
বাংলাদেশের পণ্য আমদানির চিত্রে বড় পরিবর্তন এনেছে জ্বালানি। দীর্ঘদিন আমদানি ব্যয়ে প্রথম অবস্থানে ছিল বস্ত্রশিল্পের কাঁচামাল তুলা। কিন্তু ২০২৫–২৬ অর্থবছরে তুলাকে পেছনে ফেলে প্রথমবারের মতো দেশের আমদানি পণ্যের শীর্ষে উঠে এসেছে ডিজেল। শুধু তা-ই নয়, গত অর্থবছরে এক বিলিয়ন বা ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি ব্যয়ে আমদানি হওয়া ১১ পণ্যের মধ্যে ৫টিই জ্বালানি খাতের।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও সংস্থাটির মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন কার্যালয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদায়ী অর্থবছরে দেশের ৪৬টি কাস্টমস স্টেশন দিয়ে আমদানি হওয়া পণ্যের মোট ঘোষিত মূল্য ছিল ৭ হাজার ৩১২ কোটি বা ৭৩ দশমিক ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ১১টি পণ্যের প্রতিটির আমদানি মূল্য এক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এই ১১ পণ্য আমদানিতে সব মিলিয়ে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২১ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার। কাস্টমস–প্রক্রিয়া শেষে খালাস হওয়া পণ্যের এনবিআরের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই হিসাব করা হয়েছে।
আমদানির তালিকা থেকে স্থানীয় আমদানি বাদ দিয়ে প্রকৃত আমদানির হিসাব ধরা হয়েছে। আর আমদানি মূল্য ধরা হয়েছে আমদানিকারকের ঘোষিত মূল্যের ভিত্তিতে। ফলে এই হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ পরিশোধ বা ঋণপত্রভিত্তিক আমদানি পরিসংখ্যানের সঙ্গে সরাসরি তুলনাযোগ্য নয়।
তুলার বদলে শীর্ষে ডিজেল
আমদানি ব্যয়ের দিক থেকে দীর্ঘদিন একক পণ্য হিসেবে প্রথম অবস্থানে ছিল বস্ত্রশিল্পের প্রধান কাঁচামাল তুলা। সর্বশেষ ২০২৪–২৫ অর্থবছরেও তুলা ছিল ১ নম্বরে। এবার সেই জায়গা নিয়েছে ডিজেল।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রায় ৩৩১ কোটি বা ৩ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলারের ডিজেল আমদানি হয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা তুলার আমদানি মূল্য ছিল প্রায় ৩০৭ কোটি বা ৩ দশমিক শূন্য ৭ বিলিয়ন ডলার; অর্থাৎ তুলার তুলনায় ডিজেল আমদানিতে প্রায় ২৪ কোটি ডলার বেশি ব্যয় হয়েছে।
আগের অর্থবছরে আমদানি ব্যয়ে ডিজেল ছিল চতুর্থ অবস্থানে। এবার ডিজেলের আমদানি ব্যয়ের পাশাপাশি আমদানির পরিমাণও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১০ লাখ টন বেশি ডিজেল আমদানি হয়েছে বিদায়ী অর্থবছরে, যার পরিমাণ ৩৮ লাখ ৮০ হাজার টন।
ডিজেলের বিপরীতে তুলার আমদানি ব্যয় কমেছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তুলা আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৩৪৫ কোটি ডলার। বিদায়ী অর্থবছরে তা কমে ৩০৭ কোটি ডলারে নেমেছে। এক বছরে তুলা আমদানিতে খরচ কমেছে প্রায় ১১ শতাংশ।
তুলার বদলে আমদানি পণ্যে ডিজেল প্রথম হওয়ার বড় কারণ মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের প্রভাবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়। ইরানও পাল্টাজবাব দেয়। তার জেরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানিতেও।
৫ জ্বালানি পণ্যেই ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি
বিলিয়ন ডলারের ১১ আমদানি পণ্যের তালিকায় সবচেয়ে বড় উপস্থিতি জ্বালানির। ডিজেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), কয়লা, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল—এই পাঁচ পণ্য আমদানিতে বিদায়ী অর্থবছরে খরচ হয়েছে মোট ১০ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ডিজেলের পর এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ২ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার। কয়লায় ১ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন, এলপিজিতে ১ দশমিক ২০ বিলিয়ন এবং অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বা ক্রুড অয়েল আমদানিতে খরচ হয়েছে ১ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার; অর্থাৎ দেশের মোট ৭৩ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলারের ঘোষিত আমদানি মূল্যের প্রায় ১৪ শতাংশই ব্যয় হয়েছে এই ৫ জ্বালানি পণ্য আমদানিতে। জ্বালানি পণ্যের আমদানি মূল্য বেশি হওয়ার কারণ, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতে বিশ্বজুড়ে এ ধরনের পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি।
শিল্পের কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্যেও বড় ব্যয়
জ্বালানির পাশাপাশি শিল্পের কাঁচামাল ও দেশে প্রক্রিয়াজাত হওয়া ভোগ্যপণ্যও বিলিয়ন ডলারের আমদানি পণ্যের তালিকায় বড় জায়গা দখল করেছে। তুলার পর ইস্পাতশিল্পের কাঁচামাল স্ক্র্যাপ বা পুরোনো লোহার টুকরা আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ২ দশমিক শূন্য ৮ বিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া গম আমদানিতে খরচ হয়েছে ২ দশমিক শূন্য ৫ বিলিয়ন ডলার। আর পাম তেল আমদানিতে খরচ হয়েছে ১ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন এবং সয়াবিনবীজে ১ দশমিক শূন্য ৭ বিলিয়ন ডলার।
তুলা, স্ক্র্যাপ, গম, পাম তেল ও সয়াবিনবীজ—এই পাঁচ পণ্য আমদানিতে সব মিলিয়ে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার; অর্থাৎ শিল্পের কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্যের উল্লিখিত ৫ ধরনের পণ্যের তুলনায় ৫ ধরনের জ্বালানি পণ্য আমদানিতে প্রায় ২৭ কোটি ডলার বেশি খরচ হয়েছে।
তুলা মূলত রপ্তানিমুখী বস্ত্র ও তৈরি পোশাকশিল্পের কাঁচামাল। স্ক্র্যাপ ব্যবহৃত হয় ইস্পাতশিল্পে। সয়াবিনবীজ মাড়াই করে ভোজ্যতেলের পাশাপাশি প্রাণিখাদ্যের কাঁচামাল সয়াবিন মিল উৎপাদিত হয়। অন্যদিকে গম ও পাম তেল দেশে প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করা হয়।
বিলিয়ন ডলারের তালিকায় একমাত্র সার হলো ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট বা ডিএপি। বিদায়ী অর্থবছরে এই সার আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার।
পাঁচ বছরে বদলেছে তালিকা
পাঁচ বছরের ব্যবধানে বিলিয়ন ডলারের আমদানি পণ্যের সংখ্যা খুব বেশি না বাড়লেও তালিকার ধরন বদলে গেছে। ২০২০–২১ অর্থবছরে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয়ে আমদানি হওয়া পণ্য ছিল ১০টি। এসব পণ্য আমদানিতে তখন ব্যয় হয়েছিল মোট ১৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। ওই তালিকায় শিল্পের কাঁচামালের প্রাধান্যই ছিল বেশি।
পাঁচ বছর পর বিলিয়ন ডলারের পণ্যের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১১। একই সঙ্গে এসব পণ্যের সম্মিলিত আমদানি ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২১ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারে; অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৫ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩৭ শতাংশ। তালিকার পণ্যেও পরিবর্তন এসেছে। ২০২০–২১ অর্থবছরের তালিকায় থাকা পুরোনো জাহাজ, সিমেন্টের কাঁচামাল ক্লিংকার ও ফার্নেস অয়েল এখন আর বিলিয়ন ডলারের তালিকায় নেই। তার বিপরীতে নতুন করে তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে কয়লা, ডিএপি সার, এলপিজি ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল। পাঁচ বছর আগে যে তালিকায় শিল্পের কাঁচামালের প্রাধান্য ছিল, এখন সেখানে ৫টি জ্বালানি পণ্যেই ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় হচ্ছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে দেশেও আমদানি ব্যয়ের তালিকায় জ্বালানি পণ্যের প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে। জ্বালানি আমদানিতে খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় তাতে আমদানি ব্যয়ের ওপরও চাপ বাড়ছে। তবে আমদানি প্রতিস্থাপক ও কাঁচামাল আমদানিতে খরচ বাড়লেও তা শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে ভূমিকা রাখবে। তাতে অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হবে।