নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের মধ্যে শাড়ি ব্যবহার করে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উঠে প্রাণ বাঁচালেন ভারতের তামিলনাড়ুর ২১ জন তীর্থযাত্রী। তাদের বেশিরভাগের বয়স ৫০ বছরের বেশি।
গত শুক্রবার রাতে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু হয়ে চেন্নাইয়ে ফিরেছেন ওই ২১ জন। তারা জানিয়েছেন, ভয়াবহ সেই মুহূর্তে বাস থেকে বেরিয়ে কাদামাটি ও কাঁটাঝোপ পেরিয়ে পাহাড়ে উঠতে হয়েছে। এরপর প্রায় দেড় দিন অপেক্ষার পর তাদের হেলিকপ্টারে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
তবে তাদের সঙ্গে তিনটি বাসে থাকা আরও ৩৬ জনের এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া চেন্নাই থেকে যাওয়া আরও একটি ৪৯ সদস্যের তীর্থযাত্রী দলেরও খোঁজ মিলছে না।
কয়েক মিনিটের জন্য বেঁচে গেলেন
ভেলাচেরির মুরুগু নগরের বাসিন্দা নাভু কবিরদাস ও তার স্ত্রী বিজয়া ভুবনেশ্বরী ছিলেন উদ্ধার হওয়া ২১ জনের দলে। তাদের ভাষায়, ভয়াবহ সেই ঘটনা থেকে ফিরে আসা যেন নতুন জীবন পাওয়ার মতো।
তারা কুম্বাকোনমের একটি সংস্থার ব্যবস্থাপনায় ৫৭ জনের একটি দলের সঙ্গে তিনটি বাসে নেপালের রাসুয়া এলাকায় যাচ্ছিলেন। তাদের বাসটি ছিল বহরের দ্বিতীয় বাস। কাদায় আটকে যাওয়ায় মেরামতের জন্য কিছুক্ষণ থামতে হয়েছিল বাসটিকে।
বিজয়া বলেন, ওই কয়েক মিনিটের বিরতিই শেষ পর্যন্ত তাদের জীবন বাঁচিয়ে দেয়।
কবিরদাস জানান, হঠাৎ বোমা বিস্ফোরণের মতো বিকট শব্দ শুনতে পান তারা। এরপর পাথর বাসের ওপর পড়তে শুরু করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাঁধ ভেঙে যাওয়ার মতো বেগে পানি ছুটে আসে।
পেছনের বাসটি কাত হয়ে যেতে দেখে বিজয়া আর তাকিয়ে থাকতে পারেননি। নেপালি চালক বিপদ বুঝতে পেরে সবাইকে দ্রুত বাস থেকে নেমে উঁচু জায়গার দিকে দৌড়াতে বলেন। এরপর তিনিও বাস ছেড়ে বেরিয়ে যান।
শাড়িই হলো ভরসা
বাস থেকে বের হওয়ার পর ২১ জনকে প্রায় একতলা সমান উঁচু কাদামাটির ঢাল বেয়ে উঠতে হয়। বারবার পা পিছলে নিচে পড়ে যাচ্ছিলেন তারা।
দলের সদস্য পুঙ্গোদি পাহাড়ের ওপরে উঠে নিজের সোয়েটার পরেন এবং শাড়ি খুলে নিচে থাকা অন্যদের দিকে নামিয়ে দেন।
বিজয়া বলেন, তারা শাড়ি ও সেখানে থাকা একটি তার শক্ত করে ধরে পাহাড়ে উঠতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত একজন নারী একা ওপরে উঠতে পারছিলেন না। তখন শাড়িটি তার কোমরে বেঁধা হয়। দলের অন্য সদস্যরা শাড়িটি ধরে তাকে টেনে ওপরে তুলে নেন।
কাঞ্চিপুরম জেলার একটি পঞ্চায়েত ইউনিয়ন স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা সত্যা জানান, তারা সকাল ৮টার দিকে সিয়াব্রুবেসি থেকে চীনের অভিবাসনকেন্দ্রে যাচ্ছিলেন। তাদের বাস ছিল বহরের মাঝখানে।
হঠাৎ তারা দূরে ধুলোর মেঘের মতো কিছু দেখতে পান। পরে বুঝতে পারেন, সেটি আসলে পাথর ও কাদার বিশাল স্রোত।
সত্যা বলেন, পাথর ও কাদা সুনামির ঢেউয়ের মতো আমাদের দিকে এগিয়ে আসছিল। প্রায় ৭০ থেকে ৮০ ফুট উঁচু হয়ে উঠেছিল। এমন দৃশ্য আমরা শুধু ইংরেজি সিনেমায় দেখেছি।
যাত্রীদের চালকের পাশের দরজা দিয়ে বাস থেকে বের হতে হয়। তখন কাদা তাদের গোড়ালির ওপর পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল।
ভুল পথে গিয়ে আবারও বিপদ
পাহাড়ে ওঠার জন্য কোনো পরিষ্কার পথ ছিল না। সত্যা জানান, চার ফুট উঠলে পাঁচ ফুট নিচে পিছলে পড়ছিলেন তারা।
শেষ পর্যন্ত একটি সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ক্যাম্পে পৌঁছালে তাদের পানি ও বিস্কুট দেওয়া হয়। যাদের মোবাইলে তখনো নেটওয়ার্ক ছিল, তারা তামিলনাড়ুতে পরিবারের কাছে ছবি পাঠিয়ে জানান যে তারা নিরাপদে আছেন।
পথে তারা কাদায় আটকে থাকা এক ব্যক্তিকে সাহায্যের জন্য হাত নাড়তে দেখেন। বিষয়টি উদ্ধারকারীদের জানানো হলে পরে ওই ব্যক্তিকেও উদ্ধার করা হয়।
পরদিন তীর্থযাত্রীদের আরও প্রায় তিন ঘণ্টা কাঁটাঝোপ ও সরু পাহাড়ি পথ পেরিয়ে হেলিকপ্টারে উদ্ধারের জায়গায় যেতে হয়।
কবিরদাস বলেন, পথের একদিকে ভুল হলেই প্রায় ৫০ ফুট নিচে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। একপর্যায়ে তারা ভুল পথে চলে গেলে এক নেপালি ব্যক্তি তাদের সঠিক পথ দেখান। অন্যদিকে নিচে নামার পথটি ওপরে ওঠার চেয়েও কঠিন ছিল।
পরে সামরিক হেলিকপ্টারে তাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়। কাঠমান্ডু ও নয়াদিল্লি হয়ে তারা চেন্নাইয়ে পৌঁছান।
কয়েকজনের পাসপোর্টসহ গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র হারিয়ে গেছে। এক উদ্ধার পাওয়া তীর্থযাত্রী নেপাল সরকার, নেপাল সেনাবাহিনী, ভারতীয় দূতাবাস ও তামিলনাড়ু সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আমাদের জন্য এটি সত্যিই অলৌকিক এক যাত্রা ছিল।
তামিলনাড়ুর মন্ত্রী এ রাজমোহন জানিয়েছেন, রাজ্য থেকে ৪০০ জনের বেশি মানুষ নেপালে গিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ৯০ জনের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
এমএসএম