
রূপা ভবানী (১৬২০–১৭২১) কাশ্মীরের একজন মহান সন্ত কবি ও যোগিনী। কাশ্মীরি সাহিত্যের ইতিহাসে লাল দেদের পরবর্তী দ্বিতীয় প্রধান রহস্যবাদী কবি তিনি। বাল্যকাল থেকে তাঁর অন্তরের প্রবণতা ও জীবনের প্রতিবন্ধকতা তাঁকে গভীর আধ্যাত্মিকতার পথে পরিচালিত করেছিল। তিনি কাশ্মীরি শৈব ধর্মীয় ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁর জীবন, দর্শন ও কবিতা কাশ্মীরের সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর জীবনকাল কাশ্মীরের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিবর্তনের যুগে পড়ে, যখন হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের চ্যালেঞ্জ ছিল। কাশ্মীরি শৈববাদ ও ইসলামি সুফিবাদের অনন্য সমন্বয় তাঁর চিন্তা ও রচনায় দেখা যায়। এটি তাঁকে কাশ্মীরের সাংস্কৃতিক সমন্বয়ের এক জীবন্ত প্রতীক করে তুলেছে।
রূপা ভবানীর জীবন ছিল আধ্যাত্মিক অন্বেষণ এবং ত্যাগের এক অসাধারণ যাত্রা। তিনি ১৬২০ সালে শ্রীনগরের নাওয়াকাদালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মাধব জু ধর এবং মা প্রেম দেবী দুজনেই ধার্মিক ও সংস্কৃতিমনা ছিলেন। মাধব জু ধর ছিলেন দেবী শারিকার উপাসক। তিনি প্রতিদিন হরি পর্বতের মন্দিরে যাতায়াত করতেন। জনশ্রুতি অনুসারে, এক নবরাত্রির রাতে দেবী শারিকা তাঁর পিতার সামনে এক উজ্জ্বল কন্যারূপে আবির্ভূত হন এবং তাঁর ঘরে জন্ম নেওয়ার বর দেন। দেবীর আশীর্বাদে তাঁর জন্ম হয় জ্যৈষ্ঠ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে। শৈশবে তিনি পিতার ঘরে আধ্যাত্মিক পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। সেখানে সাধুসন্ত এবং অন্বেষকদের আনাগোনা ছিল। ভবানীর পিতা তাঁকে যোগ ও তন্ত্রসাধনায় দীক্ষিত করেন। তিনি কুণ্ডলিনী যোগ, নাদযোগ (শব্দ-সাধনা), এবং অদ্বৈত বেদান্তে গভীর জ্ঞান অর্জন করেছিলেন।
রূপা ভবানী তাঁর বাবা-মায়ের ইচ্ছায় পণ্ডিত হীরানন্দ সাপ্রু নামক এক বিদগ্ধ যুবককে বিয়ে করেন। কিন্তু তাঁর গভীর আধ্যাত্মিক ঝোঁক ও সাধনার প্রতি নিবেদন তাঁর পরিবারের দৈনন্দিন জীবনধারার সঙ্গে মেলেনি। তিনি নিয়মিত মধ্যরাত্রে হরি পর্বতে সাধনার জন্য যেতেন। বিষয়টি সমাজ ও পরিবারে প্রশ্ন ও বিরোধের সৃষ্টি করেছিল। জগতের দুঃখ ও সাংসারিক কষ্ট তাঁকে আধ্যাত্মিক পথের দিকে আরও বেশি ধাবিত করে। শেষ পর্যন্ত স্বামী ও শাশুড়ির কাছ থেকে মানসিক ও শারীরিক কষ্ট সহ্য করতে না পেরে তিনি ঈশ্বরের সাধনাকে একমাত্র লক্ষ্য করে গৃহত্যাগ করেন।
গৃহত্যাগের পর তিনি কাশ্মীরের বিভিন্ন নির্জন স্থানে একাকী সাধনায় মগ্ন হন। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে প্রায় উপবাসী অবস্থায়, নীরবতা ও ধ্যানের মধ্যে, নিভৃত জীবন যাপন করেন। লোকশ্রুতি বলে, তিনি কখনো কখনো দিনের পর দিন কথা বলতেন না, কখনো গাছের নিচে বসে থাকতেন গভীর তন্ময়তায়। কিন্তু এগুলো অলৌকিক গল্প নয়, এগুলো কাশ্মীরি শৈব সাধনার স্বাভাবিক লক্ষণ। চিত্ত যখন নিজের উৎসে ফিরে যায়, তখন ভাষা থেমে যায়।

রূপা ভবানী কাশ্মীরি ভাষায় কবিতা রচনা করেন, যা ওই ভাষার সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছিল। খাঁটি কাশ্মীরির পাশাপাশি তাঁর ভাষায় সংস্কৃত, ফারসি, আরবি, হিন্দি ও উর্দু শব্দের প্রয়োগও লক্ষ করা যায়। তাঁর কবিতা তাঁর দর্শন, সাধনা ও উপলব্ধির উৎসারণ। তিনি মূলত বাখ (Vaakh) শৈলীতে কবিতা রচনা করেন, যা কাশ্মীরি ভাষার একটি প্রাচীন কাব্যিক রূপ।
অনেক বছর পর তিনি লোকালয়ে ফিরে সমবেত শিষ্যদের শিক্ষা দিতে শুরু করেন। মূলত তাঁর ছোট ছোট কবিতার মাধ্যমেই তিনি তাঁর উপলব্ধি ও দর্শন প্রকাশ করেন। সেই সময়ে কাশ্মীর ছিল ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের এক কেন্দ্রস্থল। শৈববাদ, সুফিবাদ, বৌদ্ধধর্ম ও হিন্দুধর্মের বিভিন্ন শাখা–প্রশাখা এখানে সহাবস্থান করত। এই পরিবেশে রূপা ভবানী তাঁর নিজস্ব আধ্যাত্মিক পথ তৈরি করেন, যেখানে তিনি শৈববাদ, অদ্বৈতবাদ ও সুফিবাদের মূল ধারণাগুলোকে একীভূত করেন।
তাঁর মতে, পরম সত্তা বা ঈশ্বর বা শিব হলেন একমাত্র সত্য এবং জাগতিক সবকিছুই সেই পরম সত্তারই প্রকাশ। মায়া বা অজ্ঞানতার কারণে আমরা এই অভিন্নতা উপলব্ধি করতে পারি না। তাঁর সাধনার মূল লক্ষ্য ছিল এই মায়ার আবরণ ভেদ করে আত্ম-উপলব্ধি লাভ করা এবং পরম সত্তার সঙ্গে একাত্ম হওয়া। তাঁর ভাবধারায়, বৈরাগ্য মানে জগৎ ত্যাগ নয়, দৃষ্টির সংশোধন। তিনি জগৎকে মিথ্যা বলেন না, ভুল দৃষ্টিতে দেখা বলেন। মুক্তি মানে নতুন কিছু অর্জন নয়, বরং নিজের প্রকৃত স্বরূপকে আবার চেনা।
তিনি মনে করতেন, ঈশ্বরকে বাইরে খোঁজার দরকার নেই, তিনি আমাদের হৃদয়ের গভীরে অবস্থান করছেন। এই উপলব্ধির জন্য প্রয়োজন আত্ম-অনুসন্ধান, ধ্যান, যোগাভ্যাস এবং গুরুমুখী শিক্ষা। রূপা ভবানী গুরুর ভূমিকাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করতেন এবং নিজে বহু বছর ধরে বিভিন্ন গুরুর কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মাধব জু ধরের কাছ থেকে প্রাপ্ত যোগশিক্ষা ছিল তাঁর সাধনার মূল ভিত্তি। সাধনার জন্য নির্জন প্রাকৃতিক পরিবেশকে তিনি অপরিহার্য মনে করতেন। তিনি প্রায়ই নির্জন স্থানে, গুহায় বা মন্দিরে দীর্ঘ সময় ধরে ধ্যান করতেন। পার্থিব সম্পর্ক ও বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে একান্তে ঈশ্বরের ধ্যান ও স্মরণে মগ্ন থাকাই ছিল তাঁর সাধনার বৈশিষ্ট্য।
তাঁর এই নিবিড় সাধনার ফলস্বরূপ তিনি আধ্যাত্মিক উচ্চতায় পৌঁছান এবং অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হন বলে লোকমুখে প্রচলিত আছে। তবে এই অলৌকিক ক্ষমতার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাঁর ভেতরের রূপান্তর এবং ব্রহ্মজ্ঞানের উপলব্ধি। রূপা ভবানী প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতির বাইরে গিয়ে নিজের আধ্যাত্মিক পথ তৈরি করেন, যা সেই সময়ে খুবই বিরল ছিল। তিনি পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর আধ্যাত্মিক ক্ষমতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
রূপা ভবানী কাশ্মীরি ভাষায় কবিতা রচনা করেন, যা ওই ভাষার সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছিল। খাঁটি কাশ্মীরির পাশাপাশি তাঁর ভাষায় সংস্কৃত, ফারসি, আরবি, হিন্দি ও উর্দু শব্দের প্রয়োগও লক্ষ করা যায়। তাঁর কবিতা তাঁর দর্শন, সাধনা ও উপলব্ধির উৎসারণ। তিনি মূলত বাখ (Vaakh) শৈলীতে কবিতা রচনা করেন, যা কাশ্মীরি ভাষার একটি প্রাচীন কাব্যিক রূপ। বাখ অর্থ বাক্য বা উক্তি। বাখগুলো ছোট, চার লাইনের শ্লোক, যা গভীর দার্শনিক অর্থ বহন করে এবং মরমিবাদী উপলব্ধির প্রকাশ ঘটায়। তাঁর কবিতাগুলো আধ্যাত্মিক অনুভূতি, নৈতিক উপদেশ এবং দার্শনিক চিন্তার এক অসাধারণ মিশ্রণ।
রূপা ভবানী শুধু একজন সাধুকবিই ছিলেন না, তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করা এক স্বাধীনচেতা নারী। ধর্মীয় সীমারেখা ডিঙিয়ে তিনি একটি সর্বজনীন আধ্যাত্মিক বার্তা প্রচার করেছিলেন। তাঁর জীবন ও দর্শন কাশ্মীরের সমন্বয়বাদী সাংস্কৃতিক ধারার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর কবিতা ও শিক্ষা ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির বিভেদ অতিক্রম করে মানবাত্মার মুক্তি ও ঐশ্বরিক প্রেমের কথা বলে। তাই তিনি আজও প্রাসঙ্গিক।
তাঁর কবিতার প্রধান বিষয়বস্তু পরম সত্তার প্রতি গভীর প্রেম এবং তাঁর সঙ্গে একাত্ম হওয়ার আকুতি তাঁর কবিতার মূল সুর। তাঁর কবিতায় আছে জাগতিক জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব এবং মায়ার বন্ধন থেকে মুক্তির আহ্বান। তাঁর কবিতায় ইসলামি সুফিবাদের প্রভাবও স্পষ্ট। সুফিদের মতোই তিনি প্রেম, আত্মসমর্পণ ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভের পথের কথা বলেছেন। তাঁর কবিতা দেখায় ভেতরের দিকে তাকিয়ে নিজেকে চেনার গুরুত্ব। আধ্যাত্মিক যাত্রায় গুরুর অপরিহার্যতা এবং জ্ঞানের মহিমা প্রকাশ করে তাঁর কবিতা এবং দেখায় জীবনের দুঃখ-কষ্টের ঊর্ধ্বে উঠে পরম শান্তি লাভের পথ। তাঁর কবিতায় আছে যোগসাধনার বিভিন্ন বিষয়।
তাঁর কবিতার ভাষা সহজবোধ্য কিন্তু গভীর অর্থপূর্ণ। এগুলো সাধারণ মানুষের কাছেও তাঁর দর্শনকে পৌঁছে দিতে সাহায্য করে। তাঁর বাখগুলি আজও কাশ্মীরি লোকসাহিত্য ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর ১৪৫-১৫০টি বাখ এখনো বিদ্যমান আছে। লাল দেদের পর তিনি কাশ্মীরি সাহিত্যে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব।
১৭২১ সালের মাঘ মাসের কৃষ্ণপক্ষের সপ্তমী তিথিতে তিনি মহানির্বাণ লাভ করেন। এটি একটি সচেতন প্রস্থান, যেখানে সাধু ইচ্ছাকৃতভাবে দেহত্যাগ করেন। জনশ্রুতি আছে, তাঁর দেহের পরিবর্তে শুধু চুলের গোছা ও ফুল পাওয়া যায়। সাফা কাদালসহ তাঁর সাধনার স্থানগুলো এখন ‘রূপা ভবানী অস্থাপন’ (পবিত্র স্থান) নামে পুণ্যতীর্থ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁর প্রয়াণদিবস এখনও কাশ্মীরে ‘সাহেব সপ্তমী’ হিসেবে শ্রদ্ধাভরে পালিত হয়। হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই তাঁকে শ্রদ্ধার চোখে দেখেন।
রূপা ভবানী শুধু একজন সাধুকবিই ছিলেন না, তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করা এক স্বাধীনচেতা নারী। ধর্মীয় সীমারেখা ডিঙিয়ে তিনি একটি সর্বজনীন আধ্যাত্মিক বার্তা প্রচার করেছিলেন।
তাঁর জীবন ও দর্শন কাশ্মীরের সমন্বয়বাদী সাংস্কৃতিক ধারার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর কবিতা ও শিক্ষা ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির বিভেদ অতিক্রম করে মানবাত্মার মুক্তি ও ঐশ্বরিক প্রেমের কথা বলে। তাই তিনি আজও প্রাসঙ্গিক।
রূ পা ভ বা নী র ক বি তা
১
আমি দেবতাকে খুঁজেছি
পাথরে গাঁথা মন্দিরে।
শেষে বুঝেছি—
যে পাথর হৃদয়ে জমে ছিল,
সেটাই আমাকে আড়াল করেছিল।
২
শিব দূরে নন,
তিনিই এই দেহে নিশ্বাস নেন।
তুমি শুধু নাম ধরে ডাকছ,
কিন্তু উপস্থিতিকে চিনছ না।
৩
আমি উপবাস করেছি বহুদিন,
কিন্তু ক্ষুধা কমেনি।
যেদিন ‘আমি’ উপবাসে গেল,
সেদিনই তৃপ্তি এলো।
৪
বই পড়ে পড়ে চোখ ক্লান্ত,
মাথা ভরে গেল মতবাদে।
একদিন সব বন্ধ করলাম—
সেই নীরবতাই
আমার গুরু হলো।
৫
যা তুমি ত্যাগ বলছ,
তা আসলে ভয়।
আর যা তুমি আসক্তি বলছ,
তা কেবল অচেতনতা।
৬
আমি নারী নই,
আমি পুরুষও নই।
আমি সেই জ্যোতি
যার মধ্যে এই দুই ভেঙে যায়।
৭
তুমি মুক্তি চাও ভবিষ্যতে,
আমি তাকে দেখেছি এখনই।
সময়ই হলো সবচেয়ে বড় আবরণ।
৮
শিবকে পেলাম না
যত দিন তাঁকে আলাদা ভেবেছি।
যেদিন নিজেকে ছেড়ে দিলাম,
সেদিন আর খোঁজার কিছু রইল না।
৯
লোকেরা বলল—
সে পাগল, সে ঘরছাড়া।
আমি বললাম—
আমি শুধু মিথ্যা আশ্রয় ছেড়েছি।
১০
ধ্যান মানে চোখ বন্ধ করা নয়,
ধ্যান মানে ভাঙা দৃষ্টিকে জোড়া লাগানো।
১১
তুমি স্বর্গ চাও,
কারণ পৃথিবীকে বোঝোনি।
যে পৃথিবী বোঝে,
তার আর স্বর্গের দরকার হয় না।
১২
নাম জপে জিভ ক্লান্ত,
মন রইল যেখানে ছিল;
একদিন মন থামল—
নাম নিজেই নিশ্বাসে উঠল।
১৩
শিব আগুন নন,
শিব ছাইও নন।
শিব সেই সচেতনতা
যা আগুন আর ছাই—
দুটোকেই জানে।
১৪
আমি গুরু খুঁজিনি আর,
কারণ যে খোঁজে,
সেই তো অন্তরাত্মার আড়াল।
১৫
জগৎ মায়া নয়,
অজ্ঞানই মায়া।
জগৎ তো শিবের হাসি।
১৬
শরীর ভাঙবে—
এতে ভয় কিসের?
যে জানে সে শরীর নয়,
তার মৃত্যু কোথায়?
১৭
আমি নদীর মতো ছিলাম,
চলছিলাম শিবের দিকে।
একদিন বুঝলাম—
নদী আর সাগর
আলাদা ছিলই না।
১৮
প্রশ্ন করো না বেশি,
উত্তর শব্দে নেই।
যেখানে প্রশ্ন ফুরায়,
সেখানেই শিব।
১৯
তুমি পূজা করছ ভয়ে,
আমি নীরবতায়।
দেখো—
কে বেশি কাছে।
২০
শেষ পর্যন্ত কিছুই রইল না—
না সাধনা, না সাধক।
তবু সবই ছিল।
২১
আমি তীর্থে যাইনি আর,
পা দুটোই এখন তীর্থ।
২২
শিবকে ভয় পেও না,
ভয় পেও নিজের অচেতনতাকে।
২৩
যে মন পালায়,
সে জগৎকে দোষ দেয়।
২৪
আমি চোখ বন্ধ করলে কিছু দেখি না,
চোখ খুললে সব দেখি।
এই দেখাটাই ধ্যান।
২৫
নিয়মে বাঁধা ভক্তি শুকিয়ে যায়,
সচেতনতা থাকলে
এক নিশ্বাসই যথেষ্ট।
২৬
তুমি পুণ্য গোনো,
আমি অজ্ঞান ঝরাই।
২৭
শিব মানে মূর্তি নয়,
শিব মানে সাক্ষী।
২৮
যেখানে প্রেম, সেখানে ঈশ্বর;
যেখানে ঈশ্বর, সেখানে কোনো ভেদ নেই।
২৯
আমি কিছু অর্জন করিনি,
শুধু ভুলে থাকা ছেড়েছি।
৩০
শব্দ যত বাড়ে,
সত্য তত দূরে সরে।
৩১
তুমি যে জায়গায় বসে আছ,
সেইখানেই মুক্তি বসে আছে।
৩২
ভক্তি যদি ভয় থেকে আসে,
সে ভক্তি নয়।
৩৩
আমি দেহকে শাসন করিনি,
আমি দৃষ্টিকে শুদ্ধ করেছি।
৩৪
শিব কোনো ধারণা নন,
ধারণাই তাঁর পর্দা।
৩৫
যে নিজের সঙ্গে লড়ে,
সে এখনো আলাদা ভাবছে।
৩৬
মুক্তি কোনো ঘটনা নয়,
এ এক স্থায়ী স্বীকৃতি।
৩৭
আমি সময় ছাড়িনি,
আমি সময়ের মোহ ছাড়লাম।
৩৮
যে বেশি চায়,
সে কম দেখে।
৩৯
শিব নীরব—
তাই এত স্পষ্ট।
৪০
ধ্যান মানে পালানো নয়,
ধ্যান মানে থেমে দেখা।
৪১
আমি ত্যাগ করিনি সংসার,
আমি ত্যাগ করেছি ‘আমার’।
৪২
শিব আছেন আগে,
বিশ্বাস আসে পরে।
৪৩
যে প্রশ্ন ধরে রাখে,
সে দরজা খোলে না।
৪৪
আমি নিজের মধ্যে ঢুকলাম,
আর বাইরে যাওয়া থামল।
৪৫
যেখানে আমি নেই,
সেখানেই শান্তি।
৪৬
তুমি পূর্ণতা চাইছ,
কারণ নিজেকে অসম্পূর্ণ ভাবছ।
৪৭
শিবকে ডাকার দরকার নেই,
শিব কখনো যাননি।
৪৮
আমি আগুনে যাইনি,
আমি আগুন বুঝেছি।
৪৯
যে বোঝে,
সে প্রমাণ খোঁজে না।
৫০
শেষে বুঝলাম—
পথ ছিল,
চলছিলাম আমি-ই ভুল দিকে।
৫১
আমি ধাবিত হয়েছিলাম পাতালের গহ্বরে, উদ্ধার করেছি প্রাণবায়ু;
মাটি আর পাথর থেকে পেলাম তার সন্ধান;
নাদের সাথে জাগ্রত হল আমার কুণ্ডলিনী;
মুখে পান করেছিলাম সেই সুধা,
আমার ভেতরেই সমাহিত করি প্রাণশক্তি।
৫২
আমি এই পৃথিবীতে বীজরূপে আসিনি
জন্মচক্রে পড়ার জন্যে,
আমি নই মৌলিক পদার্থ—
মাটি, জল, আগুন, বায়ু বা আকাশ,
আমি অতিক্রম করেছি সর্বব্যাপী আত্মা ও ব্যক্তিসত্তাকে,
আমি সেই পরম চৈতন্য।