শারীরিক সম্পর্কের সময় গলায় চাপ দেওয়া বা ‘চোকিং’কে অনেক তরুণ-তরুণী নিরাপদ যৌন আচরণ মনে করলেও গবেষণা বলছে, এটি মোটেও ঝুঁকিমুক্ত নয়। সামান্য চাপেও ঘাড়ের ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালি ও শ্বাসনালিতে গুরুতর ক্ষতি হতে পারে। এর ফলে অজ্ঞান হওয়া, মস্তিষ্কে ক্ষতি, স্ট্রোক এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ল স্কুলের অধ্যাপক হিদার ডগলাসের নেতৃত্বে ২০২৪ সালে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ৪ হাজার ৭০২ জনের ওপর একটি জরিপ চালানো হয়। এতে ৫৭ শতাংশ অংশগ্রহণকারী জানান, তারা জীবনে কখনো যৌন সম্পর্কে গলায় চাপ দেওয়ার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। ৫১ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা সঙ্গীর গলায় চাপ দিয়েছেন এবং ৪৩ দশমিক ৯ শতাংশ উভয় অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
ডগলাস বলেন, অনেক তরুণ-তরুণী এই আচরণকে নিরাপদ এবং যৌন সম্পর্ককে আরও উপভোগ্য করে বলে মনে করেন। কিন্তু তারা এর প্রকৃত স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে যথেষ্ট জানেন না।
অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরীর মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। সিডনিতে ওই কিশোরী যৌন সম্পর্কের সময় শ্বাসরোধের কারণে অচেতন হয়ে পড়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরে তার মৃত্যু হয়। ঘটনাটি নিয়ে পুলিশ তদন্ত করছে।
‘চোকিং’ নাকি ‘স্ট্র্যাঙ্গুলেশন’?
বিশেষজ্ঞদের মতে, যৌন সম্পর্কে গলায় চাপ দেওয়ার বিষয়টিকে ‘চোকিং’ বলা হলেও শারীরিকভাবে এর ঝুঁকি অনেকটাই শ্বাসরোধ বা ‘স্ট্র্যাঙ্গুলেশন’-এর মতো।
যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটির যৌনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডেবি হারবেনিক জানান, প্রায় এক দশক আগে দেশটিতে যৌন সম্পর্কে ‘চোকিং’ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের জরিপ করতে গিয়ে তিনি অবাক হন। ১৮ থেকে ৩৯ বছর বয়সীদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি জানিয়েছেন, যৌন সম্পর্কে তারা কখনো গলায় চাপ দেওয়ার অভিজ্ঞতা পেয়েছেন।
তার মতে, সমস্যা হলো—অনেক তরুণ-তরুণী নিজেরাই মনে করেন এটি নিরাপদ। ফলে তারা ঝুঁকি সম্পর্কে না জেনেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
হারবেনিকের গবেষণায় দেখা গেছে, অনেকে গলায় চাপ দেওয়ার পর মাথা ঘোরা, চোখে ঝাপসা বা তারার মতো দেখা এবং শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গের কথা জানিয়েছেন। এসব উপসর্গ গলায় চাপ প্রয়োগের কারণে শারীরিক ক্ষতির ইঙ্গিত হতে পারে।
বারবার চাপ দিলে বাড়ে মস্তিষ্কের ক্ষতির ঝুঁকি
গবেষকরা বলছেন, একবারের পরিবর্তে বারবার গলায় চাপ দেওয়ার ঘটনা ঘটলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। হারবেনিকের গবেষণায় অংশ নেওয়া অনেক নারী জানিয়েছেন, তারা একাধিকবার এ ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন।
নিউরোসায়েন্টিস্টদের সঙ্গে যৌথভাবে করা গবেষণায় নিয়মিত এমন অভিজ্ঞতার সঙ্গে মস্তিষ্কে সম্ভাব্য ক্ষতির সম্পর্কও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গলায় চাপ দেওয়ার ফলে শরীরে দৃশ্যমান কোনো চিহ্ন না থাকলেও ভেতরে ক্ষতি হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে সেই ক্ষতির লক্ষণ ঘটনার কয়েক দিন বা এমনকি কয়েক মাস পরেও দেখা দিতে পারে।
অ্যালকোহল বা মাদক গ্রহণের পর এ ধরনের আচরণ আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও পর্নোগ্রাফিতে বিভ্রান্তিকর তথ্য
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পর্নোগ্রাফি, ফ্যান ফিকশন ও রোমান্টিক গল্পের বিভিন্ন কনটেন্টের মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে গলায় চাপ দেওয়ার বিষয়টি স্বাভাবিক বা নিরাপদ হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে।
কিছু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্টে বিষয়টিকে মজা বা রোমান্টিক আচরণ হিসেবে দেখানো হয়। এমনকি কেউ কেউ এর ‘নিরাপদ পদ্ধতি’ আছে বলেও প্রচার করেন। গবেষকদের মতে, এসব তথ্য বিভ্রান্তিকর এবং বিপজ্জনক।
নারীদের স্বাস্থ্যবিষয়ক সংস্থা উইমেনস হেলথ নিউ সাউথ ওয়েলসের প্রকল্প কর্মকর্তা জ্যাকি ম্যাকমিলান বলেন, তরুণদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলার সময় শুধু ‘সহিংসতা’ শব্দ ব্যবহার করলে অনেকে বিষয়টি এড়িয়ে যেতে পারেন। বরং বিচার না করে তাদের বোঝানো দরকার, এই আচরণে কী ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে।
প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক যৌন শিক্ষা
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্কুল ও পরিবারে বয়স উপযোগী এবং তথ্যভিত্তিক যৌন শিক্ষা জোরদার করা জরুরি। তরুণদের শুধু ঝুঁকির কথা বললেই হবে না, তাদের সম্মতি, ব্যক্তিগত সীমা এবং নিরাপদ সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়েও শেখাতে হবে।
গবেষক ডেবি হারবেনিক জানান, কলেজ শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞেস করে দেখা গেছে, তারা গলায় চাপ দেওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে গড়ে ১৫ বছর বয়সেই প্রথম জানতে পারে। অর্থাৎ অনেকেই ১৫ বছরের আগেই এ সম্পর্কে জানতে শুরু করে।
গবেষকদের মতে, তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভুল তথ্যের ওপর নির্ভর না করে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই তরুণদের সঠিক তথ্য দেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মূল বক্তব্য হলো—কারও ঘাড়ের নরম অংশে চাপ প্রয়োগকে পুরোপুরি নিরাপদ বলা যায় না। এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে বিচারমূলক নয়, বরং তথ্যভিত্তিক ও বাস্তবসম্মত আলোচনা প্রয়োজন।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
এমএসএম