বৃষ্টি এখন আর নগরে রোমান্টিকতা নিয়ে আসে না। সে আসে আতঙ্ক নিয়ে। আধ ঘণ্টার বৃষ্টিতে হাঁটুজল, দুই ঘণ্টার বৃষ্টিতে রাজধানী অচল। আমরা বলি, ড্রেনেজ সমস্যা। কিন্তু আসল সত্যটা আরও গভীরে, আরও নিচে, মাটিতে। এই নগরে বৃষ্টি নামে, কিন্তু বৃষ্টিকে শোষণ করে নেওয়ার মতো ভূপৃষ্ঠ নেই, মাটি নেই। বৃষ্টি তো মাটিতেই নামার কথা। সেই মাটিই এখন নিখোঁজ।
মহানগর ঢাকা এক বিশাল কংক্রিটের চাদরে ঢাকা। অনেক এলাকায় অভেদ্য পৃষ্ঠের পরিমাণ ৯০ শতাংশেরও বেশি। ফলে বৃষ্টির পানি মাটির নিচে যাওয়ার পথ খুঁজে পায় না। বৃষ্টির যে পানি একসময় মাটিতে ঢুকে ভূগর্ভস্থ জলস্তরকে পূরণ করত, গাছের শিকড়কে বাঁচাত, জলাভূমি ও খালকে ধীরে ধীরে পূর্ণ করত, সেই পানি এখন রাস্তায় জমে থাকে। ঢোকার পথটা আমরাই বন্ধ করে দিয়েছি।
প্রকৃতির জলচক্রের নিজস্ব একটি ছন্দ আছে। বৃষ্টির পানির একটি অংশ মাটিতে শোষিত হয়, একটি অংশ উদ্ভিদ ও বায়ুমণ্ডলের প্রক্রিয়ায় ফিরে যায়, আরেকটি অংশ ভূমির ওপর দিয়ে গড়িয়ে নদী-খাল ও জলাধারে পৌঁছায়। সুস্থ একটি প্রাকৃতিক ভূদৃশ্য এই তিন প্রক্রিয়ার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করে। নগর সেই ভারসাম্যটাই ভেঙে দিয়েছে।
আমরা মাটির ওপর একের পর এক অভেদ্য স্তর বসিয়েছি। তৈরি করে চলেছি পিচের রাস্তা, কংক্রিটের ফুটপাত, টাইলসের কিংবা সিমেন্টের উঠান। ফলে আকাশের সঙ্গে মাটির যে স্বাভাবিক যোগাযোগ ছিল, সেটি বিচ্ছিন্ন হয়েছে। শহর যত বেশি অভেদ্য পৃষ্ঠে ঢেকে যায়, বৃষ্টির পানি তত কম মাটিতে ঢোকে এবং জলজট হয়ে সামান্য বৃষ্টিও নগরের জন্য বড় ভোগান্তির কারণ হয়ে ওঠে।
এটা শুধু ঢাকার সমস্যা নয়। বিশ্বজুড়েই দ্রুত নগরায়নের সঙ্গে প্রাকৃতিক ভূমি কমছে, বাড়ছে কংক্রিট ও অন্যান্য অভেদ্য পৃষ্ঠ। কিন্তু ঢাকার ক্ষেত্রে এর গতি ও অভিঘাত দুটোই ভয়াবহ। ১৯৮০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এই নগরীর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা বেড়েছে সাত গুণ, আর একই সময়ে হারিয়ে গেছে বিপুল পরিমাণ জলাভূমি ও জলাশয়।
২.
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, একটি ভারসাম্যপূর্ণ শহরে সবুজ ও জলাভূমির জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রাখা জরুরি। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) গবেষণাতেও মহানগর এলাকায় জলাশয়ের জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভূমি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বিআইপির হিসাব অনুযায়ী, ঢাকায় বর্তমানে জলাশয়ের পরিমাণ তিন শতাংশেরও কম। অথচ তিন দশক আগেও ঢাকার মোট আয়তনের ২০ শতাংশের বেশি এলাকায় জলাভূমি ছিল।
একসময় বৃষ্টি মাটিতে নামত। মাটি তাকে গ্রহণ করত। পানি ধীরে ধীরে নদী-খালে যেত। গাছের শিকড় পানি পেত। ভূগর্ভস্থ জলস্তর পূর্ণ হতো। নগর ও প্রকৃতির মধ্যে এই ছিল এক অলিখিত চুক্তি। মাটিকে ঢেকে দিয়ে আমরা সেই চুক্তি ছিঁড়ে ফেলেছি। বৃষ্টি আমাদের সেই বিচ্ছেদের কথা মনে করিয়ে দেয়।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে ঢাকা বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) প্রণয়নের সময় মূল ঢাকা শহরে জলাভূমি ছিল ৯ হাজার ৫৫৬ একর। ২০১৯ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৬ হাজার ৭৩ একরে। অর্থাৎ মাত্র নয় বছরে হারিয়ে গেছে প্রায় ৩৬ শতাংশ।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ’-এর তথ্য বলছে, ১৯৮০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ঢাকা মহানগরে জলাধারের ৬০ শতাংশ হারিয়ে গেছে। নগরের ৮০ শতাংশের বেশি জমি এখন কংক্রিটে মোড়া, আর সবুজ আচ্ছাদন টিকে আছে সাকুল্যে নয় শতাংশের কিছু বেশি এলাকায়।
সংখ্যাগুলো ভয়াবহ। কিন্তু সংখ্যার ভেতরের বিপদটা আরও ভয়াবহ। খাল-বিল-পুকুরকে আমরা প্রায়ই কেবল ‘পানি জমানোর জায়গা’ হিসেবে দেখি। অথচ জলাভূমি আসলে একটি জটিল বাস্তুতন্ত্র। মাটির অণুজীব, শিকড়ের জাল, জলজ উদ্ভিদ এবং জলধারণকারী মাটির স্তর মিলে একটি প্রাকৃতিক ব্যবস্থা তৈরি করে। এই ব্যবস্থা বৃষ্টির পানি শোষণ করে, ধীরে ধীরে তা ছেড়ে দেয়, দূষিত পদার্থের একটি অংশ ছেঁকে নেয় এবং ভূগর্ভস্থ জলস্তর পুনর্ভরণে ভূমিকা রাখে।
অর্থাৎ জলাভূমি শুধু পানি রাখে না। জলাভূমি শহরকে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ দেয়। খোলা জায়গা ও জলাভূমি তাই নগরের ‘অব্যবহৃত’ জায়গা নয়। এগুলো শহরের প্রাকৃতিক অবকাঠামো। কংক্রিটের রাস্তা, সেতু, ড্রেন কিংবা পাম্পিং স্টেশনের মতোই এগুলোরও একটি অবকাঠামোগত ভূমিকা আছে।
৩.
সংকটটা আসলে উন্নয়নের ধারণায়। বাংলাদেশে ‘উন্নয়ন’ বলতে আমরা প্রায়ই বুঝি আরেকটি রাস্তা, আরেকটি ভবন, আরেকটি আবাসন প্রকল্প। প্রতিটি নতুন হাউজিং প্রকল্প যেন একটি পুরোনো বিলের মৃত্যুসংবাদ। জমির প্রতিটি ইঞ্চিকে অর্থনৈতিক মূল্যে রূপান্তরের এক প্রবল তাড়না আমাদের নগরায়নকে পরিচালিত করছে। খাল-বিল-পুকুরকে দেখা হচ্ছে ‘অব্যবহৃত জমি’ হিসেবে। যেন পানি থাকা মানেই জমির অপচয়, আর সেখানে ভবন উঠলেই জমি তার প্রকৃত মূল্য পেল।
ফায়ার সার্ভিসের হিসাবে, ২০১৮ সালে ঢাকায় ১০০টি পুকুর ছিল। ২০২৩ সালে সেই সংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র ২৯টিতে। অর্থাৎ পাঁচ বছরে ৭১টি পুকুর হারিয়ে গেছে। সেই জায়গায় গড়ে উঠেছে নানা স্থাপনা।
অথচ নগর পরিকল্পনার আধুনিক ধারণা বলছে, একটি টেকসই শহরের ভিত্তি হলো নির্মিত পরিবেশ, সবুজ এবং পানির মধ্যে একটি সচেতন ভারসাম্য। এই তিনটির কোনো একটিকে অগ্রাহ্য করে গড়ে ওঠা শহর দীর্ঘমেয়াদে নিজের ভেতরেই নিজের বিপর্যয়ের বীজ তৈরি করে। টানা বৃষ্টিতে ঢাকার জলাবদ্ধতা সেই বিপর্যয়েরই দৃশ্যমান রূপ। যে খালটিতে পানি যাওয়ার কথা, সেটি দখল হয়ে গেছে। যে জলাভূমিতে পানি ছড়িয়ে পড়ার কথা, সেটি ভরাট হয়ে গেছে। যে মাটিতে পানি শোষিত হওয়ার কথা, সেটি কংক্রিটে ঢেকে গেছে।
আইন আছে, কিন্তু কার্যকর প্রয়োগ নেই। বাস্তবে সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগে জলাশয় ভরাট, দখল এবং ভূমির ব্যবহার পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে। বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (ড্যাপ) মানচিত্রে বন্যাপ্রবাহ এলাকা চিহ্নিত থাকার পরও সেসব এলাকায় নানা ধরনের স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এখানেই নগর পরিকল্পনা আর বাস্তবায়নের মধ্যে তৈরি হয়েছে গভীর বিচ্ছিন্নতা। কাগজে যা সংরক্ষিত, মাঠে তা বিক্রয়যোগ্য।
৪.
জলাশয়ের পাশাপাশি খোলা জায়গাও ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা মহানগরে মাটির দেখা পাওয়া এখন কঠিন। যে মাটিটুকু এখনও আছে, সেটুকুও কত দিন থাকবে, তা নিয়ে সংশয় আছে। অথচ সমাধান অসম্ভব নয়। ফুটপাতে পানি-শোষণক্ষম বা ভেদ্য টাইলস ব্যবহার করা যেতে পারে। নতুন ভবন নির্মাণে রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। ছাদ সবুজায়ন বাড়ানো যেতে পারে। খাল ও জলাশয়ের সীমানা নির্ধারণ করে তা কঠোরভাবে রক্ষা করা যেতে পারে। নতুন আবাসন প্রকল্প অনুমোদনের সময় মাটির স্বাভাবিক পানি শোষণক্ষমতা, জলাধার এবং সবুজ এলাকার জন্য বাধ্যতামূলক জায়গা নিশ্চিত করা যেতে পারে।
এসব কোনো অলীক ধারণা নয়। বিশ্বের বিভিন্ন শহর ইতোমধ্যে ‘স্পঞ্জ সিটি’ বা জলধারণক্ষম নগর পরিকল্পনার ধারণা নিয়ে কাজ করছে। জার্মানির বার্লিন কিংবা চীনের উহানের মতো শহরে ভেদ্য পৃষ্ঠ, সবুজ অবকাঠামো, জলধারণের স্থান এবং বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনার সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই: বৃষ্টির পানিকে যতটা সম্ভব শহরের ভেতরেই আটকে রাখা, শোষিত করা এবং ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক গতিতে ফিরিয়ে দেওয়া।
কারণ মাটিকে পুরোপুরি ঢেকে ফেললে শুধু ড্রেন বাড়িয়ে নগরকে বাঁচানো যায় না। আর ড্রেনের শেষ গন্তব্যও তো থাকতে হবে। ঢাকার খালগুলো সেই গন্তব্যেরই অংশ ছিল। ওয়াসার হিসাবে রাজধানীতে ২৬টি খালের কথা বলা হলেও বাস্তবে কার্যকর খালের সংখ্যা এক ডজনেরও কম বলে বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অনেক খাল এখন ড্রেন, নর্দমা কিংবা ডাস্টবিনের ভূমিকায় কোনোরকমে টিকে আছে।
বৃষ্টি প্রতিবছর নামবে, এটাই প্রকৃতির নিয়ম। আমাদের জন্য সেটি জরুরিও। সমস্যা হলো, বৃষ্টির পানি শোষণ কিংবা ধারণের জন্য আমরা আর মাটি রাখিনি। মাটিকে ঢেকে দিয়েছি, জলাভূমিকে ভরাট করেছি, খালকে সংকুচিত করেছি, খোলা জায়গাকে স্থাপনায় পরিণত করেছি।
একসময় বৃষ্টি মাটিতে নামত। মাটি তাকে গ্রহণ করত। পানি ধীরে ধীরে নদী-খালে যেত। গাছের শিকড় পানি পেত। ভূগর্ভস্থ জলস্তর পূর্ণ হতো। নগর ও প্রকৃতির মধ্যে এই ছিল এক অলিখিত চুক্তি। মাটিকে ঢেকে দিয়ে আমরা সেই চুক্তি ছিঁড়ে ফেলেছি। বৃষ্টি আমাদের সেই বিচ্ছেদের কথা মনে করিয়ে দেয়।
লেখক : সাংবাদিক।
এইচআর/জেআইএম