প্রিয়তম সুখ,
কেমন আছো জানতে চাইব না। ভালোই আছো হয়তো। ভালোই থাকার কথা। কেননা যেটুকু জীবন পেয়েছিলে, তোমার জন্য কখনো কারো মেঘ জমেনি মনে; কোনো বুক তোমার অনুপস্থিতির ভারে এতটা নত হয়নি, যতটা আমার হয়েছে।
আজ ঘটা করে মনে করতে বসিনি তোমায়। শুধু নিঃশ্বাসে মিশে থাকা তুমিটাকে কলমের খসখস শব্দ দিয়ে কাগজের ওপর জীবিত করার এক ব্যর্থ চেষ্টায় মগ্ন আমি। অবশ্য তুমি যে আমার অন্তরে আজও জীবিত এ কথা অস্বীকার করলে আমি মিথ্যাবাদীই বটে।
কথা ছিল আকাশ দেখার। পাহাড়, সমুদ্র, মেঘ দেখার। কথা ছিল পথ হারালে দুজন দুজনকে খুঁজে নেবার। কথা ছিল কান্না এলে চোখ মুছে দেওয়ার। কথা ছিল শেষ বিকেলের নরম আলোয় পাশাপাশি বসে পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তি ভুলে স্নিগ্ধ কোনো সন্ধ্যা খুঁজে নেওয়ার। সেই সব দেওয়া কথা আজকাল স্মৃতির ঘরে বন্দি।
জানো? আজকাল আমি পাহাড় দেখি না, সমুদ্র দেখি না, মেঘ দেখি না। দেখি না স্নিগ্ধ মাখা সন্ধ্যাবেলাও। আমি শুধু আকাশ দেখি। ওই যে আকাশের বুকের কোথাও তুমি থাকো আমি সেই আকাশ দেখি।
কখনো কখনো মনে হয়, এত বিশাল আকাশের নিচে থেকেও মানুষ কী ভীষণ একা হতে পারে! আচ্ছা, তুমি কি আমাকে দেখতে পাও না? দূরত্বটা কি সত্যিই এত বেশি? এতটাই বেশি যে আমার বুকের ভেতর থেকে উঠে আসা আর্তনাদের শব্দটুকুও তুমি শুনতে পাওনি আজও? নাকি শুনেছো? শুধু ছুটে আসতে পারোনি?
তোমার কবরের ঘরের দূরত্বটা সাড়ে তিন হাত বটে। কিন্তু এই সাড়ে তিন হাতই যেন আমার আর তোমার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক অনন্ত মহাদেশ। একটা ছোট্ট দূরত্ব যার ওপারে তুমি, আর এপারে আমি। অথচ কিছু দূরত্ব মাপা যায় হাত দিয়ে, কিছু দূরত্ব মাপা যায় না কোনো পৃথিবীর মানচিত্রে। এই সাড়ে তিন হাত তেমনই এক দূরত্ব। বিষাক্ত এক দূরত্ব।
আরও পড়ুন
বাবার চিঠির অপেক্ষায় থাকা ছেলে, মেসেজের যুগে হারিয়ে যাওয়া অনুভূতি
মনে পড়ে? তুমি ছিলে এই ব্যর্থ মানুষটার সাথী। জগতের সমস্ত রকম অপ্রাপ্তিতে পূর্ণ মানুষটার একমাত্র মানসিক প্রশান্তির আশ্রয় ছিলে তুমি। আমি যখন পৃথিবীর কাছে হেরে যেতাম, তুমি আমাকে জিততে পারার আশ্বাস দিতে।
পথ চলতে চলতে সহস্রবার হোঁচট খেয়েছি, পড়েছি, ভেঙেছি, আবার উঠেছি। আর সেই সব সময়ে তোমার কণ্ঠে শুধু ভেসে বেড়াত এই তো আর কিছুটা পথ, সাকিব। তারপর সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।
তুমি জানো? আমি পথগুলো অতিক্রম করেছি ঠিকই। আঁধারও কেটে গেছে অনেকটা। যে মানুষটাকে তুমি পৃথিবীর বিষাক্ত ভিড় থেকে দু\'হাত দিয়ে আগলে রাখতে, সেই মানুষটা আজ আক্ষরিক অর্থেই কিছুটা সফল। জীবনে কিছুটা আলো এসেছে। মানুষ এখন আমার নাম জানে। আমার লেখা পড়ে। আমার শব্দে নিজেদের দুঃখ খুঁজে পায়। আমার গল্পে নিজেদের হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর মুখ দেখতে পায়।
কিন্তু এই আলোয় দাঁড়িয়ে মন ভরে তৃপ্তি নেওয়ার জন্য তুমি নেই কোথাও। আর এই একটি না-থাকাই আমার সমস্ত সাফল্যের ওপর এক দীর্ঘ ছায়া ফেলে রেখেছে। আজকাল যখন চারপাশে আলো দেখি, অদ্ভুতভাবে অন্ধকারটাকেই বেশি মনে পড়ে। কারণ আলো সবসময় উষ্ণ নয়। কখনো কখনো আলো খুব নিষ্ঠুর। আলো আমাদের দেখিয়ে দেয় আমাদের কী নেই।
আচ্ছা, এইযে আমার গোটা জীবনটা আঁধারে ছেয়ে গেল আমার অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে গেল আমার পুরো পৃথিবীটা, এই যে আজকাল কোনো আলোই যে আমায় আলোকিত করতে পারে না আর আজকাল আমার জীবনের সবটাই যে কবরের মতো গারো অন্ধকার। এই যে পৃথিবী আবার আমার সমস্ত দরজা বন্ধ করে দিলো? সবকিছু কি আর সফলতা দিয়ে পূর্ণ হয় সবকিছু কি আর আক্ষরিক অর্থে পৃথিবীর সফলতা দিয়ে পূরণ করা যায়?
কখনো কখনো আমরা ভাগ্যের কাছে নির্মমভাবে হেরে পৃথিবীর চোখে জিতে যাই কিন্তু সেই যেতে যাওয়াটা কি আদৌ কোন অর্জন আদৌ কি তাকে জিতে যাওয়া বলে ?
আমি ভাগ্যের কাছে হেরে পৃথিবীর চোখে জিতে যাচ্ছি রোজ। আমাকে এই বেলায় কে বলবে আমায়, ‘সাকিব, ভেঙে পড়ো না। এই তো আর কিছুটা পথ, ব্যাস আর কিছুটা পথ.....’
কে বলবে? বলতে পারো?
আরও পড়ুন
সমুদ্রে নিখোঁজ জেলের পথচেয়ে দিন কাটে পরিবারের
আজকাল সবাই বলে, আমি নাকি ভালোই আছি। অন্ধকার থেকে উঠে এসে আজকাল নাকি আলোয় বাঁচি। কেউ বলে আমি সফল। কেউ বলে আমি গল্পকার কথাসাহিত্যিক দার্শনিক নতুন কত কত পরিচয় হলো । কেউ বলে আমার শব্দে মানুষ নিজের জীবন খুঁজে পায়। কিন্তু সবাই কি জানে এই শব্দগুলোর জন্ম কোথায়?
কত রাতের আর্তনাদ একটা একটা বাক্যে এসে আশ্রয় নিয়েছে? কত নির্ঘুম রাতের নিচে চাপা পড়ে আছে একটা মানুষের নাম? কতবার কলম ধরতে গিয়ে একটা পুরোনো কণ্ঠস্বর আমার সমস্ত শব্দের আগে এসে দাঁড়িয়েছে? এই সফলতার তৃপ্তির মধ্যেও যে আমার ভীষণ রকম অপ্রাপ্তি রয়েছে এই খবর কে জানে? কেই বা রাখে?
আজ দিকে দিকে আলো। চারপাশে কত শত মানুষ। কত পরিচিত মুখ, কত ভালোবাসা, কত প্রশংসা, কত হাততালি। তবু এসবের মাঝেও যে আমি এতটা সর্বহারা, তা কেবল আমিই জানি।
কারণ যে ‘আমি’টা বেঁচে থাকতে কোনোদিনই সফল হয়ে দেখাতে পারেনি তোমায়, দিতে পারেনি সফলতার তৃপ্তি আজ সেই ‘আমি’র সাফল্যের পেছনে তোমার প্রস্থানের ছায়া দাঁড়িয়ে আছে। তোমার না থাকার দহন। তোমার শূন্যতা। তোমার রেখে যাওয়া সেই অসহনীয় নীরবতা।
কী অদ্ভুত, তাই না? কখনো কখনো মানুষ তার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনটা পায় তার জীবনের সবচেয়ে বড় হারানোর পর। কিন্তু সেই অর্জন তখন আর নিছক আনন্দ থাকে না। সেটা হয়ে যায় একটা সুন্দরভাবে সাজানো শোক।
তবে কি এই সফলতার তৃপ্তি তুমিহীনা তুচ্ছ নয়? এই আলো আয়োজন সবটাই কি বৃথা নয় তুমি ছাড়া?
আজকাল কতটা একলা আমি, তুমি কি বুঝতে পারো? বুঝতে যে পারো না এ আমি বিশ্বাস করি না। তুমি বুঝতে ঠিকই পারো। হয়তো কোনো অদৃশ্য দূরত্বের ওপারে আমার প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস তোমার কাছে পৌঁছে যায়। শুধু উত্তর হয়ে ফিরে আসে না। আর এই উত্তর হীনতায় আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ শাস্তি।
স্রষ্টা আমাকে তুমি নামক প্রাপ্তির বদলে সফলতা দিয়েছে। কী নির্মম বিনিময়! পৃথিবী যাকে সাফল্য বলে, কখনো কখনো তা আসলে একজন মানুষের ব্যক্তিগত পরাজয়ের সবচেয়ে সুন্দর মুখোশ।
কিছু কিছু সফলতা পুরস্কার নয় ক্ষতিপূরণ। কিছু কিছু প্রাপ্তি প্রাপ্তি নয় কিছু হারানোর পরের সান্ত্বনা। আর আমি? আমি সেই সান্ত্বনা নিয়েই জীবন পার করছি। এই যে এত হাহাকার বুকের মাঝে, এই যে প্রতিটি নিঃশ্বাসে তোমার অনুপস্থিতির দহন, এই যে চারপাশে মানুষ অথচ ভেতরে এক বিশাল শ্মশান তবুও জীবন থেমে নেই।
জীবন তার আপন গতিতেই চলছে। ঘড়ির কাঁটা আমার শোকের জন্য থামে না। সকাল আমার কান্নার জন্য দেরি করে না। রাত আমার নিঃসঙ্গতার জন্য একটু দীর্ঘ হয় না। পৃথিবী কারো জন্য থেমে থাকে না। শুধু মানুষের ভেতরটা কোনো কোনো দিন থেমে যায়।
আমারও থেমেছিল।
সেই দিন যেদিন তুমি চলে গিয়েছিলে।
তারপর থেকে আমি হাঁটছি ঠিকই, কথা বলছি ঠিকই, লিখছি, হাসছি, সফল হচ্ছি। শুধু আমার ভেতরের একটা মানুষ সেই দিনটির কাছেই দাঁড়িয়ে আছে। সে আজও তোমার অপেক্ষায়। কোনো ফিরে আসার নয় কোনো একদিন তোমার স্মৃতির সঙ্গে শান্ত হয়ে বসতে পারার অপেক্ষায়। কারণ কিছু মানুষকে জীবনে ফিরে পাওয়া যায় না; শুধু তাদের অনুপস্থিতির সঙ্গে বাঁচতে শেখা যায়।
আর কিছু ভালোবাসা শেষ হয়ে যায় না শুধু তার রূপ বদলে যায়। কখনো তা স্মৃতি হয়, কখনো কবিতা, কখনো রাত জেগে লেখা একটি চিঠি, কখনো কোনো অচেনা পাঠকের চোখের জল, আর কখনো একজন লেখকের সমস্ত জীবনের ভাষা।
তুমি জানো? যতদিন আমার হাতে কলম থাকবে, ততদিন তোমার গল্প শেষ হবে না। তোমার সাকিব লেখক হয়েছে। তুমি কি তার পাঠক হবে না, প্রিয়? তুমি কি সেইসব কাব্যের শ্রোতা হবে না? যে কাব্যের শত শত শব্দের জন্ম তোমাকে কেন্দ্র করে?
এ জীবনে তো কিছুই দিতে পারিনি। হয়তো এই এক জীবনের ব্যর্থতাগুলোকে শব্দে পরিণত করেই কোনো একদিন তোমার সামনে দাঁড়াবো এই পৃথিবীর নয়, স্মৃতির এক অদৃশ্য দরজার সামনে।
বলব দেখো, যে ছেলেটাকে তুমি একদিন বলেছিলে, ‘আর কিছুটা পথ, সাকিব…’ সে সত্যিই পথটা হেঁটেছে। অনেক দূর হেঁটেছে। অনেক রাত পেরিয়েছে। অনেকবার ভেঙেছে। অনেকবার নিজের ভেতর থেকে নিজেকেই তুলে এনেছে। তবু লিখে গেছে।
তোমার জন্য। শুধু তোমার জন্য।
আর যদি কোনোদিন এই পৃথিবীর সমস্ত শব্দ থেমে যায়, যদি আমার কলমও একদিন নীরব হয়ে আসে, তবুও তুমি জেনে রেখো তোমার জন্য যে মানুষটা একদিন গল্পকার হয়েছিল, তার সবচেয়ে প্রিয় গল্পটা কখনো শেষ হয়নি।
কারণ কিছু মানুষ চলে যায়, কিন্তু তাদের অনুপস্থিতি থেকে যায়। কিছু ভালোবাসা শেষ হয়ে যায়, কিন্তু তার দহন শেষ হয় না। কিছু মানুষকে আর ছোঁয়া যায় না, তবু তাদের স্মৃতি আমাদের সবচেয়ে গভীর স্পর্শ হয়ে থাকে। আর কিছু মানুষ আমাদের জীবন থেকে চলে গিয়েও আমাদের জীবনের ভাষা হয়ে যায়।
আরও পড়ুন
মাদকের কড়াল গ্রাস থেকে মুক্তি মিলবে কবে?
তুমি আমার কাছে তেমনই এক ভাষা। একটি অসমাপ্ত বাক্য। একটি না পাওয়া জীবন। একটি অমোচনীয় স্মৃতি। একটি দীর্ঘশ্বাস, যার কোনো শেষ কমা নেই। আর কিছু চিঠি কখনো কোনো ঠিকানায় পৌঁছায় না। তবুও লেখা হয়। বারবার লেখা হয়। কারণ প্রাপক নেই বলে ভালোবাসার ভাষা তো আর মরে যায় না।
কখনো কখনো চিঠি প্রাপকের কাছে পৌঁছানোর জন্য লেখা হয় না। লেখা হয় যে মানুষটাকে হারিয়েছি, তাকে নিজের ভেতর থেকে আরেকবার হারিয়ে যেতে না দেওয়ার জন্য। তাই লিখছি। এতগুলো বছর পরেও লিখছি । হয়তো শেষবারের মতো। কারণ তোমার ঠিকানা নেই, তবু তোমার জন্য আমার কাছে এখনো অসংখ্য শব্দ জমে আছে।
কে জানে তুমি কি আজকাল লিখিত অলিখিতভাবে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছো নাকি আমার কাছে, দিনশেষে আমি একজন পুরুষ মানুষ তো, পুরুষ মানুষ অনুপস্থিতি পছন্দ করে না, মাঝে মাঝে ভাবায় ভীষণ ভাবে ভাবায় আমায়, এইযে যে মানুষটা আমার হয়ে চলে গেল, আমি কি আমার জীবনের শেষ দিন অব্দি কাগজে-কলমে তো সেই মানুষটার হয়ে থাকতে পারলাম? থাকতে পারবো?
জীবন থেমে থাকে না তাই আক্ষরিক অর্থে পারবো কি না জানিনা কিন্তু যেহেতু জীবনটা সচল রাখে হৃদয় স্পন্দন আমি এতোটুকু লিখে দিতে পারি আমার শেষ হৃদয় স্পন্দন অব্দি তুমি মিশে থাকবে তোমাকে মুছে ফেলা সম্ভব না।
তুমি ভালো থেকো, তুমি যেখানেই থাকো ভালো থেকো,আমাদের দেখা হবে খুব শিগগির, অবশ্যই অবশ্যই দেখা হবে।
সে অব্দি ভালো থেকো আর জেনে রেখো-
তোমার গল্পকার ভালো নেইভালো নেই তোমার গল্পকার।
ইতি,তোমার ঐ ব্যর্থ মানুষটা
লেখক: সাকিব মৃধা
কেএসকে