বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম, নির্যাতন ও খুনের অভিযোগে করা পৃথক তিনটি মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে। এসব মামলায় সাক্ষীদের জবানবন্দিতে গুম করে গোপন বন্দিশালায় আটকে রেখে নির্যাতন এবং তুলে নেওয়ার পর গুম করে নিখোঁজ করে দেওয়ার মতো রোমহর্ষক বর্ণনা উঠে এসেছে।
যদিও গুমের শিকার পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে এ ধরনের মামলার বিচার ও তদন্তে ধীরগতির অভিযোগ তোলা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিশেষ কিছু অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। তারা রাজনৈতিক বিবেচনা ছাড়াই গুমের মামলাগুলোতে সমান সুযোগ চান।
এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ৩০ আগস্ট পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। ২০১০ সালের ৩০ আগস্টকে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে জাতিসংঘ। এর পর ২০১১ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে।
আরও পড়ুন
ইলিয়াস আলী অপহরণে জিয়াউল আহসান জড়িত: চিফ প্রসিকিউটর
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী তথা প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে গুমের ঘটনায় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় তিন শতাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে যাচাই-বাছাই করে ২৫১টি ঘটনা একসঙ্গে করে একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হতে পারে। তবে ২৫১ জন এখনো জীবিত নাকি মৃত, সেটিও নিশ্চিত করতে পারেনি প্রসিকিউশন।
ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা অভিযোগগুলোর মধ্যে ‘মায়ের ডাক’-এর পক্ষ থেকে ১৫০ জনের গুমের অভিযোগ রয়েছে। গুম পরিবারের ৬০টি অভিযোগ রয়েছে। বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীসহ বিএনপির পক্ষ থেকে এবং বিভিন্ন ব্যক্তি, সংগঠন ও পরিবারের পক্ষ থেকে ব্যক্তিগতভাবে—সব মিলিয়ে তিন শতাধিক অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
যদিও প্রসিকিউশন কার্যালয় জানিয়েছে, ২৫১ ব্যক্তির গুমের ঘটনা একসঙ্গে বিচারের আওতায় আনার চেষ্টা করা হলেও প্রত্যেকের ঘটনা আলাদা কাউন্ট ও অভিযোগ হিসেবে থাকবে। যার বিরুদ্ধে যে ধরনের প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেই অনুযায়ী আসামিদের পরিচয় ও অভিযোগ নির্ধারণ করা হবে।
আরও পড়ুন
সালাহউদ্দিন আহমদ-ইলিয়াস আলী-চৌধুরী আলমসহ কয়েকশ গুমের তদন্ত জোরদার
জানা গেছে, গুমের অভিযোগ তদন্তে এরই মধ্যে ব্যক্তিকে কোথা থেকে, কবে এবং কীভাবে তুলে নেওয়া হয়েছিল, তার তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। গুমের শিকার পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। একাধিকবার গণশুনানি করা হয়েছে। অনেকের বক্তব্য রেকর্ড করা হয়েছে। গুমের বিভিন্ন ঘটনায় আলামত ও সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে।
পৃথক ঘটনা একত্রে বিচার
রাষ্ট্রপক্ষের মতে, তিন শতাধিক অভিযোগের পরিবর্তে একসঙ্গে বিচারের আওতায় আনতে পারলে সময় বাঁচবে এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে একই ধরনের ঘটনা একই প্যাটার্নে ব্যাপকভাবে সংঘটিত হয়েছে—এ বিষয়টিও আদালতের কাছে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
গুমের শিকার পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে বিচার ধীরগতির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আপনারা জানেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনের সময়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলোর তথ্য-প্রমাণ সবার চোখের সামনে রয়েছে। আর গুমের শিকার ব্যক্তিদের ঘটনা ও অভিযোগের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও উল্টো। আপনারা অবগত রয়েছেন যে, গুমের শিকার অনেক ব্যক্তি এখনো ফিরে আসেননি।’
আরও পড়ুন
চিফ প্রসিকিউটর / আয়নাঘরে হাত-মুখ বেঁধে রাখা হতো, আবার অনেককে হত্যাও করা হতো
চিফ প্রসিকিউটর জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সদস্য এসব গুমের ঘটনা ঘটাতেন। তারা পরিকল্পিতভাবে তথ্য-প্রমাণ নষ্ট করে ফেলতেন। তাই গুমের শিকার ব্যক্তি ও ঘটনাগুলোর তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করতে একটু সময় লাগছে। তবে পরিবারগুলোর সঙ্গে নিয়মিত বসা হচ্ছে এবং তাদের অভিযোগ ও তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে।
গুম পরিবারের গণশুনানি ৬ সেপ্টেম্বর
চিফ প্রসিকিউটর জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গুমের শিকার পরিবারের সদস্যদের আবারও গণশুনানির জন্য আগামী ৬ সেপ্টেম্বর তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। ওই দিন গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে। এরপর প্রতি সপ্তাহে তদন্তের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে।
‘সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই আমাদের আশা, গুমের শিকার ব্যক্তিদের নিয়ে একটি সমন্বিত রিপোর্ট দাখিলের চেষ্টা চলছে।’
সালাহউদ্দিন আহমদের গুমের অভিযোগ
গুমের শিকার হওয়ার পর যারা ফিরে এসেছেন, তাদের বিষয়ে আলাদাভাবে তদন্ত চলছে। এর মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদের গুমের অভিযোগের তদন্তও এগিয়েছে।
এ ঘটনায় ভারতের আদালতের নথি সংগ্রহ করেছে তদন্ত সংস্থা। রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউশনের দাবি, ভারতীয় আদালতের নথিতে ভুক্তভোগী, তার পরিবারের সদস্য, চিকিৎসক এবং তাকে উদ্ধারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য রয়েছে। তারা বলছেন, নথি পর্যালোচনা করে অপহরণ করে ভারতে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।
আরও পড়ুন
রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গুমের সংস্কৃতি যেন আর ফিরে না আসে: নাহিদ ইসলাম
এরই মধ্যে মামলায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান হোসেনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। আরও কয়েকজনকে গ্রেফতার প্রক্রিয়া চলছে। যদিও বেশ কয়েকজন কারাগারে রয়েছেন। রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, মূল তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে। তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে।
তিন মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ পর্যায়ে
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুমের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে তিনটি মামলার বিচার চলছে। এর মধ্যে সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে দুই শতাধিক অপহরণ, গুম ও খুনের অভিযোগ রয়েছে। মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে।
অপর দুটো হলো—ডিজিএফআইয়ের জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টার ও টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন সেলে গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় করা পৃথক মামলা। এসব মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশের মহাপরিদর্শক, র্যাবের মহাপরিচালক এবং সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য গ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
এসব মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণের মাধ্যমে গুমের বিভিন্ন ঘটনা ও সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা সম্পর্কে তথ্য এবং নির্যাতনের নির্মমতার চিত্র উঠে এসেছে।
আরও পড়ুন
গুমের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইনের খসড়া অনুমোদন
সংশ্লিষ্ট মামলার প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার শাইখ মাহাদী জাগো নিউজকে বলেন, জিয়াউল আহসানের মামলায় নয়জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। তিনি জানান, জেআইসিতে ২৩ জনকে গুম ও নির্যাতনের মামলায় এখন পর্যন্ত সাতজনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। অন্যদিকে, গুম-নির্যাতনের ঘটনায় করা টিএফআই সেলের মামলাতেও সাতজনের সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।
সাক্ষীর জবানবন্দিতে উঠে এসেছে ভয়াবহ চিত্র
চলমান গুমের তিনটি মামলাতেই ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় সাক্ষীদের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে ভয়াবহ, নির্মম ও কঠোর চিত্র।
জেআইসির গুমের মামলায় সাক্ষী নূরে আলমের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে বন্দিশালার অমানবিক পরিবেশের বর্ণনা। তার জবানবন্দি অনুযায়ী, তাকে যে কক্ষে রাখা হয়েছিল, সেটি এতটাই ছোট ছিল যে সেখানে শুয়ে পড়লে তার পা শৌচাগার পর্যন্ত চলে যেত। একই কক্ষে মাত্র আড়াই থেকে তিন ফুট লম্বা স্থানে শৌচাগার ও পানির ব্যবস্থা ছিল।
সাক্ষীর জবানবন্দিতে ইলিয়াস আলীর গুমের বর্ণনা
ইলিয়াস আলীকে গুমের ঘটনায় ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী ও সেনা সদস্য ইমরুল কায়েসের জবানবন্দিতে বিভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে।
আরও পড়ুন
নিকৃষ্টতম অপরাধগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর গুম: প্রধানমন্ত্রী
ইলিয়াস আলীকে গুমের আগে ও পরের বিভিন্ন ঘটনা উপস্থাপন করেন তিনি। তিনি জানান, ঘটনার সময় ইমরুল কায়েস জিয়াউল আহসানের সঙ্গে কাজ করতেন। ইলিয়াস আলীকে গুমের আগে মহাখালী এলাকায় একটি মাইক্রোবাসে অপেক্ষা করার বিষয়টি তিনি জানতে পারেন। পরে গণমাধ্যমে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার খবর জানতে পারেন বলে সাক্ষ্য দেন।
তদন্ত ও বিচারে রাজনৈতিক বিবেচনা না করার দাবি
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গুমের অভিযোগে করা বিশেষ কয়েকটি মামলাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক ও সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি সানজিদা ইসলাম তুলি। গত ২৫ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে তার সঙ্গে দেখা করে সাংবাদিকদের কাছে এমন দাবি তোলেন তিনি।
ওই দিন তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে প্রত্যাশা ছিল, তাদের দেওয়া গুমের অভিযোগ তদন্ত ও বিচার ট্রাইব্যুনালে গুরুত্বসহকারে দ্রুত এগিয়ে নেবে। ‘মায়ের ডাক’ থেকে প্রায় ১৫০টি গুমের অভিযোগ করা হয়েছে। গত ১২ বছরের তথ্য-উপাত্ত তারা জমা দিয়েছেন। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর তিন মাস সময়ে তারা কোনো তদন্ত দেখেননি।
গুম কমিশনে ১ হাজার ৫০০-র বেশি অভিযোগ
২০২৪ সালে গুম-সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি গঠনের পর তাদের কাছে ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে ১১৩টি অভিযোগ বাদ দেওয়ার পর ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ প্রকৃত গুমের ঘটনা হিসেবে যাচাই করা হয়।
কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, ১ হাজার ২৮২ জন অবৈধ আটক অবস্থার পর বিভিন্নভাবে ফিরে এসেছেন। ২৫১ জন কখনো ফিরে আসেননি। গুম করার পর ৩৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে—নদীতে পড়ে থাকা বা গুলিবিদ্ধ অবস্থায়।
২৫১ জনের মধ্যে কেউ কেউ ১০ বছর, ১২ বছর কিংবা ১৪ বছর ধরে নিখোঁজ।
এ-সংক্রান্ত বিষয়ে গুম-সংক্রান্ত কমিশনের সাবেক সদস্য ও মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন জাগো নিউজকে বলেন, ‘১ হাজার ৫৬৯ জন গুমের শিকার হয়েছেন। যাদের প্রত্যেককে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন। ওই ব্যক্তিদের মধ্যে এখনো ২৫১ জন ফিরে আসেননি। এমনকি তাদের সর্বশেষ পরিণতি সম্পর্কেও জানা যায়নি। কিন্তু সরকার এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর এখনো সুযোগ রয়েছে নিখোঁজ ওই ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করার। সবাই মিলে চেষ্টা করলে গুমের পর নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের শেষ পরিণতি বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা যেতে পারে।’
এফএইচ/এসএইচএস