চিপসেটের মূল্য বৃদ্ধি, খুচরা যন্ত্রাংশের সংকট এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ও ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার ধাক্কায় ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাপী স্মার্টফোন বিক্রিতে বড় ধসের পূর্বাভাস দিয়েছে বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চ। তাদের সর্বশেষ ‘স্মার্টফোন মার্কেট আউটলুক’ শীর্ষক প্রতিবেদনে জানানো হয়, চলতি বছর বিশ্বজুড়ে স্মার্টফোন সরবরাহ আগের বছরের তুলনায় ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। মন্দার এই ধারা ২০২৭ সালেও বজায় থাকবে এবং ওই বছর সরবরাহ আরও ১ দশমিক ৪ শতাংশ কমবে। তবে এই বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও নিজস্ব উৎপাদন ও সরবরাহের সুবিধা কাজে লাগিয়ে অ্যাপলকে সরিয়ে স্মার্টফোন বাজারের শীর্ষ স্থান পুনরুদ্ধার করতে যাচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিষ্ঠান স্যামসাং।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিশ্ববাজারের এই নিম্নগতি মূলত মোবাইল চিপসেট ও মেমোরি চিপের অতিরিক্ত মূল্যের কারণে তৈরি হয়েছে। বর্তমানে স্মার্টফোনের চাহিদা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একদিকে আইফোন বা প্রিমিয়াম ক্যাটাগরির ফ্লাগশিপ ফোনগুলোর চাহিদা কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও, বিপাকে পড়েছে মধ্যম ও সাশ্রয়ী বাজেটের ফোনগুলো। কারণ এসব ফোনে ব্যবহৃত প্রতিটি উপাদানের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ফলে ফোন নির্মাতারা লাভ ধরে রাখতে কমদামি ভ্যারিয়েন্টগুলো বাজার থেকে তুলে নিচ্ছে এবং সামগ্রিকভাবে ফোনের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।
কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের প্রধান বিশ্লেষক ইয়াং ওয়াং এই পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জানান, ২০২৬ সালের এই বাজার মন্দা কেবল সাময়িক চাহিদা হ্রাসের বিষয় নয়। যন্ত্রাংশের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধির কারণে কোম্পানিগুলো এমন সব মডেল ও কনফিগারেশন বাজার থেকে ছেঁটে ফেলতে বাধ্য হচ্ছে, যেগুলো আর অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয়। বিশেষ করে নিম্ন বাজেটের ফোনগুলোতে এই প্রভাব সবচেয়ে বেশি। ২০২৭ সালে চিপ সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও খুচরা পর্যায়ে বেশি দামের মজুদ করা ফোনগুলো বিক্রি শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাধারণ ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা সহজে ফিরবে না। ফলে ২০২৭ সালেও বাজারে মন্দা বজায় থাকবে এবং ২০২৮ সাল থেকে বিক্রি আবার বাড়তে শুরু করবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই মন্দা বৈশ্বিক স্মার্টফোন বাজারের অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতার চিত্র বদলে দেবে। সার্বিক বাজার যখন ১৪ শতাংশের বেশি সংকুচিত হচ্ছে, তখন ২০২৬ সালে স্যামসাংয়ের স্মার্টফোন সরবরাহ প্রায় শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে। স্যামসাংয়ের নিজস্ব সেমিকন্ডাক্টর ও মেমোরি তৈরির কারখানা থাকায় এবং বিশ্বজুড়ে বিশাল বিক্রয় নেটওয়ার্ক থাকায় তারা চিপ সংকট সহজে সামাল দিতে পারছে। বাজারের এক নম্বর স্থান ও সর্বোচ্চ বিক্রি ধরে রাখতে স্যামসাং সাময়িকভাবে মুনাফার পরিমাণ কিছুটা কমাতে রাজি হতে পারে বলে উল্লেখ করেছেন বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাপল সামগ্রিক বাজার ধসের চেয়ে তুলনামূলক ভালো পারফর্ম করবে, তবে তাদের আগামী দিনের লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা সতর্কতামূলক। ২০২৬ সালে আইফোনের সরবরাহ প্রায় ২ দশমিক ১ শতাংশ কমতে পারে তবে ২০২৭ সালে আইফোন বিক্রি আবারও ২ দশমিক ৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। আইফোন ১৭ সিরিজের সফলতার পর ২০২৬-২৭ অর্থবছরে আইফোন ১৮ সিরিজের সম্ভাব্য উচ্চমূল্য এবং মডেলগুলোর বাজারে আসার সময়ের পরিবর্তনের কারণে প্রান্তিকভিত্তিক বিক্রিতে চাপ তৈরি হতে পারে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে অ্যাপল তাদের প্রথম ফোল্ডেবল আইফোন বাজারে আনতে যাচ্ছে। প্রথম বছরে এই ফোল্ডেবল ফোনের বিক্রি ৭০ থেকে ৯০ লাখের মধ্যে থাকতে পারে, যা অ্যাপলের মোট বিক্রির অঙ্কে বড় কোনো পরিবর্তন আনবে না; তবে এটি ভবিষ্যতে তাদের নতুন ধরনের স্মার্টফোন উন্মোচনের পথ তৈরি করবে।
সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়ছে চীনের প্রথম সারির মোবাইল প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো। শাওমি, অপো, ভিভো, অনার ও ট্রানশন গ্রুপের (টেকনো, ইনফিনিক্স, আইটেল) মতো চীনা ব্র্যান্ডগুলোর ফোন সরবরাহ চলতি ২০২৬ সালে ১৫ থেকে ৩৪ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। চীনা কোম্পানিগুলো মূলত কমদামি ফোন এবং উন্নয়নশীল দেশের ওপর বেশি নির্ভরশীল। ফলে চিপের দাম বাড়ায় তাদের ব্যবসায় সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে। এই সংকট মোকাবিলায় তারা কেবল বাজার দখলের প্রতিযোগিতায় না গিয়ে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য বজায় রাখা ও দামি মডেলগুলোর ওপর বেশি জোর দিচ্ছে। তবে চীনা বাজারে ব্যতিক্রমী পারফর্ম্যান্স অব্যাহত রেখেছে হুয়াওয়ে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও নিজস্ব উন্নত চিপসেট (হিসিলিকন) উদ্ভাবন এবং চীনের বাজারে প্রচণ্ড জনপ্রিয়তার কারণে ২০২৬ সালে হুয়াওয়ের সরবরাহ ৮ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে আরও ৪ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়বে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
কাউন্টারপয়েন্ট জানিয়েছে, ২০২৮ সাল থেকে স্মার্টফোন বাজারে প্রত্যাবর্তন শুরু হবে। ওই বছর কাঁচামালের দাম স্বাভাবিক হওয়া এবং আগের স্থগিত হয়ে থাকা ফোনের চাহিদা তৈরি হওয়ার কারণে সরবরাহ প্রায় ৪ দশমিক ৮ শতাংশ বাড়বে। এ ছাড়া বিশ্বব্যাপী ৬জি নেটওয়ার্ক প্রযুক্তির বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হলে গ্রাহকদের ফোন আপগ্রেড করার আগ্রহ তৈরি হবে এবং স্মার্টফোন বিক্রি আবারও স্বাভাবিক মাত্রায় ফিরে আসবে।