প্রোস্টেটে কোনো সমস্যা দেখা না দেওয়া পর্যন্ত অধিকাংশ পুরুষই এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটির স্বাস্থ্য নিয়ে খুব একটা ভাবেন না। অথচ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রোস্টেটের নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হলো প্রোস্টেট গ্রন্থি বড় হয়ে যাওয়া বা বিনাইন প্রোস্ট্যাটিক হাইপারপ্লাসিয়া (বিপিএইচ)।
প্রোস্টেট ক্যানসারও পুরুষদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি স্বাস্থ্যঝুঁকি। উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক ক্ষেত্রেই প্রোস্টেট ক্যানসারে স্পষ্ট কোনো উপসর্গ নাও থাকতে পারে। তাই বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রোস্টেটের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কোন ধরনের খাদ্যাভ্যাস ও খাবার প্রোস্টেটকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করতে পারে, তা জানিয়েছেন রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল ও রিসার্চ সেন্টারের পুষ্টিবিদ লিনা আক্তার।
বিনাইন প্রোস্ট্যাটিক হাইপারপ্লাসিয়া ক্যানসার নয় এবং এটি সরাসরি প্রোস্টেট ক্যানসারে পরিণত হয় না। তবে প্রোস্টেট বড় হয়ে গেলে মূত্রনালিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ পাওয়া, রাতে বারবার প্রস্রাবের জন্য উঠতে হওয়া, প্রস্রাবের গতি কমে যাওয়া, প্রস্রাব শুরু করতে দেরি হওয়া কিংবা মূত্রথলি পুরোপুরি খালি না হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
উদ্ভিদ-ভিত্তিক খাবার খান
প্রোস্টেটের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত ফল ও শাকসবজি রাখা উপকারী। এসব খাবারে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন ও খনিজ শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও প্রদাহ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষ করে ব্রকলি, ফুলকপি, বাঁধাকপির মতো ক্রুসিফেরাস সবজি নিয়মিত খেতে পারেন। এসব সবজিতে থাকা কিছু উদ্ভিজ্জ যৌগ প্রোস্টেটের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে।
অন্যদিকে, টমেটোতে থাকা লাইকোপেন একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। কিছু গবেষণায় লাইকোপেনসমৃদ্ধ খাবারকে প্রোস্টেটের সুস্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত পাওয়া গেছে। লাইকোপেন সমৃদ্ধ টমেটো প্রোস্টেট গ্রন্থি বড় হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। তাই নিয়মিত খাবারের অংশ হিসেবে টমেটো রাখা যেতে পারে।
স্বাস্থ্যকর চর্বি বেছে নিন
অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার অতিরিক্ত খেলে শরীরে প্রদাহ বাড়তে পারে এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই খাবারের তালিকায় স্যাচুরেটেড ও ট্রান্স ফ্যাট কমিয়ে স্বাস্থ্যকর চর্বির উৎস রাখা ভালো।
এ ক্ষেত্রে জলপাই তেল, বাদাম, আখরোট, বীজ এবং চর্বিযুক্ত মাছ বেছে নিতে পারেন। আমাদের দেশের পরিচিত ইলিশ, পাঙ্গাস, রুই ও কাতলা মাছেও বিভিন্ন ধরনের ফ্যাট রয়েছে। এই চর্বিগুলো শরীরে প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে এবং প্রোস্টেটের সার্বিক কার্যকারিতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
জিঙ্ক সমৃদ্ধ খাবার বাড়ান
প্রোস্টেটের স্বাভাবিক কার্যকারিতায় জিঙ্ক গুরুত্বপূর্ণ একটি খনিজ। এটি শরীরের বিভিন্ন কোষের বৃদ্ধি ও স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে। তাই দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় জিঙ্কসমৃদ্ধ খাবার রাখা উপকারী হতে পারে।
কুমড়ার বীজ, শিম ও অন্যান্য ডালজাতীয় খাবার, বাদামসহ বিভিন্ন খাবার জিঙ্কের ভালো উৎস। নিয়মিত ও পরিমিত পরিমাণে এসব খাবার খেলে বিপিএইচ-এর লক্ষণগুলো নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।
শরীরকে আর্দ্র রাখুন
সার্বিক সুস্থতার জন্য পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি। তবে বিপিএইচ-এর কারণে যদি রাতে বারবার প্রস্রাবের সমস্যা থাকে, তাহলে ঘুমানোর ঠিক আগে অতিরিক্ত পরিমাণে পানি বা অন্যান্য তরল পান করলে এই সমস্যা আরও বাড়তে পারে।
এছাড়া ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় ও অ্যালকোহল কমিয়ে আনা উপকারী হতে পারে। এসব পানীয় কিছু মানুষের ক্ষেত্রে মূত্রাশয়কে বেশি সক্রিয় করে তুলতে পারে এবং প্রস্রাবের বেগ বা ঘন ঘন টয়লেটে যাওয়ার প্রবণতা বাড়াতে পারে। তাই সারা দিনে প্রয়োজনীয় পানি পান করুন, কিন্তু শোয়ার আগে অতিরিক্ত তরল গ্রহণ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন।
লাল মাংস খাবার সীমিত করুন
লাল মাংস এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার প্রোস্টেটে প্রদাহ এবং হরমোনের ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করতে পারে। মুরগি, মাছের মতো চর্বিহীন প্রোটিন এবং শিম ও ডালের মতো উদ্ভিদ-ভিত্তিক প্রোটিন বেছে নিলে তা প্রোস্টেটের স্বাস্থ্য রক্ষায় সহায়তা করতে পারে।
সবুজ চা বা গ্রিন টি পান করুন
গ্রিন টি-তে ক্যাটেচিন থাকে, যার প্রদাহ-বিরোধী এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য প্রোস্টেটের জন্য উপকারী হতে পারে। নিয়মিত গ্রিন টি পান করলে তা বিপিএইচ-এর উপসর্গ কমাতে এবং মূত্রনালির সার্বিক কার্যকারিতা উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে।
আরও পড়ুন
ডেঙ্গুতে শুধু প্লাটিলেট কমায় না, লিভারও বিকল হতে পারে
ফাইবার গ্রহণ বাড়ান
আঁশযুক্ত খাবার হজমে সাহায্য করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ করে, যা মূত্রাশয়ের উপর চাপ সৃষ্টি করে বিপিএইচ-এর লক্ষণগুলোকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। গোটা শস্য, ডাল, ফল এবং শাকসবজি হলো খাদ্যতালিকাগত আঁশের চমৎকার উৎস।
আরও পড়ুন
৮ ঘণ্টা বসে কাজে রোগের ঝুঁকি কমাতে কতক্ষণ হাঁটবেন?
স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন
অতিরিক্ত ওজন, বিশেষ করে পেটের চারপাশে, বিপিএইচ- এর ঝুঁকি বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত। নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপের সাথে একটি সুষম খাদ্য স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখতে এবং প্রোস্টেটের কার্যকারিতা উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে।
এসএকেওয়াই