ঢাকার কদমতলীতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালক ইমন কাজীকে হত্যার পর মরদেহ গুমের মামলায় আল আমিন শেখকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে হত্যার আলামত নষ্ট ও মরদেহ গুমের অপরাধে তাকে আরও তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ-৩ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ মঈন উদ্দীন চৌধুরী এ রায় ঘোষণা করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মো. জহিরুল ইসলাম (কাইয়ুম) এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, রায় ঘোষণার সময় আল-আমিন আদালতে উপস্থিত ছিলেন। পরে তার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
রায়ে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় আল-আমিনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাকে আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
এছাড়া দণ্ডবিধির ২০১ ধারায় হত্যার আলামত নষ্ট ও মরদেহ গুমের অপরাধে তাকে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা না দিলে আরও এক মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
দুটি সাজা একইসঙ্গে কার্যকর হবে। এর আগে কারাগারে থাকার সময় মূল সাজা থেকে বাদ দেওয়া হবে বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৩০ মে সন্ধ্যায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন ইমন কাজী। ওই রাত ৯টার পর তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। স্বজনরা খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান পাননি।
এরপর গেণ্ডারিয়ার ফরাশগঞ্জ মাপুর মাজার এলাকার কাছ থেকে চালকবিহীন অটোরিকশাটি উদ্ধার করা হয়। অটোরিকশার ব্যাটারিও সেখানে পাওয়া যায়।
নিখোঁজের চার দিন পর ৩ জুন রাতে পশ্চিম মোহাম্মদবাগের সোনামাবিয়া জামে মসজিদের পাশে একটি পরিত্যক্ত জমির ঝোপ থেকে ইমনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার হাত-পা বাঁধা ছিল এবং মরদেহটি একটি বস্তার ভেতরে রাখা অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে নিহতের বাবা লিটন কদমতলী থানায় হত্যা মামলা করেন।
৫ হাজার টাকা নিয়ে বিরোধ, সঙ্গে পরকীয়ার সন্দেহতদন্তে পুলিশ জানতে পারে, পারিবারিক পরকীয়ার সন্দেহ এবং ধার দেওয়া পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে ইমনকে হত্যার পরিকল্পনা করেন আল-আমিন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় ইমনকে নিজের ভাড়া বাসায় ডেকে নেন আল-আমিন। সেখানে কোকের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে তাকে খাওয়ানো হয়। পরে গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে ইমনকে হত্যা করা হয়।
হত্যার পর বাজার থেকে বস্তা ও রশি কিনে মরদেহটি বস্তাবন্দি করেন আল-আমিন। পরে সেটি একটি নির্জন স্থানে ফেলে দেওয়া হয় বলে তদন্তে উঠে আসে।
ঘটনার কয়েক দিন পর, ২০২৩ সালের ৫ জুন বরিশালের হিজলা থানার গোবিন্দপুর খয়া এলাকা থেকে আল-আমিনকে গ্রেফতার করা হয়।
পুলিশ জানায়, তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ভাড়া বাসা থেকে রক্তমাখা বিছানার চাদর এবং নিহত ইমনের ব্যবহৃত স্মার্টফোন উদ্ধার করা হয়।
পরে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন আল-আমিন। সেখানে তিনি হত্যার দায় স্বীকার করেন বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
মামলাটির তদন্ত শেষে ২০২৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন ডিবি ওয়ারী বিভাগের পুলিশ পরিদর্শক মো. রোকনুজ্জামান খাঁন।
এরপর একই বছরের ২০ অক্টোবর আল-আমিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আদালত। বিচার চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষ মোট ১০ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য উপস্থাপন করে।
সাক্ষ্য-প্রমাণ ও মামলার নথি পর্যালোচনা শেষে সোমবার আল-আমিনকে হত্যার দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং মরদেহ গুম ও আলামত নষ্টের দায়ে তিন বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত।
এমডিএএ/এমআইএইচএস