আজ পৃথিবীর মানুষ টাকার জন্য ছুটছে। কেউ বেশি টাকা উপার্জন করতে চায়, কেউ সম্পদ বাড়াতে চায়, কেউ ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য সঞ্চয় করে। কারণ টাকা থাকলে আমরা আমাদের প্রয়োজন মেটাতে পারি, খাবার কিনতে পারি, বাড়ি করতে পারি, চিকিৎসা নিতে পারি, শিক্ষা নিতে পারি। অর্থাৎ, টাকা আমাদের প্রয়োজন পূরণের একটি মাধ্যম। কিন্তু কখনো কি উল্টো করে ভেবেছেন?
যদি একদিন আপনার কাছে প্রচুর টাকা থাকে, কিন্তু সেই টাকার বিনিময়ে পাওয়ার মতো প্রয়োজনীয় জিনিস প্রায় সবার জন্যই সহজলভ্য হয়ে যায়, তাহলে সেই টাকার মূল্য কতটুকু থাকবে?
প্রশ্নটি আজ অদ্ভুত মনে হতে পারে। কিন্তু পৃথিবী যে গতিতে বদলাচ্ছে, তাতে ভবিষ্যৎ নিয়ে এই প্রশ্ন এখন থেকেই করা দরকার।
আমি নিজেই ইদানীং একটি খুব সাধারণ বিষয় লক্ষ্য করছি। সুইডেনের মতো দেশে, খুব সামান্য জায়গায় নানা ধরনের শাকসবজি চাষ করে যে পরিমাণ ফলন পাওয়া যায়, তা দেখে মাঝে মাঝে মনে হয়, উৎপাদনশীলতা যদি এভাবেই বাড়তে থাকে, তাহলে একদিন হয়তো প্রশ্ন উঠবে, এত খাবার খাবে কে? এটি শুধু একটি বাগানের অভিজ্ঞতা নয়। এটি আমাদের সামনে আসতে থাকা একটি বড় পরিবর্তনের ছোট্ট উদাহরণ।
আজ প্রযুক্তি মানুষের উৎপাদনক্ষমতাকে এমনভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা কয়েক দশক আগেও কল্পনা করা কঠিন ছিল। কৃষিতে উন্নত প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র, উন্নত বীজ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং এআই একসঙ্গে কাজ করলে একই জমি থেকে আরও বেশি উৎপাদন সম্ভব। শুধু খাদ্য নয়, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই উৎপাদন ও কাজের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
আরও পড়ুন
ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবি: বেঁচে আছেন রবিন? উত্তর খোঁজে পরিবার
আরেকটি পরিবর্তন আমরা প্রতিদিন নিজের চোখে দেখতে পাচ্ছি। কোনো সমস্যা দেখা দিলেই নানা ধরনের ডিজিটাল টুলের সাহায্যে আমরা খুব অল্প সময়ের মধ্যে সম্ভাব্য সমাধান খুঁজে পাচ্ছি। যে কাজের জন্য একসময় দীর্ঘ সময় গবেষণা করতে হতো, বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে হতো কিংবা অসংখ্য বই ঘাঁটতে হতো, আজ তার একটি প্রাথমিক উত্তর বা সমাধানের পথ অনেক ক্ষেত্রেই কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সামনে চলে আসছে। তাহলে ভাবুন, আমাদের সামনে কত বিশাল সুযোগ তৈরি হচ্ছে!
এআই শুধু মানুষের কিছু কাজ দ্রুত করছে না, মানুষের চিন্তা ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতাকেও নতুন মাত্রায় নিয়ে যাচ্ছে। আগামী দিনে এই ক্ষমতা আরও বাড়তে পারে। ফলে প্রশ্নটি শুধু হবে না, এআই কতগুলো চাকরি পরিবর্তন করবে। আরও গভীর প্রশ্ন হলো, এআই যখন উৎপাদন ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে, তখন আমাদের বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কতটা বদলাতে হবে?
কারণ টাকা নিজে কোনো খাবার নয়, কোনো বাড়ি নয়, কোনো চিকিৎসা নয়। টাকা হলো এসব পাওয়ার একটি মাধ্যম। আজ কোনো পণ্যের মূল্য নির্ধারণে শ্রম, সময়, দক্ষতা, কাঁচামাল, শক্তি ও উৎপাদনক্ষমতার ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু যদি এআই, রোবটিক্স এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি মানুষের শ্রমের প্রয়োজন অনেকটাই কমিয়ে দেয় এবং উৎপাদন বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, তাহলে অনেক পণ্যের উৎপাদন খরচও কমতে পারে।
তখন প্রশ্ন উঠবে, যদি অনেক প্রয়োজনীয় জিনিস আগের তুলনায় সহজলভ্য হয়ে যায়, তাহলে মানুষের টাকার প্রয়োজন কি আজকের মতোই থাকবে?
এর অর্থ এই নয় যে টাকা একদিন সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাবে। পৃথিবীতে জমি, প্রাকৃতিক সম্পদ, নির্দিষ্ট স্থান, শক্তি, মানুষের সময় এবং কিছু বিশেষ সেবা সবসময়ই সীমিত থাকতে পারে। ফলে অর্থের প্রয়োজন থাকবে। কিন্তু কোন জিনিসের মূল্য কত এবং কেন, সেই ধারণা বদলে যেতে পারে। অর্থাৎ, ভবিষ্যতের বড় পরিবর্তন হয়তো টাকা হারিয়ে যাওয়া নয়, বরং টাকার ভূমিকার পরিবর্তন।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মানুষের জ্ঞান ও চিন্তার বিস্ময়কর অগ্রগতি। আকাশকে আমরা খালি দেখি। অথচ সেই খালি আকাশের ভেতরেই রয়েছে অসংখ্য নক্ষত্র, গ্রহ, শক্তি এবং রহস্য। মানুষের জ্ঞানের জগতও অনেকটা তেমন। আমরা যা জানি, তা হয়তো অজানার তুলনায় অত্যন্ত সামান্য।
মানুষ যখন উন্মুক্তভাবে চিন্তা করে, প্রশ্ন করে এবং অজানাকে জানার চেষ্টা করে, তখন সৃষ্টির এমন সব অভূতপূর্ব রহস্য সামনে আসে, যা শুধু আমাদের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে না, বদলে দেয় আমাদের জীবনযাত্রা, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ধারণাও। এই কারণেই আজকের শিক্ষা দিয়ে আগামী দিনের পৃথিবীকে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়।
আমরা এমন এক সময়ে প্রবেশ করছি, যখন কোনো নতুন প্রযুক্তি বা ধারণা স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আগেই বাস্তব পৃথিবীতে তার ব্যবহার শুরু হয়ে যাচ্ছে। আর সেটি পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার আগেই হয়তো নতুন নিয়ম, নতুন নীতিমালা কিংবা নতুন রেজুলেশনের প্রয়োজন হয়ে পড়ছে। কারণ বাস্তবতা এখন এত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে যে, আমরা একটি নিয়ম তৈরি করার আগেই প্রযুক্তি হয়তো আরেক ধাপ এগিয়ে যাচ্ছে।
এখানে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার জন্যও একটি বড় প্রশ্ন রয়েছে। আমরা কি শুধু আজকের পৃথিবীর জন্য শিশুদের প্রস্তুত করব, নাকি এমন একটি পৃথিবীর জন্য প্রস্তুত করব যার অনেক কিছু আমরা নিজেরাই এখনো জানি না?
ভবিষ্যতের শিক্ষা শুধু এআই ব্যবহার শেখানোর শিক্ষা হতে পারে না। শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতা তৈরি করলেই হবে না। মানুষকে শিখতে হবে কীভাবে নতুন জ্ঞানকে যাচাই করতে হয়, কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, কীভাবে প্রযুক্তিকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করতে হয় এবং কীভাবে দ্রুত পরিবর্তিত পৃথিবীতেও নিজের বিচারবোধ ধরে রাখতে হয়। কারণ প্রযুক্তি যত শক্তিশালী হচ্ছে, মানুষের দায়িত্বও তত বাড়ছে।
এখানেই এসে আরেকটি বিষয় আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবায়। সততা ও নৈতিকতা আমাদের মধ্যে আছে, কিন্তু তার ব্যবহার কতটুকু?
আমরা সততার কথা বলি। নৈতিকতার কথা বলি। ন্যায়বিচারের কথা বলি। কিন্তু যখন অর্থ, ক্ষমতা কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থের প্রশ্ন আসে, তখন সেই মূল্যবোধগুলো আমরা কতবার নিজেদের আচরণে প্রয়োগ করি?
ভাবুন তো, এমন একটি পৃথিবী যেখানে প্রযুক্তি মানুষের অনেক সমস্যার সমাধান করতে পারছে, খাদ্য উৎপাদন বাড়ছে, তথ্য ও জ্ঞান সহজলভ্য হচ্ছে, চিকিৎসা উন্নত হচ্ছে, যোগাযোগ দ্রুত হচ্ছে, কিন্তু মানুষ যদি সততা ও নৈতিকতার ব্যবহার না শেখে, তাহলে সেই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে?
এআই হয়তো একদিন আমাদের অনেক প্রয়োজনীয় জিনিসকে অত্যন্ত সহজলভ্য করে তুলবে। উৎপাদন হয়তো এত বাড়বে যে আজকের অনেক অভাব অতীতের বিষয় হয়ে যাবে। মানুষের শ্রমের প্রয়োজনও হয়তো অনেক কমে যাবে। এমনকি প্রযুক্তি ও এআই-নির্ভর স্বচ্ছতা, নজরদারি এবং অডিট ব্যবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যেখানে দুর্নীতি বা অনৈতিক কাজ করা আগের মতো সহজ থাকবে না। হয়তো এমন একটি সময় আসবে, যখন মানুষ চাইলেও অনেক অনিয়ম গোপন করতে পারবে না, কারণ প্রযুক্তি তার অনেক ধরনের আচরণ ও লেনদেন শনাক্ত ও যাচাই করতে সক্ষম হবে।
কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়। মানুষকে অন্যায় করা থেকে বিরত রাখবে প্রযুক্তি, নাকি তার নিজের বিবেক? প্রযুক্তি হয়তো এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে, যেখানে দুর্নীতি করার সুযোগ কমে যাবে, অনিয়ম দ্রুত শনাক্ত হবে এবং অপরাধের প্রমাণ গোপন করা কঠিন হয়ে পড়বে। কিন্তু কোনো প্রযুক্তি কি মানুষের ভেতরে সততা তৈরি করতে পারবে? কোনো এআই কি একজন মানুষকে সত্যবাদী করে তুলতে পারবে, যখন তাকে কেউ দেখছে না?
হয়তো ভবিষ্যতে প্রযুক্তি আমাদের এমনভাবে পর্যবেক্ষণ করবে যে, চাইলেও আমরা সহজে অন্যায় করতে পারব না। কিন্তু সেটি মানুষের নৈতিকতার প্রমাণ নয়। সেটি হতে পারে একটি কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সাফল্য। কারণ অন্যায় করার সুযোগ না থাকা এবং সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অন্যায় না করা, এক বিষয় নয়।
প্রথমটি নিশ্চিত করতে পারে প্রযুক্তি, আইন ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। দ্বিতীয়টি আসে মানুষের বিবেক, মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষা থেকে।
তাই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো এমন একটি পৃথিবী হবে না যেখানে মানুষকে ভালো থাকতে বাধ্য করা হয়। বরং এমন একটি পৃথিবী, যেখানে প্রযুক্তি অন্যায়কে কঠিন করে তুলবে, আর মানুষের বিবেক তাকে অন্যায় থেকে দূরে রাখবে।
প্রযুক্তি আমাদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। আইন আমাদের সীমা নির্ধারণ করতে পারে। কিন্তু কেন সঠিক কাজটি করা উচিত, সেই উত্তরটি শেষ পর্যন্ত মানুষের ভেতর থেকেই আসতে হবে।
হয়তো ভবিষ্যতের প্রকৃত সাফল্য তখনই হবে, যখন আমাদের এমন প্রযুক্তি থাকবে যা অন্যায়কে সহজ হতে দেবে না, এবং এমন মানুষ থাকবে যারা প্রযুক্তির নজরদারি ছাড়াও সৎ থাকবে।
কারণ ক্যামেরা না থাকলেও যে মানুষ সৎ থাকে, তার সততার মূল্য ক্যামেরার সামনে সৎ থাকার চেয়ে অনেক বেশি। তাই আজ আমাদের শুধু ভবিষ্যতের প্রযুক্তির জন্য প্রস্তুত হওয়া নয়, ভবিষ্যতের মানুষ হওয়ার জন্যও প্রস্তুত হওয়া দরকার।
হয়তো এমন একটি সময় আসবে, যখন মানুষের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে না, “আমার কাছে কত টাকা আছে?” বরং প্রশ্ন হবে, “আমার কাছে যা আছে, তা দিয়ে আমি কী করছি?”
কারণ প্রাচুর্য মানুষকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভালো মানুষ বানায় না। প্রযুক্তি মানুষকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নৈতিক করে না। আর অর্থ মানুষের চরিত্রের বিকল্প নয়।
আমরা হয়তো এমন এক পৃথিবীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছি যেখানে খাদ্য, তথ্য, জ্ঞান, উৎপাদন এবং সমস্যা সমাধানের সুযোগ অভূতপূর্বভাবে বাড়বে। কিন্তু সেই পৃথিবীর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে শুধু আমরা কতটা উৎপাদন করতে পারলাম তার ওপর নয়, আমরা সেই প্রাচুর্য কতটা ন্যায়সঙ্গত, মানবিক ও দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে পারলাম তার ওপর।
হয়তো ভবিষ্যতে টাকার মূল্য কিছুটা কমবে, কিন্তু একজন সৎ, নৈতিক ও বিশ্বাসযোগ্য মানুষের মূল্য আরও বাড়বে। আর যদি সত্যিই সেই দিন আসে, তাহলে সেটিই হবে আমাদের সভ্যতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
কারণ তখন প্রশ্ন থাকবে না, আমরা কত কিছু অর্জন করতে পেরেছি? প্রশ্ন হবে, এত কিছু অর্জন করার পরও আমরা মানুষ হিসেবে কতটা ভালো থাকতে পেরেছি?
রহমান মৃধাগবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেনই-মেইল: rahman.mridha@gmail.com
এমআরএম