স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে একটি বাইসাইকেল গ্যারেজে বৈদ্যুতিক বাইসাইকেলের ব্যাটারি বিস্ফোরণের ঘটনায় ইউসুফ হাসান আলিফ (২৭) নামের এক বাংলাদেশি যুবক নিহত হয়েছেন। তিনি পেশায় একজন ফুড ডেলিভারি রাইডার ছিলেন। জীবিকার তাগিদে দেশ ছেড়ে স্পেনে গিয়ে এমন মর্মান্তিক পরিণতির শিকার হওয়ায় তাঁর নিজ এলাকা গাজীপুরের কালীগঞ্জ পৌরসভাসহ প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
নিহত ইউসুফ হাসান আলিফ গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ পৌরসভার উত্তরগাঁও এলাকার আব্দুল মোতালিব ও রহিমা খাতুন দম্পতির একমাত্র ছেলে। তাঁর পাসপোর্ট নম্বর A14584713।
নিহতের পরিবার ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ভাগ্য পরিবর্তনের আশা নিয়ে গত জুন মাসে স্পেনে পাড়ি জমান ইউসুফ। দেশটিতে গিয়ে তিনি বৈধভাবে বসবাসের জন্য নতুন নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েছিলেন। দীর্ঘ প্রবাসজীবনের লড়াইয়ের মাঝে মৃত্যুর মাত্র দুই দিন আগে তিনি কাঙ্ক্ষিত কাজের অনুমতি বা ‘ওয়ার্ক পারমিট’ লাভ করেছিলেন। কিন্তু সেই কাজের আনন্দ মিলিয়ে যাওয়ার আগেই মর্মান্তিক মৃত্যু তাঁর সব স্বপ্ন কেড়ে নিল।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে বার্সেলোনা প্রবাসী ও নিহত ইউসুফের মামাতো ভাই শফিকুল ইসলাম রাসেল জানান, গত রবিবার (৩০ আগস্ট) স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ৩৭ মিনিটের দিকে স্পেনের মাদ্রিদ জেলার আরগানসুয়েলা এলাকার মেট্রো পালোস দে লা ফ্রন্তেরা অংশের কাইয়ে ক্যানারিয়াস সড়কের একটি বাইসাইকেল গ্যারেজে এই দুর্ঘটনা ঘটে। প্রতিদিনের মতো নিজের ফুড ডেলিভারির কাজে ব্যবহৃত সাইকেলটি আনতে ওই গ্যারেজে গিয়েছিলেন ইউসুফ। গ্যারেজে প্রবেশ করার পরপরই হঠাৎ একটি ইলেকট্রিক বাইসাইকেলের ব্যাটারি বিস্ফোরিত হয়। মুহূর্তের মধ্যেই সেই বিস্ফোরণ থেকে পুরো গ্যারেজে আগুন ধরে যায়। আগুনে ইউসুফসহ তাঁর সাথে থাকা আরও দুই সহকর্মী গুরুতর দগ্ধ হন।
মৃত্যুর আগমুহূর্তের বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে শফিকুল ইসলাম রাসেল বলেন, আগুন লাগার পর মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়তে লড়তে ইউসুফ তাঁর সহকর্মীদের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে বাঁচার আকুতি জানিয়ে শেষ বার্তা পাঠিয়েছিলেন। তাঁর সেই শেষ বার্তায় লেখা ছিল— “আমাদের বাঁচান ভাই, দম বন্ধ হয়ে আসছে।” কিন্তু বিষাক্ত ধোঁয়া ও দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আগুনের গ্রাসে শেষ পর্যন্ত তাঁকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
খবর পেয়ে মাদ্রিদ সিটি কাউন্সিলের ফায়ার সার্ভিসের ১৩টি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করে। দীর্ঘ চেষ্টার পর দমকলকর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। পরে তাঁরা গ্যারেজে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাস অপসারণ করেন এবং নতুন করে আগুন লাগার ঝুঁকি এড়াতে ভেতরে থাকা অন্যান্য ইলেকট্রিক বাইসাইকেলগুলো দ্রুত বাইরে সরিয়ে নেন।
ঘটনাস্থলেই চিকিৎসকরা ইউসুফকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় আগুনে দগ্ধ হওয়া তাঁর অপর দুই সহকর্মীকে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, যেখানে তাঁরা চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এদিকে প্রবাসে পরিশ্রমী এক যুবকের এমন আকস্মিক ও করুণ মৃত্যুর খবরে স্পেনে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিতে শোকের মাতম চলছে। অন্যদিকে গাজীপুরের কালীগঞ্জের উত্তরগাঁও এলাকায় নিহতের বাবা-মা ও স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে চারপাশের বাতাস। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে শোকে বিহ্বল হয়ে পড়েছেন বাবা আব্দুল মোতালিব ও মা রহিমা খাতুন। নিহতের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে।