‘চমচম, টমটম ও শাড়ি—এই তিনে টাঙ্গাইলের বাড়ি।’ প্রবাদে টাঙ্গাইলের পরিচয় তুলে ধরতে যে চমচমের কথা বলা হয়, তার বয়স প্রায় দুইশ বছর। যমুনা তীরের পোড়াবাড়িতে জন্ম নেওয়া এ মিষ্টি এখন শহরের পাঁচআনী বাজার থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাচ্ছে, পাড়ি দিচ্ছে বিদেশেও। খাঁটি দুধ, পানি আর কারিগরের দক্ষতায় স্বতন্ত্র স্বাদের এ চমচম জিআই স্বীকৃতির পর পেয়েছে নতুন পরিচিতি। তবে দুধ, চিনি ও জ্বালানির দাম বাড়ায় ঐতিহ্যবাহী এ ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
স্থানীয় ইতিহাস ও সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির চমচমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আনুমানিক দুইশ বছরের ইতিহাস। ব্রিটিশ আমলে দশরথ গৌড় নামে এক ব্যক্তি আসাম থেকে টাঙ্গাইলের যমুনা নদীর তীরবর্তী পোড়াবাড়িতে আসেন। সেখানেই যমুনার পানি ও খাঁটি গরুর দুধ দিয়ে তিনি প্রথম চমচম তৈরি শুরু করেন। পরে পোড়াবাড়িতেই গড়ে তোলেন মিষ্টির ব্যবসা। সময়ের সঙ্গে এই মিষ্টির জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। একসময় পোড়াবাড়িতে প্রায় অর্ধশত চমচম তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছিল। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসতেন পোড়াবাড়ির বিখ্যাত চমচমের স্বাদ নিতে।
আরও পড়ুন
যেভাবে এলো নওগাঁর বিখ্যাত ‘প্যারা সন্দেশ’
তবে সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে পোড়াবাড়ির সেই পুরোনো জৌলুস। এখন শহরের পাঁচআনী বাজারসহ টাঙ্গাইলের বিভিন্ন এলাকার মিষ্টির দোকানেও তৈরি ও বিক্রি হচ্ছে পোড়াবাড়ির ঐতিহ্যবাহী চমচম। মিষ্টির দোকানগুলোতে প্রতিদিনই চলে চমচম তৈরির কর্মযজ্ঞ।
‘চমচম তৈরিতে দীর্ঘ সময় ধরে জ্বাল দেওয়া বিশেষ মাওয়ার আস্তরণ প্রয়োজন হয়। তবে বর্তমানে দুধ ও চিনির দাম বেড়ে যাওয়ায় মান ঠিক রেখে চমচম উৎপাদন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এই পেশার আয় দিয়েই তাদের সংসারের খরচ চালাতে হয়’
চমচমের গড়ন সাধারণত লম্বাটে। হালকা আঁচে পোড়ানোর কারণে এর বাইরের অংশের রং হয় গাঢ় বাদামি। বাইরে কিছুটা শক্ত হলেও ভেতরের অংশ থাকে নরম ও রসে ভরা। লালচে-গোলাপি আভাযুক্ত ভেতরের অংশে থাকে ঘন মিষ্টির রস ও টাটকা ছানার স্বাদ। এ বৈশিষ্ট্যই অন্য অনেক মিষ্টি থেকে টাঙ্গাইলের চমচমকে আলাদা করেছে।
দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও
একসময় টাঙ্গাইলের চমচমের খ্যাতি ছিল মূলত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। এখন সেই পরিচিতি ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বাইরেও। ভারত, মালয়েশিয়া, দুবাই, সৌদি আরব ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে থাকা প্রবাসী বাঙালিরা টাঙ্গাইল থেকে চমচম নিয়ে যাচ্ছেন।
মিষ্টি ব্যবসায়ীরা জানান, টাঙ্গাইল শহরের পাঁচআনী বাজারে প্রায় ২০টি মিষ্টির দোকান রয়েছে। এছাড়া শহরের বিভিন্ন এলাকাতেও গড়ে উঠেছে চমচম বিক্রির দোকান। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা মানুষ এসব দোকানে চমচম কিনছেন। অনেকেই নিজেরা খাওয়ার পাশাপাশি আত্মীয়স্বজনের জন্যও নিয়ে যাচ্ছেন।
‘টাঙ্গাইলের চমচমের দেশজুড়ে ব্যাপক সুনাম রয়েছে। ঐতিহ্যবাহী এ মিষ্টির মান ও সুনাম কীভাবে আরও বাড়ানো যায়, তা নিয়ে কাজ করা হবে। চমচম ব্যবসায়ীদের জন্য সরকারি যেসব সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে’- প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু
চমচম শুধু খাবার নয়, বাঙালির সামাজিক ও পারিবারিক সংস্কৃতিরও অংশ হয়ে উঠেছে। বিয়ে, পূজা, জন্মদিন, পরীক্ষায় ভালো ফল, চাকরিতে যোগদান বা পদোন্নতি, নির্বাচনে জয় কিংবা আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়ার সময় মিষ্টি বিনিময়ের প্রচলন রয়েছে। এসব ক্ষেত্রেও টাঙ্গাইলের চমচমের চাহিদা রয়েছে।
আরও পড়ুন
জামালপুরের ঐতিহ্যবাহী মিল্লির স্বাদ নিন ঘরেই
সরেজমিনে পাঁচআনী বাজারের কয়েকটি মিষ্টির দোকানে দেখা যায়, বড় বড় কড়াইয়ে দুধ জ্বাল দেওয়া হচ্ছে। দুধ জ্বাল দেওয়া শেষে শুরু হয় ছানা ও মাওয়ার আস্তরণ তৈরির কাজ। এরপর নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় তৈরি করা হয় চমচম। ক্রেতারাও দোকানে বসে চমচম খাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার পরিবারের জন্য প্যাকেট করে নিয়ে যাচ্ছেন।
চমচমের পাশাপাশি এসব দোকানে রসগোল্লা, সন্দেশ, পানতোয়া, রসমালাই ও ক্ষীরমোহনসহ বিভিন্ন ধরনের মিষ্টিও বিক্রি হচ্ছে।
খাঁটি স্বাদের পেছনে দুধ, পানি আর কারিগরের দক্ষতা
মিষ্টি ব্যবসায়ীদের দাবি, খাঁটি দুধ ও বিশুদ্ধ পানির পাশাপাশি দক্ষ কারিগরের হাতে তৈরি হওয়ার কারণেই টাঙ্গাইলের চমচমের স্বাদ আলাদা। চরাঞ্চল থেকে আসা গাভির দুধকে এক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। মিষ্টি তৈরিতে কোনো ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার না করার দাবিও করেছেন ব্যবসায়ীরা।
চমচম তৈরির কারিগর নব ঘোষ জাগো নিউজকে বলেন, ভেজালমুক্তভাবেই তারা চমচম তৈরি করেন। সুস্বাদু চমচম তৈরিতে দুধ, চিনি, পানি ও সামান্য ময়দা লাগে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তাদের কাজ করতে হয়।
আরেক কারিগর হরিলাল ঘোষ বলেন, চমচম তৈরিতে দীর্ঘ সময় ধরে জ্বাল দেওয়া বিশেষ মাওয়ার আস্তরণ প্রয়োজন হয়। তবে বর্তমানে দুধ ও চিনির দাম বেড়ে যাওয়ায় মান ঠিক রেখে চমচম উৎপাদন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এই পেশার আয় দিয়েই তাদের সংসারের খরচ চালাতে হয়।
বর্তমানে মানভেদে প্রতি কেজি চমচম ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ক্রেতারা ঐতিহ্যবাহী এ মিষ্টির স্বাদ নিতে ভিড় করছেন। বিদেশি নাগরিকদেরও অনেক সময় টাঙ্গাইলের চমচম খেতে দেখা যায়।
দেলদুয়ার উপজেলা থেকে আসা ক্রেতা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, শহরে একটি কাজে এসে কাজ শেষে চমচম খেয়েছেন। পাশাপাশি বাড়ির জন্যও চমচম কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে বাড়ছে চ্যালেঞ্জ
জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার পর টাঙ্গাইলের চমচমের পরিচিতি আগের তুলনায় বেড়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, এর ফলে চমচমের ব্যবসাতেও কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তবে একই সময়ে বেড়েছে উৎপাদন খরচ। দুধ, চিনি, গ্যাসসহ প্রায় সব ধরনের উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা।
টাঙ্গাইল জেলা মিষ্টি মালিক সমিতির সভাপতি স্বপন ঘোষ জাগো নিউজকে বলেন, টাঙ্গাইলের চমচম খাঁটি দুধ দিয়ে তৈরি করা হয় বলেই এর স্বাদ ও মান ভালো। এ কারণে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও এর সুনাম রয়েছে। তারা চমচমের মান ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।
আরও পড়ুন
শরীয়তপুরের জনপ্রিয় খাবার ‘কাজির ভাত’
তিনি বলেন, আগে চমচমের বিক্রি ভালো ছিল। বর্তমানে দুধ, চিনি ও গ্যাসসহ সবকিছুর দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। চার-পাঁচ বছর আগে মিষ্টির দাম বাড়ানো হলেও এরপর আর সেভাবে দাম বাড়ানো হয়নি। বিদেশে চমচম রপ্তানির ক্ষেত্রেও সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন।
ক্রেতাদের ভাষ্যও একই—টাঙ্গাইলের চমচমের স্বাদ অন্য কোনো মিষ্টির সঙ্গে তুলনা করা যায় না। আত্মীয়স্বজনের জন্যও তারা এখান থেকে চমচম নিয়ে যান।
স্থানীয় সংসদ সদস্য ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু জাগো নিউজকে বলেন, টাঙ্গাইলের চমচমের দেশজুড়ে ব্যাপক সুনাম রয়েছে। ঐতিহ্যবাহী এ মিষ্টির মান ও সুনাম কীভাবে আরও বাড়ানো যায়, তা নিয়ে কাজ করা হবে। চমচম ব্যবসায়ীদের জন্য সরকারি যেসব সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
যেভাবে যাবেন পোড়াবাড়ি
টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির চমচমের মূল ইতিহাস জানতে চাইলে যেতে হবে যমুনার তীরের পোড়াবাড়িতে। বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে প্রথমে টাঙ্গাইল জেলা শহরে আসতে হবে। এরপর শহর থেকে অটো বা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় সহজেই পোড়াবাড়িতে যাওয়া যায়। তবে ঐতিহ্যবাহী চমচমের স্বাদ নিতে চাইলে শহরের পাঁচআনী বাজারের মিষ্টির দোকানগুলোতেও যেতে পারেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রেলপথেও টাঙ্গাইলে আসার সুযোগ রয়েছে।
এমএএএন/কেএইচকে/জেআইএম