মাতৃগর্ভ থেকেই একটি নতুন জীবনের যুদ্ধ শুরু হয় ঢাকা শহরে। হাসপাতালে চিকিৎসকের সিরিয়াল, তারপর সি-সেকশনে ছুরি-কাঁচির নিচে আলোর মুখ দেখা। শিক্ষা-কর্মজীবনে চলে আরেক ধরনের সংগ্রাম। মাথা গোঁজার ঠাঁই হয় কারও স্থায়ী, কারও অস্থায়ী। মৃত্যুর পরও এ শহরে এক টুকরো মাটির জন্য তাকে ধরতে হয় সিরিয়াল, করতে হয় ভিন্ন ‘যুদ্ধ’।
মেগাসিটি রাজধানী ঢাকায় মানুষের শেষ আশ্রয়ের জায়গাটুকুও ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। প্রতিদিন এই শহরে যোগ হচ্ছে নতুন মুখ। বসবাসের জায়গার মতো মৃত্যুর পর দাফনের চাপও বাড়ছে। মানুষ বাড়লেও সরকারি কবরস্থানের জমি বাড়ছে না। ফলে নির্ধারিত মাপের কবর দেওয়া, কবরের মধ্যে প্রয়োজনীয় ফাঁকা জায়গা রাখা এবং নির্দিষ্ট সময় পর পুনর্ব্যবহার- সবকিছুই ক্রমে কঠিন হয়ে উঠছে।
বিপুল সংখ্যক মানুষের শহরে সরকারি কবরস্থান মাত্র ৯টি
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, দুই সিটি করপোরেশন মিলিয়ে সরকারি কবরস্থান আছে মাত্র ৯টি। ডিএনসিসির ছয়টি ও ডিএসসিসির তিনটি।
এসব কবরস্থানের মোট জমি প্রায় ২৫১ একর। দুই সিটির মোট ৩০৫ দশমিক ৪৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের মাত্র ০ দশমিক ৩৩ শতাংশ কবরস্থানের জন্য বরাদ্দ।
বনানী কবরস্থান/ছবি: বিপ্লব দিক্ষীৎ
ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ-২০২৬ অনুযায়ী, জনসংখ্যার দিক থেকে ঢাকা বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম শহর। জনসংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৫৪ লাখ। আর জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টস-২০২৫’-এর মহানগরভিত্তিক হিসাবে ঢাকা বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাধিক জনবহুল মেগাসিটি, জনসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ। মূলত ভৌগোলিক সংজ্ঞার কারণে এ দুই উৎসের হিসাবের পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।
যদিও ৬ষ্ঠ জনশুমারি ও গৃহগণনা, ২০২২ অনুযায়ী, এক কোটির কিছু বেশি। আর ঢাকা শহরের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯৫ শতাংশ মুসলিম। বাকিরা অন্য ধর্মের।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সমাজকল্যাণ ও বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোবাশ্বের হাসান জাগো নিউজকে জানান, উত্তরের চেয়ে দক্ষিণের আয়তন ও জনসংখ্যা বেশিই হবে। কিন্তু দাফনের জন্য কবরস্থানের সংখ্যা ও আয়তন কম।
আরও পড়ুন
বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ডিএনসিসির কবরস্থানে জায়গা সংরক্ষণ
তিনি জানান, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অধীনে ছয়টি সরকারি কবরস্থানের জমির পরিমাণ প্রায় ১৯২ একর। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অধীনে তিনটি প্রধান কবরস্থানের জমি প্রায় ৫৯ একর। দুই সিটি মিলিয়ে সরকারি কবরস্থানের জমি প্রায় ২৫১ একর।
দুই সিটির মোট আয়তন প্রায় ৩০৫ দশমিক ৪৬ বর্গকিলোমিটার। বিবিএসের ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, এ এলাকায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে বসবাস করেন প্রায় ৩৩ হাজার ৮০৯ জন
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ দুই সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, দুই সিটির মোট আয়তন প্রায় ৩০৫ দশমিক ৪৬ বর্গকিলোমিটার। বিবিএসের ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, এ এলাকায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে বসবাস করেন প্রায় ৩৩ হাজার ৮০৯ জন।
কবরের নীতিমালা
ডিএসসিসির ‘কবরস্থান পরিচালনা নীতিমালা-২০২০’-এর ২.৯ ধারায় মৃত ব্যক্তির বয়স ও শারীরিক গঠন অনুযায়ী কবরের আকার নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রাপ্তবয়স্কের বড় কবরের মাপ ৮×৪ ফুট বা ৩২ বর্গফুট, মাঝারি কবর ৫×৩ ফুট বা ১৫ বর্গফুট এবং শিশুর কবর ৩ ফুট ৬ ইঞ্চি×২ ফুট বা ৭ বর্গফুট। নীতিমালায় প্রতিটি কবরের নিজস্ব সীমানা রাখার কথাও বলা হয়েছে।
আজিমপুর কবরস্থান/ছবি: বিপ্লব দিক্ষীৎ
ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ ও ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টসের হিসাবের অনুযায়ী জনসংখ্যা ২ কোটি ৫৪ লাখ ও ৩ কোটি ৬৬ লাখ। এর মধ্যে ৫ শতাংশ ভিন্ন ধর্মের। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে কবর দিতে বাংলাদেশের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ন্যূনতম জমি লাগে ১৮ বর্গফুট। আমরা যদি গড়ে মুসলিম জনসংখ্যা তিন কোটি ধরি তাহলে ৩ কোটি×১৮= ৫৪ কোটি বর্গফুট জমি। অর্থাৎ তিন কোটি মানুষকে একবার করে কবর দিতে প্রয়োজন হবে প্রায় ১২ হাজার ৩৯৭ একর জমি।
তাহলে ২৫১ একরের ১০ শতাংশ বাদ দিলে থাকে ৯৮ লাখ ৪০ হাজার ২০৪ বর্গফুট। প্রতিটি কবর গড়ে ১৮ বর্গফুট হলে এই জমিতে ৫ লাখ ৪৬ হাজার ৬৭৮টি কবর দেওয়া সম্ভব। তাহলে তিন কোটি মানুষকে পর্যায়ক্রমে এই জায়গায় সমাহিত করতে হলে এক কবর প্রায় ৫৫ বার পুনর্ব্যবহার করতে হবে (এই হিসাব সংরক্ষিত কবরের জায়গাসহ)। সংরক্ষিত কবর টাকার বিনিময়ে নির্দিষ্ট বছরের জন্য। এছাড়া কিছু কবর সরকারের বিশেষ বিবেচনায় স্থায়ী। ওপরের এই হিসাব সম্ভাব্য, চূড়ান্ত নয়। সাধারণ তথ্য বিশ্লেষণ করে পাওয়া।
গ্রেভ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ও কবরস্থান কর্তৃপক্ষের রেকর্ড অনুযায়ী, রাজধানীর ৯টি কবরস্থানে প্রতিদিন গড়ে ৯০ থেকে ১১০টি মরদেহ দাফন করা হয়। এর মধ্যে আজিমপুরেই প্রতিদিন গড়ে দাফন হয় প্রায় ৩০টি মরদেহ। কোনো কোনো দিন এ সংখ্যা ৪০ থেকে ৪৫টিতেও পৌঁছে বলে জানা যায়
ডিএনসিসি ও ডিএসসিসির সংশ্লিষ্ট নথি, গ্রেভ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ও কবরস্থান কর্তৃপক্ষের রেকর্ড অনুযায়ী, রাজধানীর ৯টি কবরস্থানে প্রতিদিন গড়ে ৯০ থেকে ১১০টি মরদেহ দাফন করা হয়। এর মধ্যে আজিমপুরেই প্রতিদিন গড়ে দাফন হয় প্রায় ৩০টি মরদেহ। কোনো কোনো দিন এ সংখ্যা ৪০ থেকে ৪৫টিতেও পৌঁছে বলে জানা যায়।
সূত্র জানায়, ডিএনসিসির ছয় কবরস্থানের মোট জমি প্রায় ১৮৭ দশমিক ২১ একর। এর মধ্যে রায়েরবাজার বধ্যভূমি কবরস্থান ৯৬ দশমিক ২৩ একর, মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান ৫২ একর, উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টর ২৫ দশমিক ৫০ একর, বনানী ১০ একর, উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টর ১ দশমিক ৭৬ একর এবং উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টর ১ দশমিক ৭২ একর।
মুরাদপুর কবরস্থান/ছবি: বিপ্লব দিক্ষীৎ
ডিএসসিসির আজিমপুর, জুরাইন ও খিলগাঁওসহ কবরস্থানগুলোর মোট জমি প্রায় ৫৯ দশমিক ৮৮ একর। আজিমপুরের নতুন ও পুরাতন অংশ মিলিয়ে প্রায় ৪২ একর, জুরাইন ১২ দশমিক ২০ একর এবং খিলগাঁওসহ অন্য অংশে প্রায় ৫ দশমিক ৬৮ একর।
ডিজিটাল গ্রেভইয়ার্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের আওতায় জিপিএস ও ড্রোন জরিপে কবরস্থানগুলোর প্রকৃত সীমানা ও জমি পরিমাপ করা হয়েছে। ফলে কাগজপত্রের হিসাবের সঙ্গে কিছুটা পার্থক্য পাওয়া গেছে। আবার মোট জমির পুরোটাই দাফনযোগ্য নয়, অভ্যন্তরীণ রাস্তা, সীমানাপ্রাচীর, নর্দমা ও প্রশাসনিক স্থাপনার জায়গাও রয়েছে।
ছোট হচ্ছে কবরের আকার
রাজধানীর রায়েরবাজারের ষাটোর্ধ্ব মিজানুর রহমান প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের পর আজিমপুর পুরাতন কবরস্থানে যান। এক বছর আগে সেখানে দাফন করা হয়েছে তার স্ত্রীকে। নিয়মিত যাতায়াত করতে গিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে তার চোখে পড়েছে যে নতুন খোঁড়া কবরগুলো আগের তুলনায় ছোট এবং পাশাপাশি কবরের মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গাও কম।
আরও পড়ুন
ঢাকায় ২৫ বছর কবর সংরক্ষণ ফি দেড় কোটি টাকা!
আলাপকালে তিনি বলেন, ‘অনেক বছর ধরে এখানে আসি। আগে কবরগুলো এত ছোট ছিল না। কয়েক মাস ধরে দেখছি কবরের আকার ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে।’
মিজানুর রহমানের এই পর্যবেক্ষণ যাচাই করতে জাগো নিউজ একাধিকবার সরেজমিনে আজিমপুর কবরস্থান পরিদর্শন ছাড়াও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কবরস্থান পরিচালনা নীতিমালা, সংশ্লিষ্ট নথি ও গ্রেভ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখেছে। কবরস্থানসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নগর পরিকল্পনাবিদদের সঙ্গে কথা বলেছেন।
সরেজমিনে আজিমপুরে দেখা যায়, পাশাপাশি থাকা অনেক কবরের মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গা অত্যন্ত কম। কোথাও কোথাও কবরের সীমানা প্রায় একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে।
কবরস্থান পরিচালনার নীতিমালা অনুযায়ী সাধারণ ও বিশেষ- উভয় ধরনের কবরের জন্য চার ফুট বাই আট ফুট জায়গা নির্ধারিত রয়েছে। তবে সাধারণ কবরের ক্ষেত্রে মরদেহের সংখ্যা বেশি হওয়ায় বাস্তবে এ মাপ ঠিক রাখা সম্ভব হয় না।-আজিমপুর কবরস্থানের মোহরার মাওলানা হাফিজুর রহমান
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আজিমপুর কবরস্থানের মোহরার মাওলানা হাফিজুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘সংরক্ষিত কবরের ক্ষেত্রে নীতিমালা অনুযায়ী দাফন করা সম্ভব হলেও সাধারণ কবরের ক্ষেত্রে সব সময় নির্ধারিত মাপ বজায় রাখা সম্ভব হয় না। প্রতিবছর দাফনের সংখ্যা বাড়লেও কবরস্থানের আয়তন বাড়ছে না।’
তিনি বলেন, ‘কবরস্থান পরিচালনার নীতিমালা অনুযায়ী সাধারণ ও বিশেষ- উভয় ধরনের কবরের জন্য চার ফুট বাই আট ফুট জায়গা নির্ধারিত রয়েছে। তবে সাধারণ কবরের ক্ষেত্রে মরদেহের সংখ্যা বেশি হওয়ায় বাস্তবে এ মাপ ঠিক রাখা সম্ভব হয় না।’
মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান/ছবি: বিপ্লব দিক্ষীৎ
মোহরারের ভাষ্য, আজিমপুর কবরস্থানে প্রতিদিন প্রায় ৩০ থেকে ৩৫টি মরদেহ আসে। ফলে নির্ধারিত মাপ ও কবরের মধ্যবর্তী জায়গা রাখলে প্রয়োজনীয় স্থান সংকুলান করা কঠিন হয়ে পড়ে।বিশেষ করে সাধারণ কবরের ক্ষেত্রে জায়গার সংকটের কারণে চার ফুট প্রস্থ সব সময় রাখা যায় না। একই জায়গার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতেই বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় কবরের জায়গা নির্ধারণ করতে হয়।
শরিয়াহ অনুযায়ী কবরের গভীরতা ও বাস্তবতা
আজিমপুরে পানি না ওঠায় কোমর সমান গভীরতায় কবর খোঁড়া হয় জানিয়ে মোহরার হাফিজুর রহমান বলেন, ‘আজিমপুর পুরাতন কবরস্থানে কবর খোঁড়ার ক্ষেত্রে মরদেহের কোমর সমান গভীরতাকে অনুসরণ করা হয়। কবরস্থানের মাটি নরম হওয়ায় বেশি গভীর করে কবর খুঁড়লে আশপাশের কবরের মাটি ধসে পড়ার আশঙ্কা থাকে।’ তিনি বলেন, ‘ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী মৃত ব্যক্তিকে দাফনের ক্ষেত্রে বুক, কোমর কিংবা হাঁটু সমান গভীরতা গ্রহণযোগ্য। কোথাও পানি উঠে যাওয়ায় বেশি গভীর পর্যন্ত খোঁড়া সম্ভব না হলে হাঁটু সমান গভীরতাতেও দাফনের ব্যবস্থা করা যায়।’
আরও পড়ুন
রাবির কবরস্থান যেন ‘মাদকসেবীদের আখড়া’
মোহরারের দাবি, চার থেকে পাঁচ ফুট গভীর করে কবর খুঁড়তে গেলে আশপাশের কবরের মাটি ভেঙে ওই কবরে চলে আসার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে বর্তমানে সাধারণত মৃত ব্যক্তির কোমর সমান বা তার কিছু বেশি গভীরতায় কবর খোঁড়া হয়।
সাত বছরে ৫৭ হাজার ১৪০ সাধারণ দাফন
হাফিজুর রহমানের দেওয়া বছরভিত্তিক হিসাবে আজিমপুর পুরাতন কবরস্থানে ২০১৯-২০ অর্থবছরে সাধারণ কবর দেওয়া হয় ৯ হাজার ৫৬৫টি, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৮ হাজার ২৪৫, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৭ হাজার ৬৬২, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৭ হাজার ৮৮৮, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৮ হাজার ৪৩০, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৮ হাজার ২৫৬ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৯ হাজার ৯৪টি সাধারণ কবর দেওয়া হয়েছে।
সাত অর্থবছরে শুধু আজিমপুর পুরাতন কবরস্থানেই সাধারণ কবর হয়েছে ৫৭ হাজার ১৪০টি। গড়ে প্রতি অর্থবছরে আট হাজারের বেশি। আর চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ১১ আগস্ট দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত মাত্র ৪২ দিনে দাফন হয়েছে ৬৯৪ জনের
অর্থাৎ, সাত অর্থবছরে শুধু আজিমপুর পুরাতন কবরস্থানেই সাধারণ কবর হয়েছে ৫৭ হাজার ১৪০টি। গড়ে প্রতি অর্থবছরে আট হাজারের বেশি। আর চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ১১ আগস্ট দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত মাত্র ৪২ দিনে দাফন হয়েছে ৬৯৪ জনের।
দাফনের চাপ বাড়ছেই
কবরস্থানের ওপর চাপের একটি ধারণা পাওয়া যায় ডিএনসিসির সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা গৌতম কুমার বিশ্বাসের দেওয়া দাফনের হিসাব থেকেও।
বনানী করবস্থান/ছবি: বিপ্লব দিক্ষীৎ
তিনি জানান, ডিএনসিসির কবরস্থানগুলোতে বছরে প্রায় ছয় থেকে সাড়ে ছয় হাজার দাফন হয়। মাসিক হিসাবে এ সংখ্যা ৫শ থেকে ৫শ ৫০। মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান ও রায়েরবাজারে মাসে প্রায় ৩৮০ থেকে ৪শটি দাফন হয়।
নতুন ওয়ার্ড, নতুন কবরস্থান নেই
২০১৭ সালে ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সঙ্গে নতুন বেশ কয়েকটি ওয়ার্ড যুক্ত হয়। সরকারি গেজেট অনুযায়ী, ডিএনসিসির নতুন ওয়ার্ড অন্তর্ভুক্তির প্রজ্ঞাপন জারি হয় ১ আগস্ট ২০১৭ তারিখে। ফলে দুই সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক পরিধি ও জনসংখ্যা- দুটিই বেড়ে যায়। কিন্তু নতুন এসব ওয়ার্ডে এখন পর্যন্ত কোনো নতুন সরকারি কবরস্থান নির্মাণ করা হয়নি।
অর্থাৎ নগর প্রশাসনের আওতাধীন এলাকা বেড়েছে, মানুষের বসতি বেড়েছে, মৃত্যুর পর দাফনের প্রয়োজনও বেড়েছে- কিন্তু সেই বাড়তি চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কবরস্থানের অবকাঠামো বাড়েনি। এখানেই পরিকল্পনার প্রশ্নটি সামনে আসে।
আরও পড়ুন
নতুন রূপে আজিমপুর কবরস্থান
নতুন ওয়ার্ড যুক্ত হওয়ার বিষয়টি ২০১৭ সালেই জানা ছিল। এসব এলাকায় জনসংখ্যা কত, ভবিষ্যতে কত বাড়তে পারে এবং নাগরিক সেবার কী প্রয়োজন হবে তারও পূর্বানুমান করা সম্ভব ছিল। তাহলে নতুন কবরস্থানের জন্য জমি চিহ্নিত বা সংরক্ষণ করা হলো না কেন?
সরকারের অবস্থান কী?
নতুন কবরস্থান নির্মাণ ও জমি ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারের ভূমিকা জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম-সচিব মো. রবিউল ইসলাম (সিটি করপোরেশন-১) জাগো নিউজকে বলেন, ‘ঢাকার কবরস্থানগুলো সিটি করপোরেশনের অধীনে। উত্তর ও দক্ষিণ- দুই সিটি করপোরেশনেরই এ বিষয়ে নিজস্ব দায়িত্ব রয়েছে।’
সরকার কোনো জমি কেনার অনুমতি দেয় না। সরকারের আইন রয়েছে, অধিগ্রহণের বিধান রয়েছে। প্রয়োজন হলে সরকার জেলা প্রশাসকের (ডিসি) মাধ্যমে জমি অধিগ্রহণ করবে। অধিগ্রহণ ছাড়া ওই প্রস্তাবটি সঠিক ছিল না। প্রস্তাবটি যথাযথভাবে এলে মন্ত্রণালয় অবশ্যই অনুমোদন করবে।-স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম-সচিব মো. রবিউল ইসলাম (সিটি করপোরেশন-১)
নতুন কবরস্থানের জন্য জমি কেনার একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল- এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রস্তাবটি সঠিক ছিল না।’
রবিউল ইসলাম বলেন, ‘মূলত জমি কেনার একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু প্রস্তাবটি সঠিক হয়নি। সরকার কোনো জমি কেনার অনুমতি দেয় না। সরকারের আইন রয়েছে, অধিগ্রহণের বিধান রয়েছে। প্রয়োজন হলে সরকার জেলা প্রশাসকের (ডিসি) মাধ্যমে জমি অধিগ্রহণ করবে। অধিগ্রহণ ছাড়া ওই প্রস্তাবটি সঠিক ছিল না। প্রস্তাবটি যথাযথভাবে এলে মন্ত্রণালয় অবশ্যই অনুমোদন করবে।’
আজিমপুর করবস্থান/ছবি: বিপ্লব দিক্ষীৎ
অর্থাৎ নতুন কবরস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় জমি চিহ্নিত করা, পরিকল্পনা তৈরি এবং যথাযথ প্রস্তাব দেওয়ার মূল দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। এরপর আইন অনুযায়ী জমি অধিগ্রহণ ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া সামনে আসবে।
পরিকল্পনার ঘাটতিই কি সংকটকে গভীর করেছে?
ঢাকার জনসংখ্যা বৃদ্ধি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। বহু বছর ধরেই নগর সম্প্রসারণ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রবণতা দৃশ্যমান। একই সঙ্গে মৃত্যুর পর দাফনের প্রয়োজনও যে বাড়বে, সেটিও অনুমেয়।২০১৭ সালে দুই সিটি করপোরেশনের সঙ্গে নতুন ওয়ার্ড যুক্ত হওয়ার পরও সেখানে নতুন কবরস্থান না হওয়া এই প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
জায়গা সংকটের কারণে একই কবর নির্দিষ্ট সময় পর পুনর্ব্যবহার করা হচ্ছে। এ নিয়ে বিস্তারিত থাকবে পরের পর্বে।
যা আছে ড্যাপে
বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ড্যাপে রাজউক কবরস্থানের জন্য জমি রেখেছে ৫৬ দশমিক ৬১ একর। যদিও ঢাকার নগর পরিকল্পনায় কবরস্থানের জন্য জমি নির্ধারণ করা হলেও জনসংখ্যা ও নগরায়ণের তুলনায় এর পরিমাণ খুবই সীমিত। এর মধ্যে ঢাকা সিটি এলাকায় ৮৮ শতাংশ জমি।
আরও পড়ুন
কবরস্থান আর মসজিদের নান্দনিক মেলবন্ধন
পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পেও কবরস্থানের জন্য প্রায় ১৬ একর জমি রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সেখানে ১০ হাজার ৭৩৬টি কবরের ব্যবস্থা রাখার কথা বলা আছে। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আলাদা ১৫টি কবরের ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে। তবে বাস্তবে কতটা পাওয়া যাবে সেটার জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে।
পরিকল্পনাবিদের সতর্কবার্তা
ঢাকার কবর সংকট এখন শুধু সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক সমস্যা নয়, এটি নগর পরিকল্পনারও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আবাসন প্রকল্প অনুমোদনের সময় পার্ক, খেলার মাঠ ও অন্য কমিউনিটি সুবিধার মতো কবরস্থানের জন্যও নির্দিষ্ট জমি সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করার দরকার।-বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ও পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক মো. মুসলেহ উদ্দীন হাসান
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ও পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক মো. মুসলেহ উদ্দীন হাসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘ঢাকার কবর সংকট এখন শুধু সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক সমস্যা নয়, এটি নগর পরিকল্পনারও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আবাসন প্রকল্প অনুমোদনের সময় পার্ক, খেলার মাঠ ও অন্য কমিউনিটি সুবিধার মতো কবরস্থানের জন্যও নির্দিষ্ট জমি সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করার দরকার।’
রাজধানীর ভেতরে পর্যাপ্ত জমি না থাকলে নতুন আবাসন প্রকল্প ও শহরতলিতে পরিকল্পিত কবরস্থান গড়ে তোলার কথাও বলেন এই নগর পরিকল্পনাবিদ।
তার মতে, ‘স্থান সংকটের বাস্তবতায় নির্দিষ্ট সময় পর কবর পুনর্ব্যবহার একটি বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা হতে পারে। তবে তা সুশৃঙ্খলভাবে ও ধর্মীয় বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে করতে হবে।’
তাহলে আগামী ১০, ২০ কিংবা ৩০ বছর পর ঢাকার মানুষের শেষ ঠিকানা কোথায় হবে? নতুন সরকারি কবরস্থান নির্মাণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কী? বিদ্যমান কবরস্থানগুলোর ধারণক্ষমতা আর কত দিন? সংরক্ষিত ও সাধারণ কবরের মধ্যে জমির ভারসাম্য কীভাবে হবে? আর ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা কি শুধু কবরের ঠিকানা সংরক্ষণ করবে, নাকি শেষ আশ্রয়ের সংকট সমাধানের পথও দেখাবে? এসব বিষয়ে বিস্তারিত থাকবে পরবর্তী পর্বগুলোতে।
এমইউ/এএসএ