কবরের শেষ চিহ্নটুকু আঁকড়ে ধরে প্রিয়জনের স্মৃতি রোমন্থন করে মানুষ। কেউ পাকা করে বাঁধিয়ে, কেউ লোহার খাঁচা তৈরি করেন কবরের বাহ্যিক সুরক্ষায়। সেই কবর খুঁড়ে কঙ্কাল চুরি স্বজনদের কাছে নিঃসন্দেহে বেদনাদায়ক।
দেশের বিভিন্ন স্থানে কবর থেকে মরদেহ ও কঙ্কাল চুরির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অভিযোগ রয়েছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র কবর থেকে মরদেহ উত্তোলন করে তা প্রক্রিয়াজাত করে মানবকঙ্কালে রূপান্তর করছে, যা পরবর্তীসময়ে বিক্রি হয় উচ্চমূল্যে। আর কবর থেকে এসব কঙ্কাল সরাসরি চলে যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের কাছে কিংবা তাদের ক্লাসরুমে।
প্রথম পর্ব
আরও পড়ুন
ঢাকায় মৃত্যুর পরও জায়গার লড়াই, এক কবরের বিপরীতে ‘৫৫ জন’
এ কাজে পেশাদার কবরচোর থেকে শুরু করে কিছু মেডিকেল ও ডেন্টাল শিক্ষার্থী সম্পৃক্ত বলে তথ্য-প্রমাণ আছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কাছে।
চলতি বছরের ৯ মার্চ রাজধানীতে অর্ধশত মানবকঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় করা মামলার তদন্তে উঠে এসেছে, কবর থেকে মরদেহ ও কঙ্কাল সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মেডিকেল শিক্ষার্থীদের কাছে বিক্রির একটি ভয়ংকর সংঘবদ্ধ চক্রের তথ্য।
দ্বিতীয় পর্ব
আরও পড়ুন
কবরেও টাকার দাপট
এ চক্রটির কর্মকাণ্ড শুধু একটি স্থান বা কয়েকজন ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয়।
মেডিকেল শিক্ষার প্রসারে বাড়ছে কঙ্কালের চাহিদা
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে মোট ১০৮টি মেডিকেল কলেজ রয়েছে। এর মধ্যে ৩৮টি সরকারি মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস কোর্সে আসন পাঁচ হাজার ১০০টি এবং ৭০টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে আসন ছয় হাজার ১টি। সব মিলিয়ে এমবিবিএস কোর্সে আসন সংখ্যা ১১ হাজার ১০১টি।
পাশাপাশি দেশে ডেন্টাল কলেজ ও ইউনিট রয়েছে ৩৫টি। এর মধ্যে সরকারি ৯টি এবং বেসরকারি ২৬টি। এসব প্রতিষ্ঠানে মোট আসন ১ হাজার ৯৫০টি।
মেডিকেল শিক্ষার প্রথম দিকের অন্যতম প্রধান বিষয় অ্যানাটমি। প্রথম প্রফেশনাল পর্যায়ের প্রায় ১৮ মাসের পড়াশোনায় মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও হাড়ের গঠন সম্পর্কে বিস্তারিত শেখানো হয়। ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষার প্রস্তুতিতেও মানবকঙ্কাল এবং হাড় গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা উপকরণ।
ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে বিক্রি হচ্ছে কঙ্কাল
প্রথম বর্ষে শিক্ষার্থীদের মাথার খুলি, হাত-পায়ের হাড়, বুকের খাঁচা, মেরুদণ্ডসহ মানবদেহের প্রায় সব হাড় সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হয়। ডেন্টাল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ করে মাথার খুলি ও চোয়ালের হাড় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজের একাধিক জ্যেষ্ঠ শিক্ষক ও কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুই দশকের বেশি সময় আগে মেডিকেল ও ডেন্টাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এবং শিক্ষার্থী তুলনামূলক কম থাকায় একটি বা দুটি কঙ্কাল দিয়ে ১৫ থেকে ২০ জন শিক্ষার্থী দলগতভাবে পড়াশোনা করতো।
তারা জানান, ২০০০ সালে দেশে সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ছিল মাত্র ২৫টি। সরকারি ১৩টি ও বেসরকারি ১২টি। একই সময়ে পূর্ণাঙ্গ সরকারি ডেন্টাল কলেজ ছিল একটি (ঢাকা ডেন্টাল কলেজ)। কয়েকটি সরকারি মেডিকেল কলেজের সঙ্গে ছোট ডেন্টাল ইউনিট ছিল। এছাড়া বেসরকারি ডেন্টাল কলেজ ছিল আনুমানিক তিন-চারটি।
বর্তমানে মেডিকেল ও ডেন্টাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে ব্যক্তিগতভাবে একটি কঙ্কাল সেট রাখার প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। এ ব্যক্তিগত চাহিদা কাজে লাগিয়েই একটি অবৈধ বাজার গড়ে উঠেছে বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া যায়।
কঙ্কালের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে যা বলছেন শিক্ষার্থীরা
মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজের প্রথম এবং দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হলো মানবদেহের কঙ্কাল বা হাড়। অ্যানাটমি ক্লাসে যথাযথ ধারণা লাভ ও প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য আসল কঙ্কালের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত শিক্ষার্থীরা জ্যেষ্ঠ (সিনিয়র) শিক্ষার্থী অথবা বিভিন্ন অনলাইন ও অফলাইন গ্রুপের মাধ্যমে ব্যবহৃত আসল মানবকঙ্কাল সংগ্রহ করেন। এছাড়া বাজারে কৃত্রিম বা আর্টিফিশিয়াল কঙ্কাল কিনতে পাওয়া যায়।
শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক যে কঙ্কাল দিয়ে প্র্যাকটিক্যাল করান, সেটি আসল মানবকঙ্কাল। আসল কঙ্কালের নিজস্ব কিছু স্পষ্ট সুবিধা রয়েছে। শিক্ষক ক্লাসে পড়ানোর পর বাসায় এসে সেটি নিজের হাতে নিয়ে ধরে ধরে চর্চা করা যায় এবং স্যারের কাছে ভাইভা দেওয়ার আগে বন্ধুদের ডেমো দিয়ে ঝালিয়ে নেওয়া যায়।-রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের এমবিবিএস শিক্ষার্থী মানুয়েল ত্রিপুরা
রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের এমবিবিএস শিক্ষার্থী মানুয়েল ত্রিপুরা জাগো নিউজকে বলেন, ‘শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক যে কঙ্কাল দিয়ে প্র্যাকটিক্যাল করান, সেটি আসল মানবকঙ্কাল। আসল কঙ্কালের নিজস্ব কিছু স্পষ্ট সুবিধা রয়েছে। শিক্ষক ক্লাসে পড়ানোর পর বাসায় এসে সেটি নিজের হাতে নিয়ে ধরে ধরে চর্চা করা যায় এবং স্যারের কাছে ভাইভা দেওয়ার আগে বন্ধুদের ডেমো দিয়ে ঝালিয়ে নেওয়া যায়।’
সবচেয়ে বড় সুবিধা সঠিক অ্যানাটমিক্যাল পজিশন শেখা জানিয়ে এই শিক্ষার্থী বলেন, ‘অ্যানাটমিতে হাড় সম্পর্কিত যে কোনো তথ্য পড়ার আগে তার সঠিক পজিশন নির্ধারণ করাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। নিজের কাছে আসল হাড় থাকলে মূল কনসেপ্ট পরিষ্কার হয়, প্রফেশনাল পরীক্ষার চূড়ান্ত প্রস্তুতি সহজ হয় এবং ভাইভা পরীক্ষায় আটকে যাওয়ার ঝুঁকি কমে।’
আসল ও কৃত্রিম কঙ্কালের পার্থক্য তুলে ধরে ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ইশরাত জাহান আফনান বলেন, ‘মানবদেহের আসল কঙ্কাল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয় হতে থাকে। ফলে অনেক সময় সূক্ষ্ম দাগ বা চিহ্ন বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, আর্টিফিসিয়াল কঙ্কাল ক্ষয় হয় না এবং দীর্ঘস্থায়ী হয়।’
তিনি বলেন, ‘শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের সুবিধার জন্য আসল ও নকল- দুই ধরনের কঙ্কালই রাখা হয়। আসল কঙ্কালে কোনো জয়েন্ট বা পয়েন্ট স্পষ্ট বোঝা না গেলে আমরা আর্টিফিসিয়াল কঙ্কালের সহায়তা নিই। তবে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য মেডিকেল শিক্ষার্থীদের কাছে আসল কঙ্কালের চাহিদাই সবচেয়ে বেশি।’
মেডিকেল শিক্ষার প্রাথমিক ধাপে তত্ত্বীয় জ্ঞানের পাশাপাশি বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটাতে আসল মানবকঙ্কালের ভূমিকা অপরিসীম বলে মনে করেন শিক্ষার্থীরা।
প্রাথমিক পড়াশোনা বা থিওরি ক্লাসের জন্য কৃত্রিম কঙ্কাল হলেই চলে। কিন্তু প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা, ওরাল সার্জারি ও অ্যানেস্থেসিয়ার মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিখুঁতভাবে শেখার জন্য ডেন্টাল শিক্ষার্থীদের আসল কঙ্কাল বিশেষ করে আসল মাথার খুলি দেখা জরুরি।-পাইওনিয়ার ডেন্টাল কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আবুহেনা কামাল
পাইওনিয়ার ডেন্টাল কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আবুহেনা কামাল জাগো নিউজকে বলেন, ‘মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের মতো আমাদের মানবদেহের কঙ্কালের সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সম্পর্কে জানাটা জরুরি নয়। প্রাথমিক পড়াশোনা বা থিওরি ক্লাসের জন্য কৃত্রিম কঙ্কাল হলেই চলে। কিন্তু প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা, ওরাল সার্জারি ও অ্যানেস্থেসিয়ার মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিখুঁতভাবে শেখার জন্য ডেন্টাল শিক্ষার্থীদের আসল কঙ্কাল বিশেষ করে আসল মাথার খুলি দেখা জরুরি।’
যে প্রক্রিয়ায় কঙ্কাল সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করা হয়
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, কঙ্কাল বেচাকেনার এ অবৈধ কার্যক্রমে একাধিক স্তরে কাজ করা হয়। কবর থেকে মরদেহ বা কঙ্কাল উত্তোলনের জন্য ব্যবহার করা হয় পেশাদার ব্যক্তিদের। পরে সংগৃহীত হাড়গুলো প্রক্রিয়াজাত করে শিক্ষার্থীদের কাছে বিক্রির উপযোগী করা হয়।
বনানী কবরস্থান/ছবি: বিপ্লব দিক্ষীৎ
গত মার্চের মামলায় গ্রেফতার হওয়া চারজনের মধ্যে দুজন কবর থেকে কঙ্কাল উত্তোলনের সঙ্গে এবং অন্য দুজন কঙ্কাল সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত বলে তদন্তে জানা যায়। গ্রেফতারদের মধ্যে কাজী ও আবুল কালাম নামের দুজন মেডিকেল শিক্ষার্থী।
তদন্তে তাদের সম্পর্কে জানা যায়, তারা তৃতীয় বর্ষে পড়লেও দীর্ঘদিন একই বর্ষে ছিলেন এবং নিয়মিত পড়াশোনা বা পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছিলেন না।
তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, কঙ্কাল উত্তোলনকারীরা ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন দূরবর্তী এলাকা থেকে কম দামে কঙ্কাল সংগ্রহ করতেন। বৃহত্তর ময়মনসিংহ, গাজীপুর, জামালপুর ও শেরপুরের বিভিন্ন কবরস্থান থেকে হাড় সংগ্রহের তথ্যও জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া যায়।
৫ হাজারে সংগ্রহ, বিক্রি ৫০ হাজার
তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, একটি কঙ্কাল দূরবর্তী এলাকা থেকে সংগ্রহ করতে প্রায় ৫ হাজার টাকা ব্যয় হতো। প্রক্রিয়াজাত করার পর সেটি বিক্রি করা হতো ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকায়। বড় ক্রেতার ক্ষেত্রে দাম এক থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত উঠতো বলেও তদন্তে উঠে এসেছে। কম বিনিয়োগে বেশি মুনাফার সুযোগই এই অবৈধ বাণিজ্যে অপরাধীদের আকৃষ্ট করছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
কঙ্কালের চাহিদা ও উচ্চমূল্য কেন্দ্র করে সংগ্রাহক, প্রক্রিয়াজাতকারী, মধ্যস্বত্বভোগী ও ক্রেতাদের মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে বলে দাবি পুলিশের।
ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে কঙ্কাল বিক্রি!
ফেসবুকে ‘প্রিমিয়াম বোনস্, বোনস্ বিডি বাই/সেল, বোনস্ বাজার অব বাংলাদেশ এবং মেডিকেল বোনস্ বাই/সেলসহ ৫০টির বেশি পেজে মানুষের কঙ্কাল ও হাড় বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। এক সেট মানবকঙ্কাল ৩০ হাজার টাকা, শুধু দাঁতের সেট এক হাজার টাকা- অনেক পোস্টে এমন দামও দেওয়া রয়েছে। এই পেজগুলো অরিজিনাল মানবকঙ্কাল নিশ্চয় দেশ থেকেই সংগ্রহ করে বিক্রি করে।
ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে বিক্রি হচ্ছে কঙ্কাল
এসব কঙ্কালের বড় একটি উৎস বেওয়ারিশ মরদেহ বলে জানা যায় একাধিক সূত্রে। বেওয়ারিশ মরদেহ দাফনের হিসাব মিললেও পরে এসব মরদেহ কতদিন কবরে থাকে কিংবা এগুলোই প্রসেস করে কঙ্কাল হিসেবে বিক্রি করা হয় কি না সে বিষয়ে কোনো প্রামণিক দলিল পাওয়া যায়নি।
সাড়ে ৩ বছরে ২০৫৬ বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন
আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের দাফন সেবা কর্মকর্তা কামরুল আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ২ হাজার ৫৬টি বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন করা হয়েছে। এসব মরদেহের বেশিরভাগই জুরাইন ও রায়েরবাজার বধ্যভূমি কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।’
আমরা হাসপাতাল থেকে যথাযথ কাগজপত্রসহ মরদেহ গ্রহণ করি এবং কবরস্থানে পৌঁছে দিই। মরদেহ হস্তান্তরের পর এর দায়িত্ব কবরস্থান কর্তৃপক্ষের। আমরা পরে এগুলো পর্যবেক্ষণ করি না।-আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের দাফন সেবা কর্মকর্তা কামরুল আহমেদ
তিনি বলেন, ‘আমরা হাসপাতাল থেকে যথাযথ কাগজপত্রসহ মরদেহ গ্রহণ করি এবং কবরস্থানে পৌঁছে দিই। মরদেহ হস্তান্তরের পর এর দায়িত্ব কবরস্থান কর্তৃপক্ষের। আমরা পরে এগুলো পর্যবেক্ষণ করি না।’বছরভিত্তিক হিসাবে, ২০২৩ সালে ৪৯০টি, ২০২৪ সালে ৫৭০টি, ২০২৫ সালে ৬৪৪টি এবং ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ৩৫২টি বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন করা হয়েছে।
কবর থেকে কঙ্কাল চুরি
সম্প্রতি আজিমপুর কবরস্থান থেকে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে রাতের আঁধারে মরদেহ চুরি হয় এবং সে মরদেহ প্রসেস করে কঙ্কাল বানিয়ে বিক্রি করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
আরও পড়ুন
ঢাকায় ৪৭টি মাথার খুলি, হাড়-কঙ্কাল উদ্ধার, গ্রেফতার ৪
গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ হলে অভিযুক্ত কর্মচারীদের নামও প্রকাশ করা হয়। এ নিয়ে সিআইডি ও ডিবি পুলিশ তদন্তে নামে। আজিমপুর কবরস্থানের দায়িত্বপ্রাপ্ত মোহরারদের কাছে জবাবদিহি চান ডিএসসিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোহরার হাফিজুর রহমান বলেন, ‘কবরস্থান থেকে মরদেহ চুরি হয়, এটি আমি বিশ্বাস করি না। সিআইডি ও ডিবি পুলিশ তদন্ত করছে। আমরা ডিএসসিসির কর্মকর্তাদের কাছে লিখিত জবাব দিয়েছি। তদন্ত শুরুর পর থেকে কোনো বহিরাগত এখানে দায়িত্ব পালন করছেন না।’
হাড্ডি ব্যবসার মতো কিছু বিতর্কিত অভিযোগ ওঠার পর প্রায় ২শ জনের মতো অননুমোদিত বহিরাগত লোককে কবরস্থান এলাকা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা এ বিষয়ে তদন্ত করছে। আমরা অফিসিয়ালি সিটি করপোরেশনের কাছে তদন্তের জবাবও জমা দিয়েছি।-মোহরার হাফিজুর রহমান
তিনি বলেন, ‘হাড্ডি ব্যবসার মতো কিছু বিতর্কিত অভিযোগ ওঠার পর প্রায় ২শ জনের মতো অননুমোদিত বহিরাগত লোককে কবরস্থান এলাকা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা এ বিষয়ে তদন্ত করছে। আমরা অফিসিয়ালি সিটি করপোরেশনের কাছে তদন্তের জবাবও জমা দিয়েছি।’
চলতি বছর বেশ কয়েকটি ঘটনা আলোচনায় আসে। গত ১৮ জানুয়ারি সাভারের আশুলিয়ার নয়ারহাট এলাকার একটি পারিবারিক কবরস্থান থেকে এক রাতে তিনটি পুরোনো কবর খুঁড়ে কঙ্কাল নিয়ে যায় চোরের দল।
মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান/ছবি: বিপ্লব দিক্ষীৎ
১৪ মার্চ নরসিংদীর শিবপুরের একটি স্থানীয় সামাজিক কবরস্থান থেকে পরপর পাঁচটি কবর খুঁড়ে হাড়গোড় চুরি করা হয়। ২৬ মে ঝিনাইদহের মহেশপুর কেন্দ্রীয় কবরস্থান থেকে রাতের আঁধারে দুটি কঙ্কাল চুরির ঘটনা ঘটে। ১১ জুলাই ময়মনসিংহের ত্রিশালের একটি কবরস্থান থেকে চারটি কঙ্কাল চুরির ঘটনা উন্মোচিত হয়।
এর আগের বছরগুলোতেও এ ধরনের ঘটনার নজির রয়েছে।
নরসিংদীর শিবপুরে কঙ্কাল চুরির শিকার পরিবারের সদস্য রেজাউল করিম ঘটনার পর গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, ছয় মাস আগেই মাকে হারিয়েছি। ভেবেছিলাম মা অন্তত কবরে শান্তিতে আছেন। সকালে জিয়ারত করতে এসে দেখি কবর খোঁড়া, ভেতরে মায়ের কোনো হাড়গোড় নেই! মরার পরও মানুষকে এভাবে কষ্ট দেওয়া যায়, তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না।
সাভারের আশুলিয়ায় কঙ্কাল চুরির ঘটনায় মোহাম্মদ আকরাম হোসেন বলেন, আমার বাবাকে দাফন করেছিলাম তিন বছর আগে। ভাবতাম বাবা মাটির নিচে শান্তিতে আছেন। সকালে কবরে গিয়ে দেখি গর্ত করা, ভেতরে কোনো হাড়গোড় নেই! যারা আমার বাবার কঙ্কাল চুরি করলো, তারা মানুষ নাকি পশু? আমরা কঙ্কাল চোরদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
সাপ্পোরো ডেন্টাল কলেজে অভিযান
চলতি বছরের ২৬ মার্চ রাজধানীর উত্তরায় সাপ্পোরো ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মানবদেহের হাড়গোড় এবং প্রায় ৪৭টি মানুষের মাথার খুলি উদ্ধার করা হয়।
প্রতিষ্ঠানটি ডেন্টাল কলেজ হলেও অ্যানাটমি মেডিকেল ও ডেন্টাল- উভয় শিক্ষাব্যবস্থারই একটি আবশ্যকীয় বিষয়। পুলিশের তদন্তে ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের বিরুদ্ধে কঙ্কাল সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়েছে।
যা বলছে পুলিশ
তেজগাঁও জোনের ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ ইবনে মিজান জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রথমে চেকপোস্টে একটি-দুটি কঙ্কালসহ একজনকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তার কাছ থেকে আরও কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে একজন ডেন্টাল শিক্ষার্থীও ছিলেন। পরে তদন্তে কঙ্কাল সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করার স্থান শনাক্ত করে সেখানে অভিযান চালানো হয়।’
জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় বৃহত্তর ময়মনসিংহ, গাজীপুর, জামালপুর ও শেরপুরের বিভিন্ন কবরস্থান থেকে হাড় সংগ্রহ করে পরে রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করে সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করা হতো। চক্রটি অনলাইনেও বিভিন্নভাবে বিজ্ঞাপন দিতো।-তেজগাঁও জোনের ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ ইবনে মিজান
তার ভাষ্য, রাতের অভিযানে ওই স্থানের সত্যতা পাওয়ার পর আরও কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। সব মিলিয়ে বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় ৫০টি কঙ্কাল উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
ডিসি মোহাম্মদ ইবনে মিজান বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় বৃহত্তর ময়মনসিংহ, গাজীপুর, জামালপুর ও শেরপুরের বিভিন্ন কবরস্থান থেকে হাড় সংগ্রহ করে পরে রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করে সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করা হতো। চক্রটি অনলাইনেও বিভিন্নভাবে বিজ্ঞাপন দিতো।’
আরও পড়ুন
অনলাইনে মানুষের কঙ্কাল বিক্রি, জড়িত ডেন্টালের দুই ছাত্র: ডিএমপি
মেডিকেল শিক্ষার্থীদের কাছে কম দামে কঙ্কাল পৌঁছে দেওয়ার কথা জানিয়ে বিভিন্ন অফার দেওয়া হতো জানিয়ে তিনি বলেন, শুরুতে পুলিশও বুঝতে পারেনি যে চক্রটির বিস্তৃতি এতটা বড়।
তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্যে চক্রের কাঠামো
কঙ্কাল চুরির আলোচিত ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক আব্দুল হান্নান জাগো নিউজকে বলেন, ‘তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। গ্রেফতার চার আসামির নাম-ঠিকানা যাচাই করা হয়েছে। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও কয়েকজনকে শনাক্ত ও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। তবে এখন পর্যন্ত নতুন করে কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘আসামিদের ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে কয়েকজনের নাম এসেছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। গ্রেফতার চারজনের মধ্যে দুজন কবর থেকে কঙ্কাল উত্তোলন এবং অন্য দুজন কঙ্কাল সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মেডিকেল শিক্ষার্থীদের কাছে বিক্রির সঙ্গে জড়িত। দূরবর্তী এলাকা থেকে কম দামে কঙ্কাল সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াজাত করার পর বেশি দামে বিক্রি করা হতো।’
বড় ক্রেতার কাছে একটি কঙ্কাল এক থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হতো বলে জানান তদন্ত কর্মকর্তা।
বনানী কবরস্থান/ছবি: বিপ্লব দিক্ষীৎ
এই তদন্ত কর্মকর্তা আরও জানান, প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষে অ্যানাটমি পড়ার সময় কঙ্কালের প্রয়োজন বেশি থাকায় ওই পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যক্তিগতভাবে কঙ্কাল সংগ্রহের প্রবণতা তৈরি হয়েছে। তৃতীয় বর্ষ থেকে নির্দিষ্ট বিষয় শুরু হওয়ায় কঙ্কালের প্রয়োজন তুলনামূলক কমে যায়। কম বিনিয়োগে বেশি লাভের সুযোগ থাকায় কিছু শিক্ষার্থীও এ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে।
কাজী ও আবুল কালামসহ যে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে তারা তৃতীয় বর্ষে থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর ছিলেন এবং নিয়মিত পরীক্ষা দিচ্ছিলেন না বলে জানান তিনি।
জব্দ কঙ্কাল কোথায় যায়?
মামলার আলামত হিসেবে উদ্ধার করা কঙ্কালগুলোর সংরক্ষণ নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া চলছে। তদন্ত কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান বলেন, ‘এসব কঙ্কাল ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নয়, সংরক্ষণের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে আদালতের অনুমতি নেওয়া হয়েছে। উদ্ধার করা কঙ্কালগুলোর সঙ্গে কোনো ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজনের সম্পর্ক আছে কি না- সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই সেগুলো সংরক্ষণ করা হচ্ছে।’
একসময় ডোমদের মাধ্যমে চলতো সংগ্রহ
ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান ও মালয়েশিয়ার ইউসিএসআই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. নাসিমুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাংলাদেশে মানুষের কঙ্কাল সংগ্রহ, সংরক্ষণ, ব্যবহার ও বেচাকেনা বিষয়ে স্পষ্ট এবং সমন্বিত কোনো আইনগত কাঠামো নেই। অন্য অনেক বিষয়ের মতো এক্ষেত্রেও আইনি অস্পষ্টতা রয়েছে।’
একসময় মেডিকেল শিক্ষার্থীদের অ্যানাটমি শেখানোর জন্য ডোমদের মাধ্যমে কঙ্কাল সংগ্রহ করা হতো। অননুমোদিত বা দাবিহীন (বেওয়ারিশ) মরদেহ কিছুদিন রাখার পর পচে গেলে সেগুলো ড্রামে গরম পানিতে প্রায় পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা সিদ্ধ করা হতো। পরে মাংস আলাদা করে কঙ্কাল প্রস্তুত ও বিক্রি করা হতো।-ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. নাসিমুল ইসলাম
তিনি বলেন, ‘একসময় মেডিকেল শিক্ষার্থীদের অ্যানাটমি শেখানোর জন্য ডোমদের মাধ্যমে কঙ্কাল সংগ্রহ করা হতো। অননুমোদিত বা দাবিহীন (বেওয়ারিশ) মরদেহ কিছুদিন রাখার পর পচে গেলে সেগুলো ড্রামে গরম পানিতে প্রায় পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা সিদ্ধ করা হতো। পরে মাংস আলাদা করে কঙ্কাল প্রস্তুত ও বিক্রি করা হতো।’
ডা. নাসিমুল ইসলামের ভাষ্য, তখন (তার ছাত্রজীবনের কথা) একটি কঙ্কালের দাম ছিল প্রায় দেড় হাজার থেকে তিন হাজার টাকা। বর্তমানে আসল মানবকঙ্কালের দাম বেড়ে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত হয়েছে। তবে প্লাস্টিকের কৃত্রিম কঙ্কাল সহজলভ্য হওয়ায় মেডিকেল শিক্ষায় আসল মানবকঙ্কালের বাধ্যবাধকতা ও ব্যবহার আগের তুলনায় কমেছে।
বিদেশে পাচারের আশঙ্কা
ডা. নাসিমুল ইসলাম মনে করেন, ‘দেশে আসল মানবকঙ্কালের চাহিদা আগের চেয়ে কিছুটা কমলেও এগুলো বিদেশে পাচারের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ, বাংলাদেশে মরদেহ থেকে কঙ্কাল সংগ্রহের অবৈধ সুযোগ কিছুটা সহজ হলেও অনেক উন্নত দেশে আইন অত্যন্ত কঠোর। ফলে বাংলাদেশ থেকে আসল মানবকঙ্কাল বিদেশে পাঠাতে পারলে সেখানে চড়া মূল্য পাওয়ার সুযোগ থাকে।’
আরও পড়ুন
গাইবান্ধায় কঙ্কাল চুরি ঠেকাতে রাত জেগে কবরস্থান পাহারায় গ্রামবাসী
ডেন্টাল কলেজের শিক্ষার্থীদের কঙ্কালসহ উদ্ধারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা কেবল পড়াশোনার প্রয়োজনে নয়, বরং বড় ধরনের ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে কঙ্কাল সংগ্রহ, প্যাকেটজাতকরণ ও বিদেশে পাঠাতে বা বিক্রি করতে যুক্ত থাকতে পারে। কারণ একটি বড় চালান সরবরাহ করতে পারলে মোটা অঙ্কের আর্থিক লাভের সুযোগ রয়েছে।’
আসল ও কৃত্রিম কঙ্কাল: দাম ও সহজলভ্যতার ব্যবধান
মেডিকেল ও ডেন্টাল শিক্ষার্থীদের কাছে কৃত্রিম (প্লাস্টিক বা পিভিসি) কঙ্কাল নাকি আসল মানবকঙ্কাল- কোনটির ব্যবহার যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে বাজার বিশ্লেষণে বড় ধরনের আর্থিক ও আইনি ব্যবধান দেখা যায়।
বাজারে উচ্চমানের আমদানি করা একটি কৃত্রিম সম্পূর্ণ কঙ্কালের সেট ১৫ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৩৫ হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। আর আলাদা হাড় বা মাথার খুলি তিন হাজার থেকে ৮ হাজার টাকার মধ্যে দোকানেই সহজে কেনা সম্ভব। এসব কৃত্রিম কঙ্কাল আইনগতভাবে সম্পূর্ণ বৈধ, টেকসই ও স্বাস্থ্যসম্মত
সার্জিক্যাল ও মেডিকেল সরঞ্জাম বিক্রির বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাজারে উচ্চমানের আমদানি করা একটি কৃত্রিম সম্পূর্ণ কঙ্কালের সেট ১৫ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৩৫ হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। আর আলাদা হাড় বা মাথার খুলি তিন হাজার থেকে ৮ হাজার টাকার মধ্যে দোকানেই সহজে কেনা সম্ভব। এসব কৃত্রিম কঙ্কাল আইনগতভাবে সম্পূর্ণ বৈধ, টেকসই ও স্বাস্থ্যসম্মত।
এর বিপরীতে অবৈধ উপায়ে সংগৃহীত একটি আসল মানবকঙ্কালের দাম পড়ছে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত, যা চোরাই পথে বা সিনিয়রদের হাতবদলের মাধ্যমে লেনদেন হয়।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক যা বলছেন
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. মহিউদ্দিন মাতুববরের সঙ্গে কথা হয় জাগো নিউজের এ প্রতিবেদকের। তিনি মেডিকেল ও ডেন্টাল শিক্ষার্থীদের কঙ্কাল চুরির সঙ্গে জড়িয়ে পড়া এবং শিক্ষার্থীদের প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের পড়াশোনার সময় কঙ্কাল সংগ্রহের বিষয়ে সরকারি কোনো নীতিমালা আছে কি না সে বিষয়ে কথা বলেন।
তিনি জানান, তারা যখন মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করেছেন, তখন বড় ভাই বা সিনিয়রদের কাছ থেকে কঙ্কাল হাতবদল করে পড়াশোনা করেছেন। কঙ্কাল সংগ্রহ বা সরবরাহের বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সরকারি নিয়ম-নীতি আছে কি না তা তার জানা নেই।
কবর থেকে কঙ্কাল চুরি বন্ধে হাইকোর্টের রুল
কবর থেকে মরদেহ ও কঙ্কাল চুরি বন্ধে প্রশাসনের ব্যর্থতা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল রুল জারি করেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে কবরস্থান যথাযথভাবে তদারকি এবং মরদেহ ও কঙ্কাল চুরির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তাও জানতে চাওয়া হয়।
আরও পড়ুন
কবর থেকে ৫ কঙ্কাল উধাও
স্বরাষ্ট্র, আইন, স্থানীয় সরকার ও ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং পুলিশের মহাপরিদর্শকসহ সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছিল। কবর খুঁড়ে মরদেহ ও কঙ্কাল চুরি রোধে সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়নের নির্দেশনা চেয়ে মানবাধিকার ও সমাজ উন্নয়ন সংস্থার (মওসুস) পক্ষে করা একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট এ রুল জারি করেন।
মামলা শেষের পথে, কিন্তু রয়ে গেছে প্রশ্ন
মামলার তদন্ত বর্তমানে শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। এখন পর্যন্ত গ্রেফতার চারজনের জবানবন্দি ও প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত এগোলেও নীতিগতভাবে শিক্ষা উপকরণ হিসেবে কঙ্কালের উৎস কী হবে- সে উত্তর এখনো অস্পষ্ট। কঙ্কালের অবৈধ চাহিদা বন্ধে প্লাস্টিক বা কৃত্রিম মডেল ব্যবহারে বাধ্যবাধকতা আনা এবং সরকারি পর্যায়ে স্বচ্ছ নীতিমালা তৈরি না হলে এই অন্ধকার বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হবে বলেই মনে করছে সচেতন মহল।
মরদেহ ও কঙ্কাল চুরির ঘটনায় বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ পেয়েছিল। শত শত মরদেহ ও কঙ্কাল চুরির খবর এসেছে। চুরি করে বিক্রি করা হয়। কঙ্কাল চুরি করে বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে বিক্রি করা হয়।-রিটকারী আইনজীবী ড. গোলাম রহমান
কবর থেকে কঙ্কাল চুরি ঠেকাতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না এবং কবর দেওয়া মরদেহ সংরক্ষণের জন্য কেন আইন প্রণয়ন করা হবে না, তা জানতে চেয়ে ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল জারি করা রুলের বিষয়ে কোনো অগ্রগতি নেই। তবে, এ সংক্রান্ত রুল শুনানির উদ্যোগ নেবে বলে জাগো নিউজকে জানিয়েছেন রিটকারী আইনজীবী ড. গোলাম রহমান।
তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘মরদেহ ও কঙ্কাল চুরির ঘটনায় বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ পেয়েছিল। শত শত মরদেহ ও কঙ্কাল চুরির খবর এসেছে। চুরি করে বিক্রি করা হয়। কঙ্কাল চুরি করে বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে বিক্রি করা হয়।’
পৃথিবীর অন্য দেশে মরদেহ ও কঙ্কাল চুরি প্রতিরোধে আইন থাকলেও বাংলাদেশে কোনো আইন নেই। তাই মানবাধিকার ও সমাজ উন্নয়ন সংস্থার চেয়ারম্যান ড. গোলাম রহমান এ রিট দায়ের করেছিলেন বলে জানান।
গোলাম রহমান বলেন, ‘ওই রিটের শুনানি নিয়ে রুল জারির পাশাপাশি নির্দেশনা দিয়েছিলেন উচ্চ আদালত। সেই রুলের শুনানির জন্য হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত বিষয়ে জারি করা রুলের বিষয়ে শুনানির জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি।’
রিটে মরদেহ ও কঙ্কাল চুরির ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছিল। কোনো কিছুর তেমন অগ্রগতি নেই জানিয়ে ড. রহমান বলেন, ‘মরদেহ ও কঙ্কাল চুরি প্রতিরোধে বাংলাদেশে কোনো আইন নেই। পৃথিবীর অনেক দেশেই এ-সংক্রান্ত আইন আছে। মরদেহ চুরি হলে আত্মীয়-স্বজন চিন্তা করেন কবরে সওয়াল-জবাব হবে কীভাবে। এভাবে দিনের পর দিন মরদেহ চুরির ঘটনায় উদ্বিগ্ন অনেকেই।’
এমইউ/এএসএ/ এমএফএ