বিদ্যুতের খরচ কমাতে এখন অনেক বাড়িতেই সোলার প্যানেল বসানোর আগ্রহ বাড়ছে। অনেকের ধারণা, ছাদে সোলার প্যানেল বসিয়ে ফেললেই বিদ্যুতের বিল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি এতটা সহজ নয়। সোলার সিস্টেমের ক্ষমতা, বাড়ির দৈনিক বিদ্যুৎ ব্যবহার, সূর্যের আলো এবং ইনভার্টারের সক্ষমতা সবকিছুর উপর নির্ভর করে কতটা বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে এবং বিল কতটা কমবে।
তাই সোলার প্যানেল কেনার আগে শুধু ‘কত কিলোওয়াট’ এই একটি বিষয় দেখলে চলবে না। প্যানেলের ক্ষমতার সঙ্গে ইনভার্টারের সঠিক সমন্বয় করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সোলার প্যানেলের কিলোওয়াট বলতে কী বোঝায়?
সোলার সিস্টেমের কিলোওয়াট মূলত প্যানেলগুলোর সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বোঝায়। যেমন ১ কিলোওয়াট, ২ কিলোওয়াট, ৩ কিলোওয়াট বা ৫ কিলোওয়াটের সিস্টেমের উৎপাদন ক্ষমতা এক নয়। সাধারণভাবে ক্ষমতা যত বেশি হবে, উপযুক্ত পরিস্থিতিতে তত বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।
আরও পড়ুন
লোডশেডিংয়ে ভরসা সোলার প্যানেল, দাম কত-কোথায় পাবেন জানুন আদ্যোপান্ত
প্যানেলের কাজ হলো সূর্যের আলোকে ডিসি বিদ্যুতে রূপান্তর করা। তবে প্যানেলে লেখা ক্ষমতা অনুযায়ী প্রতিদিন একই পরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। সূর্যের আলো কতটা পাওয়া যাচ্ছে, আবহাওয়া কেমন, প্যানেলের অবস্থান ও ছায়া পড়ছে কি না এসব বিষয় উৎপাদনের উপর প্রভাব ফেলে।
ইনভার্টারের কাজ কী?
সোলার প্যানেল থেকে উৎপন্ন বিদ্যুৎ সরাসরি বাড়ির অধিকাংশ বৈদ্যুতিক যন্ত্রে ব্যবহার করা যায় না। এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ইনভার্টার। এটি প্যানেল বা ব্যাটারি থেকে পাওয়া ডিসি বিদ্যুৎকে বাড়ির ব্যবহারের উপযোগী এসি বিদ্যুতে রূপান্তর করে।
ইনভার্টারের ক্ষমতা মূলত নির্ধারণ করে একই সময়ে বাড়িতে কতটা বৈদ্যুতিক লোড চালানো যাবে। ফলে বাড়িতে যদি একসঙ্গে ফ্রিজ, টিভি, ফ্যান, লাইট, কম্পিউটার বা অন্যান্য যন্ত্র চালানোর প্রয়োজন হয়, তাহলে সেই মোট লোডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইনভার্টার বেছে নিতে হবে।
বাড়ির জন্য কত কিলোওয়াটের সোলার প্যানেল লাগবে?
এর কোনো একক উত্তর নেই। কারণ প্রতিটি বাড়ির বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরন আলাদা। কারো বাড়িতে শুধু কয়েকটি ফ্যান, লাইট, টিভি ও ফ্রিজ চলে। আবার কোথাও এসি, পানির পাম্প, গিজার, ওয়াশিং মেশিনসহ অনেক বেশি বিদ্যুৎ খরচের যন্ত্র থাকে।
তাই প্রথমে গত কয়েক মাসের বিদ্যুৎ বিল দেখে বাড়ির গড় মাসিক ব্যবহার কত ইউনিট, তা বের করা উচিত। এরপর দিনে আনুমানিক কত বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়, সেটি হিসাব করে সোলার সিস্টেমের আকার নির্ধারণ করা ভালো।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করা ছোট পরিবারের জন্য তুলনামূলক কম ক্ষমতার সিস্টেম যথেষ্ট হতে পারে। অন্যদিকে এসি বা অন্যান্য বেশি বিদ্যুৎ খরচের যন্ত্র নিয়মিত ব্যবহার করলে বড় ক্ষমতার সোলার সিস্টেমের প্রয়োজন হতে পারে।
ভবিষ্যতের ব্যবহারও মাথায় রাখুন
আজ বাড়িতে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে, ভবিষ্যতে তা একই থাকবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। সামনে নতুন এসি, ফ্রিজ, পানির পাম্প, ইভি চার্জার বা অন্য কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্র যোগ করার পরিকল্পনা থাকলে সিস্টেম বাছাইয়ের সময় সেটিও বিবেচনায় রাখা উচিত। শুধু বর্তমান ব্যবহারের হিসাব করে সিস্টেম বসালে ভবিষ্যতে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে গেলে সেটি পর্যাপ্ত নাও হতে পারে।
প্যানেল বেশি হলেই কি বিল শূন্য?
না। বেশি ক্ষমতার সোলার প্যানেল মানেই বিদ্যুতের বিল নিশ্চিতভাবে শূন্য হয়ে যাবে এমনটা বলা যায় না। কারণ মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বাড়ির মোট ব্যবহার একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এ ছাড়া সোলার সিস্টেমটি অন-গ্রিড, অফ-গ্রিড নাকি হাইব্রিড তার উপরও বিষয়টি নির্ভর করে। ব্যাটারি ব্যবহার করলে সঞ্চয়ের বিষয়টিও যুক্ত হয়। আবার প্যানেল পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেও সিস্টেমের অন্যান্য অংশের সক্ষমতা কম হলে পুরো সুবিধা পাওয়া সম্ভব নয়।
আরও পড়ুন
সোলার প্যানেল ব্যবহারে এসি-ফ্রিজ চালানো যায়?
সঠিক কম্বিনেশনই আসল
সোলার সিস্টেম বসানোর আগে তাই তিনটি বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত বাড়ির মোট বিদ্যুৎ চাহিদা, প্রয়োজনীয় সোলার প্যানেলের ক্ষমতা এবং উপযুক্ত ইনভার্টারের ক্ষমতা।
শুধু বেশি কিলোওয়াটের প্যানেল কিনে ফেললেই ভালো ফল পাওয়া যাবে না। বাড়ির ব্যবহার অনুযায়ী প্যানেল ও ইনভার্টারের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য থাকাটাই গুরুত্বপূর্ণ। সেই সঙ্গে ছাদের জায়গা, সূর্যের আলো, ব্যাটারির প্রয়োজন এবং ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ চাহিদা বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে সিস্টেম নির্বাচন করলে খরচ কমানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে ভালো সুবিধা পাওয়া সম্ভব।
কেএসকে