আধুনিক বিশ্বে প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা মানুষের জীবনকে যেমন সহজ, গতিশীল ও কর্মদক্ষ করে তুলেছে, তেমনি এর একটি নীরব কিন্তু অত্যন্ত ভয়াবহ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও দ্রুত দৃশ্যমান হচ্ছে, যা হলো ইলেকট্রনিক বর্জ্য বা ই-বর্জ্য (E-waste)। মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, স্মার্ট ঘড়ি, বিভিন্ন আধুনিক কৃষিযন্ত্র, ড্রোন, ডিজিটাল সেন্সর, জিপিএস-নির্ভর যন্ত্রপাতি এবং স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আজ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে।
প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, নতুন মডেলের প্রতি ভোক্তাদের ক্রমবর্ধমান আকর্ষণ এবং ইলেকট্রনিক পণ্যের তুলনামূলক স্বল্প আয়ুষ্কালের কারণে প্রতিনিয়ত বিপুল পরিমাণ পুরোনো যন্ত্রপাতি অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ছে। যথাযথভাবে সংগ্রহ, পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবস্থাপনা ও নিরাপদ প্রক্রিয়াজাতকরণ না হওয়ায় এসব বর্জ্য থেকে নির্গত বিষাক্ত উপাদান পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে মাটি, পানি ও বায়ু মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে এবং কৃষি উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্য গভীর সংকটের মুখে পড়ছে। তাই ই-বর্জ্য এখন আর কেবল একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, কৃষি এবং টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ।
ই-বর্জ্য বলতে এমন সব বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক পণ্যকে বোঝায়, যা ব্যবহার-অযোগ্য হয়ে গেছে অথবা দীর্ঘ ব্যবহারের পর সম্পূর্ণভাবে পরিত্যক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পুরোনো মোবাইল ফোন ও স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, টেলিভিশন, মনিটর, রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার, ওয়াশিং মেশিন, ব্যাটারি, চার্জার, সার্কিট বোর্ড, বৈদ্যুতিক তার, প্রিন্টার, স্ক্যানার, কৃষি প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত সেন্সর, জিপিএস ডিভাইস, স্মার্ট কন্ট্রোল ইউনিটসহ আরও অসংখ্য ধরনের ডিজিটাল ও আধুনিক যন্ত্র।
এসব যন্ত্রের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো এর ভেতরে থাকা সীসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিক, ক্রোমিয়াম, নিকেল, ব্রোমিনযুক্ত ফ্লেম রিটার্ডেন্ট, বিষাক্ত প্লাস্টিক ও বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক যৌগ। এসব উপাদান সহজে পরিবেশে ভেঙে যায় না; বরং দীর্ঘ সময় ধরে মাটিতে অবস্থান করে ধীরে ধীরে মাটির জৈবগুণ নষ্ট করে এবং উর্বরতা হ্রাস করে দেয়। উদ্ভিদের শিকড়ের মাধ্যমে এসব বিষাক্ত উপাদান ফসলের মধ্যে প্রবেশ করে এবং ক্রমশ খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানুষ ও প্রাণীর শরীরে জমা হতে থাকে। এর ফলে ক্যান্সার, স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি, কিডনি ও যকৃতের জটিলতা, প্রজনন সমস্যা এবং শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে মারাত্মক বিরূপ প্রভাবসহ নানা ধরনের জটিল রোগের ঝুঁকি ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে।
ই-বর্জ্য যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা না করা হলে ধীরে ধীরে আমাদের মাটি, পানি, বায়ু এবং সমগ্র খাদ্যব্যবস্থা ক্রমশ বিষাক্ত ও অনিরাপদ হয়ে উঠবে। এর ক্ষতিকর প্রভাব কেবল বর্তমান প্রজন্মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও এর দীর্ঘমেয়াদি বোঝা বহন করতে হবে।
কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে ই-বর্জ্যের ক্ষতিকর প্রভাব আরও গভীর, বিস্তৃত ও বহুমাত্রিকভাবে দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। ই-বর্জ্য থেকে নির্গত ভারী ধাতু কৃষিজমিতে ধীরে ধীরে জমা হয়ে মাটির স্বাভাবিক জৈবিক কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে এবং উপকারী অণুজীব ধ্বংস করে দেয়, যা মাটির প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করে। ফলে মাটির উর্বরতা ক্রমাগতভাবে হ্রাস পেতে থাকে এবং কৃষি উৎপাদনশীলতাও উল্লেখযোগ্যভাবে ও ধারাবাহিকভাবে কমে যায়। একই সঙ্গে বৃষ্টির পানির মাধ্যমে এসব বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদান ধীরে ধীরে মাটির গভীরে প্রবেশ করে ভূগর্ভস্থ পানিকে দূষিত করে তোলে এবং পরবর্তীতে নদী, খাল, বিল ও পুকুরে পৌঁছে জলজ পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্যকে সম্পূর্ণভাবে নষ্ট করে দেয়। অনেক ক্ষেত্রেই তামা বা অন্যান্য মূল্যবান ধাতু সংগ্রহের উদ্দেশ্যে খোলা জায়গায় ই-বর্জ্য পোড়ানো হয়, যার ফলে ডাইঅক্সিন, ফিউরানসহ অত্যন্ত বিষাক্ত ও ক্ষতিকর গ্যাস বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরিবেশকে আরও বিপজ্জনক ও অস্বাস্থ্যকর করে তোলে।
দূষিত মাটিতে উৎপাদিত শস্য, শাকসবজি ও ফলমূলের মধ্যে ভারী ধাতুর উপস্থিতি ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং একইভাবে দূষিত পানি ব্যবহার করলে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর শরীরেও বিষাক্ত উপাদান ধীরে ধীরে জমা হতে থাকে। এর ফলস্বরূপ খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয় এবং জনস্বাস্থ্য দীর্ঘমেয়াদি, জটিল ও বহুমাত্রিক ঝুঁকির মুখে পড়ে।
বাংলাদেশে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার ফলে ই-বর্জ্যের পরিমাণও সমান গতিতে ক্রমাগত বাড়ছে। স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ইন্টারনেটভিত্তিক যন্ত্রপাতি এবং কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির বিস্তার দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও একই সঙ্গে ই-বর্জ্য সমস্যাকে আরও জটিল ও বহুমাত্রিক করে তুলছে। বিশেষ করে স্মার্ট কৃষি ব্যবস্থায় বর্তমানে মাটির সেন্সর, এনপিকে সেন্সর, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ যন্ত্র, ড্রোন প্রযুক্তি, জিপিএসভিত্তিক কৃষিযন্ত্র এবং স্বয়ংক্রিয় সেচ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এসব উন্নত প্রযুক্তির যন্ত্র একসময় অচল, অকার্যকর বা প্রযুক্তিগতভাবে অপ্রচলিত হয়ে ই-বর্জ্যে পরিণত হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশে এখনো নিরাপদ সংগ্রহ, পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশবান্ধব পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা পর্যাপ্তভাবে গড়ে ওঠেনি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুরোনো ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি সাধারণ আবর্জনার সঙ্গে ফেলে দেওয়া হয় কিংবা খোলা জায়গায় অনিয়ন্ত্রিতভাবে পুড়িয়ে ফেলা হয়। এর ফলে পরিবেশ দূষণ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। তাই কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার যত বেশি বাড়বে, পুরোনো যন্ত্রপাতির নিরাপদ ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনাও তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সচেতনতার অভাবও একটি অন্যতম বড় ও গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে দিন দিন আরও প্রকট আকার ধারণ করছে। এখনো সমাজের অনেক মানুষই জানেন না যে ব্যবহৃত ব্যাটারি, চার্জার, মোবাইল ফোন কিংবা অন্যান্য বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক যন্ত্র সাধারণ আবর্জনার সঙ্গে ফেলে দেওয়া একেবারেই উচিত নয়। ফলে এসব বর্জ্য অবহেলায় ভাগাড়ে জমা হয়ে ধীরে ধীরে পরিবেশে বিষাক্ত পদার্থ ছড়িয়ে দেয় এবং দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক ক্ষতি সৃষ্টি করে।
এই বাস্তবতায় পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে সমন্বিত ও সুপরিকল্পিতভাবে জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বাস্তবমুখী ও কার্যকর শিক্ষা প্রদান করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ সচেতন নাগরিকই একটি নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও টেকসই পরিবেশ গড়ে তোলার প্রধান ও শক্তিশালী ভিত্তি।
ই-বর্জ্য সমস্যা মোকাবিলায় ব্যক্তি, সমাজ, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারের সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। অপ্রয়োজনীয় ইলেকট্রনিক পণ্য কেনার প্রবণতা কমাতে হবে এবং দীর্ঘস্থায়ী, মানসম্পন্ন ও পরিবেশবান্ধব পণ্যের ব্যবহারকে আরও বেশি উৎসাহিত করতে হবে। যন্ত্রপাতি মেরামত করে পুনরায় ব্যবহার, প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যের কাছে হস্তান্তর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা সামাজিক প্রতিষ্ঠানে দান এবং অনুমোদিত ও নিরাপদ পুনর্ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে ই-বর্জ্য যথাযথভাবে জমা দেওয়ার একটি সুসংগঠিত সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় মূল্যবান ধাতু পুনরুদ্ধার, পরিবেশবান্ধব পুনর্ব্যবহার শিল্প গড়ে তোলা এবং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারিত দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করাও সময়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দাবি। পাশাপাশি কার্যকর জাতীয় ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতিমালা প্রণয়ন, বিদ্যমান আইনের কঠোর ও বাস্তবভিত্তিক বাস্তবায়ন, পরিবেশবান্ধব শিল্পনীতি গ্রহণ এবং স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে পরিবেশ ও ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
কৃষি, পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্য একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে এবং অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত একটি একক ও সংবেদনশীল ব্যবস্থার অংশ। ই-বর্জ্য যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা না করা হলে ধীরে ধীরে আমাদের মাটি, পানি, বায়ু এবং সমগ্র খাদ্যব্যবস্থা ক্রমশ বিষাক্ত ও অনিরাপদ হয়ে উঠবে। এর ক্ষতিকর প্রভাব কেবল বর্তমান প্রজন্মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও এর দীর্ঘমেয়াদি বোঝা বহন করতে হবে। ই-বর্জ্য কোনো সাধারণ বর্জ্য নয়; এটি এক ধরনের নীরব বিষ, যা অদৃশ্যভাবে ও ধারাবাহিকভাবে পরিবেশ এবং মানবসভ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাই প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কেও সমানভাবে সচেতন থাকা এখন সময়ের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন।
প্রতিটি নাগরিক যদি ই-বর্জ্য আলাদাভাবে সংরক্ষণ করেন, অনুমোদিত ও নিরাপদ প্রতিষ্ঠানের কাছে জমা দেন এবং পুনর্ব্যবহার কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন, তাহলে এই ক্রমবর্ধমান সংকট অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এখনই পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের উপযুক্ত সময় এসেছে। কারণ নিরাপদ পরিবেশ মানেই নিরাপদ কৃষি, নিরাপদ খাদ্য, সুস্থ মানুষ এবং একটি টেকসই ভবিষ্যৎ গঠনের ভিত্তি। আজকের সচেতন ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্তই আগামী দিনের সবুজ, নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৃথিবী নির্মাণের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
লেখক: সিনিয়র কৃষিবিদ, প্রাবন্ধিক, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন।rssarker69@gmail.com
এইচআর/এএসএম