা। মাঝেমধ্যে মনে হয়, এই খাবার খেয়ে কি যুদ্ধ করা যায়?’
দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মাসফিকুল হাসান থাকেন রংপুরের পার্কের মোড়ের একটি মেসে। তার ভাষ্য, সবজির দাম ওঠানামা করলেও মাছ ও ডিমের দাম তুলনামূলক বেশি। ফলে অনেকটা বাধ্য হয়েই ব্রয়লার মুরগি কিনতে হচ্ছে। নিয়মিত ব্রয়লার খাওয়া স্বাস্থ্যকর নয়—এটি জানার পরও বাজারের খরচ সামলাতে এটাই বেছে নিতে হচ্ছে। তার ওপর এক পিস মাংসের পরিমাণ এত কম থাকে যে, তা দিয়ে আমিষের চাহিদা পূরণ করাও কঠিন।
মাসফিকুল বলেন, মেস লাইফ কেবল থাকার জায়গা নয়, বরং ভবিষ্যতের প্রস্তুতি নেওয়ার কেন্দ্র। কিন্তু নিম্নমানের খাবারের কারণে শারীরিক দুর্বলতা ও অসুস্থতা আমাদের নিয়মিত পড়াশোনা ও পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে।
‘এক মাসে ওজন কমেছে ৬ কেজি’
নিত্যপণ্যের বাড়তি দামের কারণে খাবারের তালিকা সংকুচিত হওয়ার কথা জানান তানভীর হাসান দিপু। তার মতে, আগে তুলনামূলক কম দামে মাছ-মাংস ও বিভিন্ন ধরনের সবজি দিয়ে দুবেলা খাবার খাওয়া সম্ভব হলেও এখন তা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, সকালে ডাল, ভর্তা ও ভাত এবং দুপুর ও রাতে প্রায় একই ধরনের খাবার খেতে হচ্ছে। আগে যেখানে দুবেলা আমিষ খাওয়া সম্ভব ছিল, এখন কোনো কোনো দিন একবেলা তুলনামূলক সস্তা ব্রয়লার মাংস খেয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে।
এর প্রভাব শরীরেও পড়ছে বলে জানান তিনি। তানভীর বলেন, গত মাসেও তার ওজন ছিল ৭৮ কেজি। পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার না খেতে পারায় এক মাসে ওজন কমে ৭২ কেজিতে দাঁড়িয়েছে। আমরা বিলাসী খাবার চাই না; চাই সাশ্রয়ী মূল্যে পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার। একজন শিক্ষার্থীকে যদি প্রতিদিনের খাবারের হিসাব করতে গিয়ে পুষ্টির সঙ্গে আপস করতে হয়, তাহলে সেটি শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, শিক্ষার্থী সমাজের জন্যও উদ্বেগের বিষয়।’
২৩০ শিক্ষার্থীর মেসে ৩০ টাকা মিল
রংপুরের চকবাজারের একটি মেসে থাকেন বেরোবির চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী রামিশা ফারিয়া। তার মেসে প্রায় ২৩০ জন শিক্ষার্থী থাকেন। তিনি জানান, প্রতিদিন মিলপ্রতি ৩০ টাকা এবং মাসে প্রায় ১৫ কেজি চাল দিতে হয়।
তিনি বলেন, সকালের খাবারে নিয়মিত থাকে ডাল ও আলুভর্তা। মাঝে মাঝে শাক, বেগুন বা আলুভাজি দেওয়া হয়। ডাল এতটাই পাতলা থাকে যে দেখে পানি ও হলুদ মেশানো মনে হয়। দুপুরে নামমাত্র পরিমাণে ব্রয়লার মুরগির মাংস বা কখনো অর্ধেক ডিম দেওয়া হয়। মাছ খুব কমই থাকে। আর সবজির বড় অংশজুড়ে থাকে আলু।
রামিশা ফারিয়ার অভিযোগ, এই খাবার দিয়ে মেসে থাকা শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় আমিষ ও পুষ্টির চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাবে ধীরে ধীরে নানা শারীরিক সমস্যাও অনুভব করছেন তারা।
আরও পড়ুন
বেরোবির হল ডাইনিং / নিম্নমানের খাবারে অতিষ্ঠ শিক্ষার্থীরা, ১৭ বছরেও মেলেনি কোনো ভর্তুকি
মেসের খাবারের মান নিয়ে হতাশ হয়ে নিজেই রান্না করে খাচ্ছেন মাহফুজা মিমু। তিনি জানান, মেসে ওঠার প্রথম দিকে নিয়মিত মিল নিতেন। কিন্তু খাবার মুখে দেওয়া কঠিন হওয়ায় অনেক সময় তা ফেলে দিতে হয়েছে।
আরও পড়ুন
মূল্যস্ফীতির প্রভাবে হাঁসফাঁস শিক্ষাজীবন, খাবারে পুষ্টির ঘাটতি
তিনি বলেন, রান্নার মান খারাপ হওয়ার পাশাপাশি খাবারে সবজি ও আমিষের পরিমাণও কম। আবার ক্লাস শেষে মেসে ফিরে অনেক সময় খাবার নষ্ট হয়ে যায়। বাজার করতে গেলেও মাছ, মাংস, তেলসহ বিভিন্ন পণ্যের বাড়তি দামের কারণে অল্প টাকায় ভালো বাজার করা কঠিন। শেষ পর্যন্ত কিছুটা সময় ও শ্রম বেশি লাগলেও নিজেই রান্না করে খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
আরও পড়ুন
কী খাচ্ছে বাকৃবি শিক্ষার্থীরা?
পুষ্টির ঘাটতিতে বাড়ছে শারীরিক ঝুঁকি
বেরোবির মেসজীবনের এই চিত্র শুধু খাবারের মেন্যুতে আলু কিংবা পাতলা ডালের উপস্থিতির গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য, পড়াশোনায় মনোযোগ এবং ভবিষ্যৎ গড়ার সক্ষমতা। পরিবারের সীমিত আয়, বাড়তি মেস খরচ ও নিত্যপণ্যের চড়া দামের চাপে খাবারের বাজেট কমাতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থীকে পুষ্টির সঙ্গে আপস করতে হচ্ছে।
আরও পড়ুন
গ্যাস সংকটে খাবার জুটছে না শিক্ষার্থীদের
বেরোবি মেডিকেল সেন্টারের ডেপুটি চিফ মেডিকেল অফিসার ডা. এ এম এম শাহরিয়ার বলেন, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক খাদ্যতালিকায় কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট, ফাইবার ও পানির মধ্যে ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন। তার মতে, মাংসপেশির শক্তি ও শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের জন্য প্রোটিন অপরিহার্য; বাড়ন্ত বয়সে এর প্রয়োজন আরও বেশি।
আরও পড়ুন
ঢাবির হল ক্যান্টিনে খাবারের মান নিয়ে শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ
তিনি বলেন, প্রোটিনের ঘাটতি হলে অপুষ্টি ও শারীরিক দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে আন্ডারওয়েটসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা তৈরি হতে পারে। আবার খাবারের মান ভালো না হওয়ায় অনেকে না খেয়ে থাকেন, যার ফলে গ্যাসট্রিক ও আলসারের মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
তবে শুধু প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে অতিরিক্ত ব্রয়লার মুরগির ওপর নির্ভর না করে খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন উৎস থেকে পুষ্টি নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন তিনি।
ডা. শাহরিয়ার বলেন, সুষম ও নিরাপদ খাদ্য সবার অধিকার। বিশেষ করে ভবিষ্যতে দেশ গঠনে ভূমিকা রাখবে এমন শিক্ষার্থীদের জন্য এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। মাছ-মাংসের পাশাপাশি ডিম, মসুর ডাল ও বীজজাতীয় খাবার প্রোটিনের ভালো উৎস। প্রতিদিনের খাবারে অন্তত একটি ডিম, ডাল এবং সবুজ শাকসবজি রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
আজিজুর রহমান/কেএইচকে/জেআইএম