ফোনের ওপারে একজন ‘কর্মকর্তা’। কণ্ঠে দৃঢ়তা। কথায় তাড়া। হোয়াটসঅ্যাপের প্রোফাইলে সেনাবাহিনীর পোশাক পরা একজন কর্মকর্তার ছবি। নামের পাশে পদবি। সব মিলিয়ে এমন এক আবহ, যেখানে সন্দেহ করার চেয়ে বিশ্বাস করাই যেন স্বাভাবিক। বলা হলো, আপনার মোবাইল নম্বর একটি সরকারি সফটওয়্যারে আটকে আছে। নির্বাচনের সময়ের একটি দায়িত্বের সঙ্গে সেটি যুক্ত। সমস্যা সমাধানের জন্য মোবাইলে একটি কোড যাবে। কোডটি জানিয়ে দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু যে মানুষটি ফোন করেছেন, তিনি সেই কর্মকর্তা নন। ছবিটি সত্য, পরিচয়টি মিথ্যা।
এই একটি বাক্যই আমাদের ডিজিটাল সময়ের সবচেয়ে বড় বিপদের একটি চিত্র এঁকে দেয়—ছবি সত্য হতে পারে, কিন্তু মানুষটি মিথ্যা। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এমন প্রতারণার বেশ কিছু ভয়ংকর তথ্য সামনে এসেছে। সরকারি ওয়েবসাইট, সংবাদমাধ্যম কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে পুলিশ, সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তার ছবি সংগ্রহ করে হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলছে প্রতারক চক্র। সেই পরিচয়ের আড়ালে নাগরিকদের ফোন করা হচ্ছে, ভয় দেখানো হচ্ছে, কখনো সরকারি মামলার কথা বলা হচ্ছে, কখনো সিম বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখানো হচ্ছে। এরপর চাওয়া হচ্ছে ওটিপি, পিন, পাসওয়ার্ড বা আর্থিক তথ্য। ঢাকায় এ ধরনের প্রতারণার ঘটনায় মাসে ৩০ থেকে ৪০টি পর্যন্ত সাধারণ ডায়েরি হচ্ছে। গত ছয় মাসে প্রায় ২০টি মামলা হয়েছে। এর বাইরে কত মানুষ প্রতারিত হয়েছেন কিন্তু অভিযোগ করেননি, তার হিসাব নেই। সংখ্যার এই অদৃশ্য অংশটিই সম্ভবত সবচেয়ে ভয়াবহ। কারণ প্রতারণার অর্থ কেবল হারানো টাকা নয়। এর সঙ্গে হারায় মানুষের নিরাপত্তাবোধ, প্রযুক্তির ওপর আস্থা, কখনো সামাজিক মর্যাদা, কখনো বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা সঞ্চয়।
প্রযুক্তি যত দ্রুত বদলাবে, প্রতারণার কৌশলও তত দ্রুত বদলাবে। আজ হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া কর্মকর্তা, কাল হয়তো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি কণ্ঠস্বর, পরশু হয়তো ভিডিওকলের অপর প্রান্তে দেখা যাবে এমন একটি মুখ, যাকে আমরা চিনি। তখন শুধু ‘দেখেছি’ বলে বিশ্বাস করার সুযোগ আরও কমে যাবে।
ডিজিটাল প্রতারণার চরিত্রও বদলে গেছে। একসময় প্রতারককে চিনতে কিছুটা সময় লাগত। এখন সে আপনার সামনে আসে না। তার মুখ নেই, অফিস নেই, দরজায় কড়া নাড়ার প্রয়োজন নেই। একটি ফোন, একটি হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট, একটি চুরি করা ছবি—এই সামান্য উপকরণেই সে তৈরি করে ফেলে একটি বিশ্বাসযোগ্য পরিচয়। এখানে প্রযুক্তির চেয়েও বড় অস্ত্র মানুষের মনস্তত্ত্ব।
প্রতারক জানে, মানুষ ভয় পেলে ভুল সিদ্ধান্ত নেয়। তাই সে প্রথমে ভয় তৈরি করে। ‘আপনার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে’, ‘আপনার নম্বর অপরাধে ব্যবহার হয়েছে’, ‘আপনার ব্যাংক হিসাব তদন্তের আওতায়’, ‘আপনার সিম বন্ধ হয়ে যাবে’—এমন কথায় মানুষকে কয়েক মিনিটের মধ্যে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে ফেলা হয়। এরপর আসে সমাধানের প্রস্তাব—‘এই কোডটি দিন’, ‘এই লিংকে ঢুকুন’, ‘এই অ্যাপটি ইনস্টল করুন’। অর্থাৎ আগে ভয়, পরে ফাঁদ, শেষে লুট।
এটি নিছক প্রযুক্তিগত অপরাধ নয়। এটি মানুষের আস্থাকে পুঁজি করে পরিচালিত এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক অপরাধ। সাম্প্রতিক ঘটনায় এমনও দেখা গেছে, প্রতারকেরা পুলিশ কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে একজনকে জানিয়েছে, তাঁর মোবাইল নম্বর ক্লোন করে পুলিশের নামে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। পরে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করে পরিচিতজনদের কাছে টাকা চাওয়া হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তাঁর পরিচিতদের কাছ থেকে প্রায় দেড় লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। ঘটনায় ১১ জনকে গ্রেফতারের কথাও প্রতিবেদনে এসেছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ করা দরকার। প্রতারকরা শুধু একজন ব্যক্তির টাকা চুরি করেনি; তারা তাঁর পরিচয়টিকেই চুরি করেছে। তাঁর পরিচিতদের কাছে তিনি যে মানুষ হিসেবে বিশ্বাসযোগ্য ছিলেন, সেই বিশ্বাসকে ব্যবহার করেই টাকা নেওয়া হয়েছে।
ডিজিটাল যুগের প্রতারণার সবচেয়ে ভয়ংকর বিবর্তন এখানেই। আগে চোর আপনার পকেট থেকে টাকা নিত। এখন চোর আপনার পরিচয় ধার করে আপনার পরিচিতের পকেট থেকেও টাকা নিতে পারে। আমাদের সতর্ক হওয়ার জায়গাটি তাই আরও বড়।
আমরা প্রায়ই ভাবি, ‘আমি এসব বুঝি না’, অথবা ‘আমার সঙ্গে এমন হবে না।’ এই আত্মবিশ্বাসের মধ্যেই বিপদ লুকিয়ে আছে। প্রতারকরা প্রযুক্তিবিদ খুঁজে বেড়ায় না; তারা খুঁজে নেয় এমন একজন মানুষকে, যাকে কয়েক মিনিটের মধ্যে বিশ্বাস করানো যায়। অবসরপ্রাপ্ত মানুষ, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, শিক্ষার্থী—কারও জন্যই এই ঝুঁকি দূরের নয়। বরং যাঁদের ডিজিটাল নিরাপত্তা সম্পর্কে ধারণা কম, তাঁরা বেশি ঝুঁকিতে। তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রযুক্তিকে ভয় পেতে হবে। বরং প্রযুক্তি ব্যবহারের সঙ্গে একটি নতুন নাগরিক অভ্যাস তৈরি করতে হবে—যাচাই না করে বিশ্বাস নয়।
কেউ ফোন করে যত বড় পরিচয়ই দিক, ফোন কেটে দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির অফিসিয়াল নম্বরে নিজে ফোন করে পরিচয় নিশ্চিত করতে হবে। কোনো সরকারি কর্মকর্তা ফোনে ওটিপি, পিন, পাসওয়ার্ড কিংবা ব্যাংকিংয়ের গোপন তথ্য চাইবেন—এমন ধারণাই বাদ দিতে হবে।
ওটিপি আসলে ডিজিটাল দরজার চাবি। চাবি যেমন অপরিচিতের হাতে দেওয়া হয় না, ওটিপিও তেমনি কাউকে দেওয়া যায় না। কেউ যদি ফোন করে বলে, ‘আপনার নিরাপত্তার জন্য কোডটি বলুন’, বুঝতে হবে—নিরাপত্তার কথা বলেই হয়তো নিরাপত্তা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। আরেকটি বিষয় আমাদের বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে—প্রোফাইলের ছবি পরিচয়ের প্রমাণ নয়।
একজন সেনা কর্মকর্তা, পুলিশ কর্মকর্তা, সরকারি কর্মকর্তা কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধানের ছবি অনলাইনে পাওয়া কঠিন নয়। প্রতারকরা সেই ছবিই ব্যবহার করছে। ফলে ইউনিফর্ম দেখলেই বিশ্বাস করার দিন শেষ। ডিজিটাল দুনিয়ায় পোশাকও নকল হতে পারে, নামও নকল হতে পারে, ছবি নকল হতে পারে, এমনকি কণ্ঠস্বরও প্রযুক্তির সাহায্যে নকল করা সম্ভব।
সন্দেহ তাই এখন আর অবিশ্বাসের নাম নয়; সন্দেহই নিরাপত্তার প্রথম ধাপ। কিন্তু নাগরিককে শুধু সতর্ক করে রাষ্ট্র তার দায়িত্ব শেষ করতে পারে না। ডিজিটাল প্রতারণা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান, মোবাইল অপারেটর এবং প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জরুরি। একজন মানুষ প্রতারণার শিকার হওয়ার পর দ্রুত অভিযোগ জানালে তাঁর টাকা কোথায় গেছে, কোন হিসাবে গেছে, কোন নম্বর ব্যবহার হয়েছে—এসব শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা থাকতে হবে।
বিশেষ করে অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে ‘গোল্ডেন আওয়ার’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টাকা হাতবদল হয়ে একাধিক হিসাবে চলে যাওয়ার আগেই সেটি আটকে দেওয়ার ব্যবস্থা যত দ্রুত করা যাবে, ক্ষতি তত কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে ডিজিটাল অপরাধের তদন্তে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে। শুধু প্রতারককে গ্রেফতার করলেই হবে না; তার পেছনে থাকা পুরো নেটওয়ার্ক খুঁজে বের করতে হবে। কে ছবি সংগ্রহ করছে, কে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলছে, কে ফোন করছে, কে টাকা তুলছে—প্রতিটি স্তর শনাক্ত করা জরুরি। কারণ একজন প্রতারক গ্রেফতার হলেই প্রতারণা বন্ধ হয় না। একটি চক্র ভাঙতে হলে তার অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ভাঙতে হয়। আরেকটি বড় সমস্যা—ভুক্তভোগীর নীরবতা।
প্রতারিত হওয়ার পর অনেকেই লজ্জায় কাউকে জানান না। কেউ ভাবেন, মানুষ হাসবে। কেউ মনে করেন, পুলিশে গেলে আরও ঝামেলা হবে। কেউ আবার মনে করেন, টাকা তো গেছেই, অভিযোগ করে কী লাভ। এই নীরবতাই প্রতারকের শক্তি।
প্রতারণার শিকার ব্যক্তিকে দোষী নয়, ভুক্তভোগী হিসেবে দেখতে হবে। অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। দ্রুত সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানে জরুরি প্রতারণা প্রতিরোধ হেল্পলাইন কার্যকর রাখতে হবে।স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়েও ডিজিটাল সাক্ষরতার অর্থ নতুন করে ভাবতে হবে। শুধু কম্পিউটার চালানো, ই-মেইল পাঠানো কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার শেখানো যথেষ্ট নয়। কীভাবে পরিচয় যাচাই করতে হয়, কীভাবে ফিশিং লিংক শনাক্ত করতে হয়, কেন ওটিপি গোপন রাখতে হয়, অ্যাকাউন্ট হ্যাক হলে কী করতে হবে—এসবও নাগরিক শিক্ষার অংশ হওয়া উচিত।
পরিবারের মধ্যেও এ বিষয়ে কথা বলা দরকার। বিশেষ করে প্রবীণ বাবা-মা কিংবা প্রযুক্তিতে তুলনামূলক অনভিজ্ঞ স্বজনদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করা প্রয়োজন। একটি পরিবারের একজন সদস্য সতর্ক হলে শুধু তাঁর নিজের নয়, পুরো পরিবারের ডিজিটাল নিরাপত্তা বাড়তে পারে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ডিজিটাল প্রতারণা শুধু টাকা চুরির অপরাধ নয়; এটি বিশ্বাস চুরির অপরাধ। যে মানুষটি আপনার বাবার পরিচয় ব্যবহার করে আপনার কাছে টাকা চাইছে, সে আপনার টাকা নেওয়ার আগে আপনার আবেগকে চুরি করছে। যে মানুষটি পুলিশের ছবি ব্যবহার করে আপনাকে ভয় দেখাচ্ছে, সে আপনার রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাকেও ব্যবহার করছে। যে মানুষটি বন্ধুর হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট দখল করে সাহায্যের কথা বলে টাকা চাইছে, সে বন্ধুত্বের জায়গাটিকেই অস্ত্র বানাচ্ছে।
এই কারণে ডিজিটাল নিরাপত্তার লড়াই কেবল প্রযুক্তিবিদদের লড়াই নয়। এটি রাষ্ট্রের, প্রতিষ্ঠানের, পরিবারের এবং প্রতিটি নাগরিকের লড়াই। প্রযুক্তি যত দ্রুত বদলাবে, প্রতারণার কৌশলও তত দ্রুত বদলাবে। আজ হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া কর্মকর্তা, কাল হয়তো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি কণ্ঠস্বর, পরশু হয়তো ভিডিওকলের অপর প্রান্তে দেখা যাবে এমন একটি মুখ, যাকে আমরা চিনি। তখন শুধু ‘দেখেছি’ বলে বিশ্বাস করার সুযোগ আরও কমে যাবে। তাই আমাদের নতুন একটি সামাজিক বোধ তৈরি করতে হবে—দেখা মানেই সত্য নয়, শোনা মানেই সত্য নয়, পরিচয় বলা মানেই পরিচয় প্রমাণিত নয়।
একটি ফোনকলের কয়েক মিনিট আপনার জীবনের বহু বছরের সঞ্চয় কেড়ে নিতে পারে। আবার সেই কয়েক মিনিটেই আপনি প্রতারককে থামিয়েও দিতে পারেন। পার্থক্যটি তৈরি করবে একটি ছোট্ট অভ্যাস—থামুন, ভাবুন, যাচাই করুন। ডিজিটাল যুগে হয়তো এটাই আমাদের সবচেয়ে জরুরি নাগরিক মন্ত্র। কারণ আগামী দিনের চোর দরজায় এসে কড়া নাও নাড়তে পারে। সে হয়তো আপনার ফোনের পর্দায় ভেসে উঠবে—পরিচিত একটি মুখ নিয়ে, পরিচিত একটি নাম নিয়ে, বিশ্বাসযোগ্য একটি কণ্ঠ নিয়ে।
তখন প্রশ্ন হবে না, ‘ছবিটি কার?’
প্রশ্ন হবে—‘মানুষটি আসলে কে?’
আর সেই প্রশ্নটি করতে শেখাই হবে ডিজিটাল প্রতারণার বিরুদ্ধে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।drharun.press@gmail.com
এইচআর/এমএফএ/এএসএম