
পাঁচটির বেশি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মাহমুদ শরীফ। সাইকেল চালিয়ে পাড়ি দিয়েছেন এক হাজার মাইল। ক্রিকেটে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আন্তবিভাগীয় ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় চারবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে তাঁর দল। বন্যাকবলিত মানুষের জন্য দিনের পর দিন কাজ করেছেন। এমনকি পেয়েছেন সেরা গবেষকের পুরস্কার। পিএইচডি করতে এবার যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন এই ‘অলরাউন্ডার’।

ছোটবেলা থেকেই বিদেশে পড়ার স্বপ্ন ছিল। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সেই স্বপ্ন শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি, অন্য শিক্ষার্থীদেরও উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে যাওয়ার উপায় দেখিয়েছেন মাহমুদ শরীফ। বৃত্তি, বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন ও গবেষণার সুযোগ নিয়ে অন্য শিক্ষার্থীদের তথ্য ও পরামর্শ দিয়েছেন। এবার নিজেই ৮ আগস্ট পাড়ি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে। পূর্ণ অর্থায়নে ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডায় রসায়ন বিভাগে পিএইচডি করবেন শরীফ।
শরীয়তপুরের নড়িয়ার জপসা গ্রামে মাহমুদ শরীফের বাড়ি। পালং তুলাসার গুরুদাস সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করার পর শরীয়তপুর সরকারি কলেজে এইচএসসি পড়েন। স্নাতকে ৩ দশমিক ৭৮ ও মাস্টার্সে ৩ দশমিক ৯৮ সিজিপিএ অর্জন করেন। ২০১৯ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে ভর্তি হন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর চারপাশে শুধু মাস্টার্স শিক্ষার্থীদের গবেষণা করতে দেখে মনে প্রশ্ন জাগে, স্নাতক শিক্ষার্থীরাও কি গবেষণা করতে পারেন না? সেই প্রশ্ন থেকেই প্রথম বর্ষে গবেষণার সুযোগ খুঁজতে শুরু করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে যুক্ত হন ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ অ্যান্ড হায়ার স্টাডি সোসাইটি’র সঙ্গে। পরে সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। সংগঠনটির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের গবেষণা ও বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্পর্কে জানাতে শুরু করেন তিনি।
শুরুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃত্তি, গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার তথ্য তুলে ধরতেন। করোনাভাইরাসের মহামারির পর শিক্ষার্থীদের জন্য সেমিনার ও কর্মশালার আয়োজন করতে শুরু করেন। সেখানে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে কী সুযোগ আছে, কীভাবে আবেদন করতে হবে, গবেষণার জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে—এসব বিষয়ে জানানো শুরু করেন। শরীফ বলেন, ‘সংগঠনের মাধ্যমে আমরা অনেক শিক্ষার্থীকে বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেতে সহায়তা করেছি এবং তথ্য দিয়েছি। ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে অনেককেই গবেষণার সুযোগ করে দিয়েছি।’
অন্যদের পথ দেখানোর পাশাপাশি নিজের গবেষণাও চালিয়ে গিয়েছেন শরীফ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ন্যানোটেকনোলজি, রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যান্ড ক্যাটালিটিক ল্যাবরেটরিতে গবেষণা সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। সেখানে জিংক অক্সাইডের বিশেষ ধরনের ক্ষুদ্র কণা তৈরির কাজ করেন। এর আগে ২০২৪ সালের জুনে মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মালয়ায় ভিজিটিং রিসার্চার হিসেবেও কাজ করেন তিনি।
শরীফের গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জার্নালেও। এর মধ্যে ‘জার্নাল অব এনার্জি স্টোরেজ’, ‘জার্নাল অব পাওয়ার সোর্সেস’ ও ‘এনার্জি স্টোরেজ ম্যাটেরিয়ালস’–এর মতো আন্তর্জাতিক জার্নালও আছে। গবেষণার স্বীকৃতিও পেয়েছেন শরীফ। চট্টগ্রাম গবেষণা ও উদ্ভাবন উৎসব ২০২৫–এ ‘হাইয়েস্ট ইমপ্যাক্ট পাবলিকেশন অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেন তিনি। গবেষণায় তাঁর প্রকাশনার প্রভাবের স্বীকৃতি হিসেবে এই পুরস্কার দেওয়া হয়। ২০২৫ সালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ফেলোশিপ পান তিনি। ২০২৪ সালে আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটির একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিতে ভ্রমণ অনুদানও পান।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটির বেশি ক্লাবের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন মাহমুদ শরীফ। ২০২৩ সালে ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটির’ স্টুডেন্ট চ্যাপটার প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিয়েছেন এই তরুণ। পরে এটির প্রতিষ্ঠাতা সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪ সালে ‘টেডেক্স চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়’–এর ইভেন্ট পরিচালক ছিলেন। এ ছাড়া যুক্ত ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাইক্লিস্টস ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় টোস্টমাস্টার্স ক্লাবে। এর বাইরে শরীয়তপুর জেলা ছাত্র সমিতির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। পরিবেশ নিয়ে বিভিন্ন আয়োজনে ছিলেন সংগঠক। ‘ইন্টারন্যাশনাল সাসটেইনেবল অ্যান্ড গ্রিনার আর্থ’ সম্মেলনের আয়োজক ছিলেন। এ ছাড়া নানা সম্মেলন আয়োজনে যুক্ত ছিলেন তিনি।
খেলাধুলা ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজেও শরীফের তুমুল আগ্রহ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ট্রেফয়েল–৫৪ ক্রিকেট দলের হয়ে খেলেছেন। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দলটি চারবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। ২০২২ সালে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া প্রায় এক হাজার কিলোমিটারের ক্রস–কান্ট্রি সাইকেল রাইড করেন শরীফ।
সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকেও পিএইচডির সুযোগ পেয়েছিলেন। তবে পছন্দের কাজের সঙ্গে মিল থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডা বেছে নেন শরীফ। পিএইচডির পুরো অর্থায়নের পাশাপাশি উপবৃত্তি (স্টাইপেন্ড) ও স্বাস্থ্যবিমা পাবেন তিনি।
ক্যাম্পাসজীবনে এত এত কাজের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন, এসব অভিজ্ঞতাই শরীফের পরের পথটি সহজ করেছে। শরীফ বলেন, ‘আমার কাছে বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ডিগ্রি অর্জনের জায়গা নয়, নিজেকে খুঁজে নেওয়া এবং অন্যদের জন্য সুযোগ তৈরি করার জায়গাও।’