ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে যুক্তরাজ্যের পারমাণবিক সাবমেরিন কৌশলে ভরসা রাখার কথা ভাবছে জার্মানি। যুক্তরাজ্যের সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপযোগ্য ‘ত্রিশূল’ (Trident) পারমাণবিক প্রতিরোধ কর্মসূচিতে অর্থ ও বিনিয়োগ সহায়তার কথা বিবেচনা করছে জার্মানি। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা-নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপের নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়ানোর বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
‘ত্রিশূল’ ক্ষেপণাস্ত্র কী?
ত্রিশূল বা ট্রাইডেন্ট ক্ষেপণাস্ত্র (Trident Missile): এটি সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (SLBM)। আমেরিকার তৈরি এই থার্মোনিউক্লিয়ার ক্ষেপণাস্ত্রটি যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর ওহাইও-শ্রেণি (Ohio-class) এবং যুক্তরাজ্যের রয়্যাল নেভির ভ্যানগার্ড-শ্রেণি (Vanguard-class) পারমাণবিক সাবমেরিনগুলোতে ব্যবহার করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে দ্য টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, জার্মানি নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার তৈরির পথে না গিয়ে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের বিদ্যমান পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হতে চাচ্ছে।
রাশিয়ার হুমকিতে বাড়ছে উদ্বেগ
রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং উত্তর মহাসাগর ও ব্যারেন্ট সাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমায় ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের কারণে দুশ্চিন্তায় পড়েছে ইউরোপ।
এছাডাও বাল্টিক সাগরে জার্মান উপকূলের কাছে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রসজ্জিত রুশ যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের খবর পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ন্যাটো ভূখণ্ডের গভীরে হামলা চালাতে সক্ষম দূরপাল্লার ড্রোন উৎক্ষেপণের জন্য গোপন ঘাঁটি শনাক্ত হওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে ইউরোপীয় দেশগুলো। ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা তৈরিতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস সরকার।
ব্যারেন্টস সাগরে সাবমেরিন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিযোগিতা:
বহুজাতিক ন্যাটো মেরিটাইম গ্রুপ ওয়ান (SNMG1) মাসের শেষের দিকে নরওয়েজিয়ান সাগর ও ব্যারেন্টস সাগরে টহল দিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের যোগাযোগব্যবস্থা সুরক্ষা এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই টহল দেওয়া হয় বলে জানায়।
ন্যাটো এক বিবৃতিতে বলেছে, আর্কটিক ও হাই নর্থে আমাদের অভিযান শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নৌ চলাচলের স্বাধীনতার প্রতি জোটের দীর্ঘস্থায়ী অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, এই অঞ্চলে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রতিরোধক্ষমতা, দ্রুত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা এবং সদস্যদেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।
তবে, ন্যাটোর ওই বিবৃতিতে একটি বিষয় বিশেষভাবে নজর কাড়ে। ২৮ জুলাই প্রকাশিত বিবৃতিতে ব্যারেরন্ট সাগরে মহড়ার একটি ছবি দেওয়া হলেও, এর কয়েক ঘণ্টা আগেই একই এলাকায় রাশিয়া একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করেছিল। ন্যাটোর গণমাধ্যমবিষয়ক বিবৃতিতে রাশিয়ার ওই লাইভ-ফায়ার মহড়ার কোনো উল্লেখ করা হয়নি।
কোলা উপদ্বীপের উত্তরে অবস্থিত ব্যারেন্টস সাগর রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রবাহী সাবমেরিন বহরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এলাকা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়ার নর্দার্ন ফ্লিট নরওয়ের এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনের (EEZ) কাছাকাছি সামরিক মহড়া বাড়িয়েছে।
গত মাসের মহড়ায় ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের কারণে ডেনমার্কের আয়তনের দ্বিগুণেরও বেশি একটি বিশাল সমুদ্রাঞ্চলকে ‘বিপজ্জনক’ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এর প্রায় অর্ধেক ছিল রাশিয়ার এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনে এবং বাকি অংশ নরওয়ের জলসীমায়। এলাকাটি নরওয়ে ও রাশিয়ার মধ্যে আগে বিতর্কিত থাকা সমুদ্রসীমার দক্ষিণাংশের বড় একটি অংশজুড়ে বিস্তৃত ছিল বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে দ্য ব্যারেন্টস অবজার্ভার।
একই সময়ে বারেন্টস সাগরে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র মহড়া এবং ন্যাটোর যুদ্ধজাহাজের টহল-আর্কটিক অঞ্চলে বাড়তে থাকা সামরিক উত্তেজনার নতুন ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ট্রাইডেন্ট নির্মাণে অর্থের পাশাপাশি সামরিক সহায়তা
বার্লিনের সামরিক পরিকল্পনাকারীরা সরাসরি অর্থ দেওয়ার পাশাপাশি সম্ভাব্য সহযোগিতার আওতায় প্রচলিত সামরিক বাহিনী মোতায়েন করার কথাও ভাবছে বলে জানা গেছে। এর বাইরে স্কটল্যান্ডের ফ্যাসলেন সাবমেরিন ঘাঁটি সুরক্ষায় প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনের বিষয়ও বিবেচনা করা হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবস্থার উৎক্ষেপণ সক্ষমতা স্বয়ংসম্পূরণ। তবে, ট্রাইডেন্ট ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতার ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল যুক্তরাজ্য। এই জায়গায় জার্মানি নিজেদের শিল্প ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কাজে লাগাতে চায়। এমনকি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পারমাণবিক সাবমেরিন ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতেও সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
তবে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে রয়েছে বেশ কিছু জটিলতা। ঐতিহাসিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্রসংক্রান্ত সংবেদনশীলতা, রাজনৈতিক ও আইনি সীমাবদ্ধতা এবং কৌশলগত প্রতিরোধ ব্যবস্থায় নিজেদের ভূমিকা নির্ধারণ করা জার্মানির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
ফ্রান্সের সঙ্গেও একই ধরনের আলোচনা চালাচ্ছে বার্লিন। তবে, দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নেতৃত্বে পরিবর্তন এলে এই উদ্যোগের গতিপথ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বলয়ের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব পারমাণবিক প্রতিরোধ সক্ষমতা জোরদারের পথে জার্মানির এই উদ্যোগে ইউরোপ কতটা এগোতে পারে তাই এখন দেখার বিষয়।
সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ, মিলিটারি ওয়াচ ম্যাগাজিন, দ্য ব্যারেন্টস অবজার্ভার
কে এম