বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা রংপুরে জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষকসহ পরিবারের চার সদস্যকে খুন করা হয়েছে। মিডিয়ার মাধ্যমে দেশ-বিদেশের মানুষ জানতে পেরেছেন, আমিও মিডিয়ার বরাতে জেনেছি। এই হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দুজন অপরাধীকে শনাক্ত করেছে। তাদের গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও গ্রহণ করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সে জন্য ধন্যবাদ দিতে হয়। পুলিশ ও অপরাধী হিসেবে ধৃত সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের দেওয়া তথ্যমতে তারা দুজন হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। তারা দুজনই মাদকসেবী। তাদের এক বন্ধুও আদালতে সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছেন।
পুলিশ বলছে, গত ২০ আগস্ট বৃহস্পতিবার রাতে পাশের একটি ভবন দিয়ে গণপতির নির্মাণাধীন তিনতলা বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করতে যায় মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। ইয়াবা সেবন করতে দেখে ফেলেন গণপতি। তিনি বাধা দিলে তাঁকে হত্যা করা হয়। গণপতির চিৎকার শুনে স্ত্রী প্রীতিলতা ও মেয়ে আগামীর চক্রবর্তী ছাদে ওঠার চেষ্টা করলে তাঁদেরও হত্যা করা হয়। এরপর ঘরে ঘুমিয়ে থাকা আয়ুশকেও শ্বাসরোধে হত্যা করে আসামিরা।
২২ তারিখ শনিবার রাতে তিনতলা বাড়ি থেকে চারটি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নির্মাণাধীন তিনতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় গণপতির পরিবার থাকত। প্রথম ও তৃতীয় তলার কাজ চলছিল। দ্বিতীয় তলার একটি শোবার ঘরের খাটের পাশে পড়েছিল ছেলে আয়ুশের লাশ। তার গলায় কাপড় প্যাঁচানো ছিল। তৃতীয় তলায় ওঠার সিঁড়িতে পড়েছিল গণপতির স্ত্রী প্রীতিলতা ও মেয়ে আগামীর লাশ। তাঁদের গলায় দড়ি প্যাঁচানো ছিল। তৃতীয় তলার ছাদে পাওয়া যায় গণপতি চক্রবর্তীর লাশ। গামছা প্যাঁচানো ছিল তাঁর গলায়।
আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর আস্থা রাখি। আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার করা হলে আসামিরা প্রকৃত অপরাধী কি না, তা বেরিয়ে আসবে। এই ডিজিটাল যুগের তদন্তের ক্ষেত্রে উন্নত বিশ্বে আমরা দেখতে পাই, তদন্ত সংস্থাগুলো আশপাশে সিসি ক্যামেরা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখে। যদি থাকে, তার ফুটেজ সংগ্রহ করে। মোবাইল কোম্পানির টাওয়ারগুলো থেকে ভিকটিম ও অপরাধীদের সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তার সমস্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
কতটা নিখুঁত পরিকল্পনা করে দুজন মাদকসেবী চার-চারজন মানুষকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করল, ফ্রিজ থেকে শসা-খেজুর বের করে খেল, গোসল করল। তারপর বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে, মোবাইল জলে চুবিয়ে চলে গেল। আশপাশের কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পেলেন না। প্রশ্ন হলো, ভোর সাড়ে ৫টায় আগামীর বান্ধবীর কাছে দেওয়া মেসেজটা কেমন যেন ধাঁধার মধ্যে ফেলে দিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে জানতে পারলাম, আগামীর প্রবাসী এক বান্ধবীর কাছে জিডির বিষয় জানতে চেয়েছিলেন।
তদন্ত সংস্থার এই বিষয়গুলোর সত্যতা যাচাই এবং জনমনের প্রশ্নগুলো নিরসনের জন্য তদন্তের দাবি রাখে। প্রশ্ন হলো, আসামিরা কি মোবাইল ব্যবহার করেন? যদি করেন, ঘটনার সময় তাঁদের মোবাইল কোথায় ছিল?
তবে প্রশ্ন হলো, পুলিশ কোন সূত্রের ভিত্তিতে বলছে, আসামিরা ঘটনার পর বা পুলিশ যাওয়ার আগে কেউ বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেয়, যাতে সিসি ক্যামেরায় ধরা না পড়ে? তাহলে প্রশ্ন ওঠে, সেই সিসি ক্যামেরা কোথায়? আলামত হিসেবে তা সংগ্রহ করা হয়েছে? সিসি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে?
হয়তো বলবে, অপরাধীরা দীর্ঘ সময় ঘটনাস্থলে থেকে হত্যাকাণ্ডের আলামত নষ্ট করে গেছে। একবার ভাবুন, ইয়াবা সেবন করতে কত শত পরিকল্পনার প্রয়োজন হয়। আমরা কত সহজভাবে ভাবি, একটি বদ্ধ ঘর হলেই ইয়াবা সেবন করা যায়। গণপতি-কাণ্ড যা আমাদের শেখাচ্ছে বা জানাচ্ছে, ইয়াবা সেবন করতে হলে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করতে হয়, সঙ্গে দাহ্য পদার্থ রাখতে হয়। শসা-খেজুর খেতে হয়।
প্রশ্ন ২) পুলিশ প্রাথমিক তদন্তে কীভাবে নিশ্চিত হলো যে, চারজনকে একে একে খুন করা হয়েছে? পুলিশের ভাষ্যমতে, দুই আসামি ইয়াবা সেবন করতে গণপতির ফ্ল্যাটের ছাদে যায় এবং খোলা আকাশের নিচে ইয়াবা সেবন করে। গণপতি তা দেখে ফেলায় গামছা পেঁচিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয়। পুলিশের ভাষ্যমতে, বিদ্যুতের খুঁটি থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল।
যদি আসামিরা ইয়াবা সেবন করতে যায়, তার জন্য এত প্রস্তুতি কেন? পুলিশ বলেছে, ভিকটিমের মুখে দাহ্য পদার্থ ঢেলে দেওয়া হয়েছিল, শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। বিবিসি সংবাদসূত্র মতে, নিহতদের ময়নাতদন্ত করা রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেছেন, প্রাথমিকভাবে তাঁদের কাছে মনে হয়েছে যে গণপতি চক্রবর্তীসহ চারজনকে শ্বাসরোধ করেই হত্যা করা হয়েছে।
আর পুলিশ বলছে, ‘রংপুরে ৪ জনকে খুন করে বাসায় বসেই খেজুর, শসা খেয়েছে খুনিরা।’ রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, ‘ইয়াবা খাওয়ার আলামত পেয়েছি। খেজুরের বিচি পেয়েছি। ফ্রিজ থেকে বের করে শসা খেয়েছে, তারও আলামত পেয়েছি। খুন শেষের পর তারা গোসল করে। আগুনে টেস্ট করা চুড়ি পেয়েছি। তখন মনে হয়েছে, গোল্ডের বিষয়ে অভিজ্ঞ কেউ জড়িত থাকতে পারে।’
গণপতি চক্রবর্তীর ঘরে ইয়াবা সেবন করার সরঞ্জাম পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। পুলিশ বলছে, এসব আলামতের সূত্র ধরে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থকে শনাক্ত করে আটক করা হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা হত্যার দায় স্বীকার করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ আরও জানায়, মুগ্ধ দাস নগরের সিটি বাজারে একটি মাছের দোকানে কাজ করেন। সিদ্ধার্থ দাস নগরের একটি গয়নার দোকানে প্রায় আট বছর কারিগর হিসেবে কাজ করেন।
অন্যদিকে, জড়িতদের জিজ্ঞাসাবাদের পর রংপুরের ডিবির ডিসি সনাতন চক্রবর্তী জানিয়েছেন যে, ওই শিক্ষক ও পরিবারের সদস্যদের হত্যার পর তারা আরও ৬-৭ ঘণ্টা ওই বাড়িতেই ছিল বলে তাঁদের কাছে স্বীকার করেছেন।
এ ঘটনায় রংপুর মহানগরের কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা দায়ের করেন নিহত শিক্ষকের ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ‘আমি খবর পেয়ে গ্রাম থেকে এসেছি। মামলা করেছি। আশা করি সঠিক তদন্ত করে তারা (পুলিশ) বের করবে কী হয়েছে।’
ঘটনার কো-ইনসিডেন্স—সিআইডি, ডিবি এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সকলেই হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্যক্তি—এটা হতেই পারে। আবার অপরাধচক্রের হয়তো ধারণা ছিল, এতে তদন্ত নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হবে না। এসবই আমার অনুমান।
কিন্তু গোল বাধালেন ডিবির ডিসির পোশাক। তবে এ কথাও সত্য, কোনো কোম্পানি তো একটি শার্টই তৈরি করেনি। রংপুর সিআইডির পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরী প্রাথমিক সুরতহাল ও রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের সন্দেহ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে বক্তব্য দেন।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বাবুল বিশ্বাস বলেন, ভিকটিমদের শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। মুখমণ্ডলের বিকৃতির কারণ রাসায়নিক বা অ্যাসিড নয়, বরং কয়েক দিন ধরে লাশ পড়ে থাকার প্রাকৃতিক পচনপ্রক্রিয়ার ফলে ত্বকের রং পরিবর্তন হয়েছে। নিহতদের শরীরে ধস্তাধস্তির কিছু সাধারণ আঘাতের চিহ্ন মিললেও চোয়াল ভাঙা বা চোখ বের হয়ে আসার মতো কোনো ক্ষত পাওয়া যায়নি।
তিনি সংবাদমাধ্যমে বলেন—ময়নাতদন্তের বায়োলজিক্যাল বা মাইক্রোবায়োলজি পরীক্ষায় দুই নারী ভিকটিমের শরীরে বা যৌনাঙ্গে কোনো প্রকার ধর্ষণের আলামত বা বীর্যের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।
খুনের ঘটনার সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ তদন্তের জন্য থানা পুলিশ থেকে ডিবিতে পাঠানো হয়েছে। সেই সঙ্গে চার ভিকটিমের সৎকারও সম্পন্ন হয়েছে। ময়নাতদন্ত-সংশ্লিষ্ট ডোমের তথ্য আর মর্গের চিকিৎসকের কথার মধ্যে অসংগতি। ডোম সাংবাদিকের কাছে বলেন—‘আমি বলছি এক কথা, আবার ডাক্তার রিপোর্ট লিখবেন। বাইরে কথা বলতে মানা করেছে।’ তথ্যসূত্র—৭১ টিভি।
মামলাটি স্বচ্ছ তদন্তের জন্য থানা পুলিশের কাছ থেকে ডিবিতে স্থানান্তর করা হয়েছে। মৃত্যুর সঠিক সময়, মৃত্যুর কারণ, বিষক্রিয়া বা অন্য কোনো উপাদান ছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য পোস্টমর্টেমে সংগৃহীত গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক নমুনা ও ভিসেরা সিআইডি ল্যাবে পাঠানো হয়েছে।
একটি ঘটনার পর পুলিশ প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে গিয়ে ক্রাইম সিনে পড়ে থাকা লাশ চিহ্নিত করে। এরপর আলামত সংগ্রহ করে, লাশের সুরতহাল করে। আমাদের তদন্ত সংস্থা এর সবই করেছে। প্রশ্ন হলো, লাশের সুরতহাল করার সময় কারা উপস্থিত ছিলেন?
মর্গে ময়নাতদন্তের সময়ও ডোমের বক্তব্যের সঙ্গে পুলিশ ও ফরেনসিক চিকিৎসকের বক্তব্যে বেশ কিছু অমিল পাওয়া যায়। ডোম সাহেব আলী সাংবাদিকদের জানান, নিহত প্রীতিলতা ও আগামীর দেহে ময়নাতদন্তের সময় তিনি এবং চিকিৎসকেরা সোয়াব (তরল পদার্থ বা স্পার্ম) দেখতে পান। তাঁর দাবি, নিহতের ওপর যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ভ্যাজাইনাল সোয়াবের পরীক্ষার ফলাফল বা বীর্যসংক্রান্ত তথ্য কাউকে জানাতে নিষেধ করেন।
ডোম ও চিকিৎসকের সংগৃহীত সোয়াব আলামতের চূড়ান্ত সত্যতা নিশ্চিত করার জন্য সিআইডি ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, চারজনের সুরতহাল করার সময় নিহতের পরিবারের কোনো আত্মীয়স্বজন উপস্থিত ছিলেন কি না, তা জানানো হয়নি।
এই প্রশ্ন জনমনে উঠতেই পারে—সুরতহাল করার সময় পরিবারের বা প্রতিবেশী কোনো নারী ও পুরুষ সদস্যকে রাখা হয়েছিল কি না? হয়তো বা রাখা হয়েছিল, হয়তো বা ঘটনার আকস্মিকতায় কাজে ব্যত্যয় ঘটেছে। সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ তদন্তের প্রয়োজনে প্রশ্নটি তুলে রাখলাম।
যেহেতু খুন হওয়া চারজনের দেহ পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে, তাই আঘাত বা জখম ছিল কি না, তা আর প্রমাণ করার সুযোগ নেই। প্রত্যক্ষসাক্ষীরাই একমাত্র ভরসা। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে, জনমনে স্বস্তি আনতে স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া বড্ড জরুরি।
আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর আস্থা রাখি। আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার করা হলে আসামিরা প্রকৃত অপরাধী কি না, তা বেরিয়ে আসবে। এই ডিজিটাল যুগের তদন্তের ক্ষেত্রে উন্নত বিশ্বে আমরা দেখতে পাই, তদন্ত সংস্থাগুলো আশপাশে সিসি ক্যামেরা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখে। যদি থাকে, তার ফুটেজ সংগ্রহ করে। মোবাইল কোম্পানির টাওয়ারগুলো থেকে ভিকটিম ও অপরাধীদের সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তার সমস্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
আমাদের দেশের তদন্ত সংস্থার কাছে এই প্রযুক্তি হাতে আছে। আমি রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসেবে স্বচ্ছ তদন্তের প্রত্যাশা করি। এই ঘটনার মোটিভ নিয়ে যেভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডালপালা ছড়াচ্ছে, তাতে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হচ্ছে।
ড্রাগ সাইকোলজি একটি মারাত্মক খেলা। এই সাইকোলজি মানুষকে এমনভাবে বিভ্রান্ত করে, মানুষ তার জানা বিষয়গুলো নিয়েও অবিশ্বাস করতে শুরু করে।
এই সাইকোলজি পুলিশের ভাষ্যমতে, ভিকটিম আগামীর চোয়াল ভাঙা ছিল। ফরেনসিক পাওয়া তথ্য মতে, চোয়াল ভাঙা ছিল না। চারজনের লাশ কোথায় কীভাবে ছিল, তা পুলিশের দেওয়া তথ্যকেই আমরা জানতে পেরেছি।
২০ আগস্ট দিবাগত বৃহস্পতিবার রাতে হত্যা করা হয়। পরদিন কেটে গেল। সারাদিন-রাত গণপতির লাশ ছাদে পড়ে রইল। এলাকার মানুষ তো নয়ই, কাক-শকুনের দৃষ্টিতেও পড়ল না। গণপতি হোমিও চিকিৎসা করতেন। অবাক হচ্ছি, শুক্র-শনিবার কেউ তাঁর কাছে এলেন না। তার মানে, এই দুদিন সকলেই সুস্থ ছিলেন।
গণপতি ও তাঁর পরিবার খুব ভালো ছিল। তাঁরা এত ভালো ছিলেন, পাড়া-প্রতিবেশী একবার খবর নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। তবে কি প্রতিবেশীদের সঙ্গে গণপতির সম্পর্ক ভালো ছিল না?
আগামী তাঁর প্রতিবেশীর কাছে সাহায্য না চেয়ে প্রবাসী বান্ধবীর কাছে জানতে চেয়েছিল, জিডি করলে সরকারি চাকরিতে সমস্যা হয় কি না। তদন্ত সংস্থার এই বিষয়গুলো খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
আগামী বা তাঁর পরিবারের কেউ এমন কারও বিরুদ্ধে জিডি করেছিলেন কি না, বা করতে গিয়েছিলেন কি না—হতে পারে সেই ব্যক্তি সরকারি চাকরিপ্রার্থী বা চাকরিতে আছেন কিংবা ছিলেন। আগামীর মোবাইলের তথ্য মতে, ভোর ৫টার দিকে তিনি এক বান্ধবীকে জানান, আশপাশের বাড়িতে বিদ্যুৎ আছে, তাঁদের বাড়িতে নেই। এই বিষয়গুলোর রহস্যের সমাধান হওয়া জরুরি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসেছে—গণপতি বাড়ি তৈরির সময় তাঁর কাছে চাঁদা চাওয়া হয়েছিল। অনেকের বাড়িটির প্রতি নজর ছিল। পুলিশ ক্রাইম সিনে গিয়ে সারা বাড়ি মুক্তভাবে ঘুরে বেড়িয়েছে। উপস্থিত মিডিয়ার ব্যক্তিরাও ক্রাইম সিনে হেঁটে বেড়িয়েছেন।
পুলিশের ভাষ্যমতে, আসামিরা সোনা আসল না নকল, তা আগুনে পরীক্ষা করেছে। এজন্য পুলিশের সন্দেহ, একজন অভিজ্ঞ লোকের প্রয়োজন। সেই সূত্র ধরে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে সন্দেহ করে। পরে তাঁরা আদালতে ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বর্ণনা করেন।
ইয়াবার জ্বালা মেটাতে ফ্রিজ থেকে শসা, খেজুর বের করে ধৃত সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ খেয়েছেন। খেজুর আর শসা—দুটো ভিন্ন প্রকৃতির খাবার। একটি ঠান্ডা, আরেকটি উদ্দীপক। খেজুর মিষ্টি, শরীরের তাপকে আরও বাড়িয়ে দেয়। আসামিরা গোসলও করেছেন।
পুলিশ কি তাঁদের পরনের কাপড় জব্দ করেছে কি না, তা আমরা জানতে পারিনি। ঘটনার সময় তাঁরা কোন ধরনের কাপড় পরেছিলেন, তা উদ্ধার করা হলে পোশাকবিষয়ক বিতর্কের অবসান হতে পারে।
রংপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম নাজমুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঘটনাস্থলে পাওয়া আলামতের ভিত্তিতে আমরা স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়েছি। পরে মাদকসেবন করা ব্যক্তিদের খোঁজ দেয় আমাদের স্থানীয় সোর্স। ধৃত দুজনের ডিএনএ পরীক্ষার জন্য ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে।’
আইনপেশাগত কাজের সুবাদে হরেক রকমের মানুষের সঙ্গে দেখা হয়। কেউ বলে না, ‘স্যার, আমি এটা করেছি।’ প্রথম আলোতে আইন সাংবাদিকতা হিসেবে কাজের সময় প্রতিবেদন করার প্রয়োজনে এক ইয়াবাসেবীকে প্রশ্ন করেছিলাম, ইয়াবা সেবন করলে তার অনুভূতি কেমন হয়, কেন খায়, তারা কি বেপরোয়া হয়ে ওঠে?
উত্তরে বলে, ‘স্যার, গোলাপীকে ভুলতে পারি না!’ গোলাপী নামের এক মেয়েকে সে ভালোবাসত। তার ভাষ্য, সে যখন ইয়াবা সেবন করে, তখন অন্য সময়ের চেয়ে বেশি চঞ্চল হয়ে ওঠে। কখনো কখনো একটানা কথা বলতে থাকে। দুই-তিন দিন না ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেয়। খাওয়ার প্রতি কোনো রুচি থাকে না। তারা দীর্ঘ সময় না খেয়ে পড়ে থাকে।
মনের মধ্যে প্রচণ্ড অবিশ্বাস জন্ম নেয়, কাউকে আপন মনে হয় না। সবাইকে সন্দেহ হয়। বিভ্রম বা হ্যালুসিনেশনে গোলাপীকে নিয়ে এমন কিছু অনুভব করেন, যা বাস্তবে নেই।
তাকে শেষ প্রশ্ন করেছিলাম, ‘গোলাপীকে কেমন ভালোবাস?’ উত্তরে সে বলেছিল, ‘কুত্তা যেমন হাড্ডিরে ভালোবাসে, আমি তেমনি গোলাপীরে ভালোবাসি।’ কিন্তু মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থকে গ্রেপ্তারের সময় তাঁদের চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ বা অবসাদের ছায়ামাত্র ছিল না।
চিকিৎসকদের মতে, নিয়মিত ইয়াবা সেবন করার ফলে যৌন উত্তেজনা কমে যায়। তবে ইয়াবা হলো স্নায়ু-উত্তেজক মাদক। যা সেবনের পর মস্তিষ্কে ডোপামিন নামক এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থের ক্ষরণ হয়, যার ফলে যৌন উত্তেজনা বাড়তে পারে। এই উত্তেজনার কারণে সেবনকারী দীর্ঘক্ষণ মেলামেশা করার মিথ্যা অনুভূতি অনুভব করেন। নিয়মিত ইয়াবাসেবীর স্বাভাবিক যৌন অনুভূতি নষ্ট হয়ে যায়।
ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা ফলের বিচি ও কামড়ানো শসা ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছেন। গোয়েন্দা পুলিশের ভাষ্যমতে, হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ সময় পর পুলিশ খবর পায়। শনিবার রাতে ঘটনাস্থলে গিয়ে নিহতদের লাশ উদ্ধার করেন। আলামত জব্দ করেন। এরপর ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়।
এত দীর্ঘ সময় পর ফল কি সজীব ছিল? ফল যদি সজীব না থাকে, তবে ডিএনএ টেস্টে কোনো ফলাফল আসার সম্ভাবনা কম। কারণ, ফলে বা শসায় একজন ব্যক্তির লালার স্থায়িত্ব তিন থেকে চার ঘণ্টা উপস্থিত থাকে—আমার জানা ভুলও হতে পারে।
তাহলে তদন্ত সংস্থা অপরাধ প্রমাণের জন্য অপরাধীর উপস্থিতি প্রমাণ করতে ঘটনাস্থলের আসবাবপত্রে, মেঝেতে হাতের-পায়ের ছাপ সংগ্রহ করে। এত বিষয় থাকতে শুধু তাৎক্ষণিকভাবে বিচি সংগ্রহে মনোযোগী হলেন কেন? ডাকাতির কথাই কেন বললেন, তা বোধগম্য নয়।
পুলিশের ভাষ্যমতে, ঘটনাস্থলে ইয়াবা পেয়েছেন, ঘটনাস্থলে বিভিন্ন আলামত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—চার-চারজন ব্যক্তিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হলো। তাঁদের কেউ ডাক-চিৎকার করলেন না। কোনো ধস্তাধস্তি হলো না। তবে কি নিহতদের মৃত্যু-যন্ত্রণা ছিল না? যন্ত্রণায় ছটফট করেননি? আশপাশের কেউ তাঁদের কান্না বা চিৎকার শুনতে পাননি? প্রশ্নগুলো বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে।
তদন্ত কর্মকর্তার মাথায়ও নিশ্চয় এই কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে। তবে পুলিশ তদন্ত সংস্থা পরিবর্তন হলেও একই বৃত্তে যেন ঘুরপাক না খায়—আমরা সেই প্রত্যাশা করব।
শেষ কথা, ইয়াবাসেবীরা এতটাই পরিকল্পনা করে ইয়াবা সেবন করে! তাঁদের মাথায় কীভাবে এলো সিসি ক্যামেরা আছে, তার জন্য বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করার চিন্তা এলো? যদি তাই হয়, তবে কি হত্যার পরিকল্পনা করেই তারা এসেছিল?
যদি আগামীর মুখে দাহ্য পদার্থ ঢেলে দেওয়া হয়, তা কোথা থেকে এলো? সন্ধ্যায় কারা এসেছিল গণপতির বাড়ির সামনে? কারা কারা সেই পথ দিয়ে যাতায়াত করেছে? সেই মোবাইলগুলোর গতিবিধি জানা প্রয়োজন।
ঘটনাটিকে ডাকাতি হিসেবে দেখাতে ঘরের জিনিসপত্র ইচ্ছাকৃতভাবে এলোমেলো করে। বের হওয়ার আগে বাড়ির দুটি ফোন ডিটারজেন্ট-মিশ্রিত পানিতে ভিজিয়ে রাখে, যাতে আঙুলের ছাপ না থাকে। এ যেন বাল্মীকির রামায়ণকাণ্ড।
ধৃত অপরাধীদের মোবাইল কোথায়, নাকি তারা মোবাইল ব্যবহার করে না? তা তদন্তের স্বার্থে এখন জানতে চাচ্ছি না, কিন্তু প্রত্যাশা রইল—আমার মনের প্রশ্নগুলোর উত্তর পাব। আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও তদন্ত সংস্থার প্রতি সেই ভরসা ও প্রত্যাশা রইল।
লেখক: সাংবাদিক ও আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।
এইচআর/এএসএম