শিশুর প্রথম পৃথিবী শুরু হয় মায়ের মুখ দেখেই। ভালোবাসা, ভরসা ও নিরাপত্তার প্রথম পাঠও সে পায় মায়ের কাছ থেকেই। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সন্তানের চাহিদা ও অনুভূতিতেও আসে পরিবর্তন।
শৈশব পেরিয়ে কৈশোর, আর কৈশোর থেকে যৌবনে পা রাখার এই সময়ে মায়ের ভূমিকা কি শুধু শাসন আর নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
বদলে যাওয়া এই সময়ে সন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার পাশাপাশি তার প্রথম ও বিশ্বস্ত বন্ধুও হওয়া উচিত মা। যাতে কোনো ভয়, সংকোচ কিংবা দ্বিধা ছাড়াই সন্তান নিজের কথা মায়ের কাছে বলতে পারে। শুনতে এবং বুঝতে হবে
মা ও সন্তানের বন্ধুত্বের সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি হলো মন দিয়ে শোনা এবং বোঝার চেষ্টা করা। প্রতিদিনের ব্যস্ততার মাঝেও একজন মা যখন সন্তানের জন্য কিছুটা সময় বের করে তার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনেন, তখন সন্তান বুঝতে শেখে যে, তার অনুভূতি ও মতামতের মূল্য আছে।
সন্তানের গল্প সবসময় বড় কোনো বিষয় নাও হতে পারে। প্রিয় খেলনা নিয়ে আবদার, স্কুলের বন্ধুর সঙ্গে ঝগড়া, কোনো কিছু না পাওয়ার অভিমান কিংবা বয়ঃসন্ধির জটিল অনুভূতি-সবকিছুই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এসব কথা বলার সময় মা যদি বারবার বিচার বা সমালোচনা না করে মন দিয়ে শোনেন, তাহলে সন্তানের মধ্যে তৈরি হয় নিরাপত্তাবোধ। সে ধীরে ধীরে শিখে যায়, ভুল করলেও মায়ের কাছে নিজের কথা বলা যায়। এই নিঃশর্ত গ্রহণযোগ্যতাই মা ও সন্তানের মধ্যে সম্পর্কের ভিত্তি মজবুত করে।
বিশ্বাসের জায়গা তৈরি করতে হবে
একসময় মনে করা হতো, সন্তানের সঙ্গে অভিভাবকের কিছুটা দূরত্ব থাকাই শাসন ও সম্মানের অংশ। কিন্তু শুধু ভয় বা কঠোরতার ওপর তৈরি সম্পর্ক সবসময় দীর্ঘস্থায়ী হয় না। বরং এতে সন্তান নিজের সমস্যা, ভুল কিংবা ভয় লুকিয়ে রাখার প্রবণতা তৈরি করতে পারে। সন্তানকে একাকী করে তোলে। যেকোনো ভুল বা বিভ্রান্তিতে পড়ে সন্তান যখন ঘরের বাইরে সমাধান খুঁজতে যায়, তখনই তৈরি হয় বিপত্তি। তাই সন্তানদের মা যদি হন প্রথম বন্ধু, তবে যেকোনো সমস্যা, দ্বিধা বা ভয়ের কথা শিশুরা সবার আগে নির্দ্বিধায় বলতে পারে মায়ের কাছেই।
শাসন ও বন্ধুত্বের ভারসাম্য রাখতে হবে
মা তার সন্তানদের বন্ধু হবেন, এর মানে কিন্তু এই নয় যে তিনি নিয়মানুবর্তিতা শেখাবেন না বা সঠিক দিকনির্দেশনা দেবেন না। বরং বন্ধুত্বের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে দেওয়া অভিভাবকত্ব অনেক বেশি কার্যকর। শিশুদের ভয় দেখিয়ে কোনো নিয়ম চাপিয়ে দেওয়ার চেয়ে বন্ধু মতো বুঝিয়ে বলা যেতে পারে। কেন সেই সিদ্ধান্তটি জরুরি, তা বুঝিয়ে বললে তা সহজে গ্রহণ করে। কারণ সেখানে আদেশ থাকে না, থাকে শুধু পারস্পরিক বোঝাপড়া।
আরও পড়ুন
শহরের শিশুরা কেন ঘরের মধ্যে আটকে থাকে?
ডিজিটাল যুগে বন্ধুত্ব আরও জরুরি
আজকের জটিল প্রযুক্তির যুগে শিশুরা সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব, চারপাশের নানা প্রলোভন ও মানসিক চাপের মুখোমুখি হচ্ছে। ঘরের কোণে নিজের টেবিলে বসেও সে যুক্ত থাকছে পুরো পৃথিবীর সঙ্গে। এই সময়ে সন্তান যদি মাকে তার মনের কথা বলার মতো বন্ধু না ভাবে, তবে সে নিজের ভেতরের বিভ্রান্তিগুলো মনের মধ্যেই চেপে রাখবে। মায়ের বন্ধুত্বপূর্ণ সুসম্পর্কই পারে সন্তানকে যেকোনো ভুল পথ বা মানসিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে।
আরও পড়ুন
শিশু বাড়িতে অনর্গল কথা বললেও স্কুলে একেবারে চুপ থাকে কেন?
সন্তান বড় হলে জীবনে অসংখ্য বন্ধু পাবে। কিন্তু শৈশব থেকেই মায়ের কাছ থেকে পাওয়া বন্ধুত্বের উষ্ণতা, বিশ্বাস ও নিরাপত্তার অনুভূতি তার ব্যক্তিত্ব গঠনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শুধু শাসনের দূরত্ব নয়, ভালোবাসা, বোঝাপড়া ও বিশ্বাসের মধ্য দিয়েই মা হয়ে উঠতে পারেন সন্তানের প্রথম এবং সবচেয়ে নিরাপদ বন্ধু।
এসএকেওয়াই