বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলা ছাত্রদল ও জাসাসের দুই নেতাকে ২০১৫ সালে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে করা মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহসহ চার আসামির বিরুদ্ধে জবানবন্দি দিয়েছেন এক পুলিশ কর্মকর্তা।
এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দুই এএসআইকে ২৫ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হয় বলে জবানবিন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি। এই পুলিশ কর্মকর্তার নাম পরিদর্শক আলী আহমেদ। ওই সময় তিনি আগৈলঝাড়া থানার তখনকার সেকেন্ড অফিসার ছিলেন। বর্তমানে তিনি বরিশাল মহানগর সিআইডিতে পরিদর্শক হিসেবে কর্মরত আছেন।
সোমবার (৩১ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ সাক্ষ্য দেন তিনি। ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন- বরিশালের উজিরপুর থানার সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. মাহাবুল ইসলাম ও মো. জসিম উদ্দিন এবং বরিশালের তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি) এ কে এম এহসানউল্লাহ। এদের মধ্যে মাহাবুল ইসলাম ও জসিম উদ্দিন গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন।
আরও পড়ুন
ডিভাইস মিসিংয়ের সূত্রে সাগর-রুনি হত্যা মামলায় নতুন ক্লু
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার ভুক্তভোগী দুজন হলেন আগৈলঝাড়া উপজেলা ছাত্রদলের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টিপু হাওলাদার এবং একই উপজেলার জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা জাসাসের সাংগঠনিক সম্পাদক কবির মোল্লা।
অভিযোগে বলা হয়, হাসানাত আবদুল্লাহর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন টিপু হাওলাদার ও কবির মোল্লা। রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়ে হাসানাত আবদুল্লাহ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই দুজনকে হত্যার পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র করেন। হাসানাত আবদুল্লাহ ও এহসানউল্লাহ তাদের অধস্তন পুলিশ সদস্যদের দিয়ে ২০১৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দিনগত রাতে গৌরনদী-গোপালগঞ্জ মহাসড়কের আগৈলঝাড়া বাইপাস সড়কের বড় ব্রিজের পশ্চিম পাশে টিপু হাওলাদার ও কবির মোল্লাকে গুলি করে হত্যা করে।
পুলিশ পরিদর্শক মো. আলী আহমেদ জবানবন্দিতে বলেন, ২০১৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি আমি সেকেন্ড অফিসার হিসেবে বরিশাল জেলার উজিরপুর থানায় কর্মরত ছিলাম। ওইদিন রাত সাড়ে ৯টায় বরিশাল জেলার তৎকালীন পুলিশ সুপার এ কে এম এহসানউল্লাহ উজিরপুর থানায় এসে তৎকালীন অফিসার ইনচার্জ নুরুল ইসলামের সঙ্গে তার অফিস কক্ষে ১০-১৫ মিনিট কথা বলে চলে যান।
তিনি আরও বলেন, এরপর অফিসার ইনচার্জ আমাকে ডেকে বলেন ‘অত্র থানার কর্মরত এএসআই জসিম উদ্দিন এবং এএসআই মাহাবুলকে থানা এলাকায় একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করার জন্য সিসি দাও। তারা এসপি সাহেবের নির্দেশনা অনুযায়ী ডিউটি করবে এবং তার তত্ত্বাবধানে থাকবে’। আমি তখন ডিউটি অফিসারকে ডেকে অফিসার ইনচার্জের নির্দেশনা শোনাই এবং এএসআই জসিম উদ্দিন ও এএসআই মাহাবুলকে একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনার সিসি দিতে বলি। এরপর দাপ্তরিক কার্যক্রম শেষে আমি আমার বাসায় রেস্ট নিতে চলে যাই।
আরও পড়ুন
স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো আয়নাঘর থাকবে না: রাষ্ট্রপতি
আলী আহমেদ জবানবন্দিতে বলেন, পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে টেলিভিশনের হেডলাইনে দেখি আমাদের পার্শ্ববর্তী আগৈলঝাড়া থানা এলাকায় টিপু হাওলাদার ও কবির মোল্লা নামে দুজন লোক পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। ওইদিন বিকেলে আমি থানায় গেলে অফিসার ইনচার্জ আমাকে ডেকে এএসআই মাহাবুল ও এএসআই জসিমকে আগামী ১০ দিন কোনো ডিউটি না দেওয়ার জন্য বলেন। আমি তার নির্দেশ মোতাবেক তাদের ডিউটি দেওয়া থেকে বিরত রাখি।
এরপর অফিসার ও ফোর্সদের মাঝে কানাঘুষা চলতে থাকে আগৈলঝাড়া থানার ক্রসফায়ারের ঘটনা এএসআই মাহাবুল ও এএসআই জসিম ঘটিয়েছেন।
পরবর্তী সময়ে আমি জানতে পারি এসপি সাহেবের নির্দেশে ও তত্ত্বাবধানে এএসআই মাহাবুল ও এএসআই জসিম উক্ত ঘটনা ঘটিয়েছেন। ১০ দিন পরে এএসআই মাহবুব ও এএসআই জসিম থানায় আসেন এবং তাদের কথাবার্তা অসংলগ্ন ছিলেন।
আরও পড়ুন
সালাহউদ্দিন আহমদকে গুমের মামলায় গ্রেফতার জিয়াউল আহসান
তাদের চালচলনও অস্বাভাবিক ছিল উল্লেখ করে আলী আহমেদ বলেন, থানায় এসে তারা অফিসার ইনচার্জকে বলেন, তাদের আরও ১০-১৫ দিন ছুটি প্রয়োজন। তখন অফিসার ইনচার্জ তাদের আরও ১০-১৫ দিন ডিউটি থেকে বিরত রাখার জন্য আমাকে বলেন। আমি তাদের আরও ডিউটি থেকে বিরত রাখি।
তিনি আরও বলেন, এএসআই মাহাবুল ও এএসআই জসিম অত্যন্ত বেপরোয়া ছিলেন। তাদের ডিউটি দিলে এসপি সাহেব ও এমপি সাহেবের (হাসানাত আবদুল্লাহ) রেফারেন্স দিয়ে অন্যদিকে চলে যেত, ঠিকভাবে ডিউটি করতো না। তাদের ভয়ে অন্য অফিসার ও ফোর্সরা ঠিকভাবে তাদের সঙ্গে কথা বলতো না। তারা সবসময় এসপি সাহেবের রেফারেন্সে চলতো।
তিনি বলেন, তৎকালীন সরকারের আমলে বরিশাল জেলায় আরও চার-পাঁচটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এছাড়া সারাদেশে এরকম অসংখ্য বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।
এফএইচ/বিএ