টানা কয়েকদিনের ছুটিতে পর্যটকদের ভিড় বেড়েছে কক্সবাজারে। ঈদে মিলাদুন্নবীর ছুটির সঙ্গে বৃহস্পতিবার নৈমিত্তিক ছুটি যারা নিতে পেরেছেন, তাদের খাতায় যুক্ত হয়েছে সাপ্তাহিক দুদিনের ছুটিসহ চারদিনের অবসর। এতে টানা ছুটিতে অবকাশ কাটাতে পরিবার-পরিজন নিয়ে কক্সবাজার এসেছেন সরকারি চাকরিজীবীসহ পেশাজীবীরা।
পর্যটক উপস্থিতির কথা মাথায় রেখে তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইসে আয়োজন করা হয়েছে ‘মেক্সিকান ফুডস ফেস্টিভ্যাল’। ২৬ থেকে ২৯ আগস্ট পর্যন্ত চারদিনের জন্য এ আয়োজন করা হয়েছে। সব ক্যাটাগরির পর্যটকদের কথা চিন্তা করে মাত্র ১০০ থেকে ৩০০ টাকায় মেন্যু সেট করেছে আয়োজক কর্তৃপক্ষ। বৈচিত্র্যময় এ আয়োজনে প্রথমদিন থেকেই সাড়া পড়েছে।
কক্সবাজার হোটেল ও গেস্ট হাউজ মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার জাগো নিউজকে বলেন, ‘সরকারি ছুটি থাকলেই পর্যটকদের প্রথম পছন্দের গন্তব্য থাকে কক্সবাজার। বর্ষায় কক্সবাজারে হোটেল কক্ষ ভাড়ায় ভালোই ডিসকাউন্ট থাকে। রেস্তোরাঁয় খাবারে এবং অন্য সবখানে সেবাটা বেশি পাওয়া যায়। গরমের তীব্রতাও থাকে কম। সবমিলিয়ে এসময়ে কক্সবাজারে ঘুরতে আসা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।’
সী-নাইট হোটেলের ব্যবস্থাপক শফিক ফরাজী জানান, এবারও বুধবার ঈদে মিলাদুন্নবীর ছুটির পর বৃহস্পতিবার যারা ছুটি ম্যানেজ করতে পেরেছেন, তার টানা চারদিনের অবসর নিয়ে কক্সবাজার এসেছেন। এতে পর্যটকের উপস্থিতি বেড়েছে সমুদ্র নগরীতে।
কক্সবাজার ট্যুরিস্ট ক্লাব ও টুয়াক প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি রেজাউল করিম জানান, গত ৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে বুধবার সরকারি ছুটি ছিল। পরদিন বৃহস্পতিবার অফিস খোলা থাকলেও শুক্র ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে ওই সময়ও চারদিনের সময় নিয়ে কক্সবাজারে পর্যটকের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ছিল। এবারও টানা চার দিনের ছুটিকে কেন্দ্র করে পর্যটকের চাপ বেড়েছে কক্সবাজারে। এতে হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, পর্যটনকেন্দ্র ও সৈকতকেন্দ্রিক ব্যবসায় প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে।
তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইসের পরিচালক আবদুল কাদের মিশু জাগো নিউজকে বলেন, ‘চলতি মাসে গণঅভ্যুত্থান দিবসের মতো ঈদে মিলাদুন্নবীর ছুটিতেও আমাদের হোটেলে বুকিং ভালোই বলা চলে। এবারের টানা বন্ধে আমরা চারদিনের মেক্সিকান ফুড ফেস্টিভ্যাল আয়োজন করেছি। কেসাডিয়া, গুয়াকামোল, টর্টিয়া কিংবা সুস্বাদু নাচোস-মেক্সিকোর অত্যন্ত জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী এসব খাবারের চেনা স্বাদ এখন পাওয়া যাচ্ছে এই শহরেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেকের ধারণা থাকে, তারকা মানের হোটেল মানেই অতিরিক্ত চড়া দামের খাবার। সেই ভুল ধারণা ভাঙতেই সর্বসাধারণের নাগালে মাত্র ১০০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যেই ভোজনরসিকরা উপভোগ করতে পারছেন মেক্সিকোর বাহারি সব খাবার। পাশাপাশি শিশুদের জন্যও রাখা হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা।’
হোটেলের এক্সিকিউটিভ সেফ মুহাম্মদ ইরফান হোসাইন বলেন, ‘ভ্রমণপ্রেমীরা বৈচিত্র্য পছন্দ করে, এটা বুঝতে পারছি ফেস্টিভ্যালে সব বয়সী মানুষের সাড়ায়। পর্যটক মেক্সিকান খাবারের স্বাদ নিতে ভিড় করছেন’
‘ইকো রিসোর্ট হিসেবে আমরা সারাবছরই কমবেশি বুকিং পাই। যেকোনো বন্ধে একটু চাপ থাকে। এবারও ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বুকিং হয়েছে’—বলেন মারমেইড বিচ রিসোর্টের ব্যবস্থাপক রানা কর্মকার।
একই ধরনের বুকিং হয়েছে তারকা হোটেল সায়মন, রামাদা, সি প্যারাডাইস, প্রাসাদ প্যারাডাইস, লং বিচ, কক্স টু ডে, বেস্ট ওয়েস্টার্ন হেরিটেজ, গ্র্যান্ড প্যাসিফিক, গ্রিন ন্যাচারসহ সব তারকা ও নন তারকা হোটেল, গেস্ট হাউজ ও কটেজে।
এবারের পর্যটন মৌসুমটা ভিন্ন যাচ্ছে বলে জানান সৈকতে বিপদাপন্ন পর্যটকের উদ্ধারে কাজ করা সি সেইফ লাইফগার্ডের সিনিয়র কর্মী ওসমান গণি।
আরও পড়ুন
সৈকতে নির্মাণকাজ / কক্সবাজারের ডিসিসহ চারজনকে আদালত অবমাননার নোটিশ
তিনি বলেন, ‘অতীতে এসময় পর্যটক থাকতো হাতেগোনা। কিন্তু এবার কোরবানির ঈদের পর হতে প্রতি সাপ্তাহিক বন্ধে উল্লেখ করার মতো পর্যটক আসছে। টানা বন্ধে এটি দ্বিগুণ হয়। বুধবার হতে পর্যটকে সরগরম অবস্থা চলছে। এতে আমাদের ব্যস্ততা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু বিকেলে নয়, এখন সকালের স্নিগ্ধ সময়েও জনকোলাহল বাড়ে।’
সি সেইফ লাইফগার্ডের ফিল্ড টিম ম্যানেজার ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘বর্ষায় সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করা গেলেও পানিতে নামার ক্ষেত্রে লাইফগার্ডদের নির্দেশনা অবশ্যই মানতে হবে। লাল পতাকা টানানো থাকলে কোনোভাবেই পানিতে নামা উচিত নয়। কলাতলী, সুগন্ধা ও লাবণী পয়েন্টে নিরাপদ স্থান চিহ্নিত করে পর্যটকদের গোসলে নামা উচিত। সচেতন না হলে আনন্দ ভ্রমণ মুহূর্তে বিষাদে রূপ নিতে পারে।’
আরও পড়ুন
সৈকতে লাল পতাকা টানানো স্থানে গোসলে নেমে পর্যটকের মৃত্যু, নিখোঁজ ১
কক্সবাজার চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, ‘সবমিলিয়ে কয়েক বছর আগের কক্সবাজারের বর্ষাকালীন পর্যটনচিত্র এখন আর আগের মতো নেই। একসময় যে মৌসুমকে ব্যবসায়ীরা দীর্ঘ খরা সময় হিসেবে দেখতেন, সেই বর্ষাই এখন নতুন সম্ভাবনার বার্তা দিচ্ছে। বৃষ্টিভেজা সৈকত, মেঘলা আকাশ, উত্তাল ঢেউ, মেরিন ড্রাইভের সবুজ পাহাড় আর সাগরের মিলনে বর্ষার কক্সবাজার প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসু মানুষের জন্য হয়ে উঠছে ভিন্ন এক গন্তব্য।’
সরেজমিন দেখা গেছে, পর্যটক-দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় সতর্ক অবস্থায় দায়িত্বপালন করছে ট্যুরিস্ট ও জেলা পুলিশ। মাঠে টহল দিচ্ছেন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ ভ্রাম্যমাণ আদালত। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা রোধে সিসিটিভির আওতায় আনা হয়েছে পর্যটন স্পটগুলো।
আরও পড়ুন
রোহিঙ্গা ঢলের ৯ বছর / প্রত্যাবাসন স্বপ্নের বাস্তবতায় হতাশ রোহিঙ্গারা
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিয়নের পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত) আজমল হোসেন বলেন, আমাদের প্রথম ও মুখ্য কাজ পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সে লক্ষ্যে নিয়মিত তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে টুরিস্ট পুলিশ।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, পর্যটন জোনের সুগন্ধা-লাবণী-কলাতলী পয়েন্টে লোকসমাগম একটু বেশি। তবে, সব পয়েন্টে পর্যটক উপস্থিতি চিন্তা করে তথ্যকেন্দ্র সচল রয়েছে। পর্যটক হয়রানির অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে মাঠে রয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
এ বিষয়ে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান বলেন, বিপুল লোকসমাগম মাথায় নিয়ে সতর্ক অবস্থায় দায়িত্বপালন করছে পুলিশ। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা রোধে পোশাকধারীর পাশাপাশি সাদা পোশাকে এবং পর্যটক বেশেও পুলিশের সদস্যরা ঘুরছেন। টহলে রয়েছে এলিট ফোর্স র্যাবও।
সায়ীদ আলমগীর/এসআর/জেআইএম