কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের দাম কম, অথচ একই পণ্য ভোক্তার বাজারে গিয়ে কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে এই বৈপরীত্য নতুন নয়। একদিকে কৃষক উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে ভোক্তাকে নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্য কিনতে হচ্ছে বাড়তি দামে। ফলে একই বাজারে কৃষক ও ভোক্তা, উভয়পক্ষই অসন্তুষ্ট। প্রশ্ন হচ্ছে, এই ব্যবস্থার প্রকৃত সমস্যা কোথায়? সাধারণ আলোচনায় বাজার অস্থিরতার জন্য প্রায়ই ‘মধ্যস্বত্বভোগী’কে দায়ী করা হয়। নিঃসন্দেহে বাজারে অস্বচ্ছতা, অতিরিক্ত মুনাফা, সিন্ডিকেট বা অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি থাকলে তা নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। কিন্তু কৃষিপণ্যের বাজারব্যবস্থার সমস্যাকে কেবল মধ্যস্বত্বভোগীর উপস্থিতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ কৃষকের মাঠ থেকে ভোক্তার রান্নাঘর পর্যন্ত একটি কৃষিপণ্য পৌঁছাতে উৎপাদন, সংগ্রহ, বাছাই, গ্রেডিং, প্যাকেজিং, পরিবহন, সংরক্ষণ, অর্থায়ন ও বিপণনের একাধিক ধাপ অতিক্রম করে। এই প্রতিটি ধাপে সময়, শ্রম, পরিবহন ব্যয়, নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি এবং অর্থের প্রয়োজন রয়েছে। ফলে কৃষকের বিক্রয়মূল্য ও ভোক্তার ক্রয়মূল্যের মধ্যে পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই পার্থক্য যদি অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়ে যায় এবং কৃষক ও ভোক্তা উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হন; তখন বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি।
কৃষকের ন্যায্যমূল্য বনাম ভোক্তার ন্যায্যমূল্য
কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা যেমন জরুরি; তেমনই ভোক্তার জন্যও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একপক্ষকে সুবিধা দিতে গিয়ে অন্যপক্ষকে ক্ষতিগ্রস্ত করা কোনো টেকসই বাজারনীতি হতে পারে না। কৃষক চান, উৎপাদন খরচের সঙ্গে যুক্তিসঙ্গত লাভ। ভোক্তা চান, সহনীয় ও যুক্তিসংগত দামে নিরাপদ খাদ্য। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই হওয়া উচিত কৃষি বাজার ব্যবস্থাপনার মূল লক্ষ্য। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, কোনো একটি পণ্যের দাম উৎপাদন মৌসুমে হঠাৎ পড়ে যায়। কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করেন। আবার কয়েক মাস পর একই পণ্যের সরবরাহ কমে গেলে বাজারে তার দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। অর্থাৎ উৎপাদন ও বাজারের মধ্যে সময়ভিত্তিক ভারসাম্যের অভাব আছে। এখানেই আসে বাজারনির্ভর উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা।
আগে বাজার, পরে উৎপাদন
কৃষিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রচলিত ধারণা হলো, কৃষক উৎপাদন করবেন, এরপর বাজারে গিয়ে পণ্য বিক্রি করবেন। আধুনিক কৃষি অর্থনীতিতে এই ধারণা ক্রমেই পরিবর্তিত হচ্ছে। এখন প্রয়োজন, বাজারের চাহিদা বুঝে উৎপাদন পরিকল্পনা করা। কোন মৌসুমে কোন পণ্যের চাহিদা কত, সম্ভাব্য উৎপাদন কত হতে পারে, আগের বছরের মূল্যপ্রবণতা কী ছিল, কোন অঞ্চলে কত জমিতে কী ফসল হচ্ছে, সম্ভাব্য ক্রেতা কারা, প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের চাহিদা কত, এসব তথ্য কৃষকের কাছে পৌঁছানো দরকার। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি নির্দিষ্ট সবজি বা ফলের বাজারে অতিরিক্ত চাহিদা আছে দেখে যদি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হাজার হাজার কৃষক একই সময়ে একই পণ্য ব্যাপক হারে উৎপাদন শুরু করেন, তাহলে উৎপাদন মৌসুমে সরবরাহ চাহিদাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। তখন দাম পড়ে যায় এবং কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন। অন্যদিকে কোনো পণ্যের উৎপাদন কম হলে পরবর্তীতে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়ে দাম বেড়ে যায়। ফলে কৃষকের উৎপাদন সিদ্ধান্ত যদি নির্ভরযোগ্য বাজার তথ্যের ওপর ভিত্তি করে না হয়, তাহলে বাজারে কখনো অতিরিক্ত সরবরাহ, আবার কখনো ঘাটতি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
আরও পড়ুন
কৃষিতে যুবশক্তি: কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা সৃষ্টির নতুন সম্ভাবনা
মধ্যস্বত্বভোগী কি একমাত্র সমস্যা
কৃষিপণ্যের বাজারে মধ্যস্বত্বভোগী থাকলেই যে সমস্যা, বিষয়টি এত সরল নয়। কৃষকের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ করে তা বাজারজাত করার ক্ষেত্রে সংগ্রাহক, পাইকার, আড়তদার, পরিবহনকারী, গুদাম ব্যবসায়ী, প্রক্রিয়াজাতকারী ও খুচরা বিক্রেতা, প্রত্যেকেরই কোনো না কোনো অর্থনৈতিক ভূমিকা আছে। সমস্যা তৈরি হয় তখন; যখন বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যায়, তথ্যের অসমতা তৈরি হয় এবং কৃষক তার পণ্যের প্রকৃত বাজারমূল্য সম্পর্কে জানেন না। একজন কৃষক যদি না জানেন যে, তার পণ্য অন্য বাজারে কত দামে বিক্রি হচ্ছে, তাহলে তার দরকষাকষির ক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই কম থাকবে। তাই সমাধান হতে হবে মধ্যস্বত্বভোগীকে শুধু বাদ দেওয়ার চেষ্টা নয়; বরং বাজারে স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা ও কৃষকের দরকষাকষির ক্ষমতা বৃদ্ধি করা। কৃষক সংগঠন, উৎপাদক সমবায়, চুক্তিভিত্তিক কৃষি, ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস এবং সরাসরি ক্রেতা-উৎপাদক সংযোগ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাজার তথ্যই হতে পারে কৃষকের শক্তি
কৃষকের হাতে যদি সঠিক সময়ে সঠিক বাজার তথ্য থাকে, তাহলে তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অনেক বেড়ে যায়। আজকের ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে এটি আর অসম্ভব নয়। কোন বাজারে কোন পণ্যের দাম কত, গত কয়েক সপ্তাহে দাম কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, আগামী কয়েক সপ্তাহে সরবরাহ পরিস্থিতি কেমন হতে পারে, কোন অঞ্চলে উৎপাদন বেশি হচ্ছে, কোন ক্রেতা কী পরিমাণ পণ্য কিনতে আগ্রহী, এসব তথ্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে আবহাওয়ার পূর্বাভাস, ফসলের সম্ভাব্য উৎপাদন, রোগ-পোকামাকড়ের ঝুঁকি, ইনপুটের মূল্য এবং সংরক্ষণ সুবিধার তথ্য। অর্থাৎ ডেটা-ভিত্তিক কৃষি পরিকল্পনা শুধু উৎপাদন বাড়াবে না; বাজার ঝুঁকিও কমাতে পারে।
সংরক্ষণ ও পরিবহন: বড় দুর্বলতা
বাংলাদেশে অনেক কৃষিপণ্যের বাজার অস্থিরতার অন্যতম কারণ হলো সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। বিশেষ করে দ্রুত পচনশীল ফল, সবজি, মাছ ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে কৃষক অনেক সময় পণ্য ধরে রাখার সুযোগ পান না। ফলে উৎপাদন মৌসুমে যখন বাজারে সরবরাহ বেশি, তখন কৃষক দ্রুত বিক্রি করতে বাধ্য হন। কম দামে বিক্রি না করলে পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। অথচ পর্যাপ্ত কোল্ড স্টোরেজ, আধুনিক গুদাম, প্যাকেজিং ও পরিবহন সুবিধা থাকলে কৃষক তাৎক্ষণিক বিক্রির চাপ থেকে কিছুটা মুক্ত হতে পারতেন। তাই কৃষি বাজার সংস্কারের আলোচনায় শুধু বাজারদর নয়, পোস্ট-হারভেস্ট ব্যবস্থাপনাকেও অগ্রাধিকার দিতে হবে।
আরও পড়ুন
আবহাওয়ার পূর্বাভাসেই কৃষকের সুরক্ষা সম্ভব
উৎপাদন থেকে বাজার, একটি সমন্বিত চেইন
কৃষিকে এখন আর শুধু ‘ফসল উৎপাদন’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কৃষি একটি পূর্ণাঙ্গ ভ্যালু চেইন। বীজ থেকে শুরু করে উৎপাদন, সংগ্রহ, গ্রেডিং, প্যাকেজিং, সংরক্ষণ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ভোক্তার কাছে পৌঁছানো, প্রতিটি ধাপ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। এই চেইনের কোনো একটি জায়গায় বড় ধরনের দুর্বলতা থাকলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত কৃষক ও ভোক্তার ওপর পড়ে। অতএব কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বাজার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, বেসরকারি খাত, কৃষক সংগঠন এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
কী করা যেতে পারে
প্রথমত, বাজার-চালিত উৎপাদন পরিকল্পনা চালু করা প্রয়োজন। অঞ্চলভিত্তিক চাহিদা ও সরবরাহ বিশ্লেষণ করে কৃষকদের উৎপাদন পরিকল্পনায় সহায়তা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, একটি সমন্বিত ডিজিটাল কৃষি বাজার তথ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কৃষক সহজ ভাষায় বাজারদর, চাহিদা, সরবরাহ ও মূল্যপ্রবণতা জানতে পারবেন। তৃতীয়ত, কৃষকের সংগঠিত বিপণন ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। একক কৃষকের পরিবর্তে উৎপাদক দল বা সমবায়ের মাধ্যমে বাজারজাত করলে দর কষাকষির ক্ষমতা বাড়বে। চতুর্থত, উৎপাদন এলাকার কাছাকাছি সংরক্ষণ, কোল্ড চেইন, গ্রেডিং ও প্যাকেজিং অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। পঞ্চমত, কৃষক ও বড় ক্রেতা, যেমন প্রক্রিয়াজাতকারী শিল্প, সুপারশপ, রপ্তানিকারক ও খাদ্যপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে চুক্তিভিত্তিক বাজার সংযোগ বাড়াতে হবে। ষষ্ঠত, বাজারে অস্বাভাবিক কারসাজি, মজুতদারি ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারি থাকতে হবে। তবে একই সঙ্গে বৈধ ব্যবসায়ী ও মধ্যবর্তী বাজারসেবাদাতাদের অর্থনৈতিক ভূমিকা স্বীকার করতে হবে।
এখনই সময় বাজার ব্যবস্থাপনায় নতুন চিন্তার
কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হলে শুধু ফসল কাটার পর বাজারে গিয়ে দাম নির্ধারণের চেষ্টা করলে হবে না। পরিকল্পনা শুরু করতে হবে ফসল উৎপাদনের আগেই। কী উৎপাদন হবে, কতটা উৎপাদন হবে, কোথায় উৎপাদন হবে, কখন বাজারে আসবে, কার কাছে বিক্রি হবে এবং কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে, এই পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর উৎপাদনের আগেই খুঁজে বের করতে হবে। কৃষিতে ডিজিটাল প্রযুক্তি, এআই, আইওটি, আবহাওয়া তথ্য, বাজার ডেটা ও ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে এই পরিবর্তন সম্ভব। প্রযুক্তি কৃষকের বিকল্প নয়; বরং কৃষকের সিদ্ধান্তকে আরও তথ্যসমৃদ্ধ ও কার্যকর করার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।
আরও পড়ুন
কৃষি ও খাদ্যের নতুন দিগন্ত সৌরবিদ্যুৎ
কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা কেবল কৃষকের স্বার্থের বিষয় নয়; এটি খাদ্য নিরাপত্তা, ভোক্তার স্বার্থ, কৃষির স্থায়িত্ব এবং জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। কৃষক কম দামে বিক্রি করবেন আর ভোক্তা বেশি দামে কিনবেন, এই বৈপরীত্য কোনো সুস্থ বাজারব্যবস্থার লক্ষণ নয়। একইভাবে শুধু ‘মধ্যস্বত্বভোগী’কে দায়ী করে সমস্যার সমাধানও সম্ভব নয়। প্রয়োজন উৎপাদন, বাজার তথ্য, সরবরাহ, সংরক্ষণ, পরিবহন, অর্থায়ন ও বিপণনের মধ্যে একটি কার্যকর সমন্বয়। কৃষকের জন্য ন্যায্যমূল্য এবং ভোক্তার জন্য ন্যায্যদাম, এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্যই হতে হবে কৃষি বাজার ব্যবস্থাপনার মূল দর্শন।
তাই এখনই সময়, দাম নিয়ন্ত্রণের সীমিত চিন্তা থেকে বেরিয়ে বাজার ব্যবস্থাপনার আধুনিক, তথ্যনির্ভর ও সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলার। এখনই সময় কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার; এখনই সময় কৃষি বাজার ব্যবস্থাপনায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গির। কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য ও বাজার অস্থিরতা: উৎপাদন থেকে বাজার, সমন্বিত ব্যবস্থাপনাই সমাধান।
এসইউ