যেকোনো মুহূর্তে ভয়াবহ দুর্ঘটনার শঙ্কা
ঝুঁকিতে শত শত শ্রমিক-চালকের জীবন
মিথাইল আমদানিতে জড়িত ‘প্রভাবশালী চক্র’
পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকা সত্ত্বেও সিলেটের তামাবিল স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি করা হচ্ছে উচ্চমাত্রার রাসায়নিক পদার্থ মিথানল। বন্দরে রাসায়নিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল ল্যাব, নিরাপত্তা সরঞ্জাম এমনকি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন নেই। তারপরও দাহ্য পদার্থ আমদানি করার কারণে মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে বন্দরটি।
আরও পড়ুন
আখাউড়া স্থলবন্দর / তলানিতে রাজস্ব আয়, বন্ধ অনেক ব্যবসা
ব্যবসায়ীরা বলছেন, যদি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, তাহলে মুহূর্তেই পুরো বন্দর পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। এতে বন্দরের শত শত শ্রমিক-চালক এবং যানবাহন নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছে। এ অবস্থায় সম্প্রতি এই বন্দর দিয়ে মিথানল আমদানি আরও বাড়ার পেছনে রহস্য রয়েছে বলেও জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
‘মিথানল হলো একটি বর্ণহীন, উদ্বায়ী এবং অত্যন্ত দাহ্য রাসায়নিক তরল। যা মূলত শিল্পকারখানায় দ্রাবক বা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি মানুষের জন্য মারাত্মক বিষাক্ত। বাতাসে মিথানলের বাষ্প নির্দিষ্ট মাত্রায় মিশলে এবং আগুনের সংস্পর্শ পেলে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও দ্রুত আগুন ধরে যেতে পারে। মিথানল ফ্যাকাশে নীল শিখায় জ্বলে, যা সাধারণ আলোতে সহজে দেখা যায় না। এর ফলে হঠাৎ চারদিকে তীব্র আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভারত থেকে একসময় সপ্তাহে ৪-৫টি মিথানলবাহী ট্যাংকলরি তামাবিল স্থলবন্দরে প্রবেশ করতো। বর্তমানে প্রতিদিন অন্তত ৭-৮ গাড়ি করে মিথানল আমদানি হচ্ছে। বন্দরের ভেতরেই কোনো ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া ট্যাংকলরি থেকে ড্রামে স্থানান্তর করা হয় এসব রাসায়নিক। পরে সিলেটের বিভিন্ন ল্যাবে পাঠানো হয় নমুনা। এরপর রিপোর্ট আসার আগ পর্যন্ত অন্তত দুইদিন বন্দরেই থাকে কন্টেইনারগুলো। এরপর এগুলো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানা হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মিথানল হলো একটি বর্ণহীন, উদ্বায়ী এবং অত্যন্ত দাহ্য রাসায়নিক তরল। যা মূলত শিল্পকারখানায় দ্রাবক বা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি মানুষের জন্য মারাত্মক বিষাক্ত। বাতাসে মিথানলের বাষ্প নির্দিষ্ট মাত্রায় মিশলে এবং আগুনের সংস্পর্শ পেলে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও দ্রুত আগুন ধরে যেতে পারে। মিথানল ফ্যাকাশে নীল শিখায় জ্বলে, যা সাধারণ আলোতে সহজে দেখা যায় না। এর ফলে হঠাৎ চারদিকে তীব্র আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে।
আরও পড়ুন
বেনাপোল স্থলবন্দরে মাছ আমদানি বন্ধ হওয়ার পথে
একটি সূত্র বলছে, ভারতের আসাম রাজ্যের পার্বতপুর-ডিব্রুগড় পেট্রোকেমিক্যাল থেকে দেশে আমদানি করা হচ্ছে মিথানল। দেশের কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান তামাবিল বন্দর দিয়ে এটি আমদানি করেছে।
‘বর্তমানে তামাবিল বন্দর দিয়ে মিথাইল আমদানি বেড়েছে। আগে সপ্তাহে ৪-৫টি ট্যাংকলরি ভারত থেকে আসতো। এখন প্রতিদিনই ৮-১০ গাড়ি মিথানল ভারত থেকে আসছে। এসব ট্যাংকলরি থেকে ড্রামে রাখা হয় মিথানল’—আমদানিকারক
তামাবিল স্থলবন্দরের আমদানিকারক ফারুক আহমদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘বর্তমানে ব্যবসায়ীদের অবস্থা খুব একটা ভালো নেই। আগের তুলনায় ব্যবসা-বাণিজ্য অনেকাংশে কমেছে। আগে প্রতিদিন ৭০০-৮০০ ট্রাক পাথর আমদানি হতো। এখন গড়ে ৭০০ ট্রাকের ওপরে আমদানি হয় না।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে তামাবিল বন্দর দিয়ে মিথাইল আমদানি বেড়েছে। আগে সপ্তাহে ৪-৫টি ট্যাংকলরি ভারত থেকে আসতো। এখন প্রতিদিনই ৮-১০ গাড়ি মিথানল ভারত থেকে আসছে। এসব ট্যাংকলরি থেকে ড্রামে রাখা হয় মিথানল।’
বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোনো বালাই নেই মন্তব্য করে আমদানিকারক বলেন, ‘একটা ফায়ার স্টেশনও নেই। রাসায়নিক থেকে আগুনের সূত্রপাত হলে তা নির্বাপণ করার মতো কোনো ব্যবস্থা নেই। এটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা। প্রতিদিন এই অবস্থার মধ্যেই আমাদের শ্রমিকরা বন্দরে কাজ করছেন। এতে জানমাল দুটোই নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে।’
আরও পড়ুন
ভোলাগঞ্জ স্থলবন্দর / ২০ বছর ধরে শুধু চুনাপাথর আমদানি, রপ্তানি হয় না কিছুই
নেই ফায়ার সার্ভিস স্টেশন
২০২৪ সালের ৯ নভেম্বর দুপুর ২টার দিকে তামাবিল স্থলবন্দরে একটি ভারতীয় মিথানলবাহী লরির সামনের অংশে আগুন লাগে। এসময় আতংক ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। খবর দেওয়া হয় জৈন্তাপুর উপজেলার ফায়ার সার্ভিস স্টেশনকে। সেখান থেকে ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দেরি হয়ে যায়। ডাউকি স্থলবন্দরের ফায়ার সার্ভিসের একটি পানিবাহী গাড়ি এসে স্থানীয়দের সহযোগিতায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
‘মিথানল বন্দরে আসার পর প্রতিটি ড্রাম থেকে নমুনা সংগ্রহ করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। পরীক্ষার রিপোর্ট দেখেই পণ্য খালাস বা রিলিজ দেওয়া হয়। পরীক্ষার রিপোর্ট আসতে ন্যূনতম দুদিন সময় লেগে যায়’
আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় সেসময় বন্দরে থাকা অন্য মিথানলবাহী ট্যাংকলরি, পাথর ও কয়লাবাহী শত শত ভারতীয় ট্রাক দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। আতংকে বন্দরে থাকা কয়েক হাজার শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ ছোটাছুটি করে নিরাপদ স্থানে চলে যান। এরপর থেকে সবসময়ই আতংক কাজ করে।
শুধু তাই নয়, বন্দরে আমদানি করা রাসায়নিক পদার্থ পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল ল্যাব বা টেস্টিং মেশিন নেই। একই সঙ্গে মিথানলের মতো ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক নিরাপদে রাখার পর্যাপ্ত অবকাঠামোও নেই বন্দরে।
আরও পড়ুন
বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর / রাজস্ব আয় বেড়েছে দ্বিগুণ, আমদানি-রপ্তানিও রমরমা
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, যে বন্দরে একটি বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থ পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ল্যাব নেই, সেখানে কীভাবে নিয়মিত মিথানলবাহী ট্যাংকলরি প্রবেশ করছে এবং খালাস হচ্ছে?
প্রভাবশালী চক্রের প্রভাব
মিথানল আমদানির সঙ্গে কাগজে-কলমে সিলেটের কোনো প্রতিষ্ঠান জড়িত না থাকলেও একটি প্রভাবশালী চক্র এই বন্দর দিয়ে মিথানল আমদানিতে সহযোগিতা করছে বলে জানা গেছে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকার পরও মিথানল আমদানিতে এই বন্দর ব্যবহারের পেছনে ভিন্ন কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) কেমিক্যাল ইঞ্জনিয়ারিং ও পলিমার সায়েন্সের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাস্তাবুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘মিথানল একটি উচ্চ মাত্রার দাহ্য পদার্থ। এটি কাস্টমসের সব নিয়ম মেনেই আমদানি করা উচিত।’
তিনি আরও বলেন, ‘আগে আমাদের ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা করা হতো। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের ল্যাবে পরীক্ষা হয় না। অন্য একটি গ্রুপ এখন পরীক্ষা করে।’
আরও পড়ুন
কর্মস্থল থেকে উধাও চিলমারী বন্দর কর্মকর্তা!
বন্দরের ব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে সিলেট চেম্বার অব কমার্সের সাবেক পরিচালক ফালাহ উদ্দিন আলী আহমদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘মিথানল এতটা শক্তিশালী দাহ্য পদার্থ, যদি বিস্ফোরণ ঘটে তাহলে পুরো তামাবিল বন্দর পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। এত ঝুঁকিপূর্ণ পদার্থ আমদানি করা হচ্ছে অথচও কোনো অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই। এটা এক ধরনের তামাশা।’
তিনি বলেন, ‘দেশের এত বন্দর থাকতে সিলেট দিয়ে মিথানল আমদানি একেবারে স্বাভাবিক বিষয় না। এখানে কিছু একটা আছে। আমরা চাই দেশে আমদানি অব্যাহত থাকুক। কিন্তু শতভাগ নিরাপত্তা ব্যবস্থা আগে নিশ্চিত করতে হবে।’
বন্দর দিয়ে প্রতিদিন মিথানল আমদানি করা হচ্ছে বলে জানান তামাবিল স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক (ট্রাফিক) মো. মোস্তাফিজুর রহমান।
তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘এই আমদানির সঙ্গে সিলেটের স্থানীয় কোনো প্রতিষ্ঠান সরাসরি যুক্ত নয়, তারা শুধু শুল্কায়ন ও খালাসের কাজে সহযোগিতা করে। মূলত ঢাকার দুটি গ্রুপ তাদের কোম্পানির মাধ্যমে এই মিথানল নিয়ে আসে।’
বন্দরে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেই স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘যেহেতু এই আমদানির অনুমতি এনবিআর থেকে দেওয়া হয়, তাই বন্দর কর্তৃপক্ষ হিসেবে এটি নিষেধ করার সুযোগ নেই। তবে এখানে কোনো ফায়ার সার্ভিস সিস্টেম না থাকার বিষয়টি এরইমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। বর্তমানে বন্দরে একটি নতুন প্রকল্পের কাজ চলমান। যেখানে সম্পূর্ণ ফায়ার সার্ভিস ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।’
আরও পড়ুন
ঢিমেতালে চলছে বিবিরবাজার স্থলবন্দর
বন্দরে সরাসরি কোনো রাসায়নিক পরীক্ষার সুযোগ বা ল্যাব নেই জানিয়ে সহকারী পরিচালক বলেন, ‘মিথানল বন্দরে আসার পর প্রতিটি ড্রাম থেকে নমুনা সংগ্রহ করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। পরীক্ষার রিপোর্ট দেখেই পণ্য খালাস বা রিলিজ দেওয়া হয়। পরীক্ষার রিপোর্ট আসতে ন্যূনতম দুদিন সময় লেগে যায়।’
জেএএইচ/এসআর/এএসএম