
আবর্জনা তো ফেলতেই হবে। তবে নিজের ঘরটিকে পরিচ্ছন্ন রাখতে গিয়ে বড় এক ভুল করে ফেলেন অনেকেই। কী সেই ভুল?
শহুরে জীবনের কর্মব্যস্ত একটা দিনের কথা ভাবা যাক। কারও অফিসের তাড়া, কারও ক্লাসের। কারও তাড়া সবার খাবারদাবার গুছিয়ে দেওয়ার। ছুটছেন সবাই।
তবে কিছু মানুষের ছুটে চলার ধরনটা একটু আলাদা। আমরা আমাদের ঘরগুলোকে পরিচ্ছন্ন রাখতে যা কিছু ফেলে দিচ্ছি, সবকিছু বয়ে নিচ্ছেন তাঁরা। এটাই তাঁদের পেশা। তাঁরা পরিচ্ছন্নতাকর্মী।
বাসাবাড়ির সব আবর্জনা সংগ্রহ করে নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে দেওয়াই তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব। কাজটা নিঃসন্দেহেই কষ্টকর, একই সঙ্গে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। আর ঝুঁকিটা বাড়ে আমাদেরই ভুলে।
আবর্জনার নানান ধরন। কিছু আবর্জনা পচনশীল। কিছু আবর্জনা পুনঃচক্রায়ণের মাধ্যমে প্রবেশ করে শিল্পকারখানায়। কিছু আবর্জনা অসহায় কোনো মানুষের জন্য হয়ে ওঠে ব্যবহার্য সামগ্রী।
কিছু আবর্জনার সঙ্গে মিশে থাকে মানবদেহের নানান রকম তরল। কিছু আবর্জনা ছড়ায় দুর্গন্ধ আর জীবাণু। কিছু আবর্জনা আবার ধারালো কিংবা সুচালোও হয়। তবে আমাদের দেশে বর্জ্যের ধরন অনুযায়ী তা ফেলার জন্য আলাদা বিন রাখার কোনো সর্বজনীন ব্যবস্থা নেই।
আমাদের দেশের মানুষ সব ধরনের আবর্জনা একসঙ্গে ফেলতেই অভ্যস্ত। কেউ কেউ অবশ্য পথেঘাটে, জলে-জঙ্গলে, পাহাড়ের বুকেও চট করে ফেলে দেন হাতের আবর্জনাটা। দুটি অভ্যাসের মধ্যেই আছে ভুল—নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী ময়লা না ফেলার ভুল।
যেখানে সেখানে ময়লা ফেললে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হয়। মাটিদূষণ, পানিদূষণ, জলাবদ্ধতা, জলজ বাস্তুতন্ত্রের বিপর্যয়সহ নানান ভয়াবহ সমস্যার কারণ হয়ে ওঠে ‘ছোট’ এ অভ্যাস। এ নিয়ে অনেকে সরব হলেও একসঙ্গে সব ময়লা ফেলার ভুলটা নিয়ে খুব একটা আলোচনা হয় না।
অথচ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একদল মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি। বিষয়টা একটু বুঝিয়ে বলা যাক।
বাসাবাড়ির সব আবর্জনা সংগ্রহ এবং এরপর সেসবের ধরন অনুযায়ী আলাদা করার কাজটা করেন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা। পুরো প্রক্রিয়াটিই তাঁদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
খালি হাতেই কাজ করে থাকেন এই কর্মীরা; ভয়াবহ দুর্গন্ধের মধ্যে, যেখানে ছড়িয়ে আছে নানান জীবাণু। সুরক্ষা দেওয়ার মতো পোশাক দূরের কথা, মাস্কও থাকে না তাঁদের।
কাজ করতে গিয়ে ভেজা বা স্যাঁতসেঁতে বর্জ্য থেকে তাঁদের হাতে লেগে যায় নানান জীবাণু। ধারালো বর্জ্যে হাত কেটে যেতে পারে যেকোনো সময়। সুচালো বর্জ্য ফুটে যেতে পারে আঙুলে।

প্রস্রাব বা রক্তে ভিজে থাকা জিনিসে নানান রকম ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক জন্মাতে পারে। ডায়াপারে থাকে মলের জীবাণুও। পরিচ্ছন্নতাকর্মীর হাতে কাটাছেঁড়া থাকলে কিংবা এসব জিনিস তাঁর চোখেমুখে লেগে গেলে তাঁর এ ধরনের জীবাণুর সংক্রমণ হতে পারে।
কাঁচা মাংসের রসেও জীবাণু থাকতে পারে। এসবও তাঁদের হাতে লেগে যেতে পারে।
মাছের কাঁটা হাতে ফুটে যেতে পারে। ভাঙা কাচে হাত কাটতে পারে। আঘাত লাগার পর হাতে সংক্রমণও হতে পারে।
বিভিন্ন ধারালো বা সুচালো বস্তুর আঘাত লাগতে পারে। দূষিত ধারালো বা সুচালো বস্তুর মাধ্যমে ছড়াতে পারে মারাত্মক জীবাণু। যেমন ধনুষ্টঙ্কারের জীবাণু। এসব জিনিস হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি কিংবা এইচআইভি সংক্রমিত ব্যক্তির রক্তের সংস্পর্শে এসে থাকলে তা থেকে এসব জীবাণুও ছড়াতে পারে।
এসব ঝুঁকি নিয়েই কাজ করে চলেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। দিনের পর দিন। এরই মধ্যে কেউ হয়তো ছেঁড়া একটি পুতুল কিংবা ব্যাগ কুড়িয়ে যত্ন করে মুছে রাখেন সন্তানের মুখে হাসি ফোটাবেন ভেবে, যদিও হাজারো জীবাণু জড়িয়ে থাকতে পারে ওই পুতুল কিংবা ব্যাগটার গায়ে।

উন্নত দেশগুলোয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পদ্ধতিই এমন যে আপনাকে নির্দিষ্ট আবর্জনা নির্দিষ্ট স্থানেই ফেলতে হবে। কিছু দেশে তা ফেলতে হবে আপনাকেই, সেখানে পরিছন্নতাকর্মী আপনার বাড়ি থেকে আবর্জনা সংগ্রহ করে নিয়ে যাবেন না। একজন নাগরিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ভুল করলে শাস্তিও হতে পারে।
এ দেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আমাদের জন্য সহজ ও আরামদায়ক। তবে আমাদের ‘সামান্য’ ভুলের ক্ষতিটা ব্যাপক। ভুল এড়াতে তাই খেয়াল রাখুন সামান্য কয়েকটি বিষয়।
ময়লা ফেলুন নির্দিষ্ট স্থানে। ময়লার ব্যাগের মুখ আটকে ফেলুন।
ধারালো বা সুচালো বর্জ্য (যেমন ইনসুলিন সিরিঞ্জ), ধাতব বর্জ্য, কাচ, টিউবলাইট, বাল্ব প্রভৃতি ফেলতে হবে সাবধানে। এ ধরনের বর্জ্য আলাদা একটা শক্ত প্লাস্টিকের কনটেইনারে পুরে সেটির মুখ শক্তভাবে স্কচটেপ দিয়ে আটকে এমনভাবে পেঁচিয়ে ফেলুন, যাতে কেউ আঘাত না পায়। নিতান্তই তা না পারলে এবং বর্জ্যটি আকারে খুব ছোট হলে কনটেইনারের পরিবর্তে পুরু কাপড়ে মুড়িয়ে ভালোভাবে বেঁধে ফেলা যায়।
ডায়াপার, স্যানিটারি ন্যাপকিন, ব্যবহৃত কনডম, পোষা প্রাণীর মলমূত্র (ব্যবহৃত লিটার) প্রভৃতি ভালোভাবে কাগজে মুড়িয়ে ফেলুন।
কীটনাশকের মোড়ক বা ফাটা বোতল, শক্তিশালী পরিষ্কারক বা রাসায়নিকের মোড়ক বা ফাটা বোতল, ওষুধের ফাটা বোতল প্রভৃতিও আলাদা করে মুড়িয়ে মুখ বন্ধ করে ফেলা ভালো। এসব বোতল অক্ষত থাকলে মুখ শক্ত করে আটকে ফেলুন।
রান্নাঘরের পচনশীল বর্জ্য আলাদাভাবে মুড়িয়ে মুখ বন্ধ করে ফেলা ভালো।
ব্যাটারি আলাদা ফেলা ভালো।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী