একসময় ফেসবুকের নিউজফিডে চোখ রাখলেই দেখা যেত রোমান্টিক গল্প, ডার্ক রোমান্স কিংবা সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে লেখা ছোট ছোট গল্প। কয়েক হাজার শব্দের সেই গল্প পড়তে পড়তে পাঠক পৌঁছে যেত শেষ পরিণতিতে। এখন সেই অভিজ্ঞতা বদলে যাচ্ছে। দীর্ঘ গল্প পড়ার বদলে অনেকেই কয়েক মিনিটের ভিডিওতেই প্রেম, বিচ্ছেদ, প্রতারণা, রহস্য কিংবা সম্পর্কের জটিলতা দেখতে পছন্দ করছেন। আর এই পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে এআই ড্রামা।
এআই ড্রামা বলতে সাধারণত এমন ছোট আকারের ধারাবাহিক ভিডিওকে বোঝানো হয়, যেখানে গল্পের চরিত্র, দৃশ্য, কণ্ঠস্বর, সংলাপ কিংবা ভিডিওর বড় একটি অংশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি করা হয়। প্রচলিত মাইক্রো-ড্রামার মতোই এগুলো সাধারণত মোবাইলের স্ক্রিনের জন্য তৈরি হয় এবং প্রতিটি পর্বে রাখা হয় এমন একটি ‘হুক’, যাতে দর্শক পরের পর্ব দেখতে বাধ্য হন।
সহজভাবে বললে, আগে একটি গল্পকে নাটকে পরিণত করতে অভিনেতা, ক্যামেরা, লোকেশন, আলো, মেকআপ, শুটিং ইউনিট এবং এডিটিং টিমের প্রয়োজন হতো। এআই ড্রামায় সেই প্রক্রিয়ার অনেকটাই সফটওয়্যারের মাধ্যমে করা যায়।
আরও পড়ুন
টাকার লোভ এআইয়েরও আছে, বিজ্ঞাপন পেলে করবে সেই পণ্যের সুপারিশ!
একজন নির্মাতা প্রথমে গল্পের মূল ধারণা তৈরি করেন। এরপর এআই দিয়ে চরিত্রের বর্ণনা, সংলাপ ও দৃশ্যের পরিকল্পনা তৈরি করা যায়। ভিডিও জেনারেশন মডেল সেই বর্ণনার ভিত্তিতে চরিত্র ও দৃশ্য তৈরি করে। আলাদা এআই টুল দিয়ে ভয়েসওভার, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, সাবটাইটেল এবং এডিটিংয়ের কাজও করা সম্ভব।
তবে সব এআই ড্রামা একইভাবে তৈরি হয় না। কিছু সিরিজ পুরোপুরি এআই-নির্ভর, আবার কিছু ক্ষেত্রে বাস্তব মানুষের শুট করা ফুটেজের সঙ্গে এআই দিয়ে ভয়েস, মুখ, ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট বা পোস্ট-প্রোডাকশনের কাজ করা হয়।
কীভাবে কয়েক মিনিটের একটি এআই ড্রামা তৈরি হয়?
প্রক্রিয়াটি অনেকটা ছোট একটি প্রোডাকশন হাউসের মতো হলেও এখানে বেশিরভাগ কাজ সফটওয়্যার দিয়ে করা যায়।
প্রথম ধাপ-গল্প
প্রথমে ঠিক করা হয় গল্পের বিষয়। যেমন-ধনী পরিবারের ছেলে ও সাধারণ পরিবারের মেয়ের প্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা, গোপন পরিচয়, প্রতিশোধ, বস-সেক্রেটারি সম্পর্ক কিংবা ‘ডার্ক রোমান্স’।
দ্বিতীয় ধাপ-স্ক্রিপ্ট
এআইকে গল্পের ধারণা দিলে সেটি চরিত্র, সংলাপ এবং দৃশ্য অনুযায়ী স্ক্রিপ্ট সাজাতে পারে। গল্পকে কয়েক ডজন ছোট পর্বেও ভাগ করা যায়।
তৃতীয় ধাপ-চরিত্র ও দৃশ্য
এরপর এআই ইমেজ বা ভিডিও জেনারেটরের সাহায্যে চরিত্র ও লোকেশন তৈরি করা হয়। একই চরিত্রকে একাধিক দৃশ্যে ধরে রাখাই এখানে বড় চ্যালেঞ্জ।
চতুর্থ ধাপ-ভয়েস
চরিত্র অনুযায়ী এআই ভয়েস তৈরি করা যায়। ফলে আলাদা ভয়েস আর্টিস্ট বা অভিনেতার প্রয়োজন অনেক ক্ষেত্রে কমে যায়।
পঞ্চম ধাপ-এডিটিং
সবশেষে ভিডিও ক্লিপ, সংলাপ, মিউজিক, সাউন্ড ইফেক্ট ও সাবটাইটেল একসঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। তারপর সেটি ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব শর্টস বা অন্য প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করা হয়।
অর্থাৎ একজন ছোট নির্মাতাও এখন তুলনামূলক কম লোকবল নিয়ে এমন একটি সিরিজ তৈরির চেষ্টা করতে পারেন।
আরও পড়ুন
এবার আপনার ছবি বা আইডিয়া দিয়েই স্টিকার বানিয়ে দেবে চ্যাটজিপিটি
রোমান্স আর ডার্ক রোমান্সই বেশি জনপ্রিয়
এআই ড্রামার জনপ্রিয়তার পেছনে গল্পের ধরন বড় ভূমিকা রাখছে। প্রেম, বিচ্ছেদ, প্রতারণা, গোপন সম্পর্ক, প্রতিশোধ, ক্ষমতা ও রহস্য-এসব বিষয় দর্শকের কৌতূহল দ্রুত তৈরি করে। বিশেষ করে রোমান্টিক মাইক্রো-ড্রামায় প্রতিটি পর্ব খুব ছোট রাখা হয়। গল্পের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এসে ভিডিও শেষ হয়ে যায়। ফলে দর্শকের মনে প্রশ্ন তৈরি হয় এরপর কী হবে?
এই ‘ক্লিফহ্যাঙ্গার’ বা অসমাপ্ত উত্তেজনাই পরের ভিডিওতে নিয়ে যায় দর্শককে। ভারতে মাইক্রো-ড্রামা নিয়ে মেটা ও অরম্যাক্স মিডিয়ার এক যৌথ গবেষণাতেও দেখা গেছে, ৮৯ শতাংশ দর্শক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফিডের মাধ্যমে এসব কনটেন্ট খুঁজে পান। রোমান্স, পারিবারিক গল্প ও কমেডি সেখানে জনপ্রিয় ঘরানার মধ্যে রয়েছে। একই গবেষণায় ৪৭ শতাংশ দর্শক এআই নির্মিত মাইক্রো-ড্রামাকে নতুন ও সৃজনশীল বলে মনে করেছেন।
ফেসবুকে কেন এত জনপ্রিয় হচ্ছে এআই ড্রামা?
কারণ এই ধরনের গল্পের জন্য ফেসবুকের নিউজফিড ও শর্ট ভিডিও ফরম্যাট অত্যন্ত কার্যকর। বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়াগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হচ্ছে ফেসবুক। এতে ব্যবহারকারীর সংখ্যাও বেশি। একজন ব্যবহারকারী হয়তো মূলত অন্য কিছু দেখতে ফেসবুক খুলেছেন। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে চোখে পড়ল আবেগপূর্ণ একটি দৃশ্য কাঁদছেন নায়িকা, রেগে আছেন নায়ক, কিংবা কোনো রহস্যময় চরিত্র নতুন তথ্য প্রকাশ করছে।
ভিডিওটি ভালো লাগলে পরের পর্ব খুঁজে দেখা শুরু করেন দর্শক। এখানেই পুরোনো ফেসবুকের রোমান্টিক গল্পের সঙ্গে নতুন এআই ড্রামার বড় পার্থক্য। আগে পাঠককে গল্প পড়তে হতো। এখন গল্প নিজেই ছবি, কণ্ঠস্বর, সংগীত ও অভিনয়ের মতো উপাদান নিয়ে দর্শকের সামনে হাজির হচ্ছে।
কারা বানাচ্ছে এসব?
শুধু বড় বিনোদন সংস্থা নয়, ছোট প্রোডাকশন টিম, স্বাধীন নির্মাতা এবং এআই-কেন্দ্রিক কনটেন্ট স্টুডিওরাও এই বাজারে ঢুকছে। চীনে এআই মাইক্রো-ড্রামার উৎপাদন এরই মধ্যে ব্যাপক আকার নিয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে দেশটিতে প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার শর্ট ড্রামা প্রকাশিত হয় এবং চায়না নেটকাস্টিং সার্ভিসেস অ্যাসোসিয়েশন-এর হিসাবে এর প্রায় ৯৫ শতাংশই এআই-নির্ভর ছিল। চীনের পর এই ফরম্যাট অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ছে। এআই-প্রথম নির্মাণ প্ল্যাটফর্ম ও স্টুডিওগুলো সম্পূর্ণ ভার্চুয়াল চরিত্র এবং এআই-নির্মিত দৃশ্য ব্যবহার করে সিরিজ তৈরি করছে।
এত দ্রুত জনপ্রিয় হওয়ার কারণ কী?
সবচেয়ে বড় কারণ খরচ ও গতি। একটি প্রচলিত নাটক বানাতে লোকেশন, অভিনেতা, ক্যামেরা, শুটিং ইউনিট এবং পোস্ট-প্রোডাকশনে সময় ও অর্থ লাগে। এআই সেই প্রক্রিয়ার বেশ কিছু ধাপ দ্রুত করে দিতে পারে। ফলে একই সময়ে অনেক গল্পের ধারণা পরীক্ষা করা সম্ভব। কোনো গল্পের প্রথম কয়েকটি ভিডিও ভালো পারফর্ম করলে সেটিকে আরও পর্বে বাড়ানো যায়। দর্শকের প্রতিক্রিয়া দেখে গল্পের মোড়ও বদলানো সম্ভব।
এছাড়া দর্শকের অভ্যাসও বদলেছে। এখন অনেকেই দীর্ঘ সময় ধরে একটি সিনেমা বা নাটক দেখার বদলে দিনের বিভিন্ন সময়ে এক-দুই মিনিটের ভিডিও দেখেন। মেটার গবেষণায় ভারতে মাইক্রো-ড্রামা দর্শকদের সাপ্তাহিক দেখার সময়ের মধ্যমা সাড়ে ৩ ঘণ্টা এবং প্রায় ৯০ শতাংশ দর্শন একা একা হয় বলে উঠে এসেছে।
আরও পড়ুন
এআইকে হাতিয়ার করছে হ্যাকাররা, যেভাবে সতর্ক হবেন
তবে সমস্যা নেই, এমন নয়
এআই ড্রামার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা এখনও চরিত্রের ধারাবাহিকতা। এক দৃশ্যে চরিত্রের মুখ, চুল বা পোশাক যেমন দেখা যায়, পরের দৃশ্যে তা সামান্য বদলে যেতে পারে। ঠোঁটের সঙ্গে কণ্ঠস্বরের মিল না থাকা, অস্বাভাবিক হাত-পা কিংবা দৃশ্যের হঠাৎ পরিবর্তনও এআই ভিডিওতে দেখা যায়।
এছাড়া এআই দিয়ে তৈরি গল্পের ক্ষেত্রে সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন থাকে। কোনো ভিডিও বাস্তব ঘটনা নাকি সম্পূর্ণ কল্পকাহিনি দর্শকের পক্ষে সবসময় বোঝা সহজ নয়। এর সঙ্গে রয়েছে কপিরাইট, বাস্তব মানুষের মুখ বা কণ্ঠস্বর ব্যবহারের অনুমতি এবং এআই নির্মিত কনটেন্টকে যথাযথভাবে চিহ্নিত করার প্রশ্ন। সামাজিক প্ল্যাটফর্মগুলোও এ কারণে এআই-নির্মিত কনটেন্টের লেবেলিং ও নিম্নমানের স্বয়ংক্রিয় কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে জোর দিচ্ছে।
শুধু এআই দিয়ে ড্রামাই নয়, তৈরি হচ্ছে বিজ্ঞাপন। এখন প্রশ্ন উঠছে, এআইয়ের এই আধিপত্য কি বাস্তবের অভিনেতা অভিনেত্রীদের কাজ কেড়ে নিচ্ছে? ভবিষ্যৎ কেমন হবে?
কেএসকে